সিরাজগঞ্জের ৩ মহাসড়কে ৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ যানজট

প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২১ । ১৯:২১ | আপডেট: ১৪ অক্টোবর ২১ । ১৯:৪৭

সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি

নলকা সেতুর মেরামত কাজের কারণে বেড়েছে যানজট -সমকাল

বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম পাড়ে সিরাজগঞ্জের ঢাকা-রংপুর, ঢাকা-রাজশাহী ও বগুড়া-নগরবাড়ি মহাসড়কে যানজট ও যাত্রী দুর্ভোগ এড়াতে তড়িঘড়ি শেষ হলো সওজের নলকা সেতুর মেরামত কাজ। বৃহস্পতিবার দুপুরে মেরামত কাজ শেষ করার পর সেতুর ওপরিভাগে দুটি লেনই খুলে দেওয়া হয়। এরপর আটকে পড়া শত শত বাস-ট্রাক হুরোহুরি করে ছুটতে গিয়ে নতুন করে যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে তিন মহাসড়কে ৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়।

বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সেতুর উপরিভাগের মেরামত কাজ তড়িঘড়ি শেষ করার পর হঠাৎ বিরতি নেয় সওজ। নলকা সেতু সংলগ্ন পশ্চিমে পার্শ্বরাস্তার খানাখন্দ ও এবড়োথেবড়ো অংশের মেরামত আপাতত বন্ধ। জনদুর্ভোগ ও যানজট নিরসনে আগামী সোমবার থেকে ওই কাজে হাত দেবে সওজ।

ফুলজোর নদীর উপরে ষাটের দশকে নির্মিত জরাজীর্ণ ও ভঙ্গুর এ নলকা সেতুর উপরিভাগে গত কয়েকদিন থেকে মেরামত কাজ চলছে। সেতুর মাঝে পাটাতনের নিচে বেশ ক'টি অংশে ফুটো ও ভঙ্গুর দশায় দশদিন থেকে ঢাকা-উত্তরের যানবাহন চলাচলে বিড়ম্বনার কারণে প্রচণ্ড যানজট দেখা দেয়। এরপর সওজ থেকে মেরামত কাজ শুরু করলে যানজট ও যাত্রী দুভোর্গ বেড়ে যায়। 

এদিকে, বৃহস্পতিবার ভোর থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তিন মহাসড়কে প্রচণ্ড যানজট। বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিমে ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের সয়দাবাদ, মুলিবাড়ি, কড্ডা, কোনাগাঁতী, কাশেমমোড়, পিজিএল অফিস ও নলকা পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার অংশে যানজটে দীর্ঘ সময় আটকে আছে ঢাকা-উত্তরাঞ্চলের বাস-ট্রাক। পার্শ্ববর্তী নগরবাড়ি-বগুড়া মহাসড়কের ২০ কিলোমিটার অংশেও যানজট রয়েছে। হাটিকুমরুল মোড় হয়ে নাটোর-বনপাড়া ও বগুড়া-নগরবাড়ি মহাসড়কের আরও প্রায় ২০ কিলোমিটার অংশেও যানজট ছড়িয়ে পড়েছে। ভ্যাপসা গরমে বাস-ট্রাকে দীর্ঘক্ষণ আটকে নাকাল হয়ে পড়েছেন ঢাকা-উত্তরাঞ্চলের চালকযাত্রীরা। নলকা সেতুতে একটি লেন বন্ধ রেখে নিয়ন্ত্রিতভাবে যানবাহন চলতে দেওয়ায় জট বাড়তে থাকে। দুপুরে মেরামত কাজ আপাতত তড়িঘড়ি শেষ করা হলেও জট পুরোপুরি কমেনি।

পিজিসিএল মহাব্যবস্থাপক (মার্কেটিং) সাইদুল ইসলাম বলেন, 'কয়েকদিন থেকে দিনভর সেতুর পশ্চিম পাড় থেকে নলকার মোড় হয়ে হাটিকুমরুল অভিমুখে প্রচণ্ড যানজট। এ ধরনের ভয়াবহ অবস্থা ঈদের আগে সাধারণত দেখা যায়।'

শহরের গোশালা রোডের করোতোয়া কুরিয়ার এজেন্ট গোলাম মোস্তফা বলেন, 'বুধবার বিকেলে বগুড়া থেকে গাড়ি ছেড়ে সিরাজগঞ্জ-রংপুর মহাসড়কের চান্দাইকোনা ও ভুইয়াগাতী আটকে ছিল। দুই ঘণ্টার পথ হলেও বৃহস্পতিবার সকালে সেই গাড়ি এসেছে।'

সিরাজগঞ্জ পত্রিকা বিক্রয় সমিতির সাধারণ সম্পাদক আমির আলী বলেন, 'ঢাকা থেকে উত্তরাঞ্চলের পেপার পরিবহনকারী গাড়ি বৃহস্পতিবার দুপুর দেড়টায় বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম পাড়ে সয়দাবাদে আটকে আছে। উত্তরাঞ্চলের অন্যান্য জেলায় পত্রিকা পাঠানো তো দূরের কথা, সিরাজগঞ্জেই এখনও নামেনি পত্রিকা। দেরির কারণে উত্তরাঞ্চলের সব বিক্রয় প্রতিনিধিরা মহাবিপাকে পড়েছেন।'

অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী মোস্তফা শরিফ বলেন, 'আমার ভাগ্নি জামাই ঢাকার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। শ্যামলী থেকে বুধবার সকাল ৮টায় প্রাইভেটকারে তিনি পাবনার দিকে রওনা দেন। রাত সাড়ে ৯টার দিকে সিরাজগঞ্জের নলকা সেতুর পূর্বদিকে দীর্ঘ প্রায় ৫/৬ ঘণ্টা আটকে থাকেন। ২২ ঘণ্টা পর তিনি পাবনা পৌঁছান। এভাবে বাচ্চাদের নিয়ে প্রচণ্ড গরমে বেশ নাকাল হয়েছেন।'

জেলা ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (এডমিন) মো. সালেকুজ্জামান খান বলেন, 'রাতে কম থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যানজট প্রচণ্ড বাড়ে। দুপুরের পর আবার কিছুটা কমলেও বিকেল থেকে আবার যানজট বাড়তে থাকে। আর আজ (বৃহস্পতিবার) সন্ধ্যার পর গতকালের চেয়ে যানজট আরও বেড়েছে।'

হাটিকুমরুল হাইওয়ে ট্রাফিক ইন্সপেক্টর রফিকুল ইসলাম বলেন, 'সওজের মেরামত কাজ শেষ হলেও উত্তরাঞ্চলের চেয়ে ঢাকার দিকে যানবাহন ধীর গতিতে চলছে। বগুড়া হাইওয়ে পুলিশের এসপি মুন্সী শাহাব উদ্দিন বলেন, 'সওজের প্রতি বছরই এ ধরনের মেরামত শুরু হয়। জেলা ও ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে আমাদেরও দায়িত্ব বাড়ে।'

সিরাজগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. হাসিবুল আলম বলেন, 'মহাসড়ক নির্মাণ, রক্ষাবেক্ষণ, মেরামত ও সংস্কারের দায়িত্বে সওজ। নলকা সেতুটি অনেক দিন থেকেই জরাজীর্ন ও ভগ্নদশা। মাঝখানে ফুঠো হয়ে গেছে। সেতুটি সরু, ভারী যানবাহন পারাপারে সক্ষমও নয়। এ সমস্যাটি দীর্ঘদিনের। আমাদের ছয়শ পুলিশ এ ক্রান্তিকালে মহাসড়কে দিনরাত দায়িত্ব পালন করছেন। আমি নিজেও রাতভর মহাসড়কে ছিলাম। আমরা তো রাস্তা বা সেতুর সক্ষমতা বাড়াতো পারবো না। সওজ যদি সেতু ও রাস্তার ক্যাপাসিটি বাড়িয়ে দিতে পারে, আমরা মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে ইনশাল্লাহ যানজট নিরসন করে দিতে পারব।'

সওজ নির্বাহী প্রকৌশলী দিদারুল আলম তরফদার বলেন, 'মহাসড়কে যানবাহনের প্রচণ্ড চাপের কারণে মেরামত কাজ বিঘ্ন ঘটেছে, সময়ও বেশি লেগেছে। আপাতত সেতুর মেরামত কাজ শেষ। যাত্রী দুভোগ এড়াতে পার্শ্বলেনের কাজ সোমবার শুরু হবে।'

জেলা প্রশাসক ড. ফারুক আহাম্মদ বলেন, 'সওজের মেরামত কাজ শুরু হলেই যানজট ও যাত্রী বিড়ম্বনা শুরু হয়।'

প্রসঙ্গত, বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিমে টাঙ্গাইল-রংপুর মহাসড়কে ফুলজোড় নদীর উপরে সওজের  ঝুঁকিপূর্ণ নলকা সেতু দিয়ে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কমপক্ষে ২২ জেলার যানবাহন চলছে। ১৯৯৮ সালে বঙ্গবন্ধু সেতু উদ্বোধনের পর থেকে ভারী যানবাহন চলাচলের কারণে নলকা সেতুর উপরিভাগে 'জয়েন্ট এক্সপানশন' ও বিটুমিনের স্তর প্রতিবছরই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত অংশে প্রতি বছরই সওজ থেকে মেরামত-সংস্কার কাজ করা হচ্ছে। মেরামত কাজ শুরু যানজট বেড়ে যায়।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com