সমকালীন প্রসঙ্গ

ইউপি নির্বাচন: খুনোখুনির প্রতিকার নেই?

প্রকাশ: ১৪ নভেম্বর ২১ । ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আবু সাঈদ খান

একদা ভোট ছিল উৎসব, এখন তা আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। ১১ নভেম্বর অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদের দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনে রক্ত ঝরেছে নরসিংদী, কুমিল্লা, কক্সবাজার ও চট্টগ্রামে। মৃত্যু হয়েছে সাতজনের; নির্বাচন-উত্তর আরও পাঁচজন। বুথ দখল, বাক্স ছিনতাই, জবরদস্তিমূলক ভোট প্রদান, সংঘাত-সংঘর্ষ হয়েছে নানা স্থানে। প্রথম ধাপের নির্বাচনও সংঘর্ষপূর্ণ ও রক্তাক্ত ছিল।

প্রথম ধাপের অভিজ্ঞতার পর কারও বুঝতে বাকি ছিল না, দ্বিতীয় ধাপও এর ব্যতিক্রম হবে না। তবে সংঘাত-সংঘর্ষ বন্ধে কর্তৃপক্ষের আরও জোরাল পদক্ষেপ প্রত্যাশিত ছিল। বাস্তবে তা দেখা গেল না। উপরন্তু দ্বিতীয় ধাপ নির্বাচনের আগেই প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদা হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন। নির্বাচনের এক দিন আগেই বলেছিলেন- ঘরে ঘরে, মহল্লায় মহল্লায় পাহারা দিয়ে অপ্রীতিকর ঘটনা থামানো সম্ভব নয়। নির্বাচনের পর কর্তাব্যক্তিদের নানা মন্তব্য শুনলাম। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বললেন, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ঝগড়াঝাঁটি হয়েই থাকে। কেউ কেউ বললেন, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির আমলে আরও বেশি হতো। এসব কথাবার্তা থেকেই ধারণা করা যায়, পরিস্থিতি উন্নয়নে কর্তৃপক্ষ কতটুকু আন্তরিক।

এটি সত্য যে, শুধু পুলিশ-প্রশাসন দিয়ে খুনোখুনি বন্ধ হবে না; অবস্থার উন্নতি ঘটবে না। কারণ, সংঘাতের উপাদান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রোথিত। প্রচলিত ধারার রাজনীতিতে দ্রুত স্থান করে নেওয়া সুবিধাবাদীদের শক্তি জনসমর্থন নয়; পেশি ও কালো টাকা। রাজনীতিতে পেশি ও কালো টাকার প্রভাব থাকলে নির্বাচনে তার প্রতিফলন ঘটবে না- তা কী করে আশা করি? ২০১৬ সালের নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণ ছিল; এবার তারা মাঠে নেই। কিছু বিএনপি সদস্য দলীয় মার্কা ছেড়ে স্বতন্ত্রভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, তবে সংখ্যায় খুবই কম। তারা হিসাবের মধ্যে নেই। তাই এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও খুনোখুনি দুই-ই হচ্ছে আওয়ামী লীগ মনোনীত ও বিদ্রোহীদের মধ্যে।

মনোনয়ন প্রক্রিয়ার গলদও বিদ্রোহ ও খুনোখুনির জন্য অনেকাংশে দায়ী। বহু স্থানে স্বজনপ্রীতি বা টাকার জোরে নব্য ও অগ্রহণযোগ্যরা মনোনয়ন বাগিয়ে নিচ্ছেন। বঞ্চিত হচ্ছেন যোগ্য প্রার্থী। তাই অনেক জায়গায় বিদ্রোহীদের পেছনে কর্মীরা সমবেত হয়ে লড়ছেন। কোথাও কোথাও ত্যাগী কর্মীরা বিদ্রোহের কারণে বহিস্কৃত হওয়ার পর তারা বেপরোয়া হয়ে উঠছেন। আর মোটা টাকায় কেনা মনোনয়ন পাওয়া প্রার্থীরা পরাজয় মানতে নারাজ। তিন ধাপে ২৫০ প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। এই ছোঁয়া লেগেছে সাধারণ ও নারী সদস্যপদেও। শুধু তৃতীয় ধাপেই বিনা ভোটে ৩৩৭ ও সংরক্ষিত নারী সদস্য ১৩২ জন নির্বাচিত (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর :১২ নভেম্বর ২০২১)। প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপ মিলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী সদস্যদের সংখ্যা অনেক। বলা বাহুল্য, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ীদের প্রতিদ্বন্দ্বীরা ভয় বা প্রলোভনে নির্বাচনের মাঠ ছেড়েছেন। কোনো কোনো মাঠত্যাগী প্রার্থী কিছু কামিয়েও নিয়েছেন। মনোনয়ন-বাণিজ্যের পাশাপাশি প্রার্থিতা-বাণিজ্যও হয়েছে এবার।

এ অধঃপতন নিয়ে রাজনীতিকদের মধ্যে তেমন দুঃখবোধ নেই। আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির নেতারা টিভি টকশোতে বাগ্‌বিতণ্ডা করছেন- কোন আমলের নির্বাচন কত খারাপ হয়েছে। আমি বুঝতে পারি না- বিএনপি, জাতীয় পার্টির আমলে খারাপ নির্বাচন হয়েছে বলেই তার পুনরাবৃত্তি হতে থাকবে? ভালো নির্বাচন কি কখনও হবে না?

ইউনিয়ন পরিষদ দেশের সবচেয়ে পুরোনো প্রতিষ্ঠান। রাজনৈতিক ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যেও শতবর্ষী এ প্রতিষ্ঠান টিকে আছে এবং যথারীতি নির্বাচন হয়ে আসছে। একসময় প্রতিষ্ঠানটির নাম ছিল ইউনিয়ন বোর্ড। এলাকার সর্বজনমান্য ব্যক্তিরা এ বোর্ডের প্রেসিডেন্ট হতেন। সামান্য সরকারি অনুদান ও 'চকিদারি ট্যাকসো'র ওপর কার্যক্রম চালাতে হতো (চৌকিদাররা স্থানীয় সরকারের ধার্য করা এ ট্যাক্স আদায় করত বা এই টাকায় চৌকিদারদের বেতন দেওয়া হতো বলে লোকমুখে চকিদারি ট্যাকসো কথাটি হয়েছিল)। তখন প্রেসিডেন্ট সাহেবদের গাঁটের পয়সা ব্যয় করে জনসেবা করতে হতো। তাই অনেকে প্রেসিডেন্ট হতে চাইতেন না। এলাকার লোকেরা ধনাঢ্য ও প্রভাবশালীদের অনুনয়-বিনয় করে নির্বাচনে দাঁড় করাত। তখন নির্বাচনী বুথ পাহারায় লাঠি হাতে বা গাদা বন্দুক নিয়ে আনসার থাকত। সাধারণত কোনো হাঙ্গামা হতো না। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান ইউনিয়ন বোর্ডকে ইউনিয়ন কাউন্সিল নামকরণ করেন। তখনও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয়েছে। স্বাধীনতার পর জাতীয় নির্বাচনে বল প্রয়োগের নীতির তেমন প্রভাব ইউনিয়ন পরিষদে গড়ায়নি। আমার মনে পড়ে, স্বৈরাচারী এরশাদ আমলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ব্যাপকভাবে হোন্ডা, গুন্ডা ও 'মন্ডার' ব্যবহার শুরু হয়। আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ জাতি ঐক্যবদ্ধভাবে স্বৈরশাসকের পতন ঘটিয়েছে। কিন্তু 'এরশাদীয় খেল' সবাই অনুসরণ করে চলেছে। এই খেলায় ২০২১ সালে সবাই আউট। এখন আওয়ামী লীগ বনাম আওয়ামী লীগ; মনোনীত বনাম বিদ্রোহী।

জনমনে প্রত্যাশা ক্ষমতাসীনদের কাছেই। আশার কথা, ক্ষমতাসীন দলের বিবেকবান ও দায়িত্বশীল নেতাদের মধ্যে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ আছে। তারাও পরিবর্তন চাচ্ছেন। এ প্রতিষ্ঠানটিকে রক্ষা করা এখন জাতির সামনে বিরাট চ্যালেঞ্জ।

সর্বাগ্রে প্রয়োজন স্বাধীন-নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন, যারা নির্বাচনের দায়িত্ব নেবেন, কারও আজ্ঞাবহ হবেন না। সংশ্নিষ্ট পুলিশ-প্রশাসনকে তাদের ওপর কার্যকরভাবে ন্যস্ত করতে হবে।

নির্বাচন পদ্ধতিরও পরিবর্তন আনা দরকার। দেশে এখন পার্লামেন্টারি পদ্ধতির সরকার। আর স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন) গঠিত হচ্ছে প্রেসিডেন্সিয়াল পদ্ধতির আদলে। চেয়ারম্যান ও মেয়ররা সরাসরি নির্বাচিত ও সর্বেসর্বা। এর পরিবর্তে নির্বাচিত মেম্বার বা কাউন্সিলরদের মধ্য থেকে চেয়ারম্যান বা মেয়র নির্বাচিত হওয়ার বিধান থাকলে পরিষদে জবাবদিহিতা নিশ্চিত হতো। অন্যদিকে, কোটি টাকা ব্যয় করেও সরাসরি চেয়ারমান হওয়া যেত না। হুমকি বা প্রলোভন দিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীকে বসিয়ে দিয়ে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সরাসরি চেয়ারম্যান বা মেম্বার হওয়ার সুযোগ থাকত না। কারণ, এ পদ্ধতিতে চেয়ারম্যান বা মেয়র হলে তাকে আগে মেম্বার হতে হবে। প্রতিবেশী ভারতেও স্থানীয় সরকারে এই বিধান রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের বিষয়টি পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে। যদিও এটি একটি উৎকৃষ্ট মডেল বলে বিবেচিত। যখন এ দাবি ওঠে, আমিও সমর্থন করেছিলাম। একাধিক কলামও লিখেছিলাম। তখন ভাবিনি- মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় এভাবে দুর্নীতি-স্বজনপ্রীতি হবে; মনোনয়ন-বাণিজ্য হবে। তা ছাড়া দ্বৈত পদ্ধতি চালু করা হলো; চেয়ারম্যান ও মেয়র নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন এবং মেম্বার ও কাউন্সিলরের ক্ষেত্রে দলীয় মনোনয়ন থাকল না। মেম্বার-কাউন্সিলর ও তাদের সমর্থকরা যে যার মতো অবস্থান নিলেন। অনেক সদস্য প্রার্থী নিজ দলীয় চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে গেলেন। কেউ কেউ বিদ্রোহী বা অন্য দলের চেয়ারম্যান প্রার্থীকে সমর্থন করলেন। এতে হযবরল অবস্থা তৈরি হলো। দ্বৈত শাসনের মতো এই দ্বৈত পদ্ধতির দশা।

সব দেখে এখন মনে হচ্ছে, গণতন্ত্রের আরও বিকশিত রূপ ও তৃণমূলে গণতন্ত্র চর্চা ছাড়া এটি ফল দেবে না। শুনেছি, আওয়ামী লীগও দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের বিধানটি পুনর্বিবেচনার কথা ভাবছে। ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগও নেতাদের দাবির মুখে মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও গোপালগঞ্জের ৮৮টি ইউনিয়নে জাতীয় প্রতীক বরাদ্দ দেয়নি। ওইসব ইউনিয়নে নির্বাচনপ্রত্যাশীদের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছে।

এসব পরিবর্তন দরকার। তবে কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না, যতক্ষণ রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন না হচ্ছে। রাজনীতিতে যখন পেশি আছে, কালো টাকার প্রভাব আছে; জনপ্রতিনিধি হয়ে গাড়ি-বাড়ি, কাঁড়ি কাঁড়ি টাকার মালিক হওয়ার স্বপ্টম্ন আছে; তখন কি ভালো নির্বাচন সম্ভব? এই অধঃপতন থেকে রাজনীতিকে উদ্ধার করা না হলে নির্বাচন সন্ত্রাস ও কলুষমুক্ত হবে না।

এখন প্রয়োজন সেই আদর্শবাদ, যা আমরা বিগত শতাব্দীর পঞ্চাশ ও ষাট দশকের রাজনীতিতে দেখেছি। যা ছিল বাম ও জাতীয়তাবাদীদের মধ্যে। স্বাধীনতাউত্তর সত্তরের দশকেও তা দেখেছি। রাজনীতির ব্যাপক পচন ধরে আশির দশকে, সামরিক শাসকদের হাতে। সে পচন গণতন্ত্রের দাবিদারদেরও স্পর্শ করেছে। সুবিধাবাদী, 'কাউয়া', 'হাইব্রিড'দের দাপট বেড়েই চলেছে।

বঙ্গবন্ধু বলতেন আগাছা-পরগাছার কথা, যা আসল গাছকে গ্রাস করে। কথায় বলে- আগাছার বৃদ্ধি বেশি। তাই আগাছা উৎপাটনে, সন্ত্রাসমুক্ত রাজনীতি ও নির্বাচন অনুষ্ঠানে চাই সময়োচিত রাজনৈতিক অঙ্গীকার।

সাংবাদিক ও লেখক

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com