স্মরণ

জননেতা হাবু মিয়া

প্রকাশ: ২১ নভেম্বর ২১ । ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মজিবর রহমান

মোসলেম উদ্দিন খান হাবু মিয়া

এক কঠিন সময়ে মানিকগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা মোসলেম উদ্দিন খান হাবু মিয়া পরিণত হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর নীতি ও আদর্শের মূর্ত প্রতীক হিসেবে। তার কর্মময় জীবনের ব্যাপ্তি ছিল বিশাল ও ব্যাপক। তার মতো এত বড়মাপের নেতার সাহচর্য লাভের সুযোগ হয়েছে আমার। তার সঙ্গে থেকে তাকে নিবিড়ভাবে দেখেছি, তার সঙ্গে মিশেছি। তার দুঃখের সঙ্গী হতে পেরেছি। তার সাহচর্যে যা কিছু শিখেছি, দেখেছি, তা আমাকে সব সময় অভিভূত করেছে। একদিন হঠাৎ অসুস্থতার সংবাদ পেয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে ঢাকার পরীবাগের একটি হাসপাতালে তাকে দেখতে যাই। বেডে শুয়ে আছেন শ্রদ্ধেয় নেতা। দেখা হলো, কথা হলো না। নিথর নিস্তব্ধ; কথা বলতে পারছেন না। শুধুই ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিলেন আমাদের দিকে। ২০১৩ সালের ১৬ নভেম্বর- সেই দিনটিই ছিল নেতার সঙ্গে আমাদের শেষ দেখা।

বিশাল হৃদয়ের অধিকারী এই জননেতা সব শ্রেণি-পেশার মানুষের বিপদে-আপদে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতেন। তার ব্রত ছিল মানবকল্যাণ। আওয়ামী লীগের দুঃসময়ে প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে তার সরব উপস্থিতি প্রত্যেক নেতাকর্মীর মধ্যে প্রাণ সঞ্চার করত। দুর্দিনে কখনও নির্লিপ্ত থাকেননি মোসলেম উদ্দিন খান হাবু মিয়া। দীর্ঘ ৮৫ বছরের জীবন পরিক্রমায় ৫২-এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বাংলাদেশের অভ্যুদয় অবধি তার দৃপ্ত পদচারণা। মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্ন বারবার তাকে তাড়িত করেছে। তার দীর্ঘ জীবন কেটেছে মানুষের মুক্তির সংগ্রামে। জীবনের ভোগ-বিলাসিতা ত্যাগ করে ক্ষমতা চর্চায় লিপ্ত না থেকে তথাকথিত নেতাদের সামনে তার জীবন এবং উপস্থিতি এক বাস্তব ও নীরব প্রতিবাদ।

মানিকগঞ্জ সদরের গড়পাড়ায় এক সল্ফ্ভ্রান্ত ধনাঢ্য মুসলিম পরিবারে ১৯৩০ সালে জন্মগ্রহণ করেন এই ক্ষণজন্মা মানবপ্রেমিক। ১৯৫২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাস করেন। ১৯৫৫ সালে এলএলবি পাস করার পর ১৯৫৭ সালে মানিকগঞ্জ বারে আইন পেশায় যোগ দেন। আইন পেশায় জীবনের ৫০ বছরের বেশি সময় পার করেন। তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। সব শ্রেণি-পেশার মানুষের ভালোবাসায় মোট তিনবার জাতীয় সংসদের সদস্য হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। মানিকগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি জেলা বারের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন দীর্ঘদিন। তিনি ছাত্রজীবনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন।

১৯৬৫ সালে তৎকালীন প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন; পরে তিনি আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। ১৯৬৬ সালে ছয় দফার আন্দোলনে সক্রিয় অংশ নিয়ে গোটা মানিকগঞ্জে জনমত গড়ে তোলেন। ১৯৬৯ সালে ১১ দফার দাবিতে ছাত্র আন্দোলনেও তিনি সক্রিয় সহযোগিতা করেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়নে এমএনএ নির্বাচিত হন।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় পাকিস্তান বাহিনীর ক্র্যাকডাউনের খবর পাওয়ার পর মানিকগঞ্জে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠিত হয়; যার অন্যতম সদস্য ছিলেন মোসলেম উদ্দিন খান হাবু মিয়া। তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন এবং মুজিবনগর সরকারের নির্দেশে ভারতের বিহার রাজ্যে অন্যান্য এমএনএ, এমপিএর সঙ্গে এক মাসের সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে তিনি জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং বঙ্গবন্ধু সরকারের পাট প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তিনি জড়িত ছিলেন বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডেও। মানিকগঞ্জ পাবলিক লাইব্রেরির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক, মানিকগঞ্জ ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক ছাড়াও মানিকগঞ্জ স্টেডিয়াম, অফিসার্স ক্লাব প্রতিষ্ঠায় তার ভূমিকা অগ্রগণ্য। এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে মানিকগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী তেরশ্রীতে ৪৩ জন শহীদ স্মরণে মোসলেম উদ্দিন খান হাবু মিয়ার দিকনির্দেশনা ও অনুপ্রেরণায় একটি দৃষ্টিনন্দন স্মৃতিসৌধ নির্মিত হয়, যা তাকে চিরস্মরণীয় করে রাখবে।

২০১৩ সালের ২১ নভেম্বর পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে না ফেরার দেশে চলে যান তিনি। আমৃত্যু মানবমুক্তির স্বপ্ন দেখা এই বীর মুক্তিযোদ্ধাকে জানাই গভীর ভালোবাসা ও বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।

mojibor182@gmail.com

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com