সমকালীন প্রসঙ্গ

নৌপথে কাঠামোগত হত্যার নতুন পদ্ধতি?

প্রকাশ: ২৬ ডিসেম্বর ২১ । ০০:০০ | আপডেট: ২৬ ডিসেম্বর ২১ । ০২:৩৩ | প্রিন্ট সংস্করণ

শেখ রোকন

বাংলাদেশে নৌপথ ও নৌ-নিরাপত্তা কি ব্যস্তানুপাতিক? গত দুই দিন ধরে সুগন্ধা নদীতে জ্বলতে থাকা নৌযানে আগুনের লেলিহান শিখা দেখতে দেখতে এবং বেঁচে যাওয়া মানুষের অমানুষিক অভিজ্ঞতার কথা শুনতে শুনতে প্রশ্নটি মাথায় ঘুরছিল। স্বাধীনতার পর থেকে একদিকে যেমন নৌপথের দৈর্ঘ্য কমে এসেছে, অপরদিকে তেমনই বেড়েছে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির সংখ্যা।

স্বাধীনতার পর ২৪ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ নৌপথ কমতে কমতে এখন বর্ষাকালেও কমবেশি ৬ হাজার কিলোমিটারে দাঁড়িয়েছে। শুকনো মৌসুমে কমে দাঁড়ায় তা ৪ হাজার কিলোমিটারে। আর গত ৫০ বছরে আড়াই হাজারের বেশি দুর্ঘটনায় প্রায় ২১ হাজার নৌযাত্রী প্রাণ হারিয়েছে। আহতদের সংখ্যা ও সম্পদহানির হিসাব ধরলে ক্ষয়-ক্ষতির চিত্র আরও ভয়বাহ। অথচ ঐতিহাসিকভাবে নৌপথবহুল একটি দেশে এভাবে ক্রমেই দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির সংখ্যা বৃদ্ধি অস্বাভাবিক। স্বাভাবিক হচ্ছে- যত দিন যাবে; দক্ষতা, নজরদারি ও উৎকর্ষ বাড়তে থাকবে এবং ক্রমেই দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি কমতে থাকবে। দুর্ভাগ্যবশত সেটা ঘটেনি। বরং নৌ দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ক্ষেত্রে যোগ হলো নতুন মাত্রা। নৌপথে পানির বিপদের সঙ্গে যোগ হলো আগুনের আপদ। কবি হেলাল হাফিজ 'যে জলে আগুন জ্বলে' লিখেছিলেন ভিন্ন প্রেক্ষিতে। অভিযান-১০ অগ্নিকাণ্ড সেটার নতুন প্রেক্ষিত তৈরি করল।

ঢাকা থেকে বরগুনা যাওয়ার পথে বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে 'অভিযান-১০' যাত্রীবাহী লঞ্চটিতে যেন 'নরক' নেমে এসেছিল। বিভিন্ন ধর্মীয় শাস্ত্রে নরকের যে বর্ণনা রয়েছে, তাতে একই সঙ্গে আগুনের উত্তাপ ও বরফের শৈত্য শাস্তি হয়ে নেমে আসে। পৌষের মধ্যরাতে কুয়াশাঘেরা সুগন্ধা নদীতে চলমান লঞ্চটিতে যখন আগুন লাগে, তখন বেশিরভাগ যাত্রী ছিল গভীর ঘুমে। শীতের কাপড়-চোপড় জড়িয়ে। শীত থেকে বাঁচতে নিচতলা ও দোতলার ডেকও ছিল পর্দাঘেরা। এর মধ্যে হঠাৎ অগ্নিকাণ্ডে যাত্রীদের দিশেহারা হওয়াই স্বাভাবিক। আগুন লাগলে পড়ি-মরি ছুটে বেরিয়ে যাওয়ার 'সুযোগ' থাকে। এ ক্ষেত্রে তাও ছিল না। ওপরে আগুন নিচে শীতল স্রোতস্বিনী। দুই দিকেই মৃত্যুর হাতছানি। এমন পরিস্থিতি অন্তত নৌপথে আগে কখনও দেখা যায়নি।

নজিরবিহীন অগ্নিকাণ্ড থেকে বেঁচে আসা যাত্রীদের অভিজ্ঞতা যেন আমাদের সহ্যসীমা অতিক্রম করে যায়। এক ব্যক্তি তার মা, স্ত্রী ও দুই কন্যা নিয়ে ভ্রমণ করছিলেন। আগুন লাগার পর মাকে যখন কোলে তুলে পানিতে ছুড়ে দেন, তখনও স্ত্রী ও দুই কন্যা আগুনের মুখে। মাকে তীরে রেখে এসে দেখেন, কেউ নেই। পরে এক মেয়েকে তীরে উদ্ধারকৃত ও দগ্ধ অবস্থায় পান। স্ত্রী ও অপর কন্যাকে জীবিত ফিরে পাননি। এ দৃশ্য কল্পনা করতেও আতঙ্ক গ্রাস করে। যেন কোনো হরর মুভির দৃশ্য। অথচ বাস্তবে এটাই ঘটেছে।

বরগুনার বেতাগীর হারুন মিস্ত্রী নামে এক যাত্রী সংবাদ সংস্থা ইউএনবিকে জানিয়েছেন- 'আগুন ছড়িয়ে পড়ার পরপরই মুহূর্তের মধ্যে তীব্র উত্তপ্ত হয়ে ওঠে লঞ্চের স্টিলের কাঠামো। নিচে ডেকে যেমন পা রাখা যাচ্ছিল না, তেমনই হাত দিয়ে ধরা যাচ্ছিল না কিছুই। ওই অবস্থায়ই জীবন বাঁচাতে হাত-পা পুড়িয়ে নদীতে ঝাঁপ দিতে থাকে মানুষ। মূলত যারা নদীতে ঝাঁপ দিতে পেরেছে তারাই বেঁচে গেছে। অন্যদের ভাগ্যে জুটেছে নির্মম মৃত্যু।' যারা পুড়ে মারা গেছেন, অন্তত ৪০টি অমূল্য প্রাণ, তাদের অভিজ্ঞতা আমরা জানতে পারিনি। কিন্তু নিশ্চিতভাবেই তা বহুগুণ ভয়াবহ ও মর্মান্তিক; আমাদের ভয়ংকরতম দুঃস্বপ্নেও তা কল্পনা করা সম্ভব নয়।

এই যে প্রাণহানি, এটা কি নিছক 'দুর্ঘটনা'? স্বীকার করি, সড়ক কিংবা নৌ-যাত্রাপথে দুর্ঘটনা বিশ্বজুড়েই নতুন নয়। বাংলাদেশের সুগন্ধা নদীতে যখন অভিযান-১০ লঞ্চে অগ্নিকাণ্ড ঘটে, তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এজিয়ান সাগরের গ্রিস উপকূলে নৌকা উল্টে অন্তত ১৬ জন অভিবাসনপ্রত্যাশী প্রাণ হারিয়েছেন। কিন্তু দুই অঘটনের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য হচ্ছে, গ্রিসের অভিবাসনপ্রত্যাশীরা জেনেশুনে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই ছোট নৌকায় বড় সমুদ্রে পাড়ি জমিয়েছিলেন। কিন্তু অভিযান-১০ লঞ্চের যাত্রীদের লঞ্চে তোলা হয়েছিল নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিয়ে। প্রত্যাশা ছিল, লঞ্চটিতে যাত্রীসংখ্যা নির্ধারিত সীমার মধ্যেই থাকবে। যাত্রা শুরুর আগে কল-কব্জা পরীক্ষা করা হবে। পথে সামান্যতম বিঘ্ন দেখা দিলে তা শনাক্ত ও মেরামতই হবে অগ্রাধিকার। এ ছাড়া পর্যাপ্ত লাইফবয়া ও অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা থাকবে। ফিটনেস সনদ ও দক্ষ কর্মকর্তা-কর্মচারীর কথা বলাই বাহুল্য।



বাস্তবে সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনসূত্রে জানা যাচ্ছে, লঞ্চটি ঢাকার সদরঘাট থেকেই অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল। বেঁচে যাওয়া যাত্রীরা যা বলছেন, তাতে যাত্রী সংখ্যা এক থেকে দেড় হাজার ছিল। লঞ্চের মালিকপক্ষ যথারীতি নির্ধারিত ধারণক্ষমতার মধ্যেই যাত্রীর সংখ্যার কথা বলছে- তিনশ থেকে সাড়ে তিনশ।

বিআইডব্লিউটিএ বলছে, 'চারশর মতো' যাত্রী ছিল। বেসরকারি নৌযানে যাত্রীর সংখ্যা নিয়ে সরকারি সংস্থাটির রক্ষণশীল অবস্থানের কারণ সহজেই অনুমেয়। যদি প্রকৃত সংখ্যা বলতে হয়, তাহলে তাদের নজরদারির ঘাটতিও ধরা পড়ে যায় যে! এখন, নির্ধারিত সংখ্যার তিন থেকে চার গুণ যাত্রী তুললে একটি নৌযান এমনিতেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। তার ওপর গাদাগাদি ভিড়ে যদি আগুন লাগে, পরিণতিতে যা ঘটার আশঙ্কা ছিল, বৃহস্পতিবার মাধ্যরাতে কড়া-গণ্ডায় সেটাই ঘটেছে। ক্ষোভ ও দুঃখের সঙ্গে আক্ষেপও জাগে- নির্ধারিত যাত্রীসংখ্যা মানা হলে হয়তো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকত।

যাত্রীরা বলছে, ঢাকা থেকে ছাড়ার সময়ই ইঞ্জিনে বিজাতীয় শব্দ শোনা যাচ্ছিল। বরিশাল লঞ্চঘাট পার হওয়ার পর থেকেই ডেক ও মেঝেতে অস্বাভাবিক উত্তাপ টের পাচ্ছিল যাত্রীরা। বেঁচে যাওয়া একাধিক যাত্রী সংবাদমাধ্যমে এ বক্তব্য দিয়েছেন। কিন্তু কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সেটাকে পাত্তা দেননি। আরও অবিমৃষ্যকারিতা, আগুন লাগার পরও লঞ্চটি অন্তত আধঘণ্টা চালিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে সাক্ষ্য মিলছে। যদি উত্তাপ বোঝার সময়ই বিষয়টি আমলে নেওয়া হতো, যদি আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গেই থামানো যেত; তাহলে হয়তো এত প্রাণ অকালে ঝরে পড়ত না।

নৌ-দুর্ঘটনায় পতিত লঞ্চগুলোর অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, পর্যাপ্ত লাইফবয়া থাকে না। একই পরিণতি দেখা গেল অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও। মালিকপক্ষ দাবি করছে, লঞ্চটিতে ২১টি এক্সটিঙ্গুইশার ছিল। প্রয়োজনের সময় একটিও ব্যবহার হতে দেখা গেল না। সেগুলো আদৌ কার্যকর ছিল কিনা; থাকলেও চালনার মতো প্রশিক্ষণ সংশ্নিষ্টদের ছিল কিনা- সে প্রশ্নও এখন উঠতে বাধ্য। এ ছাড়া ইঞ্জিন রুমের কাছে তেলসহ বিভিন্ন দাহ্য পদার্থ যেভাবে অরক্ষিত অবস্থায় ছিল, তাও সেধে বিপদ ডেকে আনারই নামান্তর।

ইতোমধ্যে খবর পাওয়া গেছে, লঞ্চটির 'নতুন' ইঞ্জিন লাগানো হয়েছিল নৌপরিবহন অধিদপ্তরের অনুমতি ছাড়াই। নৌযানটির সার্বিক ফিটনেস ছিল কিনা; চালকের প্রশিক্ষণ ছিল কিনা; কারও দায়িত্বে অবহেলায় আগুন লেগেছিল কিনা- এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে তদন্ত প্রক্রিয়া শেষ হলে। যদি তদন্ত শেষ হয় এবং যদি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ পায়।

স্বীকার করতে হবে, নৌপথে চলাচলকারী যাত্রিবাহী নৌযানগুলো ক্রমেই 'লাক্সারি' হচ্ছে। গতি নিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যে অসন্তোষ ছিল, সেটাও কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা চলছে। লঞ্চ ভ্রমণ কীভাবে বিলাসবহুল করা যায়, সেই চেষ্টায় কোনো ত্রুটি রাখছে না মালিকপক্ষ। যদিও সমানুপাতে বাড়ছে ভাড়া, কিন্তু নিরাপত্তার বিষয়টি এখনও কতটা অধরা- এত অমূল্য প্রাণের বিনিময়ে আমাদের আরেকবার প্রমাণ পেতে হলো।

প্রশ্ন হচ্ছে, এই প্রাণহানির প্রায় নিশ্চিত আয়োজনকে আমরা 'দুর্ঘটনা' বলব কিনা? ঝুঁকির সব দিক খোলা রেখে; নিরাপত্তার নূ্যনতম ব্যবস্থা বহাল না রেখে যাত্রা করা যদি দুর্ঘটনা হয়, তাহলে হত্যাকাণ্ড কাকে বলব? নরওয়েজিয়ান সমাজবিজ্ঞানী জোহান গ্যালটাঙ গত শতকের ষাটের দশকে 'কাঠামোগত সহিংসতা' তত্ত্ব দিয়েছিলেন। মানুষের মৌলিক সব প্রয়োজন মেটানোর পথ আনুষ্ঠানিকভাবে রুদ্ধ করা হলে তখন তার প্রাণহানি অনিবার্য হয়ে ওঠে। এ তত্ত্ব থেকেই এসেছে 'কাঠামোগত হত্যা' ধারণা। বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে অভিযান-১০ লঞ্চে কাঠামোগত হত্যার সব আয়োজন স্পষ্টতই প্রস্তুত ছিল।

লঞ্চটিতে অগ্নিকাণ্ডের পর গণসংহতি আন্দোলনের পক্ষে এই প্রাণহানিকে যথার্থই 'কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড' আখ্যা দেওয়া হয়েছে। বাস্তবে নৌপথে কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড নতুন নয়। আগে পানিতে ডুবিয়ে মারা হয়েছে; এখন এর সঙ্গে যুক্ত হলো আগুনে পুড়িয়ে মারা; এই যা পার্থক্য। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় আগের মতোই তদন্ত কমিটি করেছে; নিহতদের পরিবারকে অর্থ সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তারপর নৌ নিরাপত্তা, নজরদারি প্রভৃতি বিষয়ে সম্ভবত আগের মতোই হয়তো শীতঘুমে চলে যাবে। বিশেষত এখন যখন ভরা শীতকাল। আর অন্যদিকে এই পৌষ মাসে কেবল নয়; ষড়ঋতুর ১২ মাসে নৌপথজুড়ে আমাদের সর্বনাশ চলতেই থাকবে।

শেখ রোকন: লেখক ও গবেষক; মহাসচিব, রিভারাইন পিপল

skrokon@gmail.com

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com