নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচন

বিরোধীদের বশে আনার কঠিন পরীক্ষায় আইভী

প্রকাশ: ১১ জানুয়ারি ২২ । ০০:০০ | আপডেট: ১১ জানুয়ারি ২২ । ০২:০৫ | প্রিন্ট সংস্করণ

এমএ খান মিঠু, নারায়ণগঞ্জ

আগের তিনবার বড় ব্যবধানে সহজ জয় পেলেও এবারের নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক) নির্বাচনে কঠিন পরীক্ষায় পড়ছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভী। ভোটের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের মূল প্রতিপক্ষ বিএনপি নির্বাচনে না থাকলেও দলটির নেতা তৈমূর আলম খন্দকার মেয়র পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় আইভীকে একদিকে তার বিপক্ষে যেমন লড়তে হচ্ছে, তেমনি নিজ দলের বিরোধিতাও সামাল দিতে হচ্ছে। এ ছাড়া টানা ১৯ বছর পদে থাকা আইভীকে হোল্ডিং ট্যাক্সসহ নানা কর বাড়ানো নিয়ে অসন্তোষের চাপও সামাল দিতে হচ্ছে।

পৌরপিতা হিসেবে খ্যাত আলী আহাম্মদ চুনকার মেয়ে আইভী নিউজিল্যান্ড থেকে এসে ২০০৩ সালের নারায়ণগঞ্জ পৌর নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী হন। বিএনপিবিরোধী হাওয়ায় সেবার বিরোধী জোটের একক প্রার্থী হয়ে বিপুল ভোটে জয়ী হন। দলীয় রাজনীতিতে তার প্রধান প্রতিপক্ষ শামীম ওসমান তখন দেশে না থাকায় আওয়ামী লীগের ঐক্যবদ্ধ সমর্থন ছিল তার সঙ্গে।

২০১১ সালে নাসিকের প্রথম নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মেয়র পদে সমর্থন দেয় শামীম ওসমানকে। ভোটের সাত ঘণ্টা আগে দলের নির্দেশে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী তৈমূর নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। বিএনপি নেতাদের ভাষ্য, সেবার শামীম ওসমানকে ঠেকাতে বিএনপি এই কৌশল নিয়েছিল। শামীমকে বিপুল ব্যবধানে হারিয়ে তার সুফল তুলেছিলেন আইভী। ২০১৬ সালে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকে বিএনপির সাখাওয়াত হোসেন খানকে হারান আইভী। সেবার শামীম ওসমানের প্রবল বিরোধিতার মুখে পড়তে হয়নি তাকে।

আগের নির্বাচনগুলোতে আইভীর পক্ষে দলের নেতাদের স্বতঃস্ম্ফূর্ত হয়ে নামতে দেখা গেলেও এবার তার ভোটের প্রচারে নামতে শামীম ওসমানপন্থি আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে পুলিশ দিয়ে চাপ দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আইভীর পক্ষে নির্বাচনে সক্রিয় না থাকায় বিলুপ্ত করা নারায়ণগঞ্জ মহানগর ছাত্রলীগ কমিটির সভাপতি হাবিবুর রহমান রিয়াদই এ অভিযোগ তুলেছেন।

গতকাল সোমবার শামীম ওসমান নৌকার পক্ষে ভোটের মাঠে নামার ঘোষণা দিয়েছেন। যদিও ৫৬ মিনিটের সংবাদ সম্মেলনে একবারও আইভীর নাম নেননি; উল্টো তার সম্পর্কে নানা বক্রোক্তি করেন। শামীম ওসমানের মঞ্চে জেলা, মহানগর ও থানা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ নেতাদের ভিড় দেখা গেছে; যাদের এত দিন আইভীর ভোটের প্রচারে দেখা যায়নি। শামীম ওসমান নৌকার পক্ষে নামার ঘোষণা দিলেও তার অনুসারীরা কতটা আন্তরিক হয়ে আইভীর পক্ষে কাজ করবেন- সে সংশয় রয়েছে। আইভী অবশ্য তার আগেই বলেছেন, কারও সমর্থন তার দরকার নেই। তবে আইভীকে জিততে হলে সব পক্ষের ভোটের প্রয়োজন হবে। সেই প্রেক্ষাপটে তিনি সবার ভোটই চান।

শামীম ওসমানপন্থি এক নেতা সমকালকে বলেছেন, আইভী শুরু থেকেই ওসমান পরিবারকে আক্রমণ করছেন। শামীম ওসমানকে গডফাদার বলছেন। তৈমূর আলমকে ওসমান পরিবারের প্রার্থী বলছেন। ২০১১ সালে শামীম ওসমান যখন তার বিরুদ্ধে প্রার্থী ছিলেন, তখনও এতটা সমালোচনা করেননি। শামীম ওসমান কেন্দ্রীয় নেতাদের নির্দেশে নারায়ণগঞ্জ এসে নৌকার পক্ষে নামার ঘোষণা দিয়েছেন বটে; কিন্তু নেতাকর্মীদের আইভীর পক্ষে নামানো কঠিন। শামীম-আইভীর এখন পর্যন্ত সৌজন্য সাক্ষাৎ কিংবা কথা কিছুই হয়নি। কথাবার্তা হলেও বিরোধের পরিবেশ কিছুটা হলেও কাটত বলে মনে করেন নগরবাসী। যেমনটা ২০১৬ সালের নির্বাচনের আগে হয়েছিল।

নারায়ণগঞ্জের ভোটের মাঠে আলোচনা রয়েছে, তৈমূর স্বতন্ত্র প্রার্থী না হয়ে ধানের শীষের প্রার্থী হলে আইভীর জন্য নির্বাচন সহজ হতো। তারা বলছেন, আওয়ামী লীগ সমর্থকরা কখনোই ধানের শীষে ভোট দেন না। কিন্তু তৈমূর হাতি প্রতীকে নির্বাচন করায় এই মানসিক বাধা কম থাকবে। শামীমপন্থি আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকরা হাতিতে ভর করতে পারেন। তৈমূরের প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট এ টি এম কামাল সমকালকে বলেছেন, স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় হাতি এবার সবার প্রতীক। ধানের শীষের প্রার্থী হলে শুধু দলের ভোট পেতেন, স্বতন্ত্র হওয়ায় তৈমূর সবার ভোট পাবেন।

শামীম ওসমানের বড় ভাই সেলিম ওসমান নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে জাতীয় পার্টির (জাপা) এমপি। নারায়ণগঞ্জ জাপার নেতাকর্মীরাও আইভীর সঙ্গে নেই; বরং জাপা নেতা ও জনপ্রতিনিধিদের তৈমূরের সঙ্গে দেখা গেছে। জাপার সমর্থন এখনও পাননি আইভী। দলের মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু সোমবার বলেছেন, 'নারায়ণগঞ্জে কাউকে তারা সমর্থন দেননি। কেউ তাদের প্রার্থী নন।'

গত কয়েক বছরে বিএনপি নেতারা যত নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন, তার প্রায় সবক'টিতেই তাদের অভিযোগ ছিল- ভোটের প্রচারে হামলা-মামলা ও বাধা আসছে। গত ২৮ ডিসেম্বর থেকে ভোটের প্রচার শুরু হয়েছে নারায়ণগঞ্জে। আগের ১২ দিনে হাতি প্রতীকের প্রার্থী তৈমূর আলমের প্রচারে বাধার অভিযোগ আসেনি। কিন্তু গতকাল সোমবার এ অভিযোগ উঠেছে জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক ও তৈমূরের সিদ্ধিরগঞ্জ থানা এলাকার প্রধান নির্বাচন সমন্বয়ক মনিরুল ইসলাম রবিকে তার বাসা থেকে পুলিশ গ্রেপ্তার করায়।

আগের দিনই আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও নাসিক নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর কবির নানক তৈমূর আলমকে উদ্দেশ করে বলেছিলেন, 'ঘুঘু দেখেছেন, ফাঁদ দেখেননি। আগামী ২৪ ঘণ্টা পর বুঝবেন।' বিএনপি নেতারা বলছেন, প্রার্থীর নির্বাচনী সমন্বয়ক গ্রেপ্তার হওয়াটা তারই আলামত। আগে কখনও নারায়ণগঞ্জের সিটি নির্বাচনে এমনটি হয়নি। আইভীর দুর্বলতা প্রকাশ পাচ্ছে এসব ধরপাকড়ে।

আওয়ামী লীগ টানা ১৩ বছর ক্ষমতায়। আর আইভী ১৯ বছর। তাই ভোটের মাঠে নৌকার প্রার্থীকে কাজের খতিয়ান দিতে হচ্ছে। তৈমূর আলম আইভীর মেয়াদে কী কী কাজ হয়নি, তা দিনরাত গোনাচ্ছেন ভোটারদের। নারায়ণগঞ্জে গত কয়েক বছরে গৃহকর অনেক বেড়েছে বলে বাড়ির মালিকদের দাবি। সিদ্ধিরগঞ্জের কেল্লারপুল এলাকার বাসিন্দা নসরুল হামিদ চায়ের আড্ডায় বলেন, 'আগে বছরে এক হাজার ৪০০ টাকা হোল্ডিং ট্যাক্স দিতাম। এখন দিতে হচ্ছে ১৮ হাজার টাকা। আবার তিন বছরের বকেয়াও ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে করোনার দুঃসময়ে হাজার পঞ্চাশেক টাকার ধাক্কা এসে পড়েছে।'

ভোটের প্রচারে তৈমূর আলম হোল্ডিং ট্যাক্স, জলাবদ্ধতা ইস্যুতে আইভীকে ঘায়েল করার চেষ্টা করছেন। আইভীর ভাষ্যমতে, ৮০ শতাংশ এলাকায় রাস্তা ও ড্রেনের কাজ শেষ। তা নিয়ে নানা খুঁত বের করে তৈমূর সরব।

আইভীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত নাগরিক কমিটির সিনিয়র সহসভাপতি রফিউর রাব্বি বলেন, আইভী নৌকা প্রতীক না নিয়ে নির্বাচন করলে জয়টা তার জন্য সহজ হতো। কিন্তু আইভীর বদলে অন্য কেউ এই প্রতীক পেলে তখন ভিন্ন পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো।

সেলিনা হায়াৎ আইভী গতকাল ভোটের প্রচারে বলছেন, বিগত দিনে করা উন্নয়নের জন্যই তিনি সব শ্রেণি-পেশা ও দলের মানুষের ভোট পাবেন। নগরবাসী তার উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডকে মূল্যায়ন করবেন।

তবে জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা সমকালকে বলেছেন, আইভী বারবার ভোটে জিতলেও নেতাকর্মীদের খোঁজ নেননি কখনও। রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেন না। তিনি দলের চেয়ে নাগরিক সমাজকে বেশি গুরুত্ব দেন বলে দাবি আওয়ামী লীগ নেতাদের।

নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক শাহ নিজাম খোলাখুলি বলেছেন আইভীর নির্বাচনী কৌশল নিয়ে। তিনি বলেন, যখন দলের নেতাদের মাঠে নামাতে অন্য কাউকে দিয়ে চাপ দিতে হয়, তখন বুঝতে হবে নেতাকর্মীদের প্রতি প্রার্থীর বিশ্বাসের অভাব রয়েছে। এতে করে সাধারণ ভোটারদের কাছে ভুল বার্তা যায়। নির্বাচন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারও বাসায় এসে পুলিশ যদি হেনস্তা করে, তখন সেই নেতার কর্মীরা প্রার্থীর বিপক্ষে চলে যাবে।

তবে মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জি এম আরাফাত বলেন, দলের নেতাকর্মীদের নির্বাচনের মাঠে নামাতে আইভী পুলিশকে বলেননি। তিনি প্রশাসনকে ব্যবহার করেননি, এর প্রয়োজনও নেই। জনগণ এবং তার করা উন্নয়নেই আইভীর জয় হবে।

আইভীর নির্বাচন পরিচালনা কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক ও আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদ সদস্য আনিসুর রহমান দিপু বলেন, পুলিশ তার কাজ করছে। যারা নির্বাচনে সহিংসতা করতে পারে, তাদের ব্যাপারে খোঁজখবর নেবেই।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com