অর্ধেকের বেশিতেই আ'লীগের হার

প্রকাশ: ৩০ নভেম্বর ২১ । ০০:০০ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর ২১ । ০২:৩৭ | প্রিন্ট সংস্করণ

সমকাল প্রতিবেদক

নৌকা পেলেই জয় নিশ্চিত- এ ধারণা ধাক্কা খেয়েছে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনের তৃতীয় ধাপে। গত সাত বছরে জাতীয় সংসদ থেকে স্থানীয় সরকার- সব নির্বাচনে আওয়ামী লীগ একচেটিয়া জয় পেলেও গত রোববার ভোট হওয়া অর্ধেকের বেশি ইউনিয়নে হেরেছেন নৌকার প্রার্থীরা। তৃতীয় ধাপের ৮৯২ ইউনিয়নের ৪৬৬টিতে পরাজিত হয়েছেন আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থীরা; জিতেছে ৪২৬ ইউনিয়নে।

আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা মূলত দলের বিদ্রোহী ও স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়া বিএনপি নেতাদের কাছে পরাজিত হয়েছেন। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রায় ৭৫ শতাংশ ভোট পেলেও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বহু স্থানে নৌকার প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে। যেসব ইউনিয়নে বছর তিনেক আগে সংসদ নির্বাচনে নৌকা ৯০ শতাংশ ভোট পেয়েছিল, এবার সেখানে ১০ শতাংশেরও কম পেয়েছে। অথচ আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেলেই জয় নিশ্চিত- এ ধারণায় নৌকা পেতে কাড়াকাড়ি ছিল ভোটের মাঠে। প্রতি ইউনিয়নে গড়ে পাঁচ থেকে ছয়জন করে মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন।

তৃতীয় ধাপে এক হাজার আটটি ইউনিয়নে ভোট হওয়ার কথা ছিল। মামলা জটিলতায় সাতটির ভোট স্থগিত হয়ে যায়। বাকি এক হাজার একটি ইউনিয়নের মধ্যে চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার ১৪টিতে চেয়ারম্যান-মেম্বারসহ সবাই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হওয়ায় ভোট হয় ৯৮৭ ইউপিতে। রাউজানের ১৪টিসহ ৯৯ ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের এবং একটিতে স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয়েছেন। ফলে এক হাজার একটি ইউনিয়নের ৯০১টিতে চেয়ারম্যান পদে ভোট গ্রহণ করা হয়। তার মধ্যে মাদারীপুর জেলার ১৪টি ইউনিয়নে কাউকে দলীয় মনোনয়ন না দেওয়ায় ৮৮৭টি ইউনিয়নে নৌকার প্রার্থী ছিল।

নির্বাচনের দিন সহিংসতায় ২১টি কেন্দ্রের ভোট স্থগিত হয়েছে। এতে ৯০১টি ইউনিয়নের ৯টির চেয়ারম্যান পদে ফল ঘোষণা সম্ভব হয়নি। বাকি ৮৯২টি ইউনিয়নের ৪৬৬টিতে হেরেছে আওয়ামী লীগ। জিতেছে ৪২৬টি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদে। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী ৯৯সহ আওয়ামী লীগ মোট ৫২৫টি ইউনিয়নে জয়ী হয়েছে।

স্বতন্ত্র প্রার্থীরা একটি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতাসহ মোট ৪৪৬টি ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হয়েছেন। গত রোববার রাত ১০টার দিকে নির্বাচন কমিশন সূত্রে এই বেসরকারি ফল পাওয়া গেছে। সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি (জাপা) ১৭টি ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে জয়ী হয়েছে। ইসলামী আন্দোলন, ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম একটি করে মোট ২১ ইউনিয়নে জয়ী হয়েছে।

আওয়ামী লীগ যে ৪৬৬ ইউনিয়নে জয়ী হতে পারেনি, তার বেশিরভাগে হেরেছে নিজ দলের বিদ্রোহী এবং নির্বাচন বর্জন করা বিএনপি নেতাদের কাছে। কোথাও কোথাও আওয়ামী লীগের বিদ্রোহীরা প্রথম ও দ্বিতীয় হয়েছেন। নৌকার প্রার্থী তৃতীয় ও চতুর্থ হয়েছেন।

১১ নভেম্বর অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় ধাপের ভোটে ৮৩৩টি ইউনিয়নের ৩৪৮টিতে চেয়ারম্যান পদে পরাজিত হয়েছিলেন আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ৭৭টিসহ ৪৮৫টি ইউনিয়নে নৌকা জয়ী হয়েছিল। ওই ধাপে ২০২টি ইউনিয়নে ভোটের সংখ্যায় দ্বিতীয় স্থানে ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা। আটটি ইউনিয়নে নৌকার প্রার্থী ছিল না। বাকি ১৩৮টি ইউনিয়নে দ্বিতীয়ও হতে পারেননি শাসক দলের প্রার্থীরা। ভোটের মূল লড়াইয়ে না থাকা নৌকার প্রার্থীরা তৃতীয়, চতুর্থ, এমনকি পঞ্চম স্থানে ছিলেন।

ব্যুরো ও জেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যে রোববার অনুষ্ঠিত ৮৯২টি ইউনিয়নের ৬১০টির চেয়ারম্যান পদের ভোটের ফল বিশ্নেষণ করেছে সমকাল। মাদারীপুরের ১৪টি বাদে বাকি ৫৯৬টির মধ্যে ৩০৯টি ইউনিয়ন পরিষদে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগ জিতেছে।

৬১০টি ইউনিয়নের মধ্যে ২৬টিতে জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে নৌকার প্রার্থীর। কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলায় প্রদত্ত ভোটের আট ভাগের এক ভাগ না পাওয়ায় জামানত জব্দ হয়েছে আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের। জামানত রক্ষা হলেও অনেক স্থানে তৃতীয়, চতুর্থ হয়েছে নৌকা।

আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ফরিদপুরের ১৫টি ইউনিয়নে মাত্র একটিতে জয়ী হয়েছে নৌকা। জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে পাঁচটি ইউনিয়নে। বাকিগুলোতে জামানত টিকলেও কয়েকটিতে তৃতীয়, চতুর্থ হয়েছেন নৌকার প্রার্থীরা। ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলার তিন ইউনিয়নের দুটিতে বিএনপির স্বতন্ত্র প্রার্থী জয়ী হয়েছেন।

ইউপি নির্বাচনের প্রথম দুই ধাপেও দলের বিদ্রোহীদের কাছে ভরাডুবি হয়েছিল নৌকার প্রার্থীদের। তৃতীয় ধাপে বিদ্রোহীদের কাছে নৌকার পরাজয় আরও বড় হয়েছে। সমকালের ফল বিশ্নেষণ করা ৬১০টি ইউনিয়নের ১৮৯টিতে মনোনয়ন না পেয়ে বিদ্রোহ করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়া আওয়ামী লীগ নেতারা চেয়ারম্যান পদে জয়ী হয়েছেন। এ হিসাবে, ৩১ শতাংশ ইউনিয়নেই নিজ দলের বিদ্রোহীদের কাছে হেরেছে আওয়ামী লীগ।

সংবিধান অনুযায়ী ইউনিয়ন পরিষদ ক্ষুদ্রতম প্রশাসনিক ইউনিট। ছয় ধাপে সারাদেশের প্রায় সাড়ে চার হাজার ইউনিয়নে ভোট হবে।

বিএনপি নির্বাচনে দলীয়ভাবে অংশ নিচ্ছে না। তবে দলটির অনেক নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। তৃতীয় ধাপের ভোটে সমকাল যে ৬১০ ইউনিয়নের ফল বিশ্নেষণ করেছে, তার ৬৭টিতে বিএনপি নেতারা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। মূলত সিলেট, উত্তরবঙ্গ ও চট্টগ্রাম বিভাগের জেলাগুলোতে তারা জয়ী হয়েছেন। বগুড়ায় অনুষ্ঠিত ২৭টি ইউনিয়নের ১১টিতে বিএনপি নেতারা জয়ী হয়েছেন। সমকালের প্রতিনিধিদের তথ্য অনুযায়ী, খাগড়াছড়িতে তিন ইউপিতে স্থানীয় রাজনৈতিক দল জনসংহতি সমিতি সমর্থিত তিন প্রার্থী চেয়ারম্যান পদে জয়ী হয়েছেন।

পিরোজপুরের কাউখালীর রঘুনাথপুর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থী এইচএমআরকে খোকন মাত্র ১২০ ভোট পেয়েছেন। দলের বিদ্রোহী প্রার্থী মো. আবু সাঈদ দুই হাজার ৬৪৪ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। অথচ একাদশ সংসদ নির্বাচনে পিরোজপুর-২ আসনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের প্রার্থী ৯৫ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছিলেন।

আওয়ামী লীগ প্রার্থীর অভিযোগ, দলের নেতারা তার পক্ষে কাজ না করায় মাত্র ১২০ ভোট পেয়ে জামানত খোয়াতে হয়েছে। আর আওয়ামী লীগ নেতাদের অভিযোগ, দল অযোগ্য ব্যক্তিকে প্রার্থী করায় এই ভরাডুবি। যেসব এলাকায় আওয়ামী লীগ জামানত হারিয়েছে, সেখানেও একই অভিযোগ আসছে। আর পরাজিত প্রার্থীদের অভিযোগ দলের নেতাদের বিরুদ্ধে।

কুমিল্লার দাউদকান্দির পদুয়া ইউনিয়নে নৌকার প্রার্থী নাসির আহমেদ ২৫৬ ভোট পেয়েছেন। একই উপজেলার মালিগাঁও ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগ প্রার্থী ৮২৬ ভোট পেয়েছেন। সুনামগঞ্জের ১৭টি ইউনিয়নের ১৫টিতে হেরেছে নৌকা। জেলার পাঁচটি করে ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে দলের বিদ্রোহী এবং বিএনপি নেতাদের কাছে হেরেছে নৌকা। বাকিগুলোতে জাতীয় পার্টি, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। সামগ্রিকভাবে সিলেট বিভাগেই নৌকার ভরাডুবি হয়েছে। ৭৭টি ইউনিয়নের ৫০টিতে চেয়ারম্যান পদে হেরেছে ক্ষমতাসীন দল।

গতবারের মতো এবার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনও রক্তাক্ত হয়েছে আওয়ামী লীগ ও দলের বিদ্রোহী প্রার্থীদের সংঘর্ষে। গত রোববার ভোটের দিনে এক বিজিবি সদস্যসহ ৯ জনের প্রাণ গেছে। ভোটপরবর্তী সহিংসতায় আরও পাঁচজন নিহত হয়েছেন।

অতীতের নির্বাচনগুলোর মতো এবারের ইউনিয়ন পরিষদের ভোটেও জাল-জালিয়াতির অভিযোগ এসেছে। আগে থেকেই ব্যালটে সিল মেরে রাখা, ব্যালট ছিনিয়ে নিয়ে সিল মেরে বাক্সে ভরার ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরছে। প্রবাসী অধ্যুষিত এলাকা মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার কাদিপুর ইউনিয়নের ছকাপন উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ কেন্দ্রে ৯৫ দশমিক ৩২ শতাংশ এবং হোসেনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৯৭ দশমিক ৪২ শতাংশ ভোট পড়েছে। ওই এলাকার মৃত ভোটার এবং বিদেশে থাকাদের বাদ দিলে এত ভোট পড়া সম্ভব নয়।

[তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন বরগুনা, পটুয়াখালী, দিনাজপুর, লালমনিরহাট, কুষ্টিয়া, চাঁদপুর, বগুড়া, কুমিল্লা, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, পাবনা, রাঙামাটি, রাজবাড়ী, নওগাঁ, মৌলভীবাজার, মেহেরপুর, মানিকগঞ্জ, সাতক্ষীরা, নাটোর, যশোর, লক্ষ্মীপুর, সুনামগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রতিনিধিরা। এ ছাড়া বরিশাল, সিলেট, রংপুর, খুলনা, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম ব্যুরোও তথ্য দিয়েছে।]



© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com