খালেদা জিয়ার চিকিৎসা

রাজনীতি নয়, মানবিকতার দাবি

প্রকাশ: ১১ ডিসেম্বর ২১ । ০০:০০ | আপডেট: ১১ ডিসেম্বর ২১ । ০১:২২ | প্রিন্ট সংস্করণ

মহিউদ্দিন খান মোহন

গত ৫ ডিসেম্বর সমকালের প্রধান শিরোনাম ছিল 'রাজনৈতিক সমঝোতা না হওয়াই বড় বাধা'। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিএনপি চেয়ারপারসন অসুস্থ খালেদা জিয়ার উন্নত চিকিৎসা গ্রহণে বিদেশে যাওয়ার বিষয়ে পর্দার বাইরে এবং অন্তরালে নানামুখী তৎপরতা চলছে। সরকার চায় রাজনৈতিক সমঝোতা আর বিএনপি চায় নিঃশর্ত বিদেশ গমন। তবে সাজাপ্রাপ্ত হিসেবে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীকে সহজে বিশেষ বিবেচনায় ছাড় দিতে নারাজ সরকার। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাহী আদেশের সুবিধা পেতে খালেদা জিয়া তথা বিএনপিকেও কিছুটা রাজনৈতিক ছাড় দেওয়ার শর্ত সামনে আনছে সরকার। দলের লাগাতার কর্মসূচির ফলে জনমত আরও সংগঠিত হলে সরকার বাধ্য হয়েই সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীকে বিদেশে যাওয়ার অনুমতি দেবে।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরেই নানা জটিল রোগে আক্রান্ত। মাঝে তিনি করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। বার কয়েক হাসপাতালেও চিকিৎসা নিয়েছেন। কিছুটা সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরে গেছেন। তার উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে বিদেশে নেওয়ার কথা পরিবার ও দলের পক্ষ থেকে অনেকদিন ধরেই বলা হচ্ছিল। বিএনপি তাদের এই শীর্ষনেত্রীর উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে গমনার্থে নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করে এলেও এর সপক্ষে তেমন কোনো জোরালো আন্দোলন তারা গড়ে তুলতে পারেনি। এমন কি তাকে কারাগারের বাইরে আনতে তারা ব্যর্থ হয়েছে। শেষ পর্যন্ত খালেদা জিয়ার পরিবারের পক্ষ থেকে ছোট ভাই শামীম এস্কান্দার সরকারের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে নির্বাহী অদেশে তার সাময়িক মুক্তির ব্যবস্থা করতে সক্ষম হন। তদানুযায়ী ২০২০ সালের ২৫ মার্চ থেকে তিনি নিজ বাসায় অবস্থান এবং হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে পারছেন।

বিএনপি খালেদা জিয়ার মুক্তি নিয়ে নানা রকম কথাবার্তা বললেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা তারা নিতে পারেনি। তারা না পেরেছে আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে, না পেরেছে তার মুক্তির দাবিতে সরকারের ওপর কোনো কার্যকর চাপ সৃষ্টি করতে। এমন কি পর্দার অন্তরালে সরকারের সঙ্গে সমঝোতা স্থাপন করেও তার মুক্তির ব্যবস্থা করতে পারেনি তারা। দেখেশুনে মনে হয়, খালেদা জিয়ার মুক্তি তার দলের দ্বারা সম্ভব হবে না। তাকে যদি মুক্তি পেতেই হয়, তাহলে সরকারের অনুকম্পায় মুক্তি নিতে হবে। শেষ পর্যন্ত তাই হয়েছে। 'আপসহীন নেত্রী' খালেদা জিয়াকে সরকারের সঙ্গে আপস করেই কারাগারের বাইরে আসতে হয়েছে। আর এই সাময়িক মুক্তির জন্য সরকারের পক্ষ থেকে যেসব শর্ত দেওয়া হয়েছে, খালেদা জিয়া তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে এসেছেন এ পর্যন্ত।

একদা সাধারণ গৃহবধূ খালেদা জিয়া এক সময় পরিণত হয়েছিলেন রাজনৈতিক নেত্রীতে। আজকে তিনি আদালতের রায়ে দণ্ডিত, বয়স এবং নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে ন্যুব্জ। কিন্তু আশির দশকে এ খালেদা জিয়াই রাজপথে নেমেছিলেন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে। আজ খালেদা জিয়াকে শুধু একজন দণ্ডিত আসামি হিসেবে চিত্রিত করার প্রয়াস পাচ্ছেন কেউ কেউ। কিন্তু তিনি কি শুধুই তাই? এ দেশ, এ দেশের গণতন্ত্র, রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে তার যে বিশাল ভূমিকা রয়েছে তা কি অস্বীকার করা যাবে? ১৯৮১ সালের ৩০ মে তিনি স্বামী জিয়াউর রহমানকে অকালে হারালেন। দুই শিশুসন্তানকে বুকে আগলে যে সময়ে তার শোক সামলানোর কথা, তখন তাকে দেখা গেল বৈধব্যের পোশাক পরে জনতার মিছিলে হাঁটতে। খালেদা জিয়ার শত ভুল আমরা ধরতে পারি, কিন্তু স্বৈরাচারের কবল থেকে এ দেশের গণতন্ত্রকে মুক্ত করতে তার যে ত্যাগ, অবদান নিশ্চয়ই অস্বীকার করা যাবে না।

স্মরণ থাকার কথা- প্রায় পুরো আশির দশকজুড়ে আমরা স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনরত ছিলাম। সে আন্দোলনের পুরোভাগে ছিলেন আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। তাদের যৌথ নেতৃত্বে এ দেশের গণতন্ত্রকামী মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলনে। দুই নেত্রী তখন পরিণত হয়েছিলেন গণতন্ত্রের মূর্ত প্রতীকে। তাদের ঐক্য দেশবাসীকে আশাবাদী করে তুলেছিল। কিন্তু আমরা বড়ই পোড়া কপালের জাতি। কোনো সুখই আমাদের বেশিদিন সয় না। রাজনৈতিক সংকীর্ণতা সে ঐক্যকে বেশিদিন স্থায়ী হতে দেয়নি। অচিরেই বিভেদের বিষবাষ্প সৌহার্দ্যের পরিবেশকে বিষাক্ত করে তুলল। আমাদের দুই দিশারি দু'দিকে চলতে শুরু করলেন। আর তাদের এই মুখ ফিরিয়ে চলা গণতন্ত্রের শত্রুদের জন্য চক্রান্ত সফল করার সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়। সে এক লম্বা ইতিহাস। সে ইতিহাস নিয়ে এখানে কথা বাড়িয়ে লাভ নেই।

আমাদের জন্য মর্মযাতনার বিষয় হলো, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনের দুই নেত্রী আজ দুই মেরুতে। তাদের মধ্যে আজ যোজন যোজন দূরত্ব। সৌহার্দ্য-সহমর্মিতা সেখানে অনুপস্থিত। বরং রাজনৈতিক বৈরিতা আচ্ছন্ন করেছে এমনভাবে, তারা একে অপরের ছবিটিও বোধকরি স্পষ্ট করে দেখতে পাচ্ছেন না। অথচ এমনটি আমরা চাইনি। আমরা যেটা চেয়েছি তা আর কখনও ফিরে আসবে বলে মনে হয় না। তবে রাজনীতিকদের মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ্য, শ্রদ্ধা এবং সহমর্মিতা থাকবে না, এমনটা আমরা কামনা করিনি, করি না। আমরা আমাদের রাজনীতিকদের অনেক উচ্চতায় দেখতে চাই, যেমনটি দেখেছি অতীতে। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেন কখনোই শত্রুতা-জিঘাংসায় পর্যবসিত না হয়, আমাদের রাজনীতিকরা সে বিষয়ে সচেতন হবেন- এমনটি আশা করা নিশ্চয়ই অতিআশা নয়।

খালেদা জিয়া এখন এমন এক ব্যাধিতে আক্রান্ত, যা রীতিমতো প্রাণঘাতী হিসেবে পরিচিত। লিভার সিরোসিস এমন এক কঠিন ব্যাধি, যার সম্পূর্ণ নিরাময় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হয়ে ওঠে না। চিকিৎসকরা যে তিনটি দেশে চিকিৎসার কথা বলেছেন, সেখানে তাকে দ্রুত পাঠানো গেলে নিরাময়ের আশা অনেকটাই করা যায়। সে ক্ষেত্রে যত বিলম্ব হবে, খালেদা জিয়ার অবস্থা ততই সংকটাপন্ন হয়ে উঠতে পারে। তাই রাজনৈতিক বিতর্ক নয়, এ ব্যাপারে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই বিষয়টি বিবেচনা করা দরকার।

সরকার যদি মনে করে, খালেদা জিয়া বিদেশে গেলে আর ফিরে আসতে নাও পারেন, সে ক্ষেত্রে তার বিদেশে গমন, চিকিৎসা গ্রহণ এবং দেশে প্রত্যাবর্তন সরকারের তত্ত্বাবধানেই হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি বা যুক্তরাজ্যে আমাদের দূতাবাস বা হাইকমিশন তার চিকিৎসার বিষয়টি দেখভাল করবে। দেশে যেমন একজন বন্দিকে হাসপাতালের প্রিজন সেলে রেখে সরকার চিকিৎসার ব্যবস্থা করে, বিদেশেও সেভাবেই ব্যবস্থা করা যেতে পারে। আমার মতো অনেকের কাছেই এ মুহূর্তে খালেদা জিয়ার চিকিৎসাটাই মুখ্য, অন্য কিছু নয়। তিনি মুক্তি পেলেন কি পেলেন না, আর কখনও রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন করতে পারবেন কি পারবেন না, সেসব এখন গুরুত্বহীন প্রশ্ন। প্রশ্ন যেখানে জীবন-মরণের, সেখানে অন্য কিছুই গুরুত্ব পেতে পারে না।

জানি না কথাগুলো কতটা সংগত হবে, তারপরও বলছি। খালেদা জিয়ার সাবেক একজন কর্মী হিসেবে আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে সবিনয় আবেদন জানাচ্ছি বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনার জন্য। তারা দু'জন এক সময় এ দেশের গণতন্ত্র উদ্ধারের আন্দোলনে পাশাপাশি হেঁটেছেন। সেই সহযোদ্ধার এই জীবন-সংকটের সময়ে নিশ্চয়ই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সদয় হবেন। তার প্রতি আরও অনুরোধ, বিএনপি নেতাদের হম্বিতম্বির প্রতি কর্ণপাত করার দরকার নেই। আপনি বঙ্গবন্ধুর কন্যা। আপনার পিতা তার রাজনৈতিক বিরোধীদের প্রতি কী রকম সদয় আচরণ করেছেন তা আমরা যেমন জানি, আপনিও তেমনি জানেন। পিতার সে উদারতার নতুন দৃষ্টান্ত কন্যা প্রতিষ্ঠিত করবেন, এমন আশা তো আমরা করতেই পারি।

মহিউদ্দিন খান মোহন:সাংবাদিক ও রাজনীতি বিশ্নেষক

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com