খাসিপুঞ্জিতে উচ্ছেদ আতঙ্ক: ১

ছোট্ট খ্রিস্টিনা খংলার মনে হামলার দগদগে স্মৃতি

প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২১ । ০০:০০ | আপডেট: ০৫ অক্টোবর ২১ । ২০:১৭ | প্রিন্ট সংস্করণ

তন্ময় মোদক, কুলাউড়া (মৌলভীবাজার) থেকে ফিরে

খ্রিস্টিনা খংলা

মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার মুড়ইছড়াপুঞ্জি পর্যন্ত সিএনজিচালিত অটোরিকশাতে করে যাওয়া যায়। তবে এরপর গাড়ি, এমনকি বাইসাইকেলে করে চলার পথও নেই। সেখান থেকে কুকিজুড়িপুঞ্জিতে যাওয়ার একমাত্র উপায় পায়ে হাঁটা। আদিবাসী খাসিরা নিজেদের গ্রামগুলোকে বলে পুঞ্জি। কয়েকশ ফুট উঁচু উঁচু কয়েকটি টিলা (ছোট পাহাড়) আর পাহাড়ি ঝিরি পেরিয়ে কুকিজুড়িতে যখন পৌঁছেছি, ঘড়িতে তখন সন্ধ্যা ৭টা। খাসিদের অনেক পুঞ্জিতে এখনও বিদ্যুৎ পৌঁছেনি। এখানে পল্লী বিদ্যুতের খুঁটি বসছে অনেক কসরতের পর। তাদের ঘরগুলোতে আলো জ্বলে, কারও কারও বারান্দায় ৬০ ওয়াটের বাল্ক্ব লেগেছে, তবু অন্ধকার যেন কাটে না। এখানেই থাকে খ্রিস্টিনা খংলার পরিবার। বাংলাদেশের দুটি মাতৃতান্ত্রিক আদিবাসীর একটি হলো খাসিরা। খাসিদের রীতি অনুযায়ী মায়ের খংলা উপাধিটি পেয়েছে খ্রিস্টিনা। পাঁচ বছর বয়সী এই খ্রিস্টিনার সামনেই কয়েক দিন আগে তার বাবা রাজ নংরুমকে বেদম পিটিয়েছিল সামাজিক বনায়নের উপকারভোগী স্থানীয় বাঙালিরা।

সামাজিক বনায়ন প্রাকৃতিক বনের খালি জায়গায় বন বিভাগের নতুন বনায়নের উদ্যোগ। সামাজিক বনায়ন বিধিমালা ২০০৪ অনুযায়ী, চারা লাগিয়ে নতুন বন সৃজন করবে উপকারভোগীরা। এসব বন দেখাশোনা করার দায়িত্বও তাদের। বন বিভাগের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী সৃজন করা বনের একটি অংশের মালিক হবেন উপকারভোগীরা। প্রকৃতপক্ষে সিলেটের কুলাউড়া অঞ্চলে সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, কথিত উপকারভোগী বাঙালিরা বনের জায়গায় বন সৃজনের নামে পানজুমও করছে। ফলে বিরোধ দেখা দিয়েছে আদি পানচাষি খাসিদের সঙ্গে।

বাঙালি উপকারভোগীদের হাতে নানাভাবে হামলা ও হয়রানির শিকার হচ্ছে খাসিরা। রাজের ওপর হামলা ওই সব ঘটনার একটি। নিজে মার খেয়ে মেয়েকে বাঁচিয়েছিলেন রাজ নংরুম। ঘরের বারান্দায় খ্রিস্টিনাকে কোলে করে বসে থাকা রাজ ভাঙা ভাঙা বাংলায় আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন ঘটনার বর্বরতা বোঝানোর। ২৭ আগস্টের ওই দিনটির বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, 'আমি সকালে বের হইসিলাম মেয়েটার দাঁতের ডাক্তার দেখাইতে। আসার পথে মুড়ইছড়া চা বাগানের গেটের সামনে আমাদের ওপর হামলা হয়। আমরা একটা সিএনজিতে চাইরজন খাসি আছিলাম, তারা চল্লিশ-পঞ্চাশজন। আমাদের সবাইরে মারসে।'

হামলাকারীদের মধ্যে সুন্দর নামের একজনকে চিনতে পেরেছেন রাজ। এই সুন্দরের সঙ্গেই ছোট থেকে বড় হয়েছেন তিনি, একসঙ্গে খেলেছেন, আড্ডা দিয়েছেন। সুন্দর একসময় পানজুমে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেছেন। যাদের সঙ্গে ওঠাবসা, চলাফেরা করেছেন, তারাই আজ হয়ে উঠেছেন শত্রু- রাজকে কষ্ট দেয় এ বিষয়টিই। হামলার সময় সুন্দরের কাছে কাকুতি-মিনতি করেছেন জানিয়ে রাজ বলেন, 'আমি তারে জিগাইলাম, সুন্দর ভাই, আমারে মারতায় কিতার লাগি? আমি কিতা দোষ করছি? সে আমারে কইল, আমরা খাসিয়া পাইলেই মারমু, গাড়ি থাকি নামিয়া আয়। ওই সময় আমার ছোট মেয়েরে টানিয়া নিয়া যাইতে চাইছিল। আমি জিগাইলাম, তোমরা আমার মেয়েরে মারবায়? কথার কুনু জবাব না দিয়া আমারে লাঠি দিয়া মারা শুরু করে। আমার মেয়েরেও মারতে চাইসে, আমি তারে বুকো শক্ত করিয়া জড়াইয়া রাখছি।'

হামলার শিকার হয়ে পাশের মুড়ই ছড়া পুঞ্জিতে খ্রিস্টিনাকে নিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন রাজ নংরুম। এসময় ছবিটি তুলেছিলেন মানবাধিকারকর্মী হিরামন হেলেনা তালাং

এসব কথা বলতে বলতে রাজ খ্রিস্টিনাকে বুকে জড়িয়ে দেখাচ্ছিলেন, সেদিন কীভাবে তিনি আগলে রেখেছিলেন মেয়েকে। একটু উশখুশের পর বাবার হাত সরিয়ে দিতে চাইছিল খ্রিস্টিনা, ছোট্ট শিশুটি চাপাচাপির দমবন্ধ অবস্থা নিতে পারছিল না। ওই ঘটনার পর থেকে অপরিচিত মানুষজন দেখলেই সে ভয় পায়, বলছিলেন রাজ। রাতে প্রায়ই ঘুমের মধ্যে 'এরি পডুঃ তে উ পা ঙে' বলে কান্না করে জেগে ওঠে। খাসিদের মনখেমে ভাষায় বলা এই বাক্যের বাংলা তরজমা- 'আমার বাবাকে মেরো না।' পুঞ্জিতে খেলতে বের হলে হঠাৎ চমকে ভয় পেয়ে চিৎকার শুরু করে ছোট্ট খ্রিস্টিনা। স্কুলে যাওয়া বন্ধ আছে এখন। কখনও রাস্তাঘাটে বা বাজারে যেতে হবে শুনলে ভয়ে কুঁকড়ে যায় এ বয়সেই নির্যাতনের অভিজ্ঞতা পাওয়া খ্রিস্টিনা। ভয়ে আছেন রাজও। আগে প্রায় প্রতিদিনই স্থানীয় বাজারে নানা কাজে গেলেও ঘটনার পর থেকে মাত্র একবার ওষুধ কিনতে বাজারে গিয়েছিলেন। আতঙ্ক ভর করেছে তার মনে। পানের জুমেও যেতে পারছেন না পুরোপুরি সুস্থ না হওয়ায়।

হামলার এ ঘটনায় থানাতে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। রাজের ভাষায়, 'আমরা অভিযোগ দিসিলাম। পুলিশ কইসে তারা দেখব। এর পর থাকি বাজারো যাই না। তারা (উপকারভোগীরা) কইসে, আমরারে পাইলেই মারব।'

ওই হামলাই শেষ নয়, খাসিদের ওপর আরও হামলার ঘটনা ঘটেছে। রাজদের ওপর হামলার দু'দিন পর পাশের লুটিজুড়ীপুঞ্জির আদিবাসী মান্দি (গারো) জনগোষ্ঠীর স্কুলশিক্ষক থমাস রিছিলকে মারধর করা হয়। থমাস শিক্ষকতা ছেড়ে এখন পান চাষের পাশাপাশি কবিরাজিও করেন। তার বাড়ির উঠানে বসে ঘটনা শুনছিলাম, সেদিন এক রোগীকে চিকিৎসার কথা বলে স্থানীয় বাঙালি এক অটোরিকশা চালক তাকে নিয়ে গিয়েছিলেন। চিকিৎসা শেষে পুঞ্জিতে ফেরার পথে লাঠিসোটা নিয়ে হামলা করা হয় তার ওপর। হামলাকারীরা একই। অথচ এ ঘটনায় থানা পুলিশ করতে চাইছেন না থমাস। বলেন, 'আমার পানজুম আছে। তারারে মামলায় দিলে আমরা পানগাছও কাটি দিবো। আমি তো তখন একবারে অচল অইযামু, সংসার চালাইতে পারতাম না।'

এই কথা বলা শেষে আঙুল দিয়ে দু'জনকে দেখিয়ে বলছিলেন, 'এদের পানগাছ কাইটা দিসে কয়দিন আগে। এরার অখন রুজি প্রায় নাই।' উঠানের এক কোনায় বসেছিলেন আদিবাসী মান্দি পারমত চিরাম ও খাসি উইলসন আমলেরং। সিলেটের এই দিকের খাসি গ্রামগুলোতে আদিবাসী খাসি ও মান্দিরা মিলেমিশেই থাকে। পাশের ডলুছড়াপুঞ্জির পানজুমে পারমতের সাত একর জায়গার ৮০০ ও উইলসনের তিন একর জায়গার ৪০০ গাছ কেটে দেওয়া হয়েছে। তাদের মোট ক্ষতি হয়েছে অন্তত আট লাখ টাকার মতো।

পুঞ্জির অন্যদের মতোই পারমত আর উইলসনের আয়ের একমাত্র অবলম্বন ছিল পানগাছগুলো। দু'জনের শ খানেক গাছের মতো রয়ে গেছে, এটুকু সম্পদ নিয়ে দিন পার করা কঠিন। পারমত সকালে জুমে কাটা পানগাছ দেখে এসে জানিয়েছিলেন উইলসনকে। ঘটনা শোনার পর কী করলেন- উত্তরে নিস্পৃহ গলায় উইলসন বলেছিলেন, 'কান্না করসি। আমাদের আর করার কী আছে?'

খাসিদের এ জায়গা থেকে উচ্ছেদ করে দিতেই এ হামলাগুলো করা হচ্ছে বলে মনে করেন মুড়ইছড়াপুঞ্জির হেডম্যান ও খাসিনেত্রী ফ্লোরা বাবলি তালাং। ঐতিহ্য ও প্রথা অনুযায়ী খাসিরা বনে পানচাষ করে উল্লেখ করে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের মহিলাবিষয়ক সম্পাদক বাবলি বলেন, 'বর্তমানে আমাদের মূল সমস্যা ভূমি। সামাজিক বনায়নের নামে আমাদের ভূমিতে থাকা পানজুমগুলো দখল করা হচ্ছে। বন বিভাগের সহায়তায় ভূমিখেকোরা এর সুবিধাটা নিচ্ছে। আমরা বাধা দিচ্ছি বলেই হামলা করা হচ্ছে।'

তার মতে, হামলা ও পানজুম দখল খাসিদের উচ্ছেদের প্রক্রিয়া। বাবলি বলেন, 'তাদের প্রধান লক্ষ্যই পানগাছগুলো কাটা। কারণ, এটিই আমাদের আয়ের একমাত্র উৎস। আমরা খুব আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছি। জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে গেছে।'

লুটিজুড়ী থেকে পাহাড় বেয়ে ফিরছিলাম, আকাশে তখন মধুপূর্ণিমার বিশাল চাঁদ। ঠিকরে পড়া আলোয় দেখা যাচ্ছিল দূরের কালাপাহাড়। সিলেটের এই সর্বোচ্চ পাহাড়ের ওপাশে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য। সেখানে 'ঊনকোটি'তে রঘুনন্দন পাহাড়ের পাথুরে গায়ে অষ্টম বা নবম শতাব্দীতে খোদাই করা হয়েছিল বিশাল সব চিত্র-ভাস্কর্য। সীমান্তের বেড়াজাল বাদ দিলে কালাপাহাড় থেকে এর দূরত্ব কয়েক কিলোমিটার। হাজার বছর আগে ওপাশে চিন্তার উৎকর্ষে শিল্পের অনন্য নিদর্শন গড়ে উঠেছিল, আর এখন এপাশে আদিবাসী পুঞ্জিগুলোতে চলে উচ্ছেদের প্রক্রিয়া। খাসি ভাষায় মা ডাক থাকলেও বাবাকে তারা বলে 'পা'। খ্রিস্টিনাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, বাবা আর মায়ের মধ্যে কাকে বেশি ভালোবাসে। উত্তরে মায়ের কথা বললেও বাবার হাতটি শক্ত করে ধরে রেখেছিল। কথা বলার পুরোটা সময়েই ওর চোখে ছিল ভয়ের ছবি। চোখের সামনে বাবার ওপর হামলার এই ট্রমা হয়তো তাকে সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হবে। খাসিদের ভূমি সমস্যা একদিন কাটলেও ছোট্ট মেয়েটি বড় হয়েও এই দাগ মুছে ফেলতে পারবে কি?

© সমকাল ২০০৫ - ২০২৩

সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com