অর্থনৈতিক সম্মেলনে বক্তারা

রাজনৈতিক প্রভাবে ঋণ দেওয়া বন্ধ করতে হবে

প্রকাশ: ২৯ ডিসেম্বর ২১ । ১৪:৫৫ | আপডেট: ২৯ ডিসেম্বর ২১ । ২৩:০২

সমকাল প্রতিবেদক

সম্মেলনে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির

খেলাপি ঋণ ব্যাংক খাতের বড় সমস্যা। খেলাপি ঋণ কমাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে। রাজনৈতিক প্রভাবে ঋণ দেওয়া বন্ধ করতে হবে। ব্যাংক খাতে অনিয়ম ধরার পর তা ড্রয়ার-বন্দি না করে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। একই গোষ্ঠীর হাতে একাধিক ব্যাংকের ক্ষমতা চলে যাওয়া ঠেকাতে হবে। গতকাল রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে বণিক বার্তা আয়োজিত অর্থনৈতিক সম্মেলনে এমন মত দেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর, অর্থনীতিবিদ, উদ্যোক্তা ও ব্যাংক খাতের শীর্ষ নির্বাহীরা। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে 'পাঁচ দশকের উন্নয়ন অভিযাত্রায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক' শিরোনামে দ্বিতীয় বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্মেলনের আয়োজন করে বণিক বার্তা।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির বলেন, বর্তমান প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী ২০৩৫ সালের মধ্যেই বাংলাদেশ হবে বিশ্বের ২৫তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ। তবে সামনের দিনে দেশের অর্থনীতিতে বেশ কয়েকটি চ্যালেঞ্জ রয়েছে। যদিও করোনার কারণে অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের অর্থনীতি তেমন বিপর্যস্ত হয়নি।

প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান বলেন, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। এর অন্যতম কারণ, বড় ঋণ নিয়ে অনেকে ফেরত দেন না। এতে করে ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার ক্ষমতা কমে যায়। এ সংস্কৃতি থেকে বের হতে দক্ষতা ও দায়বদ্ধতা বাড়াতে হবে। ঋণ নিয়ে যে ফেরত দিচ্ছে না এবং যে ঋণ দিয়েছিল, উভয়ের অপরাধ বিবেচনায় নিয়ে ব্যবস্থা নিতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে বড় ঋণের বিপরীতে বন্ধকি সম্পদ বিক্রি করতে গিয়ে ব্যাংক সমস্যায় পড়ে। অনেক বড় সম্পদ হলে তা কেউ কিনতে চায় না। খণ্ড-খণ্ড করে বিক্রি করতে পারলে তখন আর এ সমস্যা থাকবে না।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, 'আশির দশকে যখন বেসরকারি ব্যাংক দেওয়া হয়েছিল আমরা জনতাম না সেগুলো চালাতে কী ধরনের নিয়ম-নীতি লাগবে। এক ব্যাংকে বা একাধিক ব্যাংকে ক্ষমতা চলে যাওয়ার জন্য যে নীতি দরকার সেটা আমরা শিখিনি। আগামীতে এসবের দরকার হতে পারে।' তিনি বলেন, সার্বিকভাবে বাংলাদেশের অনেক প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা আছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে এমন লোক আছেন, যারা প্রধান হওয়ার যোগ্য নয়। তবে বাংলাদেশে একমাত্র প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন পর্যন্ত যারা গভর্নর হয়েছেন সবাই অত্যন্ত দক্ষ ও যোগ্য। দেশের আর্থিক খাতের উন্নয়নে বাংলাদেশ ব্যাংক বিশাল ভূমিকা রেখে চলেছে। তিনি বলেন, জনসংখ্যার দিক দিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান এখন নবম। ক্রয় ক্ষমতা সমতার (পিপিপি) ভিত্তিতে আগামী বছরের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার এক ট্রিলিয়ন ডলার হয়ে বিশ্বের ৩০টি দেশের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন ভিডিও বার্তায় বলেন, যখনই কোনো পরিদর্শন রিপোর্ট আসবে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নিতে হবে। তা না করে ফাইল ড্রয়ারে ঢুকলেই দুর্নীতির বিস্তার ঘটবে। খেলাপি ঋণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ব্যাংকের নিয়োগ দেওয়া আইনজীবী ব্যাংকের পক্ষে কাজ না করে খেলাপির পক্ষে কাজ করেন। এটা আগেও ছিল, এখনও আছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, আমাদের ব্যাংকিং খাতের নিয়ম-নীতি আন্তর্জাতিক মানের। তবে সমস্যা বাস্তবায়নে। কাগজে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনেক স্বাধীনতা আছে, এটাকে অপারেশনাল করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক কখনও অতিরিক্ত নীতি প্রয়োগ করবে না। তাই বলে সব কিছু ছেড়েও দেবে না। আমানতকারী, শেয়ারহোল্ডার, ব্যাংকার- সব পক্ষের স্বার্থ দেখতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান বলেন, কৃষি, প্রবাসী আয় ও রপ্তানি এই তিন খাত দেশের অর্থনীতিতে শক্ত ভিত দিয়েছে। রেমিট্যান্সে বিদ্যমান নগদ সহায়তা আরও ১ শতাংশ বাড়ানো উচিত। একই সঙ্গে প্রবাসী বন্ডে এক কোটি টাকার যে সীমা আরোপ করা হয়েছে তা তুলে দিয়ে সুদহার কমানো যেতে পারে। তিনি বলেন, প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রেখে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য একটা চ্যালেঞ্জ। পাশাপাশি আয় বৈষম্য কমানো ও খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দিতে হবে।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি ও হা-মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ. কে. আজাদ বলেন, একক গ্রাহককে কত ঋণ দেওয়া যাবে, তার সীমা দেওয়া রয়েছে। অথচ এর বেশি ঋণ দেওয়ার প্রস্তাব বাংলাদেশ ব্যাংকে যায় এবং অনেকে ক্ষেত্রে অনুমোদন হয়ে যায়। এটি বন্ধ করা গেলে খেলাপি ঋণ কমবে এবং সুদহারও ৯ শতাংশের নিচে নামবে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংককে আরও স্বাধীনতা দেওয়া গেলে খেলাপি ঋণ কমবে। সরকার চাইলে খেলাপি ঋণ কমানো সম্ভব। বৈঠকে উপস্থিত দেশের সবচেয়ে বড় সোনালী ব্যাংকের এমডির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'অন্য যে কোনো ব্যাংকের চেয়ে দক্ষতা, শিক্ষাগত যোগ্যতায় তিনি কম নন। তবে খেলাপি ঋণের ভার তিনি নিচ্ছেন কেন। কেননা তার হাত-পা বাঁধা। তাকে রাজনৈতিক প্রভাবে ঋণ দিতে হয়।'

অর্থ বিভাগের সিনিয়র সচিব আব্দুর রউফ তালুকদার বলেন, বিশ্বের ৪১টি শীর্ষ অর্থনীতির দেশের মধ্যে গত বছর মাত্র ৮টি দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক ছিল। এর মধ্যে বেশি ইতিবাচক ছিল বাংলাদেশের।

সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আতাউর রহমান প্রধান সরকারি ব্যাংকের ঋণ পরিশোধে অনেকের অনীহার একটি উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, সম্প্রতি একটি গ্রুপ ঋণ পুনঃতপশিলের জন্য এসেছে। গ্রুপটির সোনালীসহ মোট ১১ ব্যাংকে ঋণ রয়েছে। সোনালী ছাড়া অন্য ব্যাংকগুলো বেসরকারি খাতের। সব ব্যাংকের ঋণ নিয়মিত থাকলেও সোনালীর পুরো ঋণই খেলাপি।

অনুষ্ঠানের প্রধান সহযোগী ছিল সিটি ব্যাংক। বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদের পরিচালনায় আরও বক্তব্য দেন ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহাম্মদ মনিরুল মওলা। স্বাগত বক্তব্য দেন সিটি ব্যাংকের এমডি মাসরুর আরেফিন।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com