প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিষয়ে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন: ধর্মীয় নেতাদের ভূমিকা

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা বদলাতে হবে

প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২১ । ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

--

সমাজে কিছু মানুষের মধ্যে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে এখনও নানা রকম ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে। কেউ কেউ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে পিতামাতার পাপের ফল বা সৃষ্টিকর্তার অভিশাপ হিসেবে গণ্য করেন। অথচ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরাও দুঃখ-কষ্ট, আনন্দ-বেদনা ও প্রীতি অনুভব করেন এবং উচ্ছ্বসিত হন। তারা মেধা-মনন, জ্ঞানে-ধ্যানে এবং আত্মশক্তিতে বলীয়ান হতে চান। সব ধর্মই তাদের অধিকার এবং সম্মানের স্বীকৃতি দিয়েছে। জন্মগ্রহণ কারও দোষ নয়, কর্মই প্রধান। গত ৯ সেপ্টেম্বর 'প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিষয়ে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন :ধর্মীয় নেতাদের ভূমিকা' শীর্ষক ওয়েবিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। এতে চারটি ধর্মের চারজন ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরআন, বাইবেল, ত্রিপিটক ও গীতা থেকে প্রতিবন্ধিতা নিয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। পবিত্র ধর্মগ্রন্থে প্রতিবন্ধী মানুষকে কীভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, তা বর্ণনা করেন। বক্তারা বলেন, 'প্রতিবন্ধিতা পিতামাতার পাপের ফল', 'প্রতিবন্ধিতা সৃষ্টিকতার অভিশাপ'- এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করাও পাপ। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতি অবমাননাকর আচরণের মাধ্যমে কিছু লোক অপরাধ করছেন। বিভেদ-বৈষম্য চিরতরে মুছে ফেলতে হবে। বদলাতে হবে দৃষ্টিভঙ্গি। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা দূর করতে সচেতনতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই। ডিজঅ্যাবিলিটি রাইটস ফান্ডের সহায়তায় দৈনিক সমকাল ও অ্যাকসেস বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এতে সহ-আয়োজক ছিল ডিজঅ্যাবল্ড চাইল্ড ফাউন্ডেশন (ডিসিএফ), প্রতিবন্ধী নারীদের জাতীয় পরিষদ (এনসিডিডব্লিউ), সীতাকুণ্ড ফেডারেশন, টার্নিং পয়েন্ট ফাউন্ডেশন ও উইমেন উইথ ডিজঅ্যাবিলিটিজ ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (ডব্লিউডিডিএফ)।

আলবার্ট মোল্লা

সমাজে কিছু মানুষের মধ্যে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে এখনও নানা রকম ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে। সমাজের কিছু মানুষ এটিকে পিতামাতার পাপের ফল বা সৃষ্টিকর্তার অভিশাপ হিসেবে গণ্য করে থাকেন। প্রকৃতপক্ষে এটি একটি ভ্রান্ত ধারণা।

সম্প্রতি একটি টেলিভিশন চ্যানেলে 'ঘটনা সত্য' নামে একটি নাটক প্রচার করা হয়। যেখানে মূলবার্তা দেওয়া হয়েছে- প্রতিবন্ধী সন্তান মা-বাবার পাপের ফল। এ ধরনের বার্তা সমাজে একটি নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি করবে। আমরা গভীরভাবে বিশ্বাস করি, এ ধরনের ভ্রান্ত ধারণা দূর করতে সচেতনতা বাড়ানো ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে ধর্মীয় নেতা এবং মিডিয়া বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারে। এ ক্ষেত্রে প্রধান চারটি ধর্ম ইসলাম, হিন্দু, খ্রিষ্টান ও বৌদ্ধ ধর্মীয় নেতারা তাদের নিজ নিজ ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিষয়ে ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরলে সমাজে ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টি হবে এবং কুসংস্কার দূর হবে বলে আমরা মনে করি। এ সেমিনারের মাধ্যমে আমরা যে বার্তা দিতে চাই, তা ধর্মীয় নেতারা ছড়িয়ে দেবেন। এটি ব্যাপক প্রচার হবে এবং সমাজ থেকে ভ্রান্ত ধারণা দূর হবে।

আশরাফুন নাহার মিষ্টি

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিষয়ে নেতিবাচক ধারণা দূর করতে বাংলাদেশে অনেক সংগঠন হয়েছে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিষয়ে নেতিবাচক ভাবনার অপসারণে আমরা কাজ করছি। নেতিবাচক ভাবনা থেকে বেরিয়ে এসে তাদের স্বাবলম্বী করার চেষ্টা করছি। ধর্মীয় অনুশাসন থেকে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিষয়ে ইতিবাচক ধারণা ছড়িয়ে দিলে বদলে যাবে সমাজ। আমাদের ধর্ম ইসলাম। মাতৃগর্ভে সন্তানের রূপ সৃষ্টিকর্তা ধারণ করেছেন। সুতরাং সন্তান প্রতিবন্ধী কিংবা অপ্রতিবন্ধী হবে, সুন্দর হবে না কুৎসিত হবে- সে বিষয়ে ক্ষমতা আল্লাহর। এ বিষয়ে আল্লাহ কী বলেছেন, তা আমরা জানব। ধর্মীয় ব্যক্তিদের বার্তা আমরা ছড়িয়ে দেব, যাতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিষয়ে ইতিবাচক ধারণা পোষণ হয়।



অধ্যাপক ড. মো. শামছুল আলম

এ দেশের প্রায় নব্বই শতাংশ লোক যেহেতু ইসলামের অনুসারী, তাই প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ব্যাপারে ইসলাম কী বলেছে, তা জানা খুবই জরুরি। পৃথিবীতে ইসলাম নির্দিষ্ট কোনো ভাষা, বর্ণ, শ্রেণি ও জাতের জন্য আসেনি। ইসলাম সকলের ধর্ম, মানুষের ধর্ম, মানবতার ধর্ম। ইসলামে শুধু প্রতিবন্ধী ব্যক্তি নয়, কোনো শ্রেণিকেই আলাদা করে সম্বোধন করা হয়নি। ইসলামের সৌন্দর্যের অন্যতম হলো এর সাম্য ব্যবস্থা। কাউকে আলাদাভাবে দেখার সুযোগ নেই। ইসলামে সাদা-কালো, ধনী-গরিব, আরব-অনারব, প্রতিবন্ধী-অপ্রতিবন্ধী ব্যক্তির মধ্যে মর্যাদাগত কোনো পার্থক্য নেই। মর্যাদার মাপকাঠি একমাত্র আল্লাহভীতি। অতএব, কোনো ব্যক্তির অহংকার বা গর্বের কিছু নেই। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিসহ সবাই সমান, সবাই মাটি থেকে সৃষ্ট, সবাইকে আবার মাটিতে মিশে যেতে হবে। ইসলামের ইতিহাস বলে, ভালো মানুষের পরীক্ষা বেশি হয়ে থাকে। ইসলামের দৃষ্টিতে নবীরা পৃথিবীর সেরা মানুষ। তাদের পরীক্ষাও হয়েছে সবচেয়ে বেশি। এ প্রসঙ্গে মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, 'সবচাইতে অধিক বালা-মুসিবতে পতিত হয়েছেন নবী-রসুলগণ। তারপর তাদের নিকটবর্তী ব্যক্তিবর্গ।' (আল-হাদিস)

ইসলামের দৃষ্টিতে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিবেচ্য বিষয় নয়। বিবেচ্য বিষয় হলো ইমান (তাকওয়া), সংযম, মানবতা, মানবিকতা ইত্যাদি। মানুষকে একটি অঙ্গের ত্রুটির জন্য আলাদাভাবে দেখা আমার দৃষ্টিতে এক প্রকার সাম্প্রদায়িকতা। আর সাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনা এক ধরনের জাহিলিয়াত। মুহাম্মদ (সা.) বলেন, 'আল্লাহ তোমাদের আকার-আকৃতি ও ধন-দৌলতের প্রতি দৃষ্টিপাত করেন না; বরং তোমাদের অন্তর ও কাজকর্ম দেখেন।' (সহিহ মুসলিম) ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কলব বা অন্তরাত্মা। অন্তর যার বিশুদ্ধ সে সবচেয়ে সম্মানিত ও সফল ব্যক্তি।

অতএব প্রিয় বন্ধুদের বলছি, পরিবারের মধ্যে কেউ প্রতিবন্ধী থাকলে সেজন্য মন খারাপ করবেন না। বরং ধৈর্য সহকারে মানবিক আচরণের মাধ্যমে এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ডাকে সাড়া দিতেন। সাধ্যের সবটুকু দিয়ে তিনি তাদের প্রয়োজন পূরণ করতেন। ইসলামে বেশ কিছু অভ্যাস অবৈধ। যেমন- উপহাস, দোষারোপ, মন্দনামে ডাকা, অন্যের দোষ খুঁজে বেড়ানো ইত্যাদি। এর প্রতিটি কবিরা গুনাহ বা মহাপাপ। প্রতিবন্ধিতা পিতামাতার পাপের ফল, প্রতিবন্ধিতা সৃষ্টিকর্তার অভিশাপ- এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ প্রকারান্তরে হারাম ও কবিরা গুনাহ।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সেবার মাধ্যমে আমরা আমাদের পরকালকে সমৃদ্ধ করতে পারি। তাদের প্রতি সামান্য সহানুভূতি আমাদের স্থায়ী আবাসকে আনন্দময় করতে পারে।

অনেক সময় প্রতিবন্ধী বন্ধুরা রাস্তাঘাটে চলতে গিয়ে সমস্যায় পড়ে যান; তখন তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসতে হবে। ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতায় পরিত্রাণ মিলবে না। এসব মানবীয় কাজই শুধু পরকালে আমাদের উদ্ধার করতে পারে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের কারণে মানুষকে স্রষ্টার অভিসম্পাতের মুখোমুখি হতে হবে। প্রতিবন্ধী বন্ধুদের পরকালীন জীবন হবে সুখময়। কারণ বেশি হিসাব নেওয়া হয় এমন ব্যক্তিদের, যারা ভোগ বেশি করে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা তুলনামূলকভাবে পৃথিবীতে খুব কম ভোগ করে থাকেন। অতএব তাদের হিসাব-নিকাশও হবে তুলনামূলক সহজ। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জান্নাতের সুসংবাদ দিয়ে হাদিসে বলা হয়েছে, 'মহান আল্লাহ বলেন :আমি যার প্রিয় দুটি অঙ্গ নিয়ে নিলাম, অতঃপর সে তাতে সবর করে সাওয়াবের আশা করল, বিনিময়ে আমি তার জন্য জান্নাত ছাড়া অন্য কিছুতে সন্তুষ্ট হবো না। (তিরমিযী, হাদিস নং ২৪০১)

তা ছাড়া বিপদাপদ আমাদের ধারাবাহিক পাপই শুধু মোচন করে। রাসুল (সা.) বলেন, 'মুসলিম ব্যক্তির ওপর যে সকল যাতনা, রোগব্যাধি, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, দুশ্চিন্তা, কষ্ট ও পেরেশানি আপতিত হয়, এমনকি যে কাঁটা তার দেহে বিদ্ধ হয়, এ সবের দ্বারা আল্লাহ তার পাপসমূহ ক্ষমা করে দেন। (বুখারি, হাদিস নং ৫৬৪১) ইসলামের ইতিহাসে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অবদান উল্লেখযোগ্য। বিখ্যাত সাহাবি 'আবদুল্লাহ ইবন উম্মে মাকতুম, মু'আয ইবন জাবাল ও আমর ইবনুল জামুহসহ অনেক সম্মানিত সাহাবি (রা.) শারীরিক প্রতিবন্ধী ছিলেন। এ জন্য কোনো বৈষম্যের শিকার হননি। বরং এমন গুরুত্বপূূর্ণ ও আকর্ষণীয় দায়িত্ব পালন করেছেন, যা অপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কপালে জোটেনি। আবদুল্লাহ ইবন উম্মে মাকতুম এমন দু'জনের একজন, যাদের রাসুল (সা.) কোরআন শিক্ষা দেওয়ার জন্য সর্বপ্রথম মদিনায় পাঠিয়েছিলেন। তাকে রাসুল (সা.) মসজিদে নববির ইমাম ও মুয়াজ্জিন নিযুক্ত করেছিলেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ৩৮১) রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, 'যখন বেলাল রাতে আজান দেয় তখন তোমরা পানাহার কর (সাহরি খাও), যতক্ষণ না উম্মে মাকতুম (ফজরের) আজান দেয়।' (সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৬১৭) মু'আয ইবনে জাবালকে রাসুল (সা.) ইয়েমেনের গভর্নর করেছিলেন। মু'আয ইবনে জাবাল (রা.)-এর জিজ্ঞাসার পরিপ্রেক্ষিতে বেশ কিছু আয়াত নাজিল হয়েছে। যেমন- ২:১৮৯, আমর ইবনুল জামুহ (রা.)-এর প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে নিল্ফেম্নাক্ত আয়াত নাজিল হয়- ২:২১৫। রাসুলুল্লাহ (সা.) আমরকে বনু সালামা গোত্রের প্রধান বানিয়েছিলেন। (বুখারি, হাদিস নং ২৯৬) সৌদি আরবে দীর্ঘদিন একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি গ্র্যান্ড মুফতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার নাম আবদুল্লাহ বিন বায। প্রতি বছর হজে গ্র্যান্ড মুফতি খুতবা দিয়ে থাকেন। যিনি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। তার তত্ত্বাবধানে অনেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তার লেখা প্রচুর মৌলিক গ্রন্থ রয়েছে। সৌদি আরবে গ্র্যান্ড মুফতির মর্যাদা মন্ত্রী পর্যায়ের। ইসরায়েলের অমানবিক আচরণের বিরুদ্ধে যে প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে উঠেছিল তার নেতৃত্ব দিয়েছেন শাইখ ইয়াসিন একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি। আমরা জানি, বৈদ্যুতিক বাতি, টেলিগ্রাফ, ক্যামেরাসহ অনেক কিছুর আবিস্কারক থমাস আলভা এডিসন বাল্যকালে শ্রবণশক্তি হারিয়েছিলেন। ব্রিটিশ বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং-এর কথা আমরা সবাই জানি। অতএব প্রতিবন্ধিতা ব্যক্তির প্রতিষ্ঠিত হওয়া ও অবদান রাখার পথে কোনো বাধা নয়।

'প্রতিবন্ধিতা পিতামাতার পাপের ফল' অথবা 'প্রতিবন্ধিতা সৃষ্টিকর্তার অভিশাপ'-এ ধরনের নেতিবাচক ও অনুমাননির্ভর দৃষ্টিভঙ্গি ইসলামে অবৈধ। আল্লাহতায়ালা মানুষকে সম্মানিত করেছেন। আমরা অসম্মান জানাই কীভাবে? আল্লাহ বলেন, 'আমি আদম-সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি।' (আল-কোরআন, ১৭ :৭০)

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদের অবহেলা করা মানে নিজেকেই অবহেলা করা। আমাদের কারও ঘরে যদি একটি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি থাকত, আমার মনে হয় কেউ নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করত না। আমরা সবাই মানুষকে সমান মর্যাদা ও গুরুত্ব দিতে শিখি। আমাদের মধ্যকার বিভেদ, বৈষম্য চিরতরে মুছে ফেলি, দৃষ্টিভঙ্গি বদলাই, পরকালকে শান্তিময় বানাই।

রাইট রেভা. সৌরভ ফলিয়া

'সদাপ্রভু মোশিকে কহিলেন,মনুষ্যের মুখ কে নির্মাণ করিয়াছে? আর বাকপ্রতিবন্ধী, শ্রবণপ্রতিবন্ধী, চক্ষুষ্মান বা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী কে নির্মাণ করে? আমি সদাপ্রভুই কি করি না?' (যাত্রাপুস্তক ৪: ১১ পদ)।

আমরা বর্তমানে সভ্যতার এক সুবর্ণ যুগে বাস করছি। তথাপি একটি স্থানে আমাদের অনেক ঘাটতি রয়েছে, আর সেই বিষয়টি হলো প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতি এখনও আমাদের অনেকের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও তাদের প্রতি সহযোগিতার অভাব, যা এই সভ্য ও সচেতন যুগে কখনও কাম্য নয়। তবুও বাস্তব সত্য যে, আমরা আমাদের চিন্তা-চেতনায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতি সাড়া প্রদানে অনেক বিষয়ে পিছিয়ে রয়েছি। আমাদের নিজেদের জ্ঞানের দুর্বলতাকে, সীমাবদ্ধতাকে বা প্রতিবন্ধকতাকে স্বীকার না করে অন্যদের প্রতি নেতিবাচক হচ্ছি।

আমাদের সবার কাছেই খুব উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রয়েছে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা কতটা সবল ও সক্ষম। যাদের আমরা প্রতিবন্ধী ব্যক্তি হিসেবে দেখছি তাদের আমরা আমাদের নিজেদের শারীরিক, মানসিক ও বুদ্ধিভিত্তিক মাপকাঠিতে মাপছি। যে সুযোগ-সুবিধাসমূহ আমরা ভোগ করছি সেগুলো তাদের ক্ষেত্রে উপোযোগী নয় বলেই আমাদের মাপকাঠিতে তারা দুর্বল বলে প্রতীয়মান। কিন্তু তাদের মাপকাঠিতে আমরা কেমন? আমরা সম্প্রতি টোকিওতে অনুষ্ঠিত প্যারাঅলিম্পিক দেখেছি। তারা সকলই পারে যখন তা তাদের মতো করে উপস্থাপিত হয়, আমাদের নিজেদের মতো করে নয়।

পবিত্র বাইবেলের যে অংশটি উল্লেখ করেছি সেখানে ঈশ্বর (সৃষ্টিকর্তা) নবী মোশির কাছে প্রকাশ করেছেন, সকল মানুষকেই তিনি সৃষ্টি করেছেন। সে হোক বাক্‌প্রতিবন্ধী, শ্রবণপ্রতিবন্ধী বা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী সকলেই নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে তারই সৃষ্ট মানুষ। নবী মোশি নিজে ঈশ্বরের কাছে বলেছেন যে, 'তিনি জড়মুখ জড় জিহবা।' (যাত্রাপুস্তক ৪: ১০পদ)। নবী মোশি মুখের জড়তার জন্য নিজেকে অন্যদের তুলনায় দুর্বল জানতেন কিন্তু ঈশ্বর তাকেই ব্যবহার করতে চাইলেন যেন তিনি ফরৌনের (ফেরাউন) সামনে গিয়ে কথা বলতে ও ইসরায়েল জাতিকে মুক্ত করতে পারেন। ঈশ্বরের দৃষ্টিতে তিনি দুর্বল বা অবহেলিত নন। বরং ঈশ্বর তার কাছে প্রকাশ করলেন সকলেই ঈশ্বরের ইচ্ছাকে পূর্ণ করতে যোগ্য। শাস্ত্র বাক্যটি আমাদের স্মরণ করায় যে, সকলকে নিয়েই ঈশ্বরের পরিকল্পনা রয়েছে, সৃষ্টিকর্তা সকলকে ব্যবহার করতে চান, কিন্তু আমরা বুঝি না আমাদের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার জন্য।

আমরা যাদের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অনেক সময় বোঝা মনে করি বা নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখি কিন্তু প্রভু যিশু খ্রিষ্ট আমাদের সেই প্রকার দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি খুব সুস্পষ্ট সাড়া দিয়েছেন। সাধু যোহন ৯:১-৩ পদে লেখা আছে- 'যিশু যাইতে যাইতে একজন লোককে দেখিতে পাইলেন, সে জন্মাবধি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। তাঁহার শিষ্যেরা তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, রব্বি, কে পাপ করিয়াছিল, এই ব্যক্তি, না ইহার পিতামাতা, যাহাতে এ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হইয়া জন্মিয়াছে? যিশু উত্তর করিলেন, পাপ এ করিয়াছে, কিম্বা ইহার পিতামাতা করিয়াছে, তাহা নয়; কিন্তু এই ব্যক্তিতে ঈশ্বরের কার্য্য যেন প্রকাশিত হয়, তাই এমন হইয়াছে।'

এই পবিত্র শাস্ত্রাংশটি আমাদের অনেক প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দেয়। যাদের আমরা প্রতিবন্ধী বলছি ঈশ্বর তাদের আমাদের মাঝে দিয়েছেন যেন আমরা সৃষ্টিকর্তার অনুগ্রহকে, দয়াকে, ভালোবাসাকে, তাঁর অপূর্ব সৃষ্টিকে, তাঁর রহস্যকে, তাঁর না বলা কথাকে যেন বুঝতে, শুনতে ও উপলব্ধি করতে পারি। সর্বোপরি সৃষ্টিকর্তা তাদের মধ্য দিয়ে মহিমান্বিত হন। তাই সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাসী হিসেবে সকলের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ, ভালোবাসা প্রদান, সকলকে সাহায্য করা ও অন্যের ভার বহন করতে নিজেকে উৎসর্গ করাই শ্রেয়।

সম্প্রতি মিডিয়ায় প্রচারিত একটি নাটকে প্রতিবন্ধী সন্তানকে পিতা-মাতার পাপের ফল বলে যে বার্তা দেওয়া হয়েছে তা পবিত্র বাইবেল কোনোভাবেই সমর্থন করে না। প্রভু যিশু খ্রিষ্টের উক্তিটি এই বিষয়ে খুব স্পষ্ট উত্তর দিয়েছেন।

এই প্রকার ভ্রান্ত ও নেতিবাচক ধারণা দূর করতে ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ বিশেষভাবে ভূমিকা রাখতে পারেন। উপাসনালয়ের পুরোহিতগণ পবিত্র বাইবেলের আলোকে বক্তব্য তুলে ধরতে পারেন, শিশুদের ও যুবাদের ধর্মীয় শিক্ষা প্রদানের সময় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিসহ সকল মানুষকে ভালোবাসতে, সম্মান ও সেবা করতে শিক্ষা দিতে পারেন, যা সমাজে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ওপর নেতিবাচক ধারণা দূর করতে সহায়ক হবে। সেই সঙ্গে যে সকল প্রতিষ্ঠানে আমরা ধর্মীয় নেতৃবৃন্দকে পদায়ন করি সেখানকার শিক্ষার পাঠ্যক্রমেও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতি পরিচর্যার বিষয়েও পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন, যারা ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ তারা তাদের বিষয়ে যেন আরও সক্রিয় হতে পারেন ও সত্যকে এবং করণীয়কে ব্যাখ্যা করতে পারেন উপযুক্তভাবে। সর্বোপরি ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ প্রতিবন্ধী শিশু ও ব্যক্তিদের জন্য সকল উপাসনালয়ে তাদের যোগদানের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রাখতে পারেন, যার অভাব রয়েছে। নেতৃবৃন্দ প্রতিবন্ধী শিশু ও ব্যক্তিদের পিতামাতাসহ সকল বিশ্বাসী উপাসককে তাদের প্রতি ইতিবাচক করতে পারেন, যেন উপাসনালয়ে তারা সবার সঙ্গে ভালোবাসায় ও এক সহভাগিতায় বৃদ্ধি পেতে পারে যা সকলের জন্য মঙ্গল নিয়ে আসবে।

অধ্যাপক ড. সুকোমল বড়ূয়া

বৌদ্ধ ধর্মে মানবমর্যাদা পর্যবসিত হয়েছে সব মানুষের প্রতি। শুধু প্রতিবন্ধী ব্যক্তি কেন, পৃথিবীতে বসবাসকারী ধনী-দরিদ্র, মূর্খ-পণ্ডিত, বিকলাঙ্গ, সবল-দুর্বল, রুগ্‌ণ-পীড়িত সবার প্রতি সমদৃষ্টি, সমমর্যাদা প্রদর্শিত হয়েছে। এজন্য বিশ্বে বৌদ্ধ ধর্ম বিশ্বমানবতার স্বীকৃতি পেয়েছে।

মানুষ আর্তপীড়িত, কিংবা প্রতিবন্ধী, কৃশ, দুর্বল ও কোমলপ্রাণ মানুষকে ঘৃণা করে, লাঞ্ছনা করে এবং যথাযথ মানব মর্যাদার অধিকার থেকে বঞ্চিত করে। অথচ তারাও বিশ্বমানবতার সদস্য। তারাও আমাদের মতো দুঃখ-কষ্ট, আনন্দ-বেদনা ও প্রীতি অনুভব করে এবং প্রেম-প্রীতিতে উচ্ছ্বসিত হয়। তারা মেধা, মনন, জ্ঞানে, ধ্যানে এবং আত্মশক্তিতে বলীয়ান হতে চায়। বৌদ্ধ ধর্মে তাদের স্থান, অধিকার এবং সম্মান আরও বিপুলভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। কারণ তারা আমাদের মতো মানুষ। তাদের জন্মও আমাদের মতো এই ধরিত্রীতে। জন্মের জন্য তাদের আলাদা করে অন্য কোনো স্থানে কিংবা দ্বীপে, পর্বতে কিংবা অন্তরীক্ষে পাঠানো হয়নি। জন্মগ্রহণ তাদের দোষ নয়, কর্মই তাদের প্রধান।

সুতরাং মানুষ হিসেবে মানুষের প্রতি এ রকম বৈষম্য দৃষ্টিভঙ্গি ও বৈষম্য আচরণ বৌদ্ধ ধর্মে কোনোভাবেই কাম্য নয়। এজন্যই বৌদ্ধ ধর্মের বাণীতে বিধৃত হয়েছে 'মাতা যেমন আপন সন্তানকে ভালোবাসে এবং নিজের জীবনের বিনিময়ে রক্ষা করতে চায়, ঠিক একই মমতা ও মৈত্রী যেন সবার ওপর বর্ষিত হয়।' এটাই বৌদ্ধ ধর্মের মানবতার শ্রেষ্ঠতম বৈশিষ্ট্য। কারও প্রতি শত্রুতা পোষণ না করা, পরস্পরকে বঞ্চনা না করা এবং হিংসা করে পরস্পরের মধ্যে দুঃখ উৎপাদন না করাই উত্তম।

বুদ্ধ মানুষকে বড় করে দেখেছেন। এজন্য ধর্মপদে আছে- মানবজীবন লাভ করা বড়ই দুর্লভ। বুদ্ধের শিক্ষায় উজ্জীবিত হয়ে মধ্যযুগের কবি চণ্ডীদাসও একদিন বলেছিলেন, 'শুনহ মানুষ ভাই-

সবার উপরে মানুষ সত্য
তাহার উপরে নাই।'

সুতরাং সে লক্ষ্যে এ বিশ্বে সবাই সমান। কেউ কাউকে হীন করতে পারে না, কেউ কাউকে অবজ্ঞা ও হেয়প্রতিপন্নও করতে পারে না। কারণ, আমরা সবাই মানবসন্তান, অমৃতের পুত্র, বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ জীব। সেই হিসেবে বিশ্বের সব মানুষ প্রত্যেক মানুষের বন্ধু, আত্মার আত্মীয়। আপন-পর বলতে এখানে কিছুই নেই। আত্মবৎ জ্ঞানে সবাইকে হৃদয়ে ধারণ করাই প্রকৃত মনুষ্যত্ব ধর্ম, মানবধর্ম।

পশুরা তার পশুত্ব হারায় না, কিন্তু মানুষ কেন তার মনুষ্যত্ব হারাবে? এটা আমাদের ব্যর্থতা, আমাদের অযোগ্যতা এবং আমাদের স্বার্থপরতা ও হীনতা। সুতরাং মানুষের সঙ্গে মানুষের সুসম্পর্ক ও বন্ধুত্ব হবে হৃদ্যতাপূর্ণ। ওই উদার মনে সকলকে ভালোবাসতে হবে, একই হৃদয়ে সকলকে স্থান দিতে হবে। যেহেতু আমরা সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ, সেহেতু প্রাণিকুলের মধ্যে আমাদের দায়িত্ব সর্বোচ্চ। এ বিষয়টি প্রতিমুহূর্তে আমাদের হৃদয়ে ধারণ করা উচিত এবং সকল সময় জাগ্রত রাখা উচিত।

বর্তমান বিশ্বে জাতি, ধর্ম-বর্ণ ও সম্প্রদায়, শ্বেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গ এবং ধনী-দরিদ্র, পরাশক্তি এবং পূর্ব-পশ্চিম, উত্তর-দক্ষিণ প্রভৃতি নানা ভৌগোলিক সীমারেখা ও বৈষম্য নিয়ে যেই সংঘাত ও সহিংসতা একমাত্র ওই অজ্ঞতার কারণেই সংঘটিত। যদি আমরা মনে করি মানুষ হিসেবে আমরা এক ও অভিন্ন এবং মানবতাই আমাদের ধর্ম, তাহলে বিশ্বের চেহারা আজ এত নগ্ন হতে পারে না। সুতরাং আমরা কর্মগুণেই বলীয়ান হবো, জাতি বা বংশ মর্যাদায় নয়। অতএব মানবীয় এ সকল গুণ ধারণ করা হতো দেশ-কাল ও ভৌগোলিক সীমারেখার ঊর্ধ্বের মাধ্যমে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও বিশ্ব উপকৃত হতে পারে এবং বিশ্বের সকল প্রকার সহিংসতা, সংঘাত, যুদ্ধ তিরোহিত হতে পারে। বর্ণ প্রথা, জাতি প্রথা, সম্প্রদায় ও ধর্মীয় নানা কুসংস্কার প্রথার বিরুদ্ধে বুদ্ধের এই নীতি-দর্শন ও শিক্ষা বিশ্ববাসীকে আলো দেখায়। এই আলো সম্পূর্ণ মানবিক, নৈতিক ও বৈষম্যহীন। এটাই বুদ্ধ ও বৌদ্ধধর্মের শিক্ষা। এ শিক্ষা আমাদের সকলের এবং আজকের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্যও।

স্বামী বিভাত্মানন্দ

সমোহহং সর্ব্বভূতেষু ন মে দ্বেষ্যোহস্তি ন প্রিয় :
যে ভজন্তি তু মাং ভক্ত্যা ময়ি তে তেষু চাপ্যহম্‌।। ২৯

আমি সকল ভূতে সমানভাবে বিরাজ করি, আমার প্রিয় ও অপ্রিয় নাই, কিন্তু যাঁহারা ভক্তিপূর্বক আমাকে ভজনা করেন, তাঁহারা স্বভাবতই আমাতে অবস্থান করেন এবং আমিও স্বভাবতই তাঁহাদের হৃদয়ে বাস করি। ২৯''শৃন্বন্তু বিশ্বে অমৃতস্য পুত্রা :আয়ে থামানি দিব্যানি তস্তু।

প্রথমেই আমাদের ধর্ম কি সেই বিষয়টি জানা বিশেষ প্রয়োজন।
''ধ্রিয়তে ধর্ম ইত্যাহু : স এব পরম : প্রভু:''।
যা ধারণ করে তারই নাম ধর্ম।



পাপ-পুণ্য, জ্ঞান-অজ্ঞান, সুন্দর-কুৎসিত, এক কথায় সকল ভালো এবং সকল মন্দ যা ধারণ করে, তাই ধর্ম। এমনকি ত্রিভুবনের সকল সম্ভাবনাময় সূক্ষ্ণ অণু-পরমাণু পর্যন্ত এই ধর্মের দ্বারাই ধৃত, ধর্মের দ্বারাই রক্ষিত এবং ধর্মের দ্বারাই পরিচালিত অর্থাৎ ধর্মই জগৎ যন্ত্রের যন্ত্রী।

কিন্তু মানুষ শ্রেষ্ঠ কেন? তার কারণ মানুষের মধ্যে ধর্মও রয়েছে, ধর্ম জ্ঞানও রয়েছে আর রয়েছে তার স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি। যার বলে জন্ম-জন্মান্তরের অনুশীলনে প্রাপ্ত ওই ধর্মজ্ঞান সহায়ে মানুষ সাধন পথে অগ্রসর হয়ে পড়ে এবং এই মনুষ্য জীবনেই অসীমের ক্ষমতা উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়। মানুষের এই ধর্ম জ্ঞান থাকার জন্যই মানুষ অমৃতের পুত্র। সে আপন ইচ্ছায় অমৃতের আস্বাদ পেতে পারে। তাই উপনিষদের ঋষিগণ বলেন যে মানুষ অমৃতের পুত্র। তার মধ্যে অসীমের ক্ষমতা লুকিয়ে আছে।

অষ্টাবক্র মুনী- যিনি জন্মেছেন চূড়ান্ত শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে। সমাজের চোখে তিনিও তুচ্ছ, ব্রাত্য। অথচ তিনি পরম জ্ঞানী মহাপুরুষ। অর্থাৎ ব্যক্তির আত্মজ্ঞান লাভে শারীরিক অক্ষমতা বিন্দুমাত্র প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে না। এই হলো শারীরিক প্রতিবন্ধকতা বিষয়ে অধ্যাত্মবিজ্ঞানের চূড়ান্ত ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। সংস্কৃত (দেবনাগরী) ভাষায় প্রতিবন্ধকতাকে সর্বোচ্চ সম্মান দিয়ে বলা হয় 'দিব্যাঙ্গ' বা 'দিব্য-অঙ্গ'বিশিষ্ট।

ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের জীবনেও আমরা এ ঘটনার সত্যতা দেখতে পাই। মাত্র কুড়ি বছরের যুবক, জগতে এত মধুর বস্তু থাকা সত্ত্বেও তিনি সেগুলো চান না। তার কেবল একটি চাওয়া- সেটি হলো মা। জগৎ তার কাছে মৃত আর জগতের লোকের কাছে ঠাকুর জড়বস্তুর মতো প্রতিক্রিয়াহীন। ঠাকুরের ওপর শারীরিক অত্যাচার চলছে কিন্তু ঠাকুর নির্বিকার। কিন্তু ইতিহাস বলছে যে তিনি সর্বোচ্চ চিন্তার অধিকারী। অধ্যাত্মশাস্ত্রের এসব উদাহরণ আমাদের শেখায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সম্পর্কে, সে যে কোনো রকমের প্রতিবন্ধকতাই হোক না কেন। হিন্দুশাস্ত্রে স্বয়ং ভগবান প্রতিবন্ধকতাপূর্ণ শরীর নিয়ে বামন অবতারে পৃথিবীতে অবতীর্ণ হন। অর্থাৎ প্রতিবন্ধী শরীরেও আত্মা বা ঈশ্বরের শক্তি থাকে অটুট। শক্তি পূর্ণরূপে বিদ্যমান থাকতে পারে। তাই বামন অবতারে ভগবানের অবতারণ। আত্মার মধ্যে অসীম ক্ষমতা আছে বলেই আত্মশক্তির বিকাশ ঘটে অক্ষম শরীরেও। আমরা আমাদের চারপাশেও শাস্ত্রোক্ত এই বাণীর প্রমাণ হতে দেখছি অহরহ। শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অরুণিমা সিনহা এভারেস্ট জয় করেছে। আবার স্বচ্ছন্দেই ইংলিশ চ্যানেল অতিক্রম করতে সক্ষমও হয়েছে মাসুদুর রহমান। আবার প্যারা অলিম্পিক- প্রতি চার বছর অন্তর প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চরম আত্মশক্তি বিকাশের জন্য অধ্যবসায়সহ নিরন্তর প্রচেষ্টার মহোৎসব। সুতরাং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সম্পর্কে কোনো কটু মন্তব্য করা থেকে আমাদের বিরত থাকা উচিত।

মুস্তাফিজ শফি

আমরা বিশ্বাস করি- সব মানুষের এই দেশ, সব মানুষের এ বিশ্বব্রহ্মাণ্ড। কাউকে বাদ দিয়ে কিংবা পেছনে ফেলে সামনে এগোতে পারব না।

পিছিয়ে পড়া মানুষকে মূলধারায় নিয়ে আসতে সমকাল কাজ করছে।

কোনো ধর্মই মানুষের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করেনি। কাউকে ছোট কিংবা বড় করেনি। এ জায়গা থেকে আমরা সমাজে বার্তা দিতে চাই। আমরা অন্তরের শক্তি নিয়ে কাজ করলে প্রতিবন্ধীবান্ধব রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হবে। বাঙালির অন্তরের শক্তি অনেক। 'জ্বলে পুড়ে-মরে ছারখার/ তবু মাথা নোয়াবার নয়'- এটি সুকান্ত ভট্টাচার্যের অনেক পুরোনো কথা। আমরা সে জায়গা থেকে শুরু করতে চাই। কোনো বাধাতেই আমরা পড়ে যাব না, নুয়ে পড়ব না। আমরা এগিয়ে যাব। বিপুলসংখ্যক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে ঘরে বসিয়ে রাখলে কিংবা মূলধারায় নিয়ে আসতে না পারলে জাতীয় উন্নয়ন সম্ভব নয়। সব ধর্মের মূল বার্তা মানবিকতা। সব ধর্মই মানুষের কল্যাণের কথা বলে। ধর্মের সমন্বিত চেতনাকে আমরা সামনে নিয়ে এগিয়ে যাব। আমরা যার যার ধর্ম পালন করার পাশাপাশি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার নিয়ে কাজ করব।

নানা মতের নানা ধর্মের মানুষ আছেন। তারা যার যার ধর্ম নিয়ে সম্মানের সঙ্গে সমাজে বাস করবেন। তার ধর্মমতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কল্যাণে কাজ করবেন। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কল্যাণে আদিবাসী সম্প্রদায়কেও সম্পৃক্ত করা এবং তাদের মাঝে বার্তাগুলো কীভাবে ছড়িয়ে দেওয়া যায়, সেই চেষ্টা করতে পারি। ধর্মের সমন্বিত চেতনাকে আমরা সামনে নিয়ে এগিয়ে যাব।

নাছিমা আক্তার

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা মা-বাবার পাপের ফল নয়।  এটা আমাদের সমাজে একটা কুসংস্কার। এটি থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। আমরা চাই দেশটাকে পরিবর্তন করতে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কল্যাণে যেন সবাই কথা বলেন। সবাই যেন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলতে পারি। এসডিজি অর্জনে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা অবদান রাখতে পারেন। সমকাল সব সময় আমাদের পাশে ছিল। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য তারা কথা বলে। আমরা চাই, প্রচারমাধ্যমে সমাজ থেকে নেতিবাচক ধারণা দূর হোক।




সঞ্চালক

আলবার্ট মোল্লা
সহপ্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক
অ্যাকসেস বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন

স্বাগত বক্তব্য

আশরাফুন নাহার মিষ্টি
নির্বাহী পরিচালক
ডব্লিউডিডিএফ

প্রবন্ধ উপস্থাপন

অধ্যাপক ড. মো. শামছুল আলম
চেয়ারম্যান
ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


রাইট রেভা. সৌরভ ফলিয়া
ডেপুটি মডারেটর, চার্চ অব বাংলাদেশ ও
বিশপ, বরিশাল ডায়োসিস

অধ্যাপক ড. সুকোমল বড়ূয়া
সভাপতি, বিশ্ব বৌদ্ধ
ফেডারেশন- বাংলাদেশ চ্যাপ্টার
চেয়ারম্যান, কাউন্সিল ফর ইন্টারফেইথ হারমনি-বাংলাদেশ

সাবেক চেয়ারম্যান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি অ্যান্ড বুড্ডিস্ট স্টাডিজ বিভাগ

স্বামী বিভাত্মানন্দ
অধ্যক্ষ ও সম্পাদক
রামকৃষ্ণ মিশন, দিনাজপুর

আলোচক

মুস্তাফিজ শফি
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক
সমকাল

নাছিমা আক্তার
সভাপতি
প্রতিবন্ধী নারীদের জাতীয় পরিষদ

ইশারা ভাষা সহায়তা

আরিফুল ইসলাম

অনুলিখন

জাহিদুর রহমান
স্টাফ রিপোর্টার
সমকাল

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com