চিকিৎসা সক্ষমতা বাড়লেও শঙ্কা দূর হয়নি

প্রকাশ: ১১ জানুয়ারি ২২ । ০০:০০ | আপডেট: ১১ জানুয়ারি ২২ । ০১:২৭ | প্রিন্ট সংস্করণ

রাজবংশী রায়

করোনাভাইরাস পরিস্থিতি আবার ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। প্রতিদিনই শনাক্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। গত ১৫ দিনে রোগী শনাক্তের হার ২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৮ শতাংশ ছাড়িয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, গত এক সপ্তাহে শনাক্তের হার বেড়েছে ১২৫ শতাংশের বেশি। এরই মধ্যে জনস্বাস্থ্যবিদরা হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা সক্ষমতা আরও বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন। তারা বলছেন, রোগীর সংখ্যা বাড়লে হাসপাতালে ভর্তির হার বাড়বে। তখন বর্তমানের সক্ষমতা দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হতে পারে।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এএসএম আলমগীর জানিয়েছেন, দেশে বর্তমানে ডেলটা ভ্যারিয়েন্ট সংক্রমণ ছড়াচ্ছে। তবে ওমিক্রনও দ্রুত সংক্রমণ ছড়াতে শুরু করবে।

এরই মধ্যে করোনার নতুন ধরন ওমিক্রনের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে গতকাল সোমবার ১১টি ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্যবিদরা বলেছেন, আগের অভিজ্ঞতা ভালো নয়। আগে লকডাউন কিংবা জারি করা বিধিনিষেধ তেমনভাবে কার্যকর হতে দেখা যায়নি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে আদেশ জারির মধ্যেই কার্যক্রম সীমাবদ্ধ ছিল। এতে করে সংক্রমণ সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল। এবার যেন তা না হয়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এবিএম খুরশীদ আলম সমকালকে বলেন, রোগী কমে আসায় অনেক হাসপাতালের কভিড ইউনিটে অন্যান্য রোগীর চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। কারণ গত দুই বছরে অন্য রোগীরা চিকিৎসাবঞ্চিত হয়েছেন। কিন্তু আবার সংক্রমণ বৃদ্ধির পরপরই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত করার প্রক্রিয়া চলছে।

আগের তুলনায় স্বাস্থ্য বিভাগের সক্ষমতা অনেকটা বেড়েছে বলে দাবি করেন ডা. খুরশীদ আলম।

সক্ষমতা বাড়লেও আছে শঙ্কা : দেশে ২০২০ সালের ৮ মার্চ প্রথম করোনার সংক্রমণ শুরুর পর স্বাস্থ্যসেবার ওপর সবচেয়ে চাপ পড়ে। শুরুতে পিপিই, মাস্কসহ সুরক্ষা সামগ্রীর সংকট দেখা দেয়। এরপর শয্যা সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করে। বিশেষ করে জুন-জুলাইয়ে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করে। যখন প্রতিদিনই আক্রান্ত ও মৃত্যুর রেকর্ড গড়েছিল, তখন স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা অনেকটাই ভেঙে পড়ে।

স্বাস্থ্য বিভাগের পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখা যায়, ২০২০ সালের ২৪ জুন পর্যন্ত সারাদেশে করোনা রোগী ভর্তির সাধারণ শয্যা ছিল ১৪ হাজার ৭২০টি এবং আইসিইউ শয্যা ছিল ৩৮২টি। অক্সিজেন সিলিন্ডারও ছিল অপ্রতুল, মাত্র ১০ হাজার ৩৫টি। হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা ও অক্সিজেন কনসেনট্রেটর ছিল না। পুরোনো আটটি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালসহ ২০টির মতো হাসপাতালে সেন্ট্রাল অক্সিজেন লাইন ছিল। হাসপাতালে শয্যা না পেয়ে রাস্তায় ঘুরে ঘুরে রোগী মৃত্যুর খবর আসে। ২০২১ সালের জুন ও জুলাই মাসে সংক্রমণ পরিস্থিতি আবার মারাত্মক আকার ধারণ করে। আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণ হারে আক্রান্ত ও মৃত্যু শুরু হয়। হাসপাতালে শয্যা না পাওয়ার পাশাপাশি অক্সিজেন সংকটও দেখা দেয়। হাসপাতালে ভর্তি হতে না পেরে বাসাবাড়িতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। ছয় মাসে বাসাবাড়িতে ৭৭৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।

স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, গত রোববার পর্যন্ত সারাদেশে কডিভ রোগীদের চিকিৎসার জন্য ১৩ হাজার ৪০৭টি সাধারণ শয্যা প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রোগী ভর্তি আছেন ৮১৪ জন। আর আইসিইউ শয্যা প্রস্তুত আছে ১ হাজার ২১৩টি। এর মধ্যে রোগী ভর্তি আছে ১৫৯ জন। কভিড এইচডিইউ শয্যা আছে ৭০৮টি। এর মধ্যে রোগী ভর্তি আছে ৭০ জন। হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা আছে ২ হাজার ১৯টি। অক্সিজেন কনসেনট্রেটর আছে ২ হাজার ৩৪৩টি।

সবচেয়ে অগ্রগতি হয়েছে সেন্ট্রাল অক্সিজেন লাইন স্থাপনে। শুরুর দিকে হাতেগোনা কয়েকটি হাসপাতালে সেন্ট্রাল অক্সিজেন লাইন থাকলেও গত কয়েক মাসে তা বেড়েছে। বর্তমানে ১১৮টি হাসপাতালে কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা রয়েছে।

স্বাস্থ্য বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, গত বছর জুন-জুলাই মাসে প্রতিদিন গড়ে ১০ হাজারের ওপরে মানুষ আক্রান্ত হয়েছিলেন। তখন কিন্তু প্রয়োজন থাকার পরও সবাইকে হাসপাতালে ভর্তি করা সম্ভব হয়নি। এবারও পরিস্থিতি তেমন আকার ধারণ করলে স্বাস্থ্যসেবার ওপর চাপ তৈরি হবে। সব মিলিয়ে হাসপাতালের সক্ষমতা ১৫ হাজারের মতো শয্যা। এর চেয়ে বেশি রোগী হলেই সংকট শুরু হবে।

জোরালো প্রস্তুতির আহ্বান : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, গত দুই সপ্তাহের সংক্রমণ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে বলা যায়, পরিস্থিতি খারাপ হতে শুরু করেছে। গত বছরের জুন ও জুলাই মাসের চেয়েও সংক্রমণ বেশি হতে পারে। হাসপাতালের ওপর চাপ বাড়বে। সে ক্ষেত্রে হাসপাতালগুলোর যে সক্ষমতা আছে, তা দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হতে পারে।

তিনি বলেন, এখনও সময় আছে। যতটা সম্ভব আরও সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ সমকালকে বলেন, গত দুই বছরে দুটি ঢেউয়ের সময় লক্ষ্য করা গেছে, স্বাস্থ্য বিভাগ পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রস্তুত ছিল না। বিশ্বের অনেক দেশেই চিকিৎসা নিয়ে সংকট ছিল। কিন্তু বাংলাদেশে এই সংকট ছিল অনেক বেশি। এর প্রমাণ হাসপাতালে শয্যা না পেয়ে বাসাবাড়িতে সাড়ে সাতশ' মানুষের মৃত্যুর ঘটনা। এবারও রোগী বাড়তে শুরু করেছে। হাসপাতালের ওপরও চাপ বাড়বে। সুতরাং এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে প্রস্তুতি নিতে হবে।

মন্ত্রীর দাবি, প্রস্তুতিতে ঘাটতি নেই : স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সমকালকে বলেন, করোনার সংক্রমণ মোকাবিলা একটি সমন্বিত কার্যক্রম। একটি নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থাপনা। অপরটি চিকিৎসা সম্পর্কিত। বিশ্বের সব রাষ্ট্র করোনা নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে। এখন নিয়ন্ত্রণ করতে হলে মাস্ক পরতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। জনসমাগম বন্ধ রাখা প্রয়োজন। আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় বিধিনিষেধ আরোপ করার মধ্য নিয়ে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার প্রস্তুতি সম্পর্কে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, শুরুর তুলনায় হাসপাতালের চিকিৎসা সক্ষমতা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। আইসিইউ শয্যা ও অক্সিজেন সিলিন্ডার তিন থেকে চারগুণ বেড়েছে। শুরুতে হাই ফেষ্টা ন্যাজাল ক্যানুলা, অক্সিজেন কনসেনট্রেটর ছিল না। এখন প্রায় প্রত্যেকটি কভিড ডেডিকেডেট হাসপাতালে এসব সামগ্রী আছে। সুতরাং সক্ষমতা অনেক গুণ বেড়েছে- এটি প্রমাণিত। এরপরও প্রতিদিন চিকিৎসা সক্ষমতা বাড়ানোর কার্যক্রম চলছে।

তবে মন্ত্রী স্বীকার করেন, প্রতিদিন গড়ে পাঁচ হাজার করে রোগী হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com