ঘূর্ণিঝড় 'জাওয়াদ'

কৃষকের কান্না শুনুন

প্রকাশ: ০৮ ডিসেম্বর ২১ । ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

--

অসময়ের ঘূর্ণিঝড় 'জাওয়াদ' যদিও বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের উপকূলে পৌঁছার আগেই শক্তি হারিয়ে লঘুচাপে পরিণত হয়েছিল, অন্তত কৃষিক্ষেত্রে এর ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হয়নি। ঝড়ো হাওয়া না থাকলেও সোমবার দিনব্যাপী উপকূলসহ দেশের প্রায় সর্বত্র হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টিপাত হয়েছে। এতে রোপা আমনের পাকা ধান এবং পেঁয়াজ, আলুসহ রবিশস্যের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়া দুবলার চরসহ উপকূলীয় বিভিন্ন অঞ্চলে রোদে পাতা শুঁটকির ক্ষতিও কম নয়। বিশেষত অনেক আশা ও সম্ভাবনা নিয়ে কৃষকের গোলায় ওঠার অপেক্ষায় থাকা পাকা ধান বৃষ্টির পানিতে নিমজ্জিত কিংবা শুয়ে পড়ার ক্ষতির সঙ্গে আর কিছুর তুলনা হয় না।

আমরা দেখছি, মঙ্গলবারও দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র উঠে আসছে। সমকালের খুলনা ব্যুরো থেকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরকে উদ্ৃব্দত করে পাঠানো খবরে জানা যাচ্ছে, চলতি বছর খুলনা জেলায় যে কমবেশি ৯৩ হাজার হেক্টর জমিতে আমন চাষ হয়েছিল, তার কমবেশি ৭০ শতাংশই মাঠে রয়ে গেছে এবং জাওয়াদের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই চিত্র উপকূলীয় অন্যান্য জেলার ক্ষেত্রে কমবেশি অভিন্ন। বৃহত্তর ফরিদপুর ও ঢাকায় এই মৌসুমে পেঁয়াজ, আলুসহ রবিশস্য ক্ষেতে থাকে। আমরা দেখছি, সেগুলোরও অধিকাংশ এমনভাবে বৃষ্টির পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে, নতুন করে চাষাবাদ ছাড়া উপায় নেই। এই আশঙ্কা অমূলক হতে পারে না যে, মাঠ পর্যায়ে চূড়ান্ত চিত্র পাওয়ার পর ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা আরও বাড়বে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের দায় কারও নেই; কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের পাশে দাঁড়াতে যেন বিলম্ব না হয়।

আমাদের মনে আছে, চলতি বছর মে মাসে বঙ্গোপসাগরে দেখা দেওয়া ঘূর্ণিঝড় 'ইয়াস' একই ধরনের ক্ষতি করেছিল। গতিবেগ ততটা জোরালো ছিল না, কিন্তু বর্ষণ ও ভূমিতে জোয়ারের লোনা পানি কৃষির অপূরণীয় ক্ষতি করেছিল। আমরা মনে করি, যদি উপকূলীয় বাঁধ নেটওয়ার্কের মেরামত, সংস্কার এবং ক্ষেত্রবিশেষে উচ্চতা বৃদ্ধির কাজ সময়মতো করা যেত, তাহলে এই ক্ষয়ক্ষতি বহুলাংশে এড়ানো যেত।

স্বীকার করতে হবে, ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় বাংলাদেশে সক্ষমতা এখন বৈশ্বিক উদাহরণ। আমাদের দেশে নব্বই দশকে প্রণীত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত স্থায়ী আদেশ একটি কার্যকর ব্যবস্থা হিসেবে ইতোমধ্যে প্রমাণিত। ঘূর্ণিঝড় থেকে সুরক্ষায় স্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে নকশা করার উদ্যোগও যথেষ্ট উদ্ভাবনীমূলক। এমনকি সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জলোচ্ছ্বাস ও প্লাবন মোকাবিলায় যে মাটির ঢিবি তৈরির উদ্যোগ নিয়েছিলেন, সেই 'মুজিব কেল্লা' এখনও দুর্যোগ মোকাবিলায় ভূমিকা রাখছে। এই ব্যবস্থা বন্যা, জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড় থেকে গবাদি পশু রক্ষায় হয়ে উঠছে অন্যতম প্রধান ভরসা। আমাদের স্বেচ্ছাসেবকরা যেভাবে মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে যায়, তার উদাহরণও বিশ্বে কম। এও স্বীকার করতে হবে, আমাদের ঘূর্ণিঝড় পূর্বাভাস ব্যবস্থা এখন আন্তর্জাতিক মানের। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা ও পক্ষের সঙ্গে যৌথভাবে আমরা এখন তিন-চার দিন আগেই ঘূর্ণিঝড়ের ধরন ও সম্ভাব্য গতিপথ বলে দিতে পারি। সর্বশেষ 'জাওয়াদ' যখন নিম্নচাপ থেকে ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হচ্ছিল, তখনও ব্যতিক্রম ঘটেনি।

এখন আমাদের নজর দিতে হবে বাঁধ ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী ও সংহত করার দিকে। দক্ষিণাঞ্চলজুড়ে ষাটের দশক থেকে বিভিন্ন পর্যায়ে নির্মিত উপকূলীয় বাঁধ ব্যবস্থা এখন বহুলাংশে দুর্বল হয়ে পড়েছে। সিডর, আইলা, মহাসেন, আম্পান কিংবা ইয়াসের মতো ঘূর্ণিঝড়ের সময় দেখা গেছে, ঝড়ো বাতাসের তাৎক্ষণিক ধ্বংসযজ্ঞের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করছে বাঁধ ভেঙে প্রবেশ করা জোয়ার বা জলোচ্ছ্বাস এবং 'কৃষকের কান্না' হয়ে ঝরা বৃষ্টি। কৃষকের এই কান্না নীতিনির্ধারকদের শুনতে হবে। আইলার সময়েই আমরা এই সম্পাদকীয় স্তম্ভে বলেছিলাম, বাঁধের উচ্চতা বাড়াতে না পারলে ঘূর্ণিঝড়ে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি বাড়তেই থাকবে। চলতি বছর ইয়াস ও জাওয়াদের পর আমাদের আশঙ্কাই সত্য হলো। এ ব্যাপারে অবিলম্বে উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। যত বিলম্ব হবে, কৃষকের কান্না তত বাড়তেই থাকবে।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com