রেলক্রসিংয়ে দুর্ঘটনা

প্রাণঘাতী এই নৈরাজ্য বন্ধ হোক

প্রকাশ: ০৭ ডিসেম্বর ২১ । ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সম্পাদকীয়

দেশের সড়কপথগুলো ধরে কীভাবে 'মৃত্যুর মিছিল' চলে, তা বহুল আলোচিত। এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেও প্রায় নিয়মিত বিরতিতে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে আলোকপাত করতে হয় আমাদের। কিন্তু দেশের রেলপথও যে দুর্ঘটনায় পিছিয়ে নেই- ভুলে যাওয়া চলবে না। বিশেষত, রেল ও সড়কপথের সংযোগস্থল তথা 'লেভেল ক্রসিং' দুর্ঘটনা। গত শনিবার চট্টগ্রামের খুলশী এলাকায় ডেমু ট্রেনের সঙ্গে সিএনজি অটোরিকশার সংঘর্ষে ট্রাফিক পুলিশের এক সদস্যসহ তিনজনের প্রাণহানি এর সর্বশেষ নজির। সোমবার সমকালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে রেলওয়ে সূত্র উদ্ৃব্দত করে বলা হয়েছে- গত সাত বছরে কেবল লেভেল ক্রসিংয়েই ১৩২টি দুর্ঘটনায় প্রায় দেড়শ প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।

বস্তুত রেলপথের বিভিন্ন স্থানের লেভেল ক্রসিং যেভাবে অরক্ষিত থাকে, তা যেন দুর্ঘটনার 'সদা প্রস্তুত ক্ষেত্র'। দেখা যায়, যেসব রেলক্রসিংয়ে পাহারাদার নেই, সেখানে ছোট্ট সতর্কীকরণ নোটিশ টাঙিয়ে দিয়েই দায় সারা হয়। যে দেশে প্রতিবন্ধক দিয়েও সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো যায় না, সেখানে কেবল একটি নোটিশেই কাজ হবে, ভাবাই বাহুল্য। এই প্রশ্নও সংগত যে, কতজন ওই নোটিশ পড়তে পারে! সমকালের আলোচ্য প্রতিবেদনেই দেখা যাচ্ছে, রেলের পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চল মিলে সারাদেশে প্রায় তিন হাজার লেভেল ক্রসিং রয়েছে। এর প্রায় অর্ধেকেরই অনুমোদন নেই। যে অর্ধেকের অনুমোদন রয়েছে, তার মধ্যে প্রায় সাড়ে ছয়শ ক্রসিংয়ে কোনো পাহারাদার বা 'গেটম্যান' নেই। পাহারাদার থাকলেও তারা কতটা 'দায়িত্বশীল', এর প্রমাণ আমরা শনিবার চট্টগ্রামের খুলশীতে পেয়েছি। সেখানে পাহারাদার থাকলেও ট্রেন আসার সময় ক্রসিংটি খোলা ছিল এবং দুর্ঘটনার পর তিনি পালিয়ে যান।

এসব দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির জন্য কেবল অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংই নয়; সেগুলো পাড়ি দেওয়া চালক কিংবা যাত্রীর অবিমৃষ্যকারিতাও যে সমান দায়ী, তা স্বীকার করতে হবে। রেলক্রসিংগুলো এমন নয় যে, সড়কপথের মতো মিনিটে মিনিটে ট্রেন চলাচল করে। ডানে ও বাঁয়ে ভালোভাবে দেখেশুনে মাত্র কয়েক গজ প্রশস্ত ক্রসিং পার হলেই দুর্ঘটনার আশঙ্কা বহুলাংশে কমে যায়। প্রায়ই দেখা যায়, এই সামান্য 'কষ্ট' চালকরা করতে যায় না। জীবনানন্দ দাশ তার কবিতায় বলেছিলেন- 'আমি অত তাড়াতাড়ি কোথাও যেতে চাই না।' কিন্তু পথে পথে বিশেষত, লেভেল ক্রসিংয়ে তার স্বজাতির সবারই এমন তাড়া চোখে পড়ে, যেন জীবনের চেয়ে সময়ের মূল্যই বেশি।

আমরা জানি, গতি ব্যাহত না করেও স্থল পরিবহনের দুই মাধ্যম রেল ও সড়ক কীভাবে সমান্তরাল চালু থাকতে পারে, লেভেল ক্রসিং হচ্ছে তারই বিশ্বস্বীকৃত ব্যবস্থা। কিন্তু রেল ও সড়কপথের সংযোগস্থলে এসব মৃত্যুফাঁদ নিয়ে আমাদের বহুপক্ষীয় ও দুর্ভাগ্যজনক নির্লিপ্ততাই মূলত দায়ী। তার চেয়েও দুর্ভাগ্যজনক সম্ভবত লেভেল ক্রসিং নিয়ে আমাদের মৌসুমি উদ্বেগ। আমরা দেখছি, একেকটি দুর্ঘটনার পরই কেবল এগুলোর ব্যাপারে কথাবার্তা-লেখালেখি হয়। তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। সংবাদমাধ্যমে আলোচনা হয়। কিন্তু কিছুদিন পর আবার সব নিস্তরঙ্গ হয়ে পড়ে; পথে ওত পেতে থাকে মৃত্যুদূত। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তদন্ত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন দূরে থাক, সময়মতো পেশ ও প্রকাশের গরজও দেখা যায় না। নাগরিকের মূল্যবান প্রাণ ও সম্পদ বাঁচাতে হলে প্রাণঘাতী এই নৈরাজ্য বন্ধ করতেই হবে।

এ ক্ষেত্রে কেউ কেউ সব লেভেল ক্রসিংয়ে পাহারাদার নিয়োগের সুপারিশ করে থাকেন। আমরা মনে করি, লেভেল ক্রসিংয়ের সংখ্যা ও রেলওয়ের সামর্থ্য বিবেচনায় তা বাস্তবসম্মত নয়। তবে ব্যস্ততম এলাকাগুলোতে পাহারাদার নিয়োগ ও তার উপস্থিতি নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। একই সঙ্গে কমিয়ে আনতে হবে লেভেল ক্রসিংয়ের সংখ্যা। তারও আগে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই স্থানীয়রা বা অন্য কোনো সরকারি সংস্থা যেসব 'অবৈধ' ক্রসিং তৈরি করেছে, সেগুলো বন্ধ করতে হবে। যেখানে এ ধরনের সংযোগ অনিবার্য, সেখানে র‌্যাম্প বা সুড়ঙ্গ নির্মাণ করা যেতে পারে। তাহলে দুই পথই সচল ও সুরক্ষিত থাকবে। এও মনে রাখা জরুরি, লেভেল ক্রসিংয়ের আধুনিক নানা ব্যবস্থা বিশ্বে প্রচলিত রয়েছে। তারপরও আমরা কেন মান্ধাতার আমলে পড়ে আছি? লেভেল ক্রসিংয়ের সর্বশেষ দুর্ঘটনা সামনে রেখে প্রশ্ন আমরা তুলে রাখলাম।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com