প্রতিবেশী

ভারতে সাম্প্রদায়িক উস্কানির ফাঁদ

প্রকাশ: ১৩ জানুয়ারি ২২ । ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রণেশ মৈত্র

এই কি মহাত্মা গান্ধীর ভারত? পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর ভারত? মওলানা আজাদ, খুদিরাম, কমরেড মোজাফ্‌ফর আহ্‌মদ, শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর ভারত? উগ্র সাম্প্রদায়িক দল বিজেপির আমলে বদলে গেছে ভারত। এ ভারত অন্য ভারত। অন্ধকার ডেকে আনা ভারত। রক্তের হোলিখেলার উস্কানি দেওয়ার ভারত। চলছে একবিংশ শতাব্দী। নতুন নতুন আবিস্কার, জ্ঞান-বিজ্ঞান প্রসারের নব নব আবিস্কারের শতাব্দী। নতুন সভ্যতা দুনিয়াব্যাপী গড়ে তোলার শতাব্দী। কিন্তু কী বিস্ময়! গত ২৫ ডিসেম্বর কলকাতা থেকে প্রকাশিত দৈনিক গণশক্তি এবং অন্যান্য পত্রিকা ও বাংলাদেশের প্রায় সব পত্রিকায় প্রকাশিত একটি খবরে কোনো সভ্য মানুষেরই উদ্বিগ্ন না হওয়াটাই যেন অস্বাভাবিক।

ভারতের হরিদ্বারে গত সপ্তাহে আয়োজিত 'ধর্ম সংসদ'-এর সভা ও ভাষণের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই এর বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। রুদ্ধদ্বার ওই বৈঠকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে সহিংস ভাষণ দেওয়ার পাশাপাশি খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের বড়দিনের অনুষ্ঠান ঠেকানোর আহ্বান জানানো হয়। সভা ডেকে মিয়ানমারের দৃষ্টান্ত অনুসরণের মাধ্যমে মুসলিম গণহত্যার ডাক দেন উপস্থিত হিন্দুত্ববাদী নেতারা। এ ছাড়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংকে গুনে

গুনে ছয়টি গুলি করার আকাঙ্ক্ষার কথাও বলা হয়েছে ওই ভিডিওতে। বিতর্কিত ধর্মগুরু যতি নরসিংহাসন্দের আয়োজনে ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন হিন্দুত্ব রক্ষা সেনার সভাপতি স্বামী প্রেমানন্দ গিরি, স্বামী আনন্দস্বরূপ, সাধ্বী অন্নপূর্ণা, বিজেপির নারী মোর্চার নেত্রী উদিতা ত্যাগী, বিজেপি নেতা অশ্বিনী উপাধ্যায়সহ দলের বেশ কয়েকজন প্রতিনিধি।

ধর্মীয় সম্মেলনে উগ্র ও সহিংস ভাষণের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন ভারতের রাজনৈতিক দল তৃণমূল কংগ্রেসের মুখপাত্র সাকেত গোখলে। এ ঘটনায় ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপি।

উত্তরাখণ্ডের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী হরিস রাওয়াত এই ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বলেন, 'এমন বক্তব্য নিন্দনীয় ও আপত্তিকর।' এই ঘটনায় কেন কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না, তা জানতে চেয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উঠেছে সমালোচনার ঝড়। ইতোমধ্যে এই ঘটনা নিয়ে হরিদ্বার পুলিশ স্টেশনে অভিযোগ করা হয়েছে। পুলিশ পুলিশি কায়দায় জানিয়েছে, নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের উস্কানিমূলক বক্তব্য উঠে এসেছে ভিডিওতে। তা নিয়ে অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্তে নামছে পুলিশ। এ খবরে যে কোনো দেশের যে কোনো সভ্য মানুষই ভয়ংকরভাবে ক্ষুব্ধ ও বিস্মিত হবেন। ভারতের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ভারতে বিজেপি আমলে এমন হুঙ্কার নতুন নয়। প্রথম ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকেই বিজেপি ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি শুরু করেছিল। তারা যে সংবিধান রক্ষা, ধর্মনিরপেক্ষতা রক্ষা, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার সমঅধিকার নিশ্চিত করা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার যে শপথ গ্রহণ করে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিল, তা নির্বিবাদে ভঙ্গ করে চলেছে।

মিয়ানমারে অত্যাচার-নির্যাতন করে লাখ লাখ মুসলমানকে দেশ ছাড়াতে বাধ্য করায় সে দেশের সামরিক ও উগ্র ধর্মান্ধ বৌদ্ধ পরিচালনারত সরকার আজ বিশ্বের সর্বত্র ঘৃণিত ও নিন্দিত। জাতিসংঘসহ পৃথিবীর বহু দেশের সরকার দেশত্যাগী মিয়ানমারের লাখ লাখ মুসলিমকে দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার দাবি জানাচ্ছে। বহু দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা অর্থ, ওষুধ ও অন্যান্য সহযোগিতা পাঠাচ্ছে মিয়ানমারের বিতাড়িত মুসলিমদের জন্য।

কিন্তু ভারত থেকে এমন আওয়াজ তোলা ও হুমকি দেওয়ার নিন্দার ভাষা নেই। হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টানসহ সব ধর্মে বিশ্বাসী মানুষ সেখানে পরিপূর্ণ অধিকার নিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে বাস করবেন- এটাই শান্তিপ্রিয় ও শুভবোধ সম্পন্ন সবার কাম্য। শান্তি-সম্প্রীতি বিনষ্টকারীরা কী জানে না, ভারতের সংবিধান অনুযায়ী পার্লামেন্টে ভোটে নির্বাচিত বৃহত্তম দলের পক্ষ থেকে মনোনীতি বা নির্বাচিত সংসদ সদস্য প্রধানমন্ত্রী হবেন তা তিনি হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান যে-ই হোন না কেন। ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে এখনও বিপুলসংখ্যক হিন্দু জনপ্রতিনিধি মুসলিম ভোটে নির্বাচিত হচ্ছেন। ভারতে অন্তত দু'জন জনপ্রিয় মুসলিম ব্যক্তিত্ব রাষ্ট্রপতির আসনে অধিষ্ঠিত হয়ে অত্যন্ত সুন্দরভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তারাও ছিলেন প্রথম শ্রেণির দেশপ্রেমিক।

যারাই সাম্প্রদায়িক হুমকি দেবেন বা সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ছড়াবেন, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ঘটাবেন, তারাই সভ্যতা, মানবতা ও গণতন্ত্রের দুশমন। ভারতে সাম্প্রদায়িক উস্কানির যতই ফাঁদ পাতা থাকুক এর প্রভাব যেন বাংলাদেশে না পড়ে। ওই সভায় যারা এ রকম কথাবার্তা বলেছেন, তাদের দ্রুত আইনের আওতায় নিয়ে কঠোর দণ্ড নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আরও প্রয়োজন ভারতসহ সর্বত্র ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক শক্তির যূথবদ্ধতা। তা না হলে বিশ্ব আরেক মহাবিপর্যয়ের মধ্যে পড়বে।

রণেশ মৈত্র: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনীতিক

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com