জন্মদিন

অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব

প্রকাশ: ১১ জানুয়ারি ২২ । ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

কাজী সালাহউদ্দীন

সৈয়দ মাহবুব মোরশেদ: ১৯১১-১৯৭৯

বিচারপতি সৈয়দ মাহবুব মোরশেদের ব্যক্তিত্বের প্রভা বিচারালয়ের চার দেয়ালের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছিল। প্রগাঢ় মানবতাবোধসম্পন্ন আলোকিত মানুষ ছিলেন তিনি। ব্রিটিশ ভারতে মানবতার সেবায় 'আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম' সংস্থাটির মাধ্যমে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন। দেশভাগের আগে সংঘটিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময়েও দাঙ্গা নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। তিনি ১৯১১ সালের ১১ জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার সৈয়দ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। মাতা আফজালুন নেছা শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের বোন। বাবা সৈয়দ আব্দুস সালিক ছিলেন তৎকালীন বিসিএস (বেঙ্গল সিভিল সার্ভিস)। এক সময় বগুড়া ও দিনাজপুরের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন।

১৯২৬ সালে রাজশাহী বিভাগে সব প্রার্থীর মধ্যে মাহবুব মোরশেদ প্রথম বিভাগে প্রথম স্থান লাভ করেন। ১৯৩০ সালে কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে অর্থনীতিশাস্ত্রে কৃতিত্বের সঙ্গে বিএ অনার্স পাস করেন। পর্যায়ক্রমে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ, এলএলবি উভয় পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। এর পর আইনশাস্ত্রে উচ্চতর ডিগ্রি নেওয়ার জন্য ব্যারিস্টার অ্যাট ল পড়তে লন্ডন যান। প্রেসিডেন্সি কলেজ সংকলনের প্রথম মুসলমান সম্পাদক ছিলেন তিনি। কলকাতা মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের তিনি ছিলেন অন্যতম সংগঠক। চল্লিশ দশকের প্রথমার্থে লেখক হিসেবে সৈয়দ মাহবুব মোরশেদের পরিচিতি সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। বিখ্যাত 'গার্ডিয়ান' পত্রিকায় বেশ কিছু লেখা প্রকাশিত হওয়ার পর ফিলিস্তিন এবং আরব বিশ্বে তিনি বিশেষভাবে প্রশংসিত হন। 'স্টেটসম্যান' পত্রিকায় 'কায়েদে আযম' সম্পর্কে সমালোচনা করে লেখার কারণে সে সময় সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে তিনি যুক্ত হন। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে ২১ দফা কর্মসূচি প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নে তিনি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন। ১৯৫৪ সালে তিনি ঢাকা হাইকোর্টে বিচারপতি হিসেবে শপথ নেন। এ ক্ষেত্রে তার বুদ্ধিমত্তা ও প্রজ্ঞার পরিচয় সর্বজনবিদিত।

১৯৫৪ সালের ২১ দফা কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা, যা ২১ দফারই সারাংশ; তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ১৯৬৯ সালে ছাত্রদের উত্থাপিত ১১ দফা দাবির প্রতিপাদ্য যে একই সূত্রে গাঁথা; ইতিহাস বিশ্নেষকদের তাও দৃষ্টি এড়ায়নি। এসব দাবি প্রণয়নে তার মেধা ও মননশীলতার কারণেই তিনি বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন ও প্রিয় মানুষ হয়ে উঠেছিলেন। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী কমিটি গঠনে তিনি তৎকালীন সরকারের ভ্রূকুটি উপেক্ষা করে অগ্রনায়কের ভূমিকা পালন করেছিলেন। কবি শামসুর রাহমান এ সম্পর্কে বলেন- 'আজ হয়তো অনেকেই জানেন না, সেই উৎসব কী পরিমাণ বিপজ্জনক ছিল আমাদের পক্ষে। পাকিস্তানি প্রভুদের নাখোশ করে আমরা রবীন্দ্রশতবার্ষিকী পালন করেছিলাম সেদিন। বিচারপতি সৈয়দ মোরশেদ সেদিন অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন, মনে পড়ে।'

মূলত তিনি ছিলেন বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী একজন নির্ভীক সৈনিক। ১৯৬৮ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং অন্যদের বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্রমূলক তথাকথিত মামলা করা হয়। বিচারপতি মোরশেদ এর প্রতিবাদস্বরূপ প্রধান বিচারপতির আসন থেকে পদত্যাগ করেন। সাধারণ মানুষের কাতারে নিজেকে শামিল করেন। বঙ্গবন্ধুর পক্ষে তার কৌঁসুলি হিসেবে প্রখ্যাত আইনবিদ স্যার উইলিয়ামস নিযুক্ত হন। স্যার উইলিয়ামসের সবচেয়ে নিকটতম সহযোগী ছিলেন বিচারপতি মোরশেদ। তিনি তার অসাধারণ পাণ্ডিত্য, প্রজ্ঞা ও মেধার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকারকে মূল্য দিয়েছিলেন। প্রধান বিচারপতির আসন থেকে পদত্যাগ করে তিনি একদিকে আইয়ুব সরকারের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন। পাশাপাশি দেশবাসীর অকুণ্ঠ সম্মান, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা লাভ করেছিলেন। বিশেষত যারা স্বাধীনতাকামী অর্থাৎ বাংলাদেশ নামের একটি রাষ্ট্রের স্বপ্ন বুকে ধারণ করেছিলেন, মূলত তাদের জন্য সময়টি ছিল ক্রান্তিকাল। ঠিক সেই সময় নির্ভীকতা, ত্যাগের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে বিচারপতি মোরশেদ জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়েছিলেন।

সৈয়দ মাহবুব মোরশেদ শুধু একটি নাম নয়। ইতিহাসের কিংবদন্তি অবিস্মরণীয় নাম। তিনি আমাদের বাতিঘর, অনুপ্রেরণার উৎস। তিনি ১৯৭৯ সালের ৩ এপ্রিল এই সুন্দর সুশোভিত পৃথিবী ছেড়ে গেলেও বেঁচে আছেন বাঙালির হৃদয়ে। ১১২তম জন্মদিনে তাকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি।

কাজী সালাহউদ্দীন: কবি, মহাসচিব; মোরশেদ স্মৃতি সংসদ

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com