রাজনীতি

বিএনপির জন্য সংলাপের বিকল্প নেই

প্রকাশ: ১১ জানুয়ারি ২২ । ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সাইফুর রহমান তপন

নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনের লক্ষ্যে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ শুরু করেছেন গত ২০ ডিসেম্বর। এ সংলাপের মাধ্যমে একটা সার্চ কমিটি তৈরি হবে। ওই সার্চ কমিটি 'যোগ্য' ব্যক্তিদের তালিকা করে একটা নির্বাচন কমিশন গঠনে সরকারকে সহায়তা করবে। রাষ্ট্রপতি এ সংলাপে বিএনপিকে ১২ জানুয়ারি অংশগ্রহণ করার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। কিন্তু বিএনপি মহাসচিব ফখরুল ইসলাম আলমগীর আমন্ত্রণ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই জানিয়ে দিয়েছেন, তারা সংলাপে যাবেন না। এর পরিপ্রেক্ষিতে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, রাষ্ট্রপতির এ সংলাপ কি কোনো ফল বয়ে আনবে? তবে এ কথার সঙ্গে সঙ্গে এ প্রশ্নও উঠেছে- সংলাপ বর্জন করে বিএনপি কী অর্জন করবে?

প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার আগে বলে নেওয়া দরকার, ৬ জানুয়ারি পর্যন্ত জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টিসহ ১৬টি রাজনৈতিক দল এ সংলাপে অংশগ্রহণ করেছে। সামনের দিনগুলোতে নিবন্ধিত মোট ৩৪টি দলের মধ্যে আরও কয়েকটি দলের এতে অংশ নেওয়ার কথা আছে। শুধু তাই নয়, যদিও বিএনপি এবং তার কয়েকটি মিত্র দল এ সংলাপে যাচ্ছে না বলে জানিয়েছে। অবশ্য মিত্রদের মধ্যে ড. কামাল হোসেনের গণফোরাম এবং মেজর জেনারেল (অব.) ইবরাহিমের কল্যাণ পার্টিও আছে। সংলাপে তাদের অংশগ্রহণের বিষয়টা নিশ্চিত হয়েছে।

বিএনপি অবশ্য রাষ্ট্রপতির আমন্ত্রণ পাওয়ার আগেই গত ২৯ ডিসেম্বর স্থায়ী কমিটির বৈঠক করে জানিয়ে দিয়েছিল- তারা বিশ্বাস করে, নির্বাচনকালে নিরপেক্ষ নির্দলীয় সরকার ছাড়া সুষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কোনো নির্বাচন কমিশনই করতে পারবে না। রাষ্ট্রপতি নিজেই বলেছেন, পরিবর্তন করার ক্ষমতা তার নেই। সে কারণে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর সংলাপ কোনো ইতিবাচক ফল আনতে পারবে না। বিএনপি অর্থহীন কোনো সংলাপে অংশগ্রহণ করবে না।

বিএনপি দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল। সর্বত্র আওয়ামী লীগের আধিপত্য বিরাজ করলেও দেশে সরকারবিরোধী লোকের সংখ্যা কম নয়। আর এদের কাছে বিএনপি এখনও প্রথম পছন্দের দল। অতএব চলমান সংলাপে বিএনপির অংশগ্রহণ করা বা না-করা জনমতের ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে না- তা বলার সুযোগ নেই।

তবে বিএনপি যে বলছে, 'অর্থহীন' সংলাপে গিয়ে 'সময় নষ্ট' না করে তারা দেশে 'আন্দোলনের সুনামি' তৈরি করবে; এর মাধ্যমে এ বছরেই সরকার হটিয়ে 'গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা' করবে- তা কি বাস্তবসম্মত?

বিএনপির এ অবস্থানটা বাস্তবসম্মত হতো, যদি নির্বাচনকালে একটা 'নির্দলীয়' সরকার প্রতিষ্ঠার বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য থাকত। সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে গড়ে ওঠা জাতীয় ঐকমত্যের কারণেই এ ধরনের একটা সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৯১ সালে। আবার আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংসদের তৎকালীন সব বিরোধী দলের আন্দোলনের কারণে ১৯৯৬ সালে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধানটি যুক্ত হয়েছিল। এখন কি এর একটাও আছে? তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ব্যাপারে জনমত এখন বিভক্ত। বিএনপিও এ বিষয়ে সব বিরোধী দলকে এক ছাতার নিচে আনতে পারেনি।

প্রশ্ন হচ্ছে, ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে ওই জাতীয় ঐকমত্য কি বহাল ছিল?

২০০৬ সালের নির্বাচন ঘিরে তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত সরকার পছন্দের বিচারপতিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে পাওয়ার জন্য উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের বয়স বৃদ্ধি থেকে শুরু করে বিএনপিদলীয় রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিনকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান বানাতে যেসব কাণ্ডকীর্তি করেছিল, তাতে এ ধরনের সরকারের প্রতি আওয়ামী লীগ শুধু নয়, দেশের সিংহভাগ মানুষের চূড়ান্ত অনাস্থা তৈরি হয়েছিল। এমন পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে দেশে ১/১১ নামে ছদ্মবেশী সামরিক সরকার ক্ষমতা দখল করেছিল; যার বিরুদ্ধে বিএনপি নেতাকর্মীদের ক্ষোভ-বিদ্বেষ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের চেয়ে কম ছিল না বরং একটু বেশিই ছিল। তা কি ওই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেয়নি?

২০১৪ সালের সংসদ নির্বাচনের আগে-পরে বিএনপি ওই বিধানটি ফিরিয়ে আনার জন্য আন্দোলনের নামে কম চেষ্টা করেনি। কিন্তু কোনোটাই কাজে আসেনি। অর্থাৎ নির্বাচনকালে কথিত নির্দলীয় সরকার বসানোর ইস্যুটা মাঠে ফয়সালা হয়ে গেছে। আর তা ফয়সালা হয়েছিল বলেই বিএনপি নেতারা ২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনের আগে প্রকাশ্যেই স্বীকার করেছেন- ২০১৪ সালে নির্বাচন বর্জন করে তারা ভুল করেছেন।

বিএনপি নেতাদের কথা থেকে এটা পরিস্কার, সংলাপে না গিয়ে তারা বরং সরকার পতনের আন্দোলনে মনোযোগ দেওয়াকেই যুক্তিযুক্ত বলে মনে করছেন। অর্থাৎ শুধু রাষ্ট্রপতির সংলাপ বর্জন নয়; বিএনপি ২০১৪ সালের আগে ফিরে যেতে চায়। দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা কি ২০১৪ সালের চেয়ে ভঙ্গুর সাংগঠনিক ভিত্তির দলটিকে সে সুযোগ দেবে?

অস্বীকার করা যাবে না, বর্তমান সরকারের আমলে যে দুটো নির্বাচন কমিশন তৈরি হয়েছিল, তারা জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। কিন্তু সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন গত ৫০ বছরে কোনো সরকার উপহার দিতে পেরেছে কি? যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিএনপি ও তার মিত্ররা চাইছে; তাদের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোও অন্তত পরাজিত পক্ষের কাছ থেকে পাস মার্ক পায়নি। এখনও সুযোগ পেলেই বিএনপি নেতারা ২০০৮ সালের নির্বাচন সম্পর্কে সমালোচনামুখর হয়ে ওঠেন। তা ছাড়া ১/১১-এর তিক্ত অভিজ্ঞতার পর গণতন্ত্রপ্রেমিক কোনো দল বা মানুষই খাল কেটে কুমির আনতে চাইবে না।

দেশে দেশে এবং এ ভূখণ্ডে বহু নজির আছে, প্রতিদ্বন্দ্বী দল বা প্রার্থীরা জনসম্পৃক্ত হলে জনগণের ভোটাধিকার চর্চায় কেউ বাধা দিতে পারে না। তাই বিএনপি যদি নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিচর্চার মাধ্যমে নিজের জনভিত্তিকে মজবুত করায় মনোযোগী হয়; সেটা একদিকে তাদের লাভবান করবে, আরেকদিকে দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে মজবুত করবে।

সাইফুর রহমান তপন: সাবেক ছাত্রনেতা

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com