ইউপি নির্বাচন

অন্তত মেম্বার সাহেবদের ছাড় দিন

প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২১ । ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মোশতাক আহমেদ

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সামনে রেখে জনৈক ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরেই গ্রামের বাড়ি বাড়ি হেঁটে আসন্ন নির্বাচনে মেম্বার পদে নিজের প্রার্থিতা প্রচার করে চলেছেন। সাড়াও পেয়েছেন মানুষের। খুব বেশি না হলেও মোটামুটি। এ অবস্থায় মনোনয়ন জমা দেওয়ার মাত্র পাঁচ দিন আগে হঠাৎ করে গ্রামের ক'জন প্রভাবশালী ব্যক্তি সম্ভাব্য প্রার্থীদের ডেকে এক 'দরবার' বসালেন। সেই দরবারে তিন প্রার্থীর মধ্যে একজনকে গ্রামের পক্ষ থেকে প্রার্থী ঘোষণা করে অন্য দু'জনকে 'বসে যেতে' নির্দেশ দেওয়া হলো। সেই সঙ্গে এ-ও জানিয়ে দেওয়া হলো, যদি কেউ এই সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নিজেকে প্রার্থী ঘোষণা করে তাহলে তার বিরুদ্ধে 'সর্বাত্মক ব্যবস্থা' নেওয়া হবে। (অনেকটা সর্বাত্মক লকডাউনের মতো)। এমনকি যে বা যারা তার প্রার্থিতার পক্ষে প্রস্তাবক বা সমর্থক হবে, তাদের ক্ষেত্রেও এই বিচার এবং শাস্তি প্রযোজ্য হবে। না, এ কোনো দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার কাহিনি নয়, এটা আমাদের বাংলাদেশেরই এক উপজেলার গল্প। গতকালই আমার নিজ উপজেলার একজন টেলিফোনে আমাকে এ কথা জানালেন। অবিশ্বাস করার তেমন কোনো কারণ নেই। এ কারণেই যে, আরও কয়েক জায়গা থেকেও একই রকম কথা শুনেছি। এভাবেই এগিয়ে চলেছে আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের নির্বাচনী রথ।

আর মাত্র কদিন পরই ১১ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দ্বিতীয় ধাপের ৮৪৮টি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন। তৃণমূল পর্যন্ত বিস্তৃত একমাত্র বিরোধী দল বিএনপি এই নির্বাচনে অংশ নেবে না- এ কথা আগেই জানিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশের আর কোনো দলেরই যেহেতু গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত সংগঠন নেই, তাই এই নির্বাচন যে অনেকটা একদলীয়ভাবেই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, তাতে কোনোই সন্দেহ নেই। অবশ্য সিপিবিসহ ছোটখাটো দু-একটি দলও অংশ নিচ্ছে। কিন্তু এসব দলের সাংগঠনিক অবস্থা বিবেচনায় তাদের এই অংশগ্রহণ নির্বাচনের একদলীয় চরিত্রকে খুব একটা পাল্টাতে পারবে এমনটি আশা করার কোনো কারণ আপাতত দেখছি না।

কিছুদিন আগেই (২০ সেপ্টেম্বর) ইউপি নির্বাচনের প্রথম ধাপের দ্বিতীয় পর্যায়ে ১৬০টি ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে। এর আগে গত এপ্রিলে প্রথম ধাপের প্রথম পর্যায়ে ২০৪টি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। বিভিন্ন কারণে সাতটি ইউনিয়নের নির্বাচন স্থগিত রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, প্রথম ধাপে অনুষ্ঠিত ৩৬৪টি ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে ৬৯ প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন।

এই বাস্তবতাতেই দেশে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দ্বিতীয় ধাপের ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন। যেহেতু মাঠে কোনো বিরোধী দল নেই, তাই সরকারি দলের লোকেরাই বিরোধী দলের 'প্রক্সি' দিয়ে মাঠ মাতিয়ে রেখেছেন। জানা যায়, দলীয় মনোনয়ন লাভে লবিং এবং তদবিরের জন্য এক সপ্তাহ ধরে দেশের প্রায় ৮৫০টি ইউনিয়ন থেকে নূ্যনতম আট হাজার নেতাকর্মী ঢাকায় অবস্থান করেছেন। নিজ নিজ মনোনয়ন নিশ্চিত করার জন্য প্রার্থীরা সম্ভাব্য কার্যকর এমন কোনো পথ নেই, যে পথে তারা হাঁটেননি। নিজ নিজ এলাকার প্রভাবশালী আমলা, সাংসদ, নেতা, কবি, সাংবাদিক, কোনো মাধ্যমকেই তারা বাদ রাখেননি। নিন্দুকেরা অবশ্য অন্য রকম প্রচারও করছে যে, মনোনয়নে নাকি টাকা-পয়সাও খরচ করা হয়েছে। এমন অনেক মনোনয়নপ্রত্যাশীকে দেখেছি যারা কোনোদিন দলীয় কোনো কর্মসূচিতেও অংশ নেননি। অথচ মনোনয়ন নিতে এসেছেন এই আশায়, 'যদিই লাইগ্যা যায়' তাহলে আর ঠেকায় কে? মার্কা পেলেই হলো। আর কিছুর দরকার নেই।

যেহেতু নির্বাচনে কোনো বিরোধী দল নেই এবং নিজ দলের সম্ভাব্য বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। তাই অতীতের মতো এবারও আশা করা যেতে পারে, বেশ কিছুসংখ্যক চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে যাবেন। কিন্তু পরিষদের সদস্য বা মেম্বার পদের নির্বাচন যেহেতু দলীয়ভাবে হচ্ছে না, তাই এই পদের জন্য উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রার্থী মাঠে থাকবেন- এটাও আশা করা যেতে পারে। কিন্তু এখানেই হয়েছে যত সমস্যা। যদি কোনোভাবে বিরোধী কেউ জিতেই যায় তাহলে 'শক্তির একচ্ছত্র অধিকার' বা 'মনোপলি অব পাওয়ার'-এ ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থেকে যাবে। এটা তো মেনে নেওয়া যায় না! তাই স্থানীয় সরকার কাঠামোর নিম্নতম ধাপের এই পদটির দিকেও কর্তৃত্ববাদীরা তাদের থাবা প্রসারিত করছে এবং স্থানীয় গ্রামীণ মাতবরের নামে মূলত রাষ্ট্রের কর্তৃত্ববাদিতার সুবিধাভোগীরাই এই পদটিরও গলাটিপে ধরার চেষ্টা করছে।

শতাব্দী প্রাচীন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান পদটি সামাজিক মর্যাদার প্রতীক। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হওয়ার বা জয়ী করার মধ্য দিয়ে এই পদটির নির্বাচনকেও হাস্যাস্পদ করে তুলেছি। বাকি আছে একমাত্র বেচারা মেম্বার সাহেব। এটিকেও যদি মাতবর সাহেবরা গিলে খান, তাহলে নির্বাচন নামক ক্রিয়াটির আর কোনো প্রয়োজনই থাকবে না। আমরা কি সেদিকেই যাচ্ছি?

এ ধরনের নির্বাচনে কারা বা কোন শক্তি লাভবান হয় বেশি? আলোর নাকি অন্ধকারের? তাই সংশ্নিষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এটুকুই বলব, দয়া করে নির্বাচন ব্যবস্থার প্রান্তিকতম পদটিকেও এভাবে শেষ করবেন না। এতেও যদি ভোটার ও প্রার্থী উৎসাহ হারিয়ে ফেলে, বাংলাদেশে ভবিষ্যতে আর কোনোদিন কার্যকর নির্বাচন হবে না। এমনকি কেন্দ্রে বিরিয়ানি খাওয়ার ব্যবস্থা করলেও ভোটার পাওয়া কঠিন হবে।

জাতিসংঘের সাবেক কর্মকর্তা

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com