বর্ণমালায় মুক্তিযুদ্ধ

প্রকাশ: ১৬ ডিসেম্বর ২১ । ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্বজিৎ ঘোষ

কোনো পরাধীন জাতির মুক্তিসংগ্রামের দীর্ঘ সাধনা যখন সফল হয়, তখন তা জাতীয় চেতনার মর্মমূলে থাকে নিরন্তর প্রবহমান; বিরাজ করে অনাগত কাল ধরে অনির্বাণ প্রেরণার উৎস হয়ে। মুক্তিযুদ্ধের বৃহত্তর প্রেক্ষাপট নির্মাণে একটি দেশের জাতীয় সংস্কৃতি পালন করে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি যেমন একটি দেশের মুক্তিসংগ্রামকে ত্বরান্বিত করতে পারে, তেমনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় স্নাত হয়ে পৃথিবীর দেশে দেশে গড়ে উঠেছে সমৃদ্ধ শিল্প-সাহিত্য। বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের প্রেক্ষাপট নির্মাণেও এদেশের সাহিত্য পালন করেছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিক; আবার যুদ্ধোত্তরকালে, বিগত অর্ধ-শতাব্দীতে, জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের চেতনাকে মর্মমূলে লালন করে আমাদের সাহিত্যের অঙ্গনও হয়েছে নতুন ভাবনা ও মূল্যবোধে পরিশ্রুত ও সমৃদ্ধ- সাহিত্যে সঞ্চারিত হয়েছে নতুন নতুন মাত্রা।

স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে বিগত পঞ্চাশ বছরে মুক্তিযুদ্ধকে অবলম্বন করে অনেক সাহিত্যকর্ম রচিত হয়েছে। এ কথা নির্দি্বধায় বলা যায়, এই সময়ের বাংলাদেশের সাহিত্যে জড়িয়ে আছে সংগ্রাম ও বিজয়ের বিমিশ্র অভিব্যক্তি, যা একান্তই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার। দীর্ঘ সিকি-শতাব্দী ধরে নিজেকে শনাক্ত করার যে সাধনায় বাংলাদেশের সাহিত্যকরা ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ, তার সাফল্যে সাহিত্যের বিষয় ও প্রকরণে, যুদ্ধোত্তরকালে, এসেছে নতুন মাত্রা। বিষয় ও ভাবের দিক থেকে বাংলাদেশের সাহিত্যে যেমন মুক্তিযুদ্ধের প্রতিফলন ঘটেছে, তেমনি প্রকরণ-পরিচর্যায়ও মুক্তিযুদ্ধের অনুষঙ্গ উপস্থিত। আমাদের সাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধের প্রতিফলন ঘটেছে বিভিন্নভাবে। কখনও সরাসরি যুদ্ধকে অবলম্বন করে সাহিত্য রচিত হয়েছে, কখনও-বা সাহিত্যের বিষয়াংশ সৃষ্টি হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় পরিস্নাত হয়ে। কোনো কোনো সাহিত্যকর্মে স্বাধীনতার স্বপক্ষীয়দের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা এবং দ্বিপক্ষীয়দের প্রতি ঘৃণাবোধ উচ্চারিত হয়েছে; আবার কোথাও বা রচনার বহিরঙ্গে লেগেছে মুক্তিযুদ্ধের স্পর্শ।

স্বাধীনতা চেতনা বাংলাদেশের সাহিত্যিকদের পুনর্জাত করেছে নতুন মূল্যবোধে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে কলম হাতে তারা অনেকেই হতে চেয়েছেন এক একজন নতুন মুক্তিযোদ্ধা। এই সময়খণ্ডে সামাজিক দায়বদ্ধতা প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে আমাদের সাহিত্যিকরা শানিত হাতে বেছে নিলেন শিল্প-আয়ুধ। স্বাধীনতাযুদ্ধ চলার সময়ে বাংলাদেশের সাহিত্যিকরা ছিলেন পাকিস্তানি ঘাতকদের অন্যতম শিকার। সন্ত্রাসের মধ্যে বাস করেও বাংলাদেশের সাহিত্যিকরা সংগ্রামের মন্ত্রে উদ্বুব্দ হয়ে সাহিত্য রচনা করেছেন, পালন করেছেন শব্দ-সৈনিকের ভূমিকা। একাত্তরের যুদ্ধকালীন সময়ে যেমন, তেমনি যুদ্ধ-পরবর্তী সময়েও শোণিতাক্ত শব্দে ও সংলাপে আমাদের সাহিত্যিকরা বাণীবদ্ধ করে রেখেছেন মুক্তিযুদ্ধের অম্লান সব চেতনা। তবে এ কথা এখানে উল্লেখ্য যে, মুক্তিযুদ্ধের সময় কি অব্যবহিত পরে যেসব সাহিত্যকর্ম রচিত হয়েছে, তাতে প্রাধান্য পেয়েছে আবেগ, মনন নয়। সময়ের দাবিতে রচিত প্রচারসর্বস্ব এসব সাহিত্যকর্মে যুদ্ধের সংবাদ আছে, পাকিস্তানি সৈন্যকর্তৃক নারী-ধর্ষণের চিত্র আছে, আছে করতালি-নিনাদিত জনপ্রিয় বক্তৃতার মেলা, আছে বিপুল আবেগের উদ্দাম প্লাবন; কিন্তু যা নেই তা হলো শৈল্পিক পরিচিতিবোধ ও স্রষ্টার নিরাসক্ত জীবনচেতনা। তবু এরই মাঝে আমরা স্মরণ করতে পারি বেশ কিছু যুগন্ধর এবং যুগোত্তীর্ণ সাহিত্যকর্মের নাম।


কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক, ছড়া- এসব ক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধের উপাদান এবং অনুষঙ্গ নানাভাবে শিল্পিতা পেয়েছে। বাংলাদেশের এমন কোনো সাহিত্যিক নেই যিনি মুক্তিযুদ্ধকে অবলম্বন করে কিছু না কিছু লিখেছেন। হয়তো একক কোনো লেখকের রচনায় নয়, তবে মুক্তিযুদ্ধকে অবলম্বন করে লেখা সকলের সাহিত্যকর্ম পাঠ করলে মহান মুক্তিযুদ্ধের একটা নিষ্ঠ ছবি পাঠক আবিস্কার করতে পারবেন। হয়তো দেখা যাবে একজন লেখকের অব্যক্ত কোনো ভাবনা অন্য একজন লেখকের রচনায় প্রাধান্য পেয়ে ফুটে ওঠেছে। তবে এ কথা স্বীকার করতেই হবে, মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে অনেক সাহিত্যকর্ম প্রকাশিত হলেও আমরা এখনও পাইনি এমন এক গুচ্ছ কালজয়ী সৃষ্টি, যা মুক্তিযুদ্ধের সময় বাঙালির চৈতন্যের জাগরণকে যথাযথভাবে প্রতিভাসিত করতে সক্ষম হয়েছে। এর কারণ বহুবিধ। প্রথমত, নানা কারণেই আমাদের মুক্তিযুদ্ধ হয়তো যথার্থ জনযুদ্ধে পরিণত হতে পারেনি। ফলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাও হয়নি সর্বব্যাপ্ত এবং গভীরতা সঞ্চারী। বোধ করি এ কারণেই স্বাধীনতার অব্যবহিত পর থেকেই এ পর্যন্ত স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির এত আস্ম্ফালন। ভাবতেও বিস্ময় লাগে, অতি অল্প সময়ের ব্যবধানে স্বাধীনতার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির হাতে শহীদ হয়েছেন, দেশের ক্ষমতা দখল করেছে মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি। অনেকের মতো বাংলাদেশের লেখকরাও কি ইতিহাসের এই পশ্চাৎগতিতে প্রভাবিত হয়েছেন? দ্বিতীয়ত, কাছ থেকে দেখলে অনেক সময়ই নিরাসক্ত থাকা যায় না। হয়তো এতকাল যে সাহিত্যকর্ম রচিত হয়েছে, সেখানে আছে এই নিরাসক্তির অভাব।

উপযুক্ত কারণ সত্ত্বেও বিগত পঞ্চাশ বছরে বাংলাদেশের সাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধের যে প্রতিফলন ঘটেছে, তা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে সাহিত্যরচনা একটি চলমান প্রক্রিয়া, মুক্তিযুদ্ধ অনিঃশেষ অবিনাশী চিরন্তর শিল্প-উপাদান। এখন যেমন মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে সাহিত্যকর্ম রচিত হচ্ছে, ভবিষ্যতেও হবে। সময় পেরিয়ে যখন আসবে নতুন প্রজন্মের সাহিত্যিক, হয়তো তাদের হাতেই লেখা হবে আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে লেখা একগুচ্ছ কালোত্তীর্ণ সাহিত্যকর্ম।

সাহিত্যের সঙ্গে সমাজউন্নতির রয়েছে নিবিড় সম্পর্ক। বাংলাদেশ আজ সামাজিক অগ্রগতির নানা সূচকেই দৃশ্যমান উন্নতি করেছে। কিন্তু সংস্কৃতি ক্ষেত্রে উন্নতির ছোঁয়াটা কতটুকু। আমরা কি সংস্কৃতিযাত্রায় অগ্রসর হয়েছি, না কি পিছিয়ে যাচ্ছি। সাংস্কৃতিক উন্নতি না ঘটলে অন্য উন্নতি যে প্রভাবসঞ্চারী হয় না- এ কথা তো সকলেই স্বীকার করবেন। সংস্কৃতি বলতে রবীন্দ্রনাথ 'মনের কৃষি'কে বুঝেছিলেন। কর্ষণ যেমন পতিত জমিকে করে তোলে ফসলসম্ভবা, তেমনি সংস্কৃতি মানুষকে করে তোলে উন্নতি রুচি ও উৎকর্ষময় চিত্তের অধিকারী। রামপ্রসাদ যে বলেছেন, 'ওরে মন, কৃষি কাজ জানো না,/এমন মানব-জমিন রইল পতিত,/আবাদ করলে ফলতো সোনা'- এ বাণীই যেন সংস্কৃতি ভাবনার মূলকথা। এ প্রসঙ্গেই মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে সাহিত্যরচনার রয়েছে সবিশেষ তাৎপর্য। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সর্বত্রসঞ্চারী করতে সাহিত্যিকরা পালন করতে পারেন দূরবিস্তারী ভূমিকা। তাদের রচনায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যত বেশি বিস্তার লাভ করবে ততই মঙ্গল।

সংস্কৃতির মূল আবেদন- মানুষের সঙ্গে মানুষের মৈত্রীবন্ধন। বাংলাদেশের সনাতন সংস্কৃতিরও মূল প্রোথিত ছিল মানবমৈত্রীতে। কিন্তু ঔপনিবেশিককালে আমাদের সংস্কৃতিকে বিনষ্ট করে সৃষ্টি করা হয়েছিল ভিন্ন এক সংস্কৃতি। সে সংস্কৃতি মানুষের সঙ্গে মানুষের বিচ্ছিন্নতা বিভঙ্গতা বিকৃতির সংস্কৃতি। এ ক্ষেত্রেই মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্য আনতে পারে একটা ইতিবাচক পরিবর্তন। কেননা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মানুষের সঙ্গে মৈত্রীবন্ধনে কথা বলে- বিচ্ছিন্নতার পরিবর্তে তা মানবমিতালিতে আহ্বান জাগায়। সংস্কৃতির এই সমুত্থিত জাগরণটাই হওয়া উচিত আমাদের সকল সাহিত্যসাধনার মূল লক্ষ্য।

রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ। আমরাও মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারাতে চাই না। আমরা বিশ্বাস করি, শিক্ষা এবং সংস্কৃতির শক্তিতে বলীয়ান হয়ে বাঙালি জাতি ইতিবাচক সমর্থক চেতনায় উপনীত হবে। এ ক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্য আমাদের কাছে হয়ে উঠতে পারে অনুপ্রেরণার অবিরল এক সূর্য-উৎস।

লেখক
প্রাবন্ধিক
উপাচার্য, রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com