১৫ আগস্টে বঙ্গবন্ধুর ছবি ভাঙচুরের মামলা

সেদিন কী করেছিলেন আ স ম ফিরোজ

প্রকাশ: ১৮ ডিসেম্বর ২১ । ০০:০০ | আপডেট: ১৮ ডিসেম্বর ২১ । ১৬:০৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

সুমন চৌধুরী, বরিশাল জিতেন্দ্র নাথ রায়, বাউফল (পটুয়াখালী)

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের ট্র্যাজেডির দিন ক্ষমতাসীন দলের প্রবীণ রাজনীতিক সাংসদ আ স ম ফিরোজের বিরুদ্ধে আনন্দমিছিল করে বরিশাল শহরে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে হামলা-ভাঙচুর ও বঙ্গবন্ধুর ছবি অবমাননার অভিযোগে মামলার বিষয়টি নিয়ে জোর আলোচনা চলছে।

এত বছর পর মামলা দায়েরের উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তাছাড়া এমপি ফিরোজ সব সময় আওয়ামী লীগের রাজনীতিতেই জড়িত ছিলেন। খোঁজখবর নিয়ে জানা গেছে, এ মামলা আসলে ক্ষমতাসীন দলের কোন্দল থেকে উৎসারিত। দলীয় কোন্দলে সেখানে এ পর্যন্ত নিহত হয়েছেন ৭ জন। ফিরোজের বিরুদ্ধে একটি পক্ষ অত্যন্ত সক্রিয়। এর সঙ্গে আগামী জাতীয় নির্বাচনে পটুয়াখালী-২ (বাউফল) আসনে মনোনয়নের হিসাব-নিকাশও জড়িত আছে।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর বরিশালে আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতার এ অভিযোগ এতদিন মুখে মুখেই সীমাবদ্ধ ছিল। বাউফল সদর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের শ্রমবিষয়ক সম্পাদক জাহিদুল হক মামলার  আবেদন করলে পুরোনো অভিযোগটি নতুন করে সামনে এসেছে। তখনকার ছাত্রলীগ নেতা আ স ম ফিরোজ এরইমধ্যে পটুয়াখালী-২ আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে ৭ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ছিলেন বিগত সংসদের চিফ হুইপও।

মামলার বিষয়ে কাল রোববার আদালত সিদ্ধান্ত দেবেন। তবে ৪৬ বছর আগের বিষয়টি কারা কী উদ্দেশ্যে নতুন করে সামনে আনলো এ নিয়ে চলছে নানামুখী আলোচনা।

১৯৭৫ সালে বরিশালে রাজনীতির সঙ্গে সংশ্নিষ্ট কিংবা রাজনীতির খোঁজখবর রাখতেন এবং বর্তমানে বাউফলে আওয়ামী লীগের সক্রিয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বরিশালে আওয়ামী লীগের একটি গ্রুপের পক্ষে সক্রিয় ছিলেন তখনকার তুখোর ছাত্রলীগ নেতা ফিরোজ। আবার বর্তমানে বাউফলে তিন ভাগে বিভক্ত আওয়ামী লীগের একটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনি। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ও মামলার আবেদন করেছে প্রতিপক্ষ শিবির।

বাউফলের কালাইয়া গ্রামের সন্তান ফিরোজ দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ব্রজমোহন (বিএম) কলেজের ছাত্রনেতা ছিলেন। ১৯৬৯-৭০ সালে তিনি ছাত্র সংসদের (বাকসু) নির্বাচিত ভিপি ছিলেন। পরে পটুয়াখালী-২ আসনে ১৯৭৯ সালে আওয়ামী লীগের একাংশের (মিজান) মনোনয়নে প্রথম এমপি হন। এরপর ১৯৮৬, ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪ এবং ২০১৮ সালে সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের টিকিটে বিজয়ী হন।

বরিশালে সেদিন কী ঘটেছিল: ফিরোজের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে সবচেয়ে বেশি সরব কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় সদস্য ও ১৯৬৮ সালের বাকসু ভিপি খান আলতাফ হোসেন ভুলু। মামলায় দ্বিতীয় সাক্ষী তিনি। ভুলু ১৯৭৫ সালে বরিশাল জেলা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। মামলার ১ নম্বর সাক্ষী তখনকার বরিশাল জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ও বর্তমান আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক।

ভুলু সমকালকে বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই খুনিদের বিচারে দাবিতে তার নেতৃত্বে মিছিল বের হয়। খুনি মোশতাকের পক্ষ নেন তৎকালীন বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও বঙ্গবন্ধু সরকারের মন্ত্রিপরিষদের প্রতিমন্ত্রী নুরুল ইসলাম মঞ্জু। মিছিলটি সদর রোড বিবির পুকুর পাড়ে পৌঁছলে মঞ্জু ও ফিরোজের নেতৃত্বে ৮-১০ জন বগুড়া রোড থেকে বের হয়ে হামলা করে। পরে হামলাকারীরা আওয়ামী লীগ কার্যালয় ভাঙচুর ও বঙ্গবন্ধুর ছবিতে জুতা ঝুলিয়ে আনন্দ-উল্লাস করেছে। একইভাবে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, বিএম কলেজসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরেও বঙ্গবন্ধুর ছবি ভাঙচুর করা হয়।

তবে এ বিষয়ে ভিন্নমত দিয়েছেন নগরীর বাসিন্দা এক বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি ঘটনাস্থলের অদূরে অশ্বিনী কুমার হলের দোতলায় দাঁড়িয়ে ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছেন বলে দাবি করেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি সমকালকে বলেন, অশ্বিনী কুমার হল লাগোয়া একটি দোতলা ভবনে ছিল আওয়ামী লীগ কার্যালয়। বেলা ১১টার দিকে দুটি ট্রাকে লঞ্চঘাটের একদল শ্রমিক এসে কার্যালয়টি ভাঙচুর করে। ছট্টু নামের এক শ্রমিক নেতা ছিলেন তাদের নেতৃত্বে। আওয়ামী লীগ কার্যালয় ভবনের উত্তর দিকে প্রাচীরের বাইরে (কাঠপট্টি যাওয়ার সড়কে) তিনটি টিনের ঘর এখনও বিদ্যমান। মাঝের ঘরটিতে সপরিবারে থাকতেন ফিরোজ। ভাঙচুরকারীরা চলে যাওয়ার পর তিনি বাসা থেকে বের হয়ে ঘটনাস্থল প্রত্যক্ষ করেন।

এ বক্তব্য সমর্থন করে সদর রোডের বাসিন্দা আরেক মুক্তিযোদ্ধা বলেন, সদর রোড গুলবাগ হোটেলে দাঁড়িয়ে তিনি ঘটনা দেখেছেন। লঞ্চঘাটের শ্রমিকরা ভাঙচুর করলেও আ স ম ফিরোজকে সেখানে দেখা যায়নি। এই দুই মুক্তিযোদ্ধাই দাবি করেন, ১৫ আগস্ট বরিশালে আনন্দ কিংবা প্রতিবাদ মিছিল কিছুই হয়নি।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে আ স ম ফিরোজের মোবাইল ফোনে কল দেওয়া হলে বন্ধ পাওয়া গেছে। গত মঙ্গলবার মামলা দায়েরের পর তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, '৭০-এর দশকে যারা বিএম কলেজে ছাত্ররাজনীতিতে তার সঙ্গে পেরে ওঠেনি তারাই এসব মিথ্যাচার ছড়াচ্ছেন। তার সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সব জানেন। তাই তাকে বার বার দলীয় মনোনয়ন দিয়েছেন ও চিফ হুইপ করেছেন।

নেপথ্যে বাউফলের দলীয় বিরোধ?: আগস্ট ট্র্যাজেডির পর ফিরোজ পটুয়াখালী-২ (বাউফল) আসনে রাজনীতি শুরু করেন। ২০০১ সাল পর্যন্ত বাউফল আওয়ামী লীগ ছিল তার একক নিয়ন্ত্রণে। ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে এ আসনে দলের মনোয়ন দাবি করে পৃথক বলয় তৈরি করেন শিল্পপতি ও মার্কেন্টাইল ব্যাংকের পরিচালক এস এম ফিরোজ। শেষ পর্যন্ত ফিরোজ নৌকা প্রতীক পেলেও চারদলীয় জোট প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন। ২০০৮ সালে আবার সাংসদ নির্বাচিত হলেও ২০১২ সালে পৌর নির্বাচনে আরেকদফা হোঁচট খান। তার মনোনীত প্রার্থী গোলাম কিবরিয়া পান্নুকে পরাজিত করে মেয়র নির্বাচিত হন স্বেচ্ছাসেবক লীগের কেন্দ্রীয় নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী জিয়াউল হক জুয়েল। তাকে ঘিরে বিরোধীরা নতুন করে সংগঠিত হলে শক্ত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েন ফিরোজ। প্রতিটি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ বিভক্ত হয়ে পড়ে।

২০১৯ সালের উপজেলা নির্বাচনে মেয়র সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীকে পরাজিত করে চেয়ারম্যান হন এমপি ফিরোজের তিন যুগের অস্থাভাজন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোতালেব হাওলাদার। এরপর থেকে তাদের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি হতে থাকে। গত ৬ মাস ধরে মোতালেব সাংসদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছেন। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালনে এমপি ফিরোজ বুধবার এবং মোতালেব হাওলাদার ও মেয়র জুয়েল বৃহস্পতিবার পৃথক ৩টি শোডাউন করেছেন।

স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, ফিরোজের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি সুবিধাভোগী মোতালেব তার স্ত্রীকে উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ও ছেলেকে দুইবার চেয়ারম্যান বানিয়েছেন।

আলোচনায় জাহিদ হোসেন: বাউফল সদর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের শ্রমবিষয়ক সম্পাদক তিনি। মোতালেবের অনুসারী হিসেবে পরিচিত। এমপি ফিরোজের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ নিয়ে মামলা করতে তিনি কেন উৎসাহী জানতে চাইলে জাহিদ সমকালকে বলেন, ''গত ৯ ডিসেম্বর বেলা ১১টার দিকে উপজেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে দম্ভ করে বলেছেন 'আমি বঙ্গবন্ধুর ছবি ভেঙেছি, আরও অনেক কিছু করেছি, তাতেই আমার কিছু হয় নাই, তার বিরোধিতাকারীরাও কিছু করতে পারবেন না।' একথা শুনে বঙ্গবন্ধুর কর্মী হিসেবে আমার মনে আঘাত লাগায় আমি মামলার আবেদন করেছি।'' মোতালেব বলেন, তিনি জাহিদকে চেনেন তবে মামলা করার বিষয়ে কিছু জানেন না।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com