৭২'র সংবিধান পূর্ণ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখি

প্রকাশ: ১৬ ডিসেম্বর ২১ । ০০:০০ | আপডেট: ১৯ ডিসেম্বর ২১ । ১৭:১৮ | প্রিন্ট সংস্করণ

ড. কামাল হোসেন, সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা

ড. কামাল হোসেন। বাংলাদেশের সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা, বঙ্গবন্ধু সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও গণফোরাম সভাপতি। মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসীদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এক পতাকার নিচে দেখতে চান তিনি। এ জন্য প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতিকে ছাড় দিতে হবে বলে তিনি মনে করেন। সমকালকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী, সংবিধান, আইনের শাসন, মানবাধিকার, রাজনীতি, অর্থনীতি, নির্বাচন কমিশন গঠন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও দেশের সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শাহেদ চৌধুরী


স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর প্রাপ্তি সম্পর্কে আপনার ভাবনা জানতে চাই...

ড. কামাল হোসেন :
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল নিরস্ত্র জনগণের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। সেই মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত বাংলাদেশ স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পূর্ণ করেছে। এই পঞ্চাশ বছরে যেমন গৌরবের অধ্যায় রয়েছে, তেমনি রয়েছে অগৌরবের অধ্যায়। আমরা মহান স্বাধীনতা পেয়েছি। পবিত্র সংবিধান অর্জিত হয়েছে। এটাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। এই সময়ে কিছু কিছু ক্ষেত্রে মানুষের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। নারীশিক্ষা বেড়েছে। দেশ চলছে সাংবিধানিক শাসন ব্যবস্থায়। সাম্প্রদায়িকতা অনেকটাই মুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ সার্বিকভাবে দেশের উন্নতি হয়েছে। বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে দেশ বেশ এগিয়েছে।


কোন কোন ক্ষেত্রে অপ্রাপ্তি রয়েছে বলে মনে করছেন?

ড. কামাল হোসেন :
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও মানবাধিকার সংরক্ষণের বিষয়টি সংবিধানে থাকলেও এর বাস্তবায়নে অনেক ঘাটতি রয়েছে। মানুষকে দারিদ্র্যমুক্ত করে তাদের অর্থনৈতিক এবং সামাজিক অধিকার নিশ্চিত করার কথা থাকলেও সেটা হয়নি। বেকারত্বের সংখ্যা দেখেই বোঝা যায়, মেহনতি মানুষ কর্মসংস্থান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। স্বাধীনতার ৫০ বছর পরেও এই ঘাটতিগুলো স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছি। এই সময়ে দুর্নীতি, দখলবাজি, লুটপাট, অর্থ ও সম্পদ পাচার এবং দলবাজির ঘটনাবলির সঙ্গে সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটেছে। এর পাশাপাশি ঘটেছে ধর্মীয় মৌলবাদের উত্থান। ধর্মকে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সন্ত্রাস, হত্যা-গুম ও পুলিশ কর্তৃক আইনের অপব্যবহার, অপপ্রয়োগ ও নানা পর্যায়ে মানুষের হয়রানির ঘটনাবলিও নিঃসন্দেহে উদ্বেগের। আসলে সরকার ঠিকমতো রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারছে না। অবশ্য সেটা কতটা ইচ্ছার কিংবা ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাও বিবেচ্য।



দফায় দফায় সংবিধান কাটাছেঁড়া প্রসঙ্গে কিছু বলবেন?

ড. কামাল হোসেন :
সংবিধানে প্রথম কাঁচি চালিয়েছেন সামরিক শাসক মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। তিনি জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধে গিয়ে এটা করেছেন। আসলে জনগণকে তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করার জন্যই সংবিধানে কাঁচি চালানো হয়েছে। অবশ্যই এসব অনুচিত হয়েছে। সেই থেকে সংবিধানের মূল চেতনা থেকে আমরা সরে গেছি। যার কারণে মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়েছে। সার্বিক অর্থে পবিত্র সংবিধান কাটাছেঁড়া করার বিষয়টি একেবারেই অনৈতিক। এটা খুবই উদ্বেগের বিষয়। একাত্তরের বিজয় বহন করে এনেছিল 'বাঙালি জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা'। এই চার মূলনীতির ভিত্তিতে প্রগতির পথে অগ্রযাত্রার অমূল্য ও ঐতিহাসিক এক সম্ভাবনা থাকলেও বিজয়ের মাহেন্দ্রক্ষণের ৫০ বছর পরে এসে গভীর বেদনার সঙ্গে দেখতে হচ্ছে, সেদিনের সেই অমূল্য বিজয় সম্ভারের খুব অল্পই আজ অবশিষ্ট রয়েছে। পবিত্র সংবিধান থেকে রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতি তুলে ফেলা হয়েছিল। এটা ছিল মৌলিক অধিকারের পরিপন্থি। অবশ্য পরবর্তী সময়ে জনদাবির মুখে রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই কৃতিত্বের দাবিদার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।



মহান মুক্তিযুদ্ধের পূর্ণাঙ্গ লক্ষ্য অর্জনে আর কী করা উচিত?

ড. কামাল হোসেন :
জাতীয় জীবনের যেসব জায়গায় বহুল প্রত্যাশিত লক্ষ্য অর্জিত হয়নি, তা অর্জনে যা কিছু করা প্রয়োজন সেটাই করতে হবে। কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। নারী-পুরুষের বৈষম্য দূরীকরণে কার্যকর উদ্যোগী ভূমিকা নিতে হবে। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে হবে। বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলা সম্ভব হলে অবশ্যই স্বাধীনতার লক্ষ্য বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব শক্তিকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ হলে ইতিবাচক সবকিছুই বাস্তবায়ন করা সম্ভব। আমি সব সময়ই ঐক্যের কথা বলে আসছি।



মহান মুক্তিযুদ্ধের সব শক্তির মধ্যে কীভাবে ঐক্য গড়ে তোলা সম্ভব?

উত্তর :
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একজন সহকর্মী হিসেবে আমাকে ডাকলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে স্বাগত জানাব। তার সঙ্গে কাজ করব। পবিত্র সংবিধান সমুন্নত রাখার প্রয়োজনে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা জাতীয় ঐক্য গড়ার জন্য আন্তরিকতা দেখালে তার আয়োজনে আমি কাজ করব। তাকে সমর্থন জানাব। কিন্তু এমনটা হবে বলে মনে হয় না। তারপরেও সব দল এবং নাগরিককে সম্মিলিতভাবে বৃহত্তর ঐক্য গড়ার চেষ্টা করতে হবে। সবাই মিলেমিশে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। সংবিধান অনুযায়ী দেশ চালাতে হবে। যেকোনো মূল্যে সংবিধানকে সমুন্নত রাখতেই হবে।



মহান স্বাধীনতার ৫০ বছরে গণতন্ত্র ও সুশাসন রক্ষায় রাজনৈতিক দলগুলো কতটা কার্যকর ভূমিকা রেখেছে?

ড. কামাল হোসেন :
এটা সত্য, গণতন্ত্র ও সুশাসন রক্ষায় রাজনৈতিক দলগুলো শতভাগ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। এখনও গণতন্ত্র বিকাশে যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। তাই গণতন্ত্রের প্রয়োজনে মানুষের মৌলিক অধিকারগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করা থেকে রাষ্ট্রকে সরে আসতে হবে। আর গণতন্ত্র হরণের জন্য দুই সামরিক শাসক মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান ও লে. জেনারেল এইচ এম এরশাদ দায়ী। আবার পূর্ণাঙ্গভাবে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা কার্যকরের বেলায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।


মহান স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে আপনার অনুভূতি কী?

ড. কামাল হোসেন :
প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তির মিশেল অনুভূতি। আমরা জনগণের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছি। এটা প্রাপ্তির অনুভূতি। কিন্তু জনজীবনের নানা ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়ে গেছে। এটা অপ্রাপ্তি। তবে সব ঘাটতি মিটিয়েই এগিয়ে যেতে হবে। দেশের বয়স বেড়েছে। আমারও অনেক বয়স হয়েছে। তাই জীবনের এই ক্ষণে পবিত্র সংবিধানের সব সুযোগ-সুবিধাসংবলিত একটি সুখী, সুন্দর ও বর্ণিল বাংলাদেশ দেখে যেতে চাই।


প্রত্যাশা কী ছিল?

ড. কামাল হোসেন :
এটা সত্য, শিক্ষার মান কিছুটা বেড়েছে। এই মান আরও বৃদ্ধি পাওয়া উচিত ছিল। অথচ শিক্ষাব্যবস্থা উপেক্ষিতই রয়েছে।

সরকার একটু ছাড় দিলেই বঙ্গবন্ধু এবং স্বাধীনতার সপক্ষের সব শক্তির এক পতাকাতলে কাজ করা সম্ভব। এটার বাস্তবায়ন হলে জাতি মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। সেই দিনটিই দেখে যেতে চাই। সেই দিনটিরই অপেক্ষায় আছি। একদিন একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ মানুষের আত্মত্যাগের মাধ্যমে পাওয়া চার রাষ্ট্রীয় মূলনীতি বাঙালি জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার ধারায় রাষ্ট্র পরিচালিত হবে। ১৯৭২ সালের সংবিধানের মূল ভিত্তি পূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠা পাবে। এমনটা হলে এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী থাকতে পারে।



বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেবেন?

ড. কামাল হোসেন :
সেটা পরে দেখা যাবে। তবে বর্তমান সরকার নিরপেক্ষ নির্বাচন চায় না। তাই অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার চাই। নির্বাচন কমিশনে নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের দেখতে চাই।



রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে সংলাপে ডাকলে সাড়া দেবেন কি?

ড. কামাল হোসেন :
অবশ্যই সাড়া দেব। রাষ্ট্রপতির আহ্বানে সাড়া দেওয়া উচিত। নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য আইন করার উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রপতি রাজনৈতিক দলগুলোকে সংলাপে ডাকলে সেখানে অবশ্যই যাওয়া উচিত হবে।


নির্বাচন কমিশন গঠনে আপনার প্রস্তাব কী?

ড. কামাল হোসেন :
নির্বাচন কমিশন এখনও আইনগত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারেনি। অথচ আইনের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন গঠনের কথা পবিত্র সংবিধানে রয়েছে। আর অবাধ, নিরপেক্ষ ও স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য আইন প্রণয়ন করা উচিত।







© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com