করোনা পরীক্ষার সুযোগ মিলেছে, সুবিধা মেলেনি কম ভোগান্তির

সরেজমিন বিমানবন্দর

প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২১ । ০০:০০ | আপডেট: ১২ অক্টোবর ২১ । ০২:০৫ | প্রিন্ট সংস্করণ

শহিদুল আলম

কুমিল্লা সদর দক্ষিণের সাইফুল ইসলাম গত ৭ মার্চ সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে দেশে এসেছিলেন ছুটিতে। তিন মাসের ছুটি শেষে ৫ জুন কর্মস্থল আবুধাবি ফেরার টিকিট ছিল তার। বিমানবন্দরে করোনা পরীক্ষার সুবিধা না থাকায় এতদিন যেতে পারেননি। পিসিআর টেস্ট শুরু হওয়ায় শনিবার রাত ২টার ফ্লাইটে আবুধাবি ফিরেছেন সাইফুল। তবে এ জন্য তাকে পোহাতে হয়েছে ১৭ ঘণ্টার ভোগান্তি। বাড়ি থেকে বেরিয়ে দিনভর অপেক্ষা, করোনা পরীক্ষার লাইন ধরা, পরীক্ষার ফল পেতে ভিড় ও ভোগান্তি শেষে তিনি কর্মস্থলের উড়োজাহাজে চড়েন।

সাইফুলের মতো সব প্রবাসী কর্মী এবং আমিরাতগামী যাত্রীদের একই ভোগান্তি সইতে হচ্ছে। বিমানবন্দরে করোনা পরীক্ষার সুযোগ তৈরি হলেও কম ভোগান্তির সুবিধা নেই। অনেক কষ্ট সহ্য করে তাদের বিদেশে ফিরতে হচ্ছে।

আমিরাতের শর্ত মেনে যাত্রার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে করোনা পরীক্ষা করা হচ্ছে। ফলাফল নেগেটিভ এলে বিমানবন্দরে এসে বিমান উড্ডয়নের ছয় ঘণ্টা আগে করোনা পরীক্ষা করা হচ্ছে। তাতে করোনা নেগেটিভ এলে তবেই বিমানে চড়ার সুযোগ মিলছে। ছয় ঘণ্টা আগে করোনা পরীক্ষা করার শর্ত থাকলেও যাত্রীদের আসতে হচ্ছে কমপক্ষে আট ঘণ্টা আগে।

শনিবার বিকেল ৩টায় সাইফুলের সঙ্গে কথা হয় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের দুই নম্বর টার্মিনালের সামনে। সেখানে তিনি দুই আত্মীয়কে নিয়ে ব্যাগবোচকাসহ দেয়ালে হেলান দিয়ে বসেছিলেন।

সাইফুল জানান, আগের দিন তিনি কুমিল্লা সরকারি হাসপাতালে করোনা পরীক্ষা করান। শুক্রবার সন্ধ্যায় নেগেটিভ সনদ পান। শনিবার সকাল ১০টায় ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। যানজট না থাকায় দুপুর ১টায় বিমানবন্দরে পৌঁছে যান। এসে জানতে পারেন, বিমান ছাড়ার ছয় ঘণ্টা আগে অর্থাৎ সন্ধ্যা ৬টায় বিমানবন্দরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারবেন। পাঁচ ঘণ্টা অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু কোথায় অপেক্ষা করবেন? কোনো বন্দোবস্ত নেই। তাই টার্মিনালের সামনে ব্যাগবোচকা নিয়ে শুয়ে-বসে সময় পার করছেন। সাইফুলের সঙ্গে টেলিফোনে কথা হয়। তিনি জানান, ৬টায় বিমানবন্দরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে করোনা পরীক্ষার নমুনা দিতে লাইনে দাঁড়ান। তিন ঘণ্টা লাইনে দাঁড়ানোর পর নমুনা দেন। তারপর আবার তিন ঘণ্টা লাইন ধরে করোনার ফল হাতে পান। ছয় ঘণ্টা চলে গেছে লাইনে দাঁড়িয়ে।

কেন এমন অপেক্ষার ভোগান্তি? বিমানবন্দরের কর্মকর্তারা জানালেন, সমস্যা ফ্লাইটের সময়সূচিতে। সন্ধ্যা ৭টা থেকে সাড়ে ৭টার মধ্যে আমিরাতের দুবাই ও আবুধাবিগামী তিনটি ফ্লাইট ছাড়ে। আবার রাত ১টা থেকে ২টার মধ্যে তিনটি ফ্লাইট ঢাকা থেকে যাত্রা করে।

সন্ধ্যার যাত্রীদের দুপুর ১টার পর থেকে করোনার নমুনা দিতে হয়। নমুনা দিয়ে ফল পেতে কমপক্ষে চার ঘণ্টা লাগে। বিমান উড্ডয়নের এক ঘণ্টা আগে ফল পেতে হলে ৬টা থেকে সাড়ে ৬টার মধ্যে সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করতে হয়। বিমান উড্ডয়নের এক ঘণ্টা আগে বোর্ডিং পাস সংগ্রহের বাধ্যবাধকতা থাকায় এই তিন ফ্লাইটের হাজেরখানেক যাত্রীর করোনা পরীক্ষা ও ফল দেওয়ার চাপ তৈরি হয় এই পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ ঘণ্টার মধ্যে।

মধ্যরাতের তিন ফ্লাইটের আরও হাজারখানেক যাত্রীর পরীক্ষার চাপ তৈরি হয় রাত ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে। রাত ১২টা থেকে ১টার মধ্যে তাদের ফল নিতে হয়। গত সোমবার নির্ধারিত সময়ে ফল না পাওয়ায় ৮০ যাত্রী বিমানে উঠতে পারেননি।

আমিরাতগামী যাত্রীদের করোনা পরীক্ষায় গত ১৬ সেপ্টেম্বর বিমানবন্দরে স্থাপিত হয় ছয়টি ল্যাব। নানা টানাপোড়েন ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার পর ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে টেস্ট শুরু হয়েছে। তারা ১২টি মেশিনে দিনে গড়ে আড়াই হাজার যাত্রীর করোনা পরীক্ষা করছেন। ১২টি মেশিনে চার ঘণ্টায় এক হাজার ২০০ নমুনা পরীক্ষা করা যায়। কোনো ল্যাবেই র‌্যাপিড টেস্ট সুবিধা নেই। পিসিআর টেস্ট করা হয়, যাতে ফল পেতে তিন থেকে চার ঘণ্টা লাগে। র‌্যাপিড টেস্টে ঘণ্টাখানেক সময় লাগে। ভারত, পাকিস্তানসহ বাকি দেশগুলো আমিরাতের শর্ত পূরণে বিমানবন্দরে র‌্যাপিড সুবিধা চালু করেছে। শাহজালালে র‌্যাপিড টেস্ট সুবিধা কিংবা ল্যাবে মেশিন সংখ্যা বাড়লে অপেক্ষার ভোগান্তি কম হতো।

বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ এইচ এম তৌহিদ-উল-আহসান সমকালকে বলেন, সময় মতো সার্টিফিকেট না পাওয়ায় কয়েকজন যাত্রী বিমান ধরতে পারেননি। তবে এ বিষয়ে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) কিছু করার নেই। বেবিচক শুধু যাত্রীদের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করে। যাত্রীরা সময় মতো সনদ পাচ্ছে কিনা, দীর্ঘ লাইন কেন হচ্ছে- তা দেখার দায়িত্ব স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের।

করোনার নমুনা পরীক্ষার ল্যাব এলাকায় যাত্রী ব্যতীত বাকিদের প্রবেশের সুযোগ নেই। রোববার সন্ধ্যায় ঢাকা ত্যাগ করা দুবাইয়ের যাত্রী আজিজুল ইসলাম সমকালকে জানান, নমুনা দেওয়ার লাইন ধরা থেকে ফল হাতে পেতে পাঁচ ঘণ্টা লেগেছে। শনিবার বিমানবন্দরের এক নম্বর টার্মিনালের কাচের দরজার বাইরে থেকে দেখা গেছে, ল্যাবের কাউন্টারগুলোর সামনে হুড়োহুড়ি ভিড়।

বিমানবন্দরের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. শাহরিয়ার সাজ্জাদ হোসেন বলেন, প্রতিদিন গড়ে আড়াই হাজার যাত্রীর পরীক্ষা করতে হয়। ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে ১৫ হাজারের বেশি যাত্রীর পরীক্ষা করা হয়েছে। তাদের মধ্যে অন্তত ১০ জন পজেটিভ হয়েছেন। দীর্ঘ লাইন ও ভোগান্তির কারণ ৭টা থেকে সাড়ে ৭টার মধ্যে তিনটি ফ্লাইটের প্রায় এক হাজার যাত্রীর করোনা পরীক্ষা করতে হয়। ফ্লাইটগুলো কয়েক ঘণ্টা পরপর ছাড়লে এই চাপ হতো না।

বিমানবন্দর সূত্র জানিয়েছে, ফ্লাইটের সময়সূচি পরিবর্তন করা প্রায় অসম্ভব। ফ্লাইটের স্লট নির্ধারণ একটি জটিল বিষয়। বাংলাদেশ চাইলেই এককভাবে সময়সূচি নির্ধারণ করতে পারবে না। আমিরাত কর্তৃপক্ষেরও অনুমতি প্রয়োজন। তাদের বিমানবন্দরগুলোতে কোন উড়োজাহাজ কখন অবতরণ করবে- তা বছরখানেক আগেই ঠিক হয়।

বিমানবন্দরের অভ্যন্তরে ল্যাবগুলোর সামনে পর্যাপ্ত জায়গা নেই। প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী ইমরান আহমদ দুই দফা বিমানবন্দর পরিদর্শন করে জানিয়েছিলেন, পার্কিং ভবনের ছাদে বসবে ল্যাব। এর জন্য স্টিলের স্থাপনা নির্মাণ করা হবে, যাতে সপ্তাহ দুয়েক সময় লাগবে। ১১ দিন পার হলেও এখন পর্যন্ত এমন স্থাপনা নির্মাণের কোনো উদ্যোগ নেই। গ্রুপ ক্যাপ্টেন এম তৌহিদ-উল-আহসান বলেছেন, পার্কিংয়ের ছাদে স্থায়ীভাবে ল্যাব স্থাপনের প্রস্তাব পায়নি বেবিচক।







© সমকাল ২০০৫ - ২০২১

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com