রাজনীতি

ক্ষমতা রাজনীতিকদের হাতে থাকছে না কেন

প্রকাশ: ১২ জানুয়ারি ২২ । ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

রাজনীতিকদেরই ভালো জানার কথা- রাষ্ট্রের ওপর আসল কর্তৃত্ব কার। কর্তৃত্ব জনগণের হওয়ারই কথা। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র; তার মালিকানা জনগণের হবে- এটাই প্রতিশ্রুতি। কিন্তু তা হয়নি। রাষ্ট্র এ যুগে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান অন্য যে কোনো সময়ের তুলনায়। রবীন্দ্রনাথের উপমাটি খুব সুন্দর। কেবল উপমা নয়, আকাঙ্ক্ষাও। খুব ভালো হতো রাষ্ট্র যদি হতো ডিমের খোসার মতো। ডিমের খোসা খুবই জরুরি, যাকে ছাড়া ডিম চলে না। ভেতরের সারবস্তুকে ঘিরে রাখে, পাহারা দেয়। খোসা আছে বলেই ডিমের ভেতর প্রাণের জন্ম হয় ও নিরাপদ অস্তিত্ব জানা যায়। কিন্তু এমনিতে খোসার দাম কী? ডিম থেকে আলাদা করে ফেললে ডিমের খোসাকে কে মূল্য দেয়? রাষ্ট্র জনগণের জন্য প্রয়োজনীয়, কিন্তু জনগণের সেবকমাত্র, তার বেশি কিছু নয়। কিন্তু সেটা হয় না। রাষ্ট্র হয়ে দাঁড়ায় অন্তর্গত জনসাধারণের শাসক; তা সে পিতার মতো হোক কিংবা দৈত্যের মতো।

এ প্রশ্নও ওঠে- মালিক কে? এই যে পিতা কিংবা দৈত্য তার ওপর কর্তৃত্ব কার? রাজনীতিক অনেকেই আগে যা-ই মনে করে থাকুন কিংবা প্রকাশ্যে যা-ই বলুন না কেন, এখন অনেকেই স্বীকার করেন, রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব জনগণের হাতে নেই। যারা জনপ্রতিনিধি মনে করেন নিজেদের, তারাও মনে করেন, কর্তৃত্ব তাদের হাতে নেই। রয়েছে আমলাতন্ত্রের হাতে। কিছুদিন আগে জাতীয় সংসদে এ প্রসঙ্গে ব্যাপক হৈচৈ হয়ে গেল। তারপর সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন-বিশ্নেষণ, বুদ্ধিজীবীদের লেখার মাধ্যমে এর নানা ব্যাখ্যা হলো। কিন্তু বিষয়টি মিইয়ে যেতেও খুব সময় লাগল না। মনে পড়ছে, পাকিস্তানের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি ছিল কিছুটা ভিন্ন রকমের। ওখানেও সামনে রাজনীতিকরাই ছিলেন বটে, কিন্তু তাদের চেয়ে আমলাতন্ত্রের সদস্যরা ছিলেন শক্তিশালী। শাসন তো করত মূলত সামরিক ও বেসামরিক আমলারা।

বিপুল আত্মত্যাগের বিনিময়ে রাজনীতিকরাই পেলেন ক্ষমতা; কিন্তু ধরে রাখতে পারলেন না। কারণ রাজনীতিকরা সুসংগঠিত ছিলেন না। তাদের মধ্যে বিভেদ ছিল প্রবল। ভেতরে-বাইরে চাপ ও সমস্যা ছিল বহুবিধ। ভেঙে পড়েছিল অর্থনীতি, দেখা দিয়েছিল দুর্ভিক্ষ। এর পর তো অনেক কিছুই ঘটে গেল। স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘটল ভয়াবহ, মর্মন্তুদ ও বিয়োগান্ত ঘটনা। স্বাধীন দেশে রাজনীতি পথহারা হয়ে গেল।

দীর্ঘদিন এমনটি চলল নানা আবরণে, নানা কৌশলে। রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর স্বার্থান্বেষীদের ভর করে শাসন চলল। স্বাধীনতা লোক বদলাল ঠিকই, কিন্তু ব্যবস্থাপনা বদলাল না। ব্যবস্থাপনা না বদলিয়েই অবস্থা বদলের কথা চলল। সংবিধান নতুন ছিল, তবে তা ছিল গণতান্ত্রিক। কিন্তু সেই সংবিধানে অনেক কাটাছেঁড়া হলো। স্বাধীনতার অঙ্গীকার-প্রত্যয় অনেক কিছুই বিপন্ন-বিপর্যস্ত হলো।

এ দেশের জনগণ বরাবরই চেয়েছে সংসদীয় গণতন্ত্র। কিন্তু তা বারবার হোঁচট খেয়েছে স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকেই। দেশে এ পর্যন্ত সরকার বদল তো বহুবারই হলো। তাতে কি রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বে পরিবর্তন এসেছে? না, আসেনি। সরকার ও জনগণের মধ্যে দূরত্ব দেখা গেছে এবং ক্রমেই যেন তা বাড়ছে। এ জন্যই ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য কিংবা টিকে থাকার জন্য নানারকম বল প্রয়োগ ও অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর ভর করা হয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশে রাজনৈতিক সরকার বাদে দুর্ভাগ্যবশত সামরিক সরকারের শাসন এবং প্রয়োজনের তাগিদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শাসন; এর কোনোটাই তো আমাদের কাম্য ছিল না। কাম্য ছিল রাজনীতিকরাই দেশ চালাবেন।

রাজনীতি ও নির্বাচন স্বাধীন দেশে নানাভাবে কলুষিত হয়েছে ক্ষমতামুখী রাজনৈতিক দলগুলোর স্বার্থে। এ কারণেও জনগণ ও সরকারের মধ্যে দূরত্ব বেড়েছে ও বাড়ছে। জনগণ দূরেই থাকবে, যেমন তারা ছিল। রাষ্ট্রক্ষমতার বিন্যাস এমনই, জনসমর্থনের অভাব ঘটলেই যে সরকারের পতন ঘটবে, তা বলা যায় না। এমন দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে আছে। তবে পতন ঘটে তখন, যখন জনঅসন্তোষের পাশপাশি কিংবা তার সুযোগে সরকারের নিজের ঘরে অর্থাৎ ক্ষমতাসীন দলে বা আমলাতন্ত্রের ভেতর বিদ্রোহের লক্ষণ দেখা যায়।

দেশে স্থানীয় সরকারের নিম্নস্তর ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন চলছে। এর মধ্যে এই নির্বাচনের কয়েকটি ধাপ শেষ হয়েছে। বড় একটি রাজনৈতিক দল তাতে অংশ নিচ্ছে না। দেখা যাচ্ছে, ক্ষমতাসীন মহলের নেতৃত্ব দানকারী দলের মধ্যে চলছে গৃহদাহ এবং এর ভয়াবহ পরিণতি এখন পর্যন্ত শতাধিক মানুষের প্রাণহানি। এই নির্বাচনের আরও দুটি ধাপ বাকি। শেষ পর্যন্ত আরও কত কী ঘটে, তা বলা মুশকিল।

নির্বাচনের নিয়ামক শক্তি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশনের প্রধানসহ দায়িত্বশীল অনেকের। তারপরও বড় বিস্ময়কর অবস্থান ও প্রতিক্রিয়া। একজন কমিশনার যথার্থই বলেছেন- ভোটযুদ্ধে যুদ্ধ আছে, ভোট নেই। প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদা গণতন্ত্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ নির্বাচন ব্যবস্থাকে যে খাদের কিনারে নিয়ে গেলেন, তা গণতন্ত্র ও রাজনীতির জন্য ভয়াবহ অশনিসংকেত। অনেক আগেই জনআস্থা হারিয়েছে এই কমিশন। তবে এই ব্যবস্থায় ক্ষত সৃষ্টি হয়ে চলেছে আরও আগে থেকেই। বিদায়ী আরও কয়েকটি কমিশনও তা-ই করেছে। ক্রমেই ক্ষত গভীর হচ্ছে। দুর্ভাবনা এখানেই।

মনে রাখা দরকার, সব শুরুরই শেষ আছে এবং কোনো কোনো শেষ ভয়াবহও হয়ে ওঠে। এমন দৃষ্টান্তও স্বাধীন বাংলাদেশে আছে। রাজনীতি হয়ে পড়েছে বাণিজ্যনির্ভর- এ কথাও এখন বহুল উচ্চারিত। রাজনীতিক অনেকেই নিজেদের ভাবমূর্তি তো উজ্জ্বল করতে পারেনইনি, বরং এমন সব ক্ষত সৃষ্টি করেছেন, যেগুলোর উপশম সহজে হওয়ার নয়, যূথবদ্ধ সমাজ ও রাজনীতির গতিধারা পরিবর্তনের আন্দোলন ছাড়া।

একটা কথা প্রাসঙ্গিক মনে হয়- বুদ্ধির চোখ আছে, সে দেখতে পায়; রাজনৈতিক নেতারা যেমন পান। কিন্তু বুদ্ধি হচ্ছে খোঁড়া, সে যে নিজে নিজে চলবে, তা পারে না। সে জন্য তাকে সওয়ার হতে হয় ইচ্ছাশক্তির কাঁধে। ইচ্ছাশক্তির পা আছে কিন্তু চোখ নেই। জনগণের ওই দশা, সে চলতে পারে; পা আছে কিন্তু পথ চেনে না। তার কাঁধে বসে যে নেতৃত্ব, সে-ই তাকে চালায় নিজের স্বার্থ অনুযায়ী।

জনগণ রাষ্ট্রক্ষমতার দিকে এগোতে পারে না; পারেনি। তার প্রয়োজন দৃষ্টিশক্তির। এই শক্তি বুদ্ধিজীবীরা দিতে পারেন, যদি তারা জনগণের স্বার্থকে নিজের স্বার্থের সঙ্গে এক করে নিতে পারেন। কিন্তু বাংলাদেশে তাও হয়নি। বুদ্ধিজীবী অনেকে নিজের স্বার্থই দেখেছেন। জনগণ মালিক হতে পারছে না তাদের রাষ্ট্রের, যে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য তারা মূল্য দিয়েছেন অপরিসীম। সমাজ, অর্থনীতি, সংস্কৃতিতে এমন ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়নি, যার ফলে জাতীয়তাবাদী ঐক্য দৃঢ় হবে। স্বাধীনতা সব মানুষকে মুক্তি দেয়নি- এই সত্য আমরা কি এড়াতে পারি?

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী আমরা উদযাপন করলাম গত বছর। ৫০ বছর একটি জাতির জন্য তো কম সময় নয়। মনে রাখা দরকার, স্বাধীনতা ক্রয়ের ব্যাপার নয়; চূড়ান্ত বিচারে অর্জনেরও নয়। স্বাধীনতা আসলে গড়ে তোলার বিষয়। নিচ থেকে ধাপে ধাপে গড়ে তুলতে হয়। সে কাজে কি আমরা নিযুক্ত রয়েছি? বৈষম্যের ছায়া ক্রমেই গাঢ় ও বিস্তৃত হচ্ছে। রাষ্ট্র ভেঙেছে কিন্তু শ্রেণি ভাঙেনি। গণতন্ত্রের কথা সবাই বলছেন। গণতন্ত্রের প্রধান কথা অধিকার ও সুযোগের সাম্য। আত্মজিজ্ঞাসা প্রয়োজন, তা কি নিশ্চিত করা গেছে?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী :ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com