পদ্মাতীরে ভাগাড়

প্রদীপের নিচে অন্ধকার

প্রকাশ: ১১ জানুয়ারি ২২ । ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সম্পাদকীয়

পদ্মা নদী এখন রাজশাহী নগরীর ভাগাড়- সোমবার সমকালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের এমন ভাষ্য আমাদের যেমন উদ্বিগ্ন, তেমনই বিস্মিত করেছে। সন্দেহ নেই, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নগরসংলগ্ন নদীগুলো অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে বস্তুগত বর্জ্য ফেলার সহজ গন্তব্যে পরিণত হচ্ছে। বিশেষত প্রবাহস্বল্পতায় ভোগা নদীগুলোর পরিস্থিতি সবচেয়ে করুণ। এ নিয়ে সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রায়ই নিয়মিত বিরতিতে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়ে থাকে। তাই বলে পদ্মার মতো প্রমত্তা নদীও একই পরিণতি বরণ করতে যাবে- ভাবতে গেলে বিস্মিত হতে হয় বৈকি! আমাদের বিস্ময় এই কারণেও, যে নগরীর বর্জ্য এভাবে নদী ও পরিবেশ দূষণের হুমকি তৈরি করছে, তার নাম রাজশাহী। আমরা জানি, পরিবেশ সুরক্ষা ও দূষণ ব্যবস্থাপনায় এই নগর ইতোমধ্যে দেশের বাইরেও বৈশ্বিকভাবে প্রশংসা কুড়িয়েছে। কয়েক বছর আগে বায়ুদূষণ হ্রাসে এই নগরী 'বিশ্বসেরা' স্থান অধিকার করেছিল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উপাত্তের উদ্ৃব্দতি দিয়ে তখন ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানে রাজশাহীর পরিবেশ সুরক্ষা বিষয়ে প্রশস্তিমূলক প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছিল। আমাদের এও মনে আছে, ২০২০ সালের মার্চে 'পরিচ্ছন্ন গ্রাম, পরিচ্ছন্ন নগরী' কর্মসূচির আওতায় পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম উদ্বোধন করতে গিয়ে রাজশাহীর পরিচ্ছন্নতার প্রশংসা করেছিলেন খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেই শহর আজ বর্জ্যের ভাগাড়!

সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এটা স্পষ্ট, নগরীর অভ্যন্তরীণ পরিচ্ছন্নতা পদ্মাতীরের আলুপট্টি এলাকায় প্রতিফলিত না হওয়ার মূল কারণ অব্যবস্থাপনা। আলোচ্য প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজশাহী শহরের যত পুরোনো স্থাপনা ভাঙচুর হচ্ছে, তার সব বর্জ্য পদ্মায় ফেলা হচ্ছে। শহরের বহুতল ভবন নির্মাণের জন্য স্পাইলিং করার সিমেন্ট ও বালুর তরল রাসায়নিক পদার্থও রয়েছে এর মধ্যে। নির্বিচারে ফেলা হচ্ছে পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্য। ফলে শুধু নদী ভরাট ও পরিবেশদূষণই নয়, নদীটির প্রবাহদূষণ ও বৃহত্তর অর্থে মৎস্যসম্পদসহ জীববৈচিত্র্যও হুমকিতে পড়ছে। এভাবে বর্জ্য ফেলার নেপথ্যে নিছক অবিমৃষ্যকারিতা যে নেই, তা বোঝা যায় ভরাট করা অংশে বিভিন্ন স্থাপনা তৈরির উদ্যোগ দেখে। বস্তুত প্রভাবশালী মহলের কারসাজি কিংবা আশীর্বাদ ছাড়া নদীতে বর্জ্য ফেলার 'দুঃসাহস' সাধারণ নাগরিকের কখনও হয় না। নদী দখলের এই 'ধ্রুপদি' পদ্ধতি দেশের অন্যান্য এলাকাতেও দেখা যায়- প্রথমে বর্জ্য ফেলা হয়, তারপর সেখানে তৈরি হয় স্থাপনা। প্রথমে অস্থায়ী সামাজিক ও ধর্মীয় কাঠামো নির্মাণ করা হয়; তারপর স্থায়ী আবাসিক ও বাণিজ্যিক স্থাপনা। পদ্মাতীরের আলুপট্টি এলাকায় সেটাই ঘটেছে।

আমরা মনে করি, এই দখল প্রক্রিয়ার দায় রাজশাহী সিটি করপোরেশন ও স্থানীয় জনপ্রশাসন এড়াতে পারে না। যেমন আলুপট্টি এলাকায় কঠিন বর্জ্যের পাশাপাশি নগর থেকে তরল বর্জ্যও নালা বেয়ে নদীতে পড়ছে বলে আলোচ্য প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। কঠিন বর্জ্য না হয় উড়ে এসে জুড়ে বসছে; তরল বর্জ্যের নালা তো রীতিমতো 'পরিকল্পিত দূষণ'! এলাকাটিতে নদীভাঙনকবলিত জনগোষ্ঠীর বসতি গড়ে ওঠার নেপথ্যেও কারা রয়েছে; খুঁজে দেখা জরুরি। নদীভাঙনপীড়িত মানুষের প্রতি আমাদের সহানুভূতি নিশ্চয় রয়েছে। কিন্তু তার জন্য সামষ্টিক সম্পত্তিতে দখলদারিত্ব মেনে নেওয়া যায় না। বিভিন্ন শহরে এভাবে ছিন্নমূল মানুষকে সামনে রেখে বসতি গড়ে তুলে 'ভাড়া' আদায় করে কারও কারও আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার নজির আমাদের সামনে বিস্তর। রাজশাহীর পদ্মাপাড়েও যে তার পুনরাবৃত্তি হয়নি- সে নিশ্চয়তা কে দেবে?

আমরা দেখতে চাই, নগর কর্তৃপক্ষ ও জেলা প্রশাসন অবিলম্বে পদ্মাপাড়ের আলুপট্টি এলাকায় কঠিন ও তরল দূষণ বন্ধে সক্রিয় হয়েছে। একইভাবে রাজশাহী শহরসংলগ্ন অন্যত্রও দূষণ চলছে কিনা, খতিয়ে দেখা জরুরি। দখল উচ্ছেদের কোনো বিকল্প নেই। বিশেষত জেলা প্রশাসন নিজেই যেখানে সাড়ে পাঁচ শতাধিক দখলদারের তালিকা প্রস্তুত করেছে, সেখানে ব্যবস্থা নিতে বাধা কোথায়? এভাবে প্রকাশ্য দূষণ দেখেও পরিবেশ অধিদপ্তর যে হাত-পা গুটিয়ে বসে রয়েছে- তা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। অধিদপ্তরের বিভাগীয় পরিচালক যেভাবে 'মাসিক সভা'য় বিষয়টি তোলার কথা বলছেন, তা দূষণকারী ও দখলদারদের উৎসাহ দেওয়ারই নামান্তর। ব্যক্তি বা গোষ্ঠীবিশেষের অবহেলা ও অবিমৃষ্যকারিতার কাছে পরিচ্ছন্ন নদীর স্নিগ্ধ নদীতীর এভাবে হারিয়ে যেতে দেওয়া যায় না।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com