মূল লক্ষ্য এখনও অর্জিত হয়নি

প্রকাশ: ১৬ ডিসেম্বর ২১ । ০০:০০ | আপডেট: ১৯ ডিসেম্বর ২১ । ১৭:১৮ | প্রিন্ট সংস্করণ

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা। সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে সব সময়ই সোচ্চার। মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকেই লেগে আছেন এ কাজে। পাশাপাশি রাজনীতি নিয়েও সরব। সমকালকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি খোলামেলা কথা বলেছেন। জানিয়েছেন, স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে স্বাস্থ্য খাতে প্রাপ্তির চেয়ে অপ্রাপ্তির পাল্লাই ভারী। সরকারি কর্মকর্তা, ঠিকাদার এবং ওষুধ কোম্পানিগুলো মিলেমিশে দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হওয়ায় এত বছরেও স্বাস্থ্যসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন লোটন একরাম।


স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে প্রাপ্তি কেমন?

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী :
অবশ্যই আমাদের বেশ কিছু অর্জন আছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় গড় আয়ু ছিল ৩৭ বছর। এখন গড় আয়ু বৃদ্ধি পেয়ে ৭২ বছর হয়েছে। মাতৃ ও শিশুমৃত্যুর হারও কমেছে। টিকা দেওয়া বেড়েছে। মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বেড়েছে। আগে বেশির ভাগ মানুষের পায়ে স্যান্ডেল দেখা যেত না। এখন কাউকে খালি পায়ে দেখা যায় না।

অপ্রাপ্তি সম্পর্কে কী বলবেন?

জাফরুল্লাহ চৌধুরী :
মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যাশা এখনও স্বপ্নই রয়ে গেছে। আমাদের মূল লক্ষ্য এখনও অর্জিত হয়নি। সত্যিকারের মুক্তিযোদ্ধা ছিল এক থেকে দেড় লাখ। এখন তা তিন লাখে পৌঁছেছে। দুই-তিন লাখ নারী বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছে। তাদের বীরাঙ্গনা বলা হয়। এখন সরকারের পক্ষ থেকে মাত্র চারশ বীরাঙ্গনা নারীকে ভাতা দেওয়া হচ্ছে। আবার এ ভাতা পেতেও ঘুষ দিতে হয়। দেশের মানুষ পরিপূর্ণ পুষ্টি পায় না। চিকিৎসাসেবা পায় না। এটিও সত্য যে, এখনও একটি ইউনিয়নে ৪০ থেকে ৫০ হাজার মানুষের বাস থাকলেও একজন এমবিবিএস পাস চিকিৎসক দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এটা লজ্জার ব্যাপার। বিল্ডিং আছে কিন্তু চিকিৎসক নেই। আমরা বলি, দেশে মৃত্যুর হার কমেছে। কিন্তু কার তুলনায় মৃত্যুহার কমেছে। কিউবার সঙ্গে তুলনা করলে কম। ভারতের সঙ্গে তুলনায় এগিয়েছে। কিন্তু কেরালা, শ্রীলঙ্কার তুলনায় পিছিয়ে। ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যসেবায় সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় হয়। স্বাস্থ্যসেবায় মোট খরচের ৬০-৭০ ভাগ যায় মানুষের পকেট থেকে। সবার পক্ষে শহরে আসা সম্ভব নয়। সংবিধান স্বীকৃত স্বাস্থ্যসেবার অধিকার পাচ্ছে না সব মানুষ। এটা সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা সরকারের।

প্রতিটি ইউনিয়নে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছানোর ব্যাপারে আপনার পরামর্শ কী?

জাফরুল্লাহ চৌধুরী :প্
রতিটি ইউনিয়নে সার্বিক খরচ বাবদ ১০ কোটি টাকা ব্যয় করলেই সত্যিকারের স্বাস্থ্যসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছানো যাবে। তাহলে বড় শহরের হাসপাতালে এক হাজার কোটি টাকা খরচ করার প্রয়োজন হবে না। চিকিৎসকদের নিজ নিজ জেলা থেকে নিয়োগ দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। নিজ জেলায় যারা চাইবে পরীক্ষায় অংশ নেবে, আর যারা চাইবে না তারা অংশ নেবে না।

বয়স্কদের সুরক্ষার বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?

জাফরুল্লাহ চৌধুরী :
এ বিষয়ে সরকারের কোনো নজর নেই। দেশের মোট জনসংখ্যার দশ ভাগ ৬০ বছরের বেশি বয়স্ক। মাঝে মাঝে পত্রপত্রিকায় দেখি- ছেলেমেয়েরা বৃদ্ধ মা-বাবাকে দেখাশোনা করছে না। এই অসহায় বয়স্কদের কে দেখবে? সৌভাগ্যবশত আমি আজ ১৫ দিন গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন রয়েছি। এ সুযোগ কতজন মানুষ পায়। সরকারিভাবে শুধু রাজধানীর আগারগাঁওয়ে একটি বৃদ্ধাশ্রম রয়েছে। বেসরকারি পর্যায়ে গাজীপুরের জয়দেবপুরে একটি বৃদ্ধাশ্রম রয়েছে।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্যবিষয়ক সাময়িকী ল্যানসেটের গবেষণায় বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবায় সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে অবস্থান ভারত, পাকিস্তান, ভুটান, নেপাল ও আফগানিস্তানের ওপরে এবং শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের নিচে...

জাফরুল্লাহ চৌধুরী :
এতে সত্যিকার চিত্র উঠে এসেছে। জার্নালটির গবেষণায় বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবার প্রকৃত চিত্র উঠে এসেছে। এটি বিশ্বের একটি খ্যাতনামা ১৮০ বছরের পুরোনো স্বাস্থ্য জার্নাল। এ জার্নালটি না পড়লে চিকিৎসক হয় না। এ গবেষণায় বোঝা যায়, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের নিচে রয়েছে আমাদের স্বাস্থ্যসেবার সূচক।

১৯৮২ সালে জাতীয় ওষুধনীতি প্রণয়নের সঙ্গে আপনি যুক্ত ছিলেন। এ পর্যন্ত ওষুধ খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি কী দেখছেন?

জাফরুল্লাহ চৌধুরী :
এ সময়ে ওষুধ খাতে অগ্রগতি হয়েছে। ১৯৮৪ সালে দেশে ৯০ ভাগ ওষুধ বিদেশ থেকে আমদানি হতো। এখন ৯৭ ভাগ ওষুধ দেশেই উৎপাদন হয়। মোট কথা, বিদেশনির্ভরতা কমে গেছে। আগে কোম্পানিগুলো মাসে যে পরিমাণ ওষুধ বিক্রি করত, এখন প্রতিদিনই এর চেয়ে বেশি বিক্রি করে। বাইরেও রপ্তানি করছে।

ওষুধ কোম্পানিগুলো ইচ্ছামতো মূল্য নির্ধারণ করছে। অভিযোগ রয়েছে, অনেক বেশি দামে ওষুধ বিক্রি করছে...

জাফরুল্লাহ চৌধুরী :
সরকার নিজেই নিজের নিয়ম ভঙ্গ করেছে। ১৯৮২ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত সরকারই সব ওষুধের মূল্য নির্ধারণ করে দিত। ১১৭টি ওষুধের মূল্য সরকারই নির্ধারণ করেছে, তাই এগুলোর দাম বাড়েনি। কিন্তু '৯৪ সালে বিএনপি সরকারের সময়ে ওষুধ কোম্পানিগুলো সরকারকে নানা যুক্তি ও নয়ছয় বুঝিয়ে ওষুধের দাম নির্ধারণের ক্ষমতা কোম্পানিগুলোর হাতে নিয়ে গেল। এখন প্রায় চারশ ওষুধের মূল্য কোম্পানিগুলো নিজেরাই নির্ধারণ করছে। সেগুলোর দাম প্রতিনিয়ত বেড়ে চলছে। ওষুধ নীতির মূল লক্ষ্য ছিল- দাম স্থিতিশীল রাখা। এমনকি কোম্পানিকে যথাযথ লাভ দিয়েই যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ করে দিত।

করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলার বিষয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?

জাফরুল্লাহ চৌধুরী :
করোনার সময়ে স্বাস্থ্য খাতে ভয়াবহ দুর্নীতি হয়েছে। করোনা মোকাবিলায় বড় ব্যর্থতা হলো- যে ওষুধ সাত ডলারে কেনা যেত, তা ১৪ ডলারে কিনেছে। সংসদে মূল্য প্রকাশ করেনি। ব্যর্থতার মধ্যে আরও রয়েছে- সবাইকে মাস্ক তথা স্বাস্থ্যবিধি মানাতে বাধ্য করতে পারেনি। অন্যদিকে কিছু সফলতাও রয়েছে, অতি দ্রুত কয়েক কোটি মানুষকে টিকা দিতে পেরেছে সরকার।

সরকারি হাসপাতালে সেবা নিয়ে মানুষের অনেক অভিযোগ রয়েছে। কীভাবে উত্তরণ সম্ভব?

জাফরুল্লাহ চৌধুরী :
স্বাস্থ্যসেবাকে বিকেন্দ্রীকরণ করা জরুরি। সাধারণ ছোটখাটো রোগের জন্য স্ব-স্ব ইউনিয়নে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। এতে ঢাকাসহ বড় শহরে রোগীর চাপ ও দুর্ভোগ অনেকাংশে কমে যাবে।

উন্নত চিকিৎসার জন্য ধনীরা বিদেশে পাড়ি জমান। দরিদ্ররা দেশে কীভাবে ওই উন্নত চিকিৎসা পেতে পারেন?

জাফরুল্লাহ চৌধুরী :
চিকিৎসাসেবার মান আরও উন্নত করতে হবে। ভালো চিকিৎসক লাগবে এবং উচ্চতর প্রশিক্ষণ অব্যাহত রাখতে হবে। চিকিৎসকের সংখ্যা বাড়াতে হবে। রোগীকে সময় নিয়ে দেখতে হবে। সঠিকভাবে রোগ নির্ণয় করতে হবে। উন্নত যন্ত্রপাতি লাগবে। ভালো টেকনিশিয়ান প্রয়োজন। ভারতে যে খরচ হয়, দেশেও সে খরচ হয়। তারপরও মানুষ কেন যায়- তা অনুসন্ধান করেই করণীয় ঠিক করতে হবে।

সর্বজনীন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে না ওঠার কারণ কী?

জাফরুল্লাহ চৌধুরী :
এ অবস্থায় সর্বজনীন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে উঠবে না। সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হলে কোম্পানিকে লাভ দিয়ে সব ওষুধের মূল্য সরকারেরই নির্ধারণ করে দেওয়া উচিত। ওষুধের মূল্য, রোগ নির্ণয়, অপারেশন ও অন্যান্য চিকিৎসা ব্যয় অর্ধেকে (৫০ ভাগ) কমিয়ে আনলেই আর্থিকভাবে অসচ্ছল রোগীরা কিছুটা হলেও স্বাস্থ্যসেবা পাবেন।

স্বাস্থ্য খাতে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ এবং দুর্বলতা আছে, যা কাটিয়ে উঠলে গ্রহণযোগ্য একটা স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব বলে মনে করেন অনেকে...

জাফরুল্লাহ চৌধুরী :
ঢাকা বা শহরকেন্দ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বন্ধ করে স্থানীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা করলেই একটি গ্রহণযোগ্য স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। শুধু জটিল রোগের রোগীকে বড় শহরে পাঠাবে। এতে রোগীদের খরচও কমবে। সরকারি চারটি ওষুধ কোম্পানির সঙ্গে বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে প্রতিযোগিতা করতে বললে ওষুধের মূল্য আরও কমে যাবে।

দুর্নীতির কারণেই স্বাস্থ্য খাতে আশানুরূপ উন্নয়ন হচ্ছে না বলেও অভিযোগ করে আসছেন অনেকে- আপনি কী বলেন?

জাফরুল্লাহ চৌধুরী :
স্বাস্থ্য খাতে বড় সমস্যা হচ্ছে দুর্নীতি। এই দুর্নীতির কারণেই গরিব মানুষ সুলভ মূল্যে চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন না। দুর্নীতিকে আড়ালে রাখতেই সংসদে ওষুধের দাম প্রকাশ করে না স্বাস্থ্যমন্ত্রী। সাত ডলারের ভ্যাকসিন কিনছে ১৩-১৪ ডলারে। '৯৪ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ওষুধের মূল্য নির্ধারণে কোম্পানির ওপর ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতা রক্ষা করছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও।

স্বাস্থ্য খাতের বাজেট বরাদ্দ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?

জাফরুল্লাহ চৌধুরী :
দুর্নীতি ও ভুলনীতি বহাল রেখে বাজেট বরাদ্দ বাড়ালেও লাভ হবে না। কমিশন খেতে কর্মকর্তারা যন্ত্রপাতি কেনার প্রতি বেশি আগ্রহী। কিন্তু স্বাস্থ্যসেবা বাড়ানোর ব্যাপারে তেমন কোনো আগ্রহ নেই। বাজারে পাঁচশ টাকার যন্ত্র সরকার কিনছে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকায়।

এ খাতে অর্থ ব্যবহারের সক্ষমতা ও কেনাকাটায় স্বচ্ছতা এবং অভিজ্ঞতার অভাব রয়েছে বলে গণমাধ্যমেও খবর বেরিয়েছে...

জাফরুল্লাহ চৌধুরী :
এটা শতভাগ সত্য- লুটপাট করার চেষ্টায়ই কর্মকর্তারা ব্যস্ত থাকেন। অর্থ ব্যয়ের ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ করা জরুরি।




© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com