মায়ের কবরে শায়িত হলেন সাংবাদিক রিয়াজ উদ্দিন

প্রকাশ: ২৬ ডিসেম্বর ২১ । ১৮:৪৩ | আপডেট: ২৬ ডিসেম্বর ২১ । ১৯:৫৩

সমকাল প্রতিবেদক

জাতীয় প্রেস ক্লাব চত্বরে রিয়াজ উদ্দিন আহমেদের প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। ছবি: সমকাল।

একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক, দ্য ফিন্যান্সিয়াল হেরাল্ড সম্পাদক ও প্রকাশক রিয়াজ উদ্দিন আহমেদের দাফন সম্পন্ন হয়েছে। রাজধানীর বারিধারা কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে তৃতীয় জানাজা শেষে বনানীতে মায়ের কবরে তাকে সমাহিত করা হয়। 

রোববার বাদ আসর (বিকেল ৫টার দিকে) তাকে সমাহিত করা হয়। এর আগে নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলার নারান্দী চীন মৈত্রী কেন্দ্রের সামনে শরাফত আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে বাদ জোহর দ্বিতীয় এবং জাতীয় প্রেস ক্লাব চত্বরে প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। 

জাতীয় প্রেসক্লাবে শ্রদ্ধা নিবেদনের পাশাপাশি রোববার বেলা ১১টার দিকে অনুষ্ঠিত রিয়াজ উদ্দিনের প্রথম নামাজে জানাজায় অংশ নেন শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন, সাবেক মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বিএনপির শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, আকরামুল হাসান, শামসুদ্দিন দিদার, ন্যাপের গোলাম মোস্তফা ভুঁইয়াসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা।

সহকর্মীদের মধ্যে তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এসেছিলেন সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম, নোয়াব সভাপতি এ কে আজাদ, এডিটরস গিন্ডের সভাপতি মোজাম্মেল বাবু, সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মোজাম্মেল হোসেন মঞ্জু, নিউ এজের প্রকাশক এসএসএম শহিদুল্লাহ খান, জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি মুহাম্মদ শফিকুর রহমান, শওকত মাহমুদ, সাইফুল আলম এবং সম্পাদক পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ও বণিক বার্তা সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদসহ আরও অনেকে।

সম্পাদক পরিষদের পক্ষ থেকে সভাপতি ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম এবং ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ও বণিক বার্তা সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ শ্রদ্ধা জানান। ছবি: সমকাল।

এছাড়া সাংবাদিক শাহজাহান মিয়া, স্বপন সাহা, আজিজুল ইসলাম ভুঁইয়া, মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল, এম এ আজিজ, বদিউল আলম, গোলাম মহিউদ্দিন খান, আবদুল হাই শিকদার, রফিকুর রহমান, এলাহী নেওয়াজ খান, কামরুল ইসলাম চৌধুরী, আবদুল হাই সিদ্দিকী, সৈয়দ আবদাল আহমেদ, ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের এম আবদুল্লাহ, নুরুল আমিন রোকন, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের কাদের গনি চৌধুরী, জাতীয় প্রেসক্লাবের শাহেদ চৌধুরী, মাইনুল আলম, আশরাফ আলী, কাজী রওনক হোসেন, বখতিয়ার রানা, কাদির কল্লোল শ্রদ্ধা জানান জ্যেষ্ঠ এ সহকর্মীর প্রতি।

জানাজার আগে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ডা. জাফরুল্লাহ বলেন, ‘তার এই মৃত্যুতে অভাবনীয় ক্ষতি হয়েছে সাংবাদিকতা পেশায়। পৃথিবীতে কোনো শূন্যতা থাকে না। তবে হয়ত উনাকে হারানোয় যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে, তা এখনোই পূরণ হবে না। উনার ভালো গুণগুলো আমাদের সকলের স্মরণ রাখা দরকার। তার সাহস, দেশপ্রেম, বস্তুনিষ্ঠতা, সাংবাদিক শ্রেণির জন্য তার দরদ-অবদানকে আমাদের স্মরণে রাখতে হবে।’

রিয়াজ উদ্দিন আহমেদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘রিয়াজ ভাইয়ের চলে যাওয়া আমাদের সকলের জন্যই বেদনার, কষ্টের। উনি সেই সাংবাদিক, যিনি গণতন্ত্রের পক্ষে অত্যন্ত সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন এবং তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা দিয়ে, তার মেধা দিয়ে সাংবাদিকতাকে সবসময় সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করেছেন। আমি মনে করি, এই সময়ে যখন গণতন্ত্রের একটা সংকট চলছে, তখন তার মতো সাংবাদিকের খুব বেশি প্রয়োজন ছিল। আমি একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে রাজনীতিতে তার একটা বড় শূন্যতা অনুভব করছি। তার বিদাহী আত্মার আমি শান্তি কামনা করছি।’

ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, ‘সাংবাদিকদের অধিকার, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং সাংবাদিকদের জন্য একটি সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টির অনেক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন সম্পাদক পরিষদের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ। সবার সঙ্গে মিলে-মিশে কাজ করার একটা স্বভাবসুলভ গুণ ছিল রিয়াজ ভাইয়ের, আমরা যেন সেই গুণ আমাদের মধ্যে আনতে পারি। উনার সাংবাদিকতার মূল্যবোধকে শ্রদ্ধা জানিয়ে আমরা যেন আরও উন্নত স্তরের সাংবাদিক হতে পারি, এই প্রত্যাশা রইল।’

নিউজ পেপারস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-নোয়াবের সভাপতি একে আজাদ বলেন, ‘একজন পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে যতগুলো গুণ থাকা দরকার আন্তর্জাতিক লেভেলে এবং দেশীয় লেভেলে, প্রত্যেকটা গুণে তিনি গুণান্বিত ছিলেন। তিনি দীর্ঘদিন সাংবাদিক ইউনিয়নের নেতৃত্ব দিয়েছেন। পরে নোয়াবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। আমি বলব, রিয়াজ সাহেবের জীবনের যে উল্লেখযোগ্য অবদান এই প্রেসক্লাবের জন্য, সাংবাদিকদের জন্য, সাংবাদিক ইউনিয়নের জন্য, নতুন প্রজন্ম যেন তার জীবন থেকে শিক্ষা নেয়। রিয়াজ ভাইয়ের আদর্শকে যেন আমরা ধারণ করতে পারি। তিনি আমাদের মাঝে চিরদিন বেঁচে থাকবেন।’

নিউজ পেপারস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-নোয়াবের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানান সভাপতি এ কে আজাদ। ছবি: সমকাল।

জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি শওকত মাহমুদ বলেন, ‘রিয়াজ ভাই তার সাংবাদিকতার চৈতন্যবোধ দিয়ে আমাদেরকে অনুপ্রাণিত করেছেন। জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি হিসেবে যখন তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন, তখন আমি তার সাধারণ সম্পাদক ছিলাম। আমি লক্ষ্য করেছি, সাংবাদিকতার প্রতি তার যে মর্মত্ববোধ, সাংবাদিকতার প্রতি তার যে দায়িত্ববোধ, সর্বোপরি গণতন্ত্র সমুন্নত রাখা জন্য তার যে ভূমিকা, তিনি তা নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে গেছেন। আজকে আমরা অভিভাবকশূন্য হয়ে গেছি।’

জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি সাইফুল আলম বলেন, ‘রিয়াজ ভাই একজন ভালো সংগঠক ছিলেন, ভালো অভিভাবক ছিলেন। পেশার প্রতি তার যে আত্মনিবেদন, তার কোনো তুলনা নেই। সাংবাদিকতার পেশার সঙ্গে কখনো তিনি আপস করেন নাই। সাংবাদিক-কর্মচারীর স্বার্থের প্রতি তিনি সবসময়ে অবিচল ছিলেন। একটা বিষয় স্পষ্ট যে, মতানৈক্য কখনোই মানুষের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি করে না, এটা আমরা রিয়াজ ভাইয়ের কাছে থেকে শিখেছি। মতানৈক্য থাকতেই পারে, কিন্তু সেখানে দূরত্ব নাই। সেই মতানৈক্য গ্রহণ করা, মতানৈক্য নিয়ে আলোচনা করার মানসিকতায় তিনি আমাদেরকে উদ্ধুদ্ধ করেছেন সারাজীবন।’

জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, ‘রিয়াজ ভাইকে নিস্তব্ধ নিথর রেখে আজকে আমরা কথা বলছি, এটা আমরা কয়েকদিন আগেও ভাবতে পারিনি। কয়েকদিন আগেও উনি এসে রিপোর্টার্স ইউনিটির নির্বাচন পরিচালনা করেছেন, জাতীয় প্রেসক্লাবের মিটিংয়ে অংশ নিয়েছেন। আমাদের যে কোনো সংকটে আমরা তার সঙ্গে যোগাযোগ করতাম। তিনি আমাদেরকে পরামর্শ দিতেন, তেমন একজনকে আমরা হারিয়েছি। আমরা আমাদের অভিভাবককে মিস করব। সাংবাদিকতা জগতে তার যে অভাব, সেটি পূরণ হবার নয়।’

প্রেস ক্লাবে জানাজা শেষে হেলিকপ্টারে করে তার মরদেহ নেওয়া হয় জন্মস্থান নরসিংদীর মনোহরদীতে। পরে সেখানে বাদ জোহর দ্বিতীয় নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় এলাকার শত শত মানুষ অংশ নেন। পরে হেলিকপ্টারে করে মরদেহ রাজধানীর বারিধারায় নেওয়া হয়। সেখানেই তৃতীয় নামাজে জানাজা শেষে বনানীতে মায়ের কবরে তার মরদেহ সমাহিত করা হয়। 

মনোহরদীর নারান্দী চীন মৈত্রী কেন্দ্রের সামনে শরাফত আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে দ্বিতীয় নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ শনিবার রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তার বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর। তিনি করোনা-পরবর্তী জটিলতায় ভুগছিলেন।

১৯৬৮ সালে পাকিস্তান অবজারভার পত্রিকায় যোগদানের মধ্য দিয়ে সাংবাদিকতা শুরু করেন রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ। ইংরেজি সাংবাদিকতায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা এই খ্যাতিমান সাংবাদিক প্রায় ৫০ বছরের সাংবাদিকতা জীবনে দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের প্রধান সম্পাদক, দি নিউজ টুডে সম্পাদক ও প্রকাশক, ডেইলি টেলিগ্রাফ সম্পাদক, ডেইলি স্টারের উপ-সম্পাদক ছিলেন। রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার তথ্য উপদেষ্টা ছিলেন কিছু দিন। ছাত্রজীবনে তিনি প্রথমে ছাত্রলীগ ও পরে বাংলা ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতা ছিলেন।

তিনি জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, অবিভক্ত ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, বিএফইউজের সভাপতি, মহাসচিব, সার্কভুক্ত দেশগুলোর সাংবাদিকদের ফেডারেশন সমন্বয়ে গড়া দক্ষিণ এশিয়া সাংবাদিক সমন্বয় পরিষদের চেয়ারম্যান এবং সাউথ এশিয়ান ফ্রি মিডিয়া অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ছিলেন।


© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com