রূপপুরে প্রথম পরমাণু চুল্লি

টেকসই উন্নয়নের পথে আরেক ধাপ

প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২১ । ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সম্পাদকীয়

পাবনার রূপপুরে নির্মাণাধীন দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে 'রিঅ্যাক্টর প্রেশার ভেসেল' বা পরমাণু চুল্লিপাত্র স্থাপনের মধ্য দিয়ে বহু আকাঙ্ক্ষিত এ প্রকল্প আরেক ধাপ এগিয়ে গেল। রোববার ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এর উদ্বোধন করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের দক্ষিণাঞ্চলে আরেকটি পারাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের যে প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন, তাও যথেষ্ট উৎসাহব্যঞ্জক।

কারণ দেশে যেভাবে প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ ফুরিয়ে আসছে এবং বিশ্ববাজারে গ্যাসসহ অন্যান্য জ্বালানির দাম যেভাবে বাড়ছে; তাতে পরমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে মনোযোগ দেওয়াই হবে দূরদর্শিতার প্রমাণ। বস্তুত খোদ রূপপুর পরমাণু কেন্দ্রই জ্বালানি খাত নিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শিতার অন্যতম প্রধান প্রমাণ। রোববারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী যথার্থ বলেছেন, পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গেও পাকিস্তান আমলের বঞ্চনার ইতিহাস জড়িত। তারা ধোঁকাবাজি করেছে শুধু জমি বরাদ্দ করে। আর প্রকল্পের বরাদ্দ পশ্চিম পাকিস্তানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। আমরা দেখেছি, বঙ্গবন্ধু সত্তরের নির্বাচনেই এই পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের দাবি তুলেছিলেন। আর স্বাধীনতার পর স্বল্প সময়ের মধ্যে আইএইএ তথা আন্তর্জাতিক আণবিক সংস্থার সঙ্গে চুক্তি করেন। আমাদের দুর্ভাগ্য, পঁচাত্তরের মর্মান্তিক পট পরিবর্তনের পর আরও অনেক ইতিবাচক ও উন্নয়নমূলক উদ্যোগের মতো পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পও হিমাগারে চলে যায়।

আমরা জানি, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার টানা তিন মেয়াদের প্রথম থেকেই বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধিতে বিশেষ মনোযোগ দিয়ে এসেছে। অথচ 'ফাইভ ডিজিট' উৎপাদনে পৌঁছার কথা মাত্র এক দশক আগেও ভাবা যেত না। বিশেষত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা চার হাজার মেগাওয়াটও ছুঁতে পারেনি। বিদ্যুৎ সংযোগের অভাবে আবাসন ব্যবসা এবং শিল্প স্থাপনেও এসেছিল স্থবিরতা। গ্রামীণ জনপদেও বিদ্যুতের অভাবে চাষাবাদ বিঘ্নিত হতে দেখা গেছে। কিছু সমালোচনা সত্ত্বেও বিদ্যুৎ খাতে সম্পূর্ণতা অর্জনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বর্তমান সরকার 'কুইক রেন্টাল' ও প্রতিবেশী দেশ থেকে বিদ্যুৎ আমদানির মতো উদ্ভাবনী পদক্ষেপ গ্রহণ করায় গুরুত্বপূর্ণ এ খাতে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পেরেছি। গত মাসেই বিভিন্ন এলাকায় অবস্থিত মোট ৭৭৯ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন পাঁচটি বিদ্যুৎকেন্দ্র উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে দেশ শতভাগ বিদ্যুতায়নের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এই বিদ্যুৎ উৎপাদন টেকসই করতে সহায়ক হবে বলে প্রত্যাশিত। এখন এ প্রকল্প যথাসময়ে সম্পন্ন করার দিকে মনোযোগ দিতে হবে।

আমাদের মনে আছে, বর্তমান সরকার ২০০৯ সালে দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই প্রকল্পটি নিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনা করে এবং ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রায় পরিত্যক্ত রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎ প্রকল্পের বিপুল গতি সঞ্চারের কৃতিত্ব বর্তমান সরকার পেতেই পারে। অস্বীকার করা যাবে না, দীর্ঘসূত্রতা ছাড়াও প্রকল্পটির কারিগরি দিক নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। বিশেষত পরমাণু বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়টি। তবে সরকারের পক্ষে সবসময়ই আশ্বস্ত করা হয়েছে। আমারও মনে করি, এত বড় ও নানা বিবেচনায় স্পর্শকাতর এ প্রকল্প বাস্তবায়ন ও পরিচালনায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে সবার আগে। আগামী দিনগুলোতেও আমরা দেখতে চাইব, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটির নিরাপত্তা সর্বাধিক গুরুত্ব পেয়েছে।

মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে পরমাণু বিদ্যুৎ প্রকল্পে যে কোনো ধরনের দুর্ঘটনা জনবিরল দেশের তুলনায় বহুগুণ মারাত্মক হয়ে দেখা দিতে বাধ্য। ভাবতে হবে তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশের পক্ষে বিপর্যয় সামাল দেওয়ার আর্থিক ও কারিগরি সামর্থ্যের কথাও। স্বস্তির বিষয়, রূপপুর পরমাণু প্রকল্প নিয়ে বিভিন্ন সময়ের বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীও এ বিষয়ে আলোকপাত করেছেন। তিনি বলেছেন, সব ধরনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। রোববারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সভাপতি বিজ্ঞানমন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান ব্যাখ্যা করেছেন, এই পর্ব হচ্ছে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। অন্যান্য বক্তার এই বক্তব্যও প্রণিধানযোগ্য যে, প্রকল্পটি পরিবেশবান্ধব। আমরা প্রত্যাশা করি, এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের উন্নয়ন যেমন ত্বরান্বিত হবে, তেমন হয়ে উঠবে টেকসই।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২১

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com