বিশেষ লেখা

মানসম্মত উচ্চশিক্ষা তৈরি করবে দক্ষ জনসম্পদ

বিশ্ববিদ্যালয় বিশেষ সংখ্যা

১৬ জানুয়ারি ২২ । ০০:০০

অধ্যাপক আনোয়ারুল আজিম আরিফ, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ

আগামীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে মানুষকে মানবসম্পদে রূপান্তর করতে হবে। মানসম্মত উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করা গেলে সম্পদে রূপান্তর হবে আমাদের আগামী প্রজন্ম। তখন নতুন চ্যালেঞ্জ নিতে পারবে তারা। সমাধান করতে পারবে জটিল সব সমস্যাও। এ দক্ষ প্রজন্ম তৈরি করতে হলে পাবলিক ও প্রাইভেট উভয় বিশ্ববিদ্যালয়কে কাজে লাগাতে হবে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়কে বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তিতে আরও বেশি মনোযোগী হতে হবে। দক্ষ শিক্ষকের সংখ্যা বাড়াতে হবে। আধুনিক ল্যাব নির্মাণ করতে হবে। যুগোপযোগী গবেষণার মান ও সংখ্যা বাড়াতে হবে। অবকাঠামো নির্মাণেও মনোযোগ দিতে হবে। এসব করতে গেলে দরকার হবে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ। সরকারকেও দিতে হবে সময়।

একসময় আইআইইউসি ধর্মান্ধ, স্বাধীনতাবিরোধী লোকজন দিয়ে পরিচালিত হয়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয় তখন ইমেজ সংকটে ছিল। এখন বিশ্ববিদ্যালয়টি সেখান থেকে বেরিয়ে এসেছে। সরকারেরও পৃষ্ঠপোষকতা পাচ্ছে। পরিবর্তন হচ্ছে ইমেজেরও। আগামীতে এ পরিবর্তন আরও দৃশ্যমান হবে। কারণ বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং নীতিবোধ সম্পন্ন মানুষ তৈরিতে মনোযোগী হবে আইআইইউসি।

প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়কে নিজের পায়ে ভর করে দাঁড়াতে হয়। শুরুতে তাই আর্থিক ও অবকাঠামোগত সমস্যায় পড়ে তারা। এ সময় তাদের দরকার সাপোর্ট। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ করতে এবং দক্ষ শিক্ষক জোগাড় করতে অনেক সময় বেগ পেতে হয় প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়কে। এ জন্য কেউ কেউ গবেষণা ও মানসম্মত ল্যাব নির্মাণে আপস করতে বাধ্য হন। কারণ পুরো প্রক্রিয়াটা বেশ ব্যয়সাপেক্ষ।

১৯৯২ সালে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাক্ট প্রণয়নের পর ১৯৯৩ সাল থেকে দেশে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়। ওই সময়ে অল্প কিছু প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ছিল। ১৯৯৬ সালের আগে দেশে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ছিল মাত্র ১৬টি। ইতোমধ্যে অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন পেয়েছে। এ সংখ্যা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০৯টি।

শুরুতে যারা অনুমোদন সনদ পেয়েছেন তাদের অনেককে ভাড়া করা ক্যাম্পাসে শিক্ষা কার্যক্রম চালাতে হয়েছে। তবে সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন কড়াকড়ি আরোপ করায় ইতোমধ্যে স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণ করেছে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়। তবে সময়ের পরিসর বিবেচনা করলে দেশে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় এখনও প্রারম্ভিক পর্যায়ে রয়েছে। কিছু কিছু বিশ্ববিদ্যালয় মানের সঙ্গেও আপস করছে। ভাড়া করা ভবনে দিচ্ছে ক্যাম্পাস। নিচে মুদি দোকান কিংবা সেলুনও রয়েছে। এটা বিশ্ববিদ্যালয়ের চরিত্রের সঙ্গে যায় না। উচ্চশিক্ষায় পরিবেশটাও একটা গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যদি তুলনা করি, তাহলে প্রাইভেট পৃষ্ঠা ২ :কলাম ৫

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমস্যা অনেক।

যুগের চাহিদা মেটাতে এক সময় চারটি সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় এবং দুটি বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় ছিল। এই ক'টি বিশ্ববিদ্যালয় দিয়ে উচ্চ শিক্ষার যে ক্রমবর্ধমান চাহিদা সেটা মেটানো সম্ভব হচ্ছিল না। তাই দেশের বিজ্ঞজনেরা গভীর উৎকণ্ঠায় পড়ে যান। অনেক শিক্ষার্থী ভারত, ইউরোপ, আমেরিকাতে চলে যায়। এর মাধ্যমে দেশের টাকাও চলে যেতো। কিন্তু সেখানে গিয়ে অখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে থাকে তারা। নিজস্ব খরচে পড়ালেখা সম্ভব না হয় না বলে ২/১ সেমিস্টার পর তাদের অনেকেই আবার ঝরে পড়তে থাকে। ড্রপআউট হয়ে জীবিকার জন্য নিন্মমানের কাজ বেছে নিতে হয় তাদেরকে। এভাবে দেশ থেকে বিদেশে গিয়ে সম্ভাবনাময় অনেক ছাত্র-ছাত্রী তাদের মূল্যবান জীবন নষ্ট করেছে। এটা উদ্বেগের বিষয়। তখন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় চালু হলে তারা সেখানে না গিয়ে এখানে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেত। এখন এ চিত্র কিছুটা পাল্টেছে। মানসম্মত কিছু প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ও হয়েছে। তবে মাত্রাতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে এ সংখ্যাটা বাড়ছে খুব ধীর গতিতে।

প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রছাত্রী পাওয়ার বড় বাজার তৈরি হচ্ছে এখন। যেসব বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন পেয়েছে তাদেরকে দক্ষ শিক্ষক যোগাড় করতে হবে। উপযুক্ত সিলেবাস, কারিক্যুলাম তৈরি করতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তি কাজে লাগাতে স্মাট ক্লাসরুম তৈরি করতে হবে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যে জোয়ার শুরু হবে সেটাকে কাজে লাগানোর জন্য শিক্ষার্থীদের সত্যিকার অর্থে মানবসম্পদে পরিণত করতে হবে। এখন যথেষ্ট বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। তাহলেই আমার লক্ষ্য অর্জন করতে সক্ষম হবো। অবশ্যই আমাদের আধুনিক গ্রন্থাগার গড়ে তুলতে হবে। ইঞ্জিনিয়ারিং ও প্রযুক্তিকে আরও দক্ষভাবে কাজে লাগাতে হবে। ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উন্নত দেশে পরিণত করার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হলে মানুষকে মানবসম্পদে পরিণত করতে হবে।

আইআইউসি যাত্রা শুরু করে ১৯৯৫ সাল থেকে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সুবিধা হলো এটিতে ১০০ একরের সুবিশাল বিস্তৃত ক্যাম্পাসে ৪৬টির ওপরে ভবন রয়েছে। অবকাঠামোগত দিক থেকে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে আইআইইউসির ক্যাম্পাস অনেক সমৃদ্ধ। গত মার্চে আমি দায়িত্ব নিয়েছি। দায়িত্ব নিয়েই সমস্যায় পড়তে হয়েছে। সমস্যা হলো- ২৫ বছরের পুরোনো বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে আগের প্রশাসন থেকে আমরা কোন টাকা-পয়সা পাইনি। প্রথম মাসের বেতন দিতেই আমাদের হিমশিম খেতে হয়। তবে ধীরে ধীরে আমরা সেই পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসছি।

আইআইইউসিকে নতুনভাবে সাজাতে উদ্যাগ গ্রহন করেছি। আমরা নতুন নতুন একাডেমিক ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা করেছি। আধুনিক ল্যাব নির্মাণেরও পরিকল্পনা গ্রহন করেছি। সীতাকুণ্ডের কুমিরা রেলস্টেশনকে আইআইইউসির নামে নামকরণ করা হয়েছে। সেই স্টেশন থেকে বিশ্ববিদ্যালয় গেইট পর্যন্ত রেলওয়ে নিজস্ব খরচে রাস্তা নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। রাস্তাটি হলে সরাসরি স্টেশন থেকে ক্যাম্পাসে চলে আসা যাবে। এখন বাসে যাওয়া-আসা করতে হয়। সেজন্যু প্রচুর অর্থ ব্যয় হয়। তাছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে থাকা খালগুলোকে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে হাতির ঝিলের আদলে সৌন্দর্য্যবধন করা হবে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে আইআইইউসিকে আধুনিক প্রযুক্তি সমৃদ্ধ একটি আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত করতে চাই। বস্তুত আইআইইউসিকে আধুনিকায়ন ও মুক্তিযুদ্ধের ভাবধারায় পরিচালিত করার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আইআইইউসি ট্রাস্ট পুনর্গঠন করেছেন। চট্টগ্রাম-১৫ আসনের সংসদ সদস্য প্রফেসর আবু রেজা মোহাম্মদ নেজাম উদ্দিন নদভী ট্রাস্টি বোর্ডে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। করোনার দুঃসময় কেটে গেলে আশাকরি আইআইসিইউ তার লক্ষ্য অর্জনে দ্রুত এগিয়ে যাবে।

আইআইইউসিতে এখন ৩৪০ জন সার্বক্ষণিক শিক্ষকসহ প্রায় ৪৩০ জন শিক্ষক শিক্ষা প্রদান করছেন। সমৃদ্ধ অবকাঠামো আইআইইউসি'র একটি উল্লেখযোগ্য দিক। ৪৩ একর জমির উপর নিজস্ব ক্যাম্পাসে প্রায় সাড়ে ৬ লক্ষের অধিক বর্গফুট জায়গায় ৪০টি ভবনেআইআইইউসি'র শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। যেদিকে দৃষ্টি যাবে সবুজ আর সবুজ। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করতে চাই যে, ২০১৫ ও ২০১২ সালে সারাদেশে বৃক্ষরোপণে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাটাগরীতে আইআইইউসি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় পুরস্কার লাভ করে। পর্যাপ্ত পরিমাণ অত্যাধুনিক কম্পিউটার ল্যাব, ইন্টারনেট ল্যাব, ৩৮০ সনঢ়ং ইন্টারনেট সুবিধা, প্রায় ১৫ হাজার ৫০০টি ব-লড়ঁৎহধষং ও ব-নড়ড়শং, ৩৫ হাজার টাইটেলের ৮৪ হাজার ৪৩৪টি বইয়ের লাইব্রেরী নিয়ে সমৃদ্ধ এই বিশ্ববিদ্যালয়।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com