তুমুল গাঢ সমাচার

বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র: বাহাত্তরের সংবিধান ও সমতামুখী সমাজের আকাঙ্ক্ষা

ধারাবাহিক

প্রকাশ: ১৪ জানুয়ারি ২২ । ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিনায়ক সেন

পর্ব ::১০৫

[পূর্বে প্রকাশিতের পর]

নিষ্ঠুরতার কথা যেহেতু উঠলই, সেহেতু এ কথাও বলা উচিত যে এ ক্ষেত্রে আমরা অনেক দেশকে ছাড়িয়ে গেছি। চিলিতে সালভাদর আয়েন্দে মিলিটারি ক্যুতে নিহত হয়েছেন। কিন্তু তার পরিবার-পরিজন, সন্তান-সন্ততিকে খুন করা হয়নি। একই কথা খাটে প্যাট্রিস লুমুম্বা, ইন্দিরা গান্ধী, জুলফিকার আলী ভুট্টো প্রমুখের ক্ষেত্রে। তারাও অন্যায় এবং অস্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করেছেন, কিন্তু সেজন্য তার পরিবার-পরিজনকে মৃত্যুবরণ করতে হয়নি। এমন যে নির্দয় স্টালিন নির্বিচারে [বা কখনও প্রহসনের বিচার অনুষ্ঠান করে] তার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের একের পর এক সরিয়ে দিচ্ছিলেন তিনিও সপরিবারে নিধনযজ্ঞে সায় দেননি। একে একে মারা গিয়েছিলেন জিনোভিয়েভ, কামেনেভ, রাদেক, পিতাকভ, বুখারিন গত শতকের তিরিশের দশকে। ট্রটস্কিও নিহত হলেন ১৯৪০ সালে মেক্সিকোয় আততায়ীর হাতে। এসব কোনো ক্ষেত্রেই যারা নিহত হলেন অন্যায়ভাবে বা আইনবহির্ভূতভাবে, তাদের পরিবারবর্গকে কিন্তু নিশ্চিহ্ন করা হয়নি। তৃতীয় বিশ্বের বর্বরতম স্বৈরশাসকরা তথা সামরিক অভ্যুত্থানকারীরা প্রায় কখনোই পরিবারবর্গের ওপরে চড়াও হয়নি। কেবল শেখ মুজিবের বেলায় এর ব্যতিক্রম হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকে শুধু নয়, তার নিকটতম পরিবারের প্রায় সবাইকে ১৫ আগস্টের সেই নিষ্ঠুরতম রাতে হত্যা করা হয়েছে; যার নিকটতম তুলনা আধুনিককালে আমি সহসা কোথাও খুঁজে পাই না। এই নিষ্ঠুর বর্বরতার কারণ কী, উৎস কী, ব্যাখ্যা কী এ প্রশ্ন তোলাই যায়। তবে এটুকু বলতে পারি, ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের পর (আমি এর সাথে ৩ নভেম্বরের জেল-হত্যাকাণ্ডকেও যোগ করব) বাঙালি জাতি আর নিজেকে নিরপরাধ বলে দাবি করতে পারবে না। 'নিরপরাধ' শব্দটি আমি বিশেষ অর্থে ব্যবহার করছি এখানে। বোধকরি দার্শনিক হান্নাহ্‌ আরেন্ডের একটি উক্তি ছিল যে হলোকাস্টের পর মানবজাতির কেউই আর নিরপরাধ দাবি করতে পারে না- যেন সবারই হাতে লেগে আছে অদৃশ্য রক্তের দাগ। এই অমোচনীয় অপরাধবোধ সব সময় আমাদের তাড়া করে ফিরবে।

বাকশাল কর্মসূচির পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন সম্ভব নয় মূলত দুই কারণে। প্রথমত, কর্মসূচিটিই বাস্তবায়ন করা যায়নি ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে। শুধু বাস্তবায়নের আয়োজন বা প্রাকপ্রস্তুতি চলছিল সে সময়ে। প্রশাসনিক সংস্কারের প্রাথমিক পদক্ষেপ সবেমাত্র নেওয়া হয়েছিল। প্রতিটি জেলায় নিরীক্ষামূলক বহুমুখী অর্থনৈতিক সমবায় করার দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল- এর বেশি কিছু নয়। কালক্রমে এই কর্মসূচির সব উপাদান জড়ো হতো, পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়িত হতো, তখন মূল্যায়নের বা কোনো দিক বদলানোর প্রয়োজন দেখা দিলে তা করা হতে পারত। কিন্তু সেই পর্যন্ত ঘটনা গড়াতেই পারেনি। এ ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু সবগুলো কার্ড খোলা রেখেছিলেন। নিরীক্ষা সফল হলে মডেলটিকে সর্বত্র ছড়িয়ে দেওয়া; আর ব্যর্থ হলে, নতুন আঙ্গিকে পুনরায় যাত্রা শুরু করা। তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রকে বঙ্গবন্ধু 'নিরীক্ষাধর্মী রাষ্ট্র' হিসেবেই পূর্বাপর দেখেছিলেন। দ্বিতীয় যে কারণে বাকশাল কর্মসূচির মূল্যায়ন জটিল হয়ে পড়ে তা হলো এর সূচনা পর্বের আকর-উপাদানের অপ্রতুলতা। তৃতীয় বিশ্বের জাতিসমূহ আর্কাইভ-ভিত্তিক ইতিহাস বোঝে না এবং আর্কাইভ-ভিত্তিক ইতিহাস সংরক্ষণে যত্নবান নয়। উদাহরণত, ১৯৭২ সালের গণপরিষদের তরফে যে ৩১-সদস্যবিশিষ্ট ড্রাফটিং কমিটি করা হয়েছিল তার 'সভা বিবরণী' বা মিনিটস্‌ সংরক্ষিত হয়নি। সংবিধানের খসড়ার ওপরে যে ৯৮টি সংশোধনী প্রস্তাব গণপরিষদের বাইরের থেকে 'জনগণের পক্ষ থেকে' এসেছিল তারও কোনো তালিকা নেই। সেসব সংশোধনী কী নিয়ে ছিল তাও এখন জানার উপায় নেই। একমাত্র ভরসা পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত 'সম্পাদকের কাছে চিঠি' বা কোনো দল বা সংগঠনের তরফে প্রদত্ত বিবৃতি। কিন্তু তার থেকে কেবল আঁচ করা চলে, আর্কাইভিস্টের প্রয়োজন তাতে করে মেটে না। এ কথা বিশেষভাবে প্রযোজ্য বাকশালের ক্ষেত্রে। বাকশালের কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় কে কী বলেছিলেন তা যেমন জানা যায়নি, বঙ্গবন্ধু কীভাবে কোন বিশেষ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন বা কাদের সাথে আলোচনা করেছিলেন তারও কোনো বিবরণ রক্ষিত হয়নি। কোনো প্রাসঙ্গিক ডকুমেন্ট মহাফেজখানায় পরে গিয়ে থাকলেও তা আজকের দিনে 'দেখার' অধিকার নিতান্ত সংকুচিত। এ কথা খাটে সত্তর-আশি বা নব্বইয়ের দশকের রাষ্ট্রব্যবস্থার ক্ষেত্রেও। সরকারি দলিলপত্রের হয়তো কোথাও 'সংগ্রহ' বা 'সঞ্চয়ন' ঘটেছে, কিন্তু সেই অদৃশ্য আর্কাইভে গবেষকের প্রবেশাধিকার নেই বা অত্যন্ত সীমিত।

এসব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বাকশাল কর্মসূচির নানা দিকের আলোচনা আজকের যুগের পরিপ্রেক্ষিতে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। প্রথমত, আগেই বলেছি, এর পেছনের প্রধান প্রণোদনা ছিল অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার। একটি বৈরী পরিস্থিতির থেকে অর্থনীতির গেড়ে যাওয়া চাকাকে টেনে ওপরে তোলা। অর্থনীতিকে এবং এর সম্পর্কিত প্রশাসনকে সক্রিয় করার জন্য একটা 'শক থেরাপির' দরকার ছিল। এ ক্ষেত্রে অবস্থার দুর্বিপাক বোঝাতে এক দক্ষিণপন্থি সমালোচকের দ্বারস্থ হচ্ছি। বাকশাল প্রবর্তনের প্রায় এক বছর আগে ১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে 'মঞ্চে- নেপথ্যে' উপসম্পাদকীয়তে লেখক দেশের প্রশাসনিক পরিস্থিতির বর্ণনা দিচ্ছেন। এতে অতিশয়োক্তি থাকতে পারে, কিন্তু পরিস্থিতি তখন ক্রমশ অ-শাসনযোগ্য হয়ে উঠেছিল, তা অনুমান করা যায়। পুরো উদ্ধৃতিটি নিচে তুলে ধরতে চাই :

'অনেকেই আজকাল বলেন, শুধু অর্থনীতিই ভাঙ্গিয়া পড়িতেছে না, শুধু রাজনীতিই বারুদের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হইয়া উঠিতেছে না, শুধু আইনের শাসনই অপস্রিয়মাণ হইয়া পড়িতেছে না, প্রশাসনও আজ বিপর্যস্ত, ভগ্নোন্মুখ। প্রশাসনযন্ত্রের ভাঙ্গিয়া পড়ার দশা দেখা দিয়া থাকুক আর না-থাকুক, এর গতি যে নিদারুণভাবে শ্নথ হইয়া উঠিয়াছে, এর ইনিশিয়েটিভ বা উদ্যোগের যে অনেকখানি অভাব দেখা দিয়াছে, তাহাতে কোন সন্দেহ নাই। যেন একটা স্ট্যাগনেশন বা আবদ্ধতা প্রশাসন যন্ত্রকে ঘিরিয়া ধরিয়াছে, সেই বেড়া হইতে উহা বাহির হইয়া আসিতে পারিতেছে না। ... এক সহযোগী হিসাব করিয়া দেখাইয়াছেন যে, সচিবালয়ে যে ক্ষেত্রে সপ্তাহে অন্তত সাড়ে একচল্লিশ ঘণ্টা কাজকর্ম হওয়ার কথা, সে ক্ষেত্রে কাজের কাজ হয় মাত্র সাড়ে ষোল ঘণ্টা। বাকি পঁচিশ ঘণ্টাই ফাও। কর্মকর্তারা আসেন দেরিতে, যান সকাল-সকাল। দুই দিক দিয়াই তো আর তাহারা অ-সময়নিষ্ঠ হইতে পারেন না! কোর্ট কাচারিতে শুনি কয়েক লাখ পেন্ডিং কেস। এর পিছনে না-হয় বোধগম্য কারণ আছে- প্রয়োজনের অর্ধেকও জজ-ম্যাজিস্ট্রেট নাই। কিন্তু প্রশাসনের আপিসে আপিসে কেন শত-সহস্র পেন্ডিং ফাইল? কেন ফাইলের মুভমেন্ট এত ধীর-মন্থর? কেন ডিসিশনে এত দীর্ঘসূত্রতা? জজ-ম্যাজিস্ট্রেটের না-হয় নিদারুণ অভাব আছে, কিন্তু অফিসার-কর্মচারীর তো কোনো অভাব নাই? এইটুকু দেশে শুনিয়াছি, কর্মচারী-কর্মকর্তার সংখ্যা বাড়িয়া সাড়ে ছয় লাখ ছাড়াইয়া গিয়াছে। রাজস্বের সিংহভাগ ব্যয় হইতেছে অফিসার পুষিতে। তবু কেন কাজ হয় না? গলদ কোথায়? ... সত্য কথা বলিতে কি, সরকারি কর্মচারীরা আজ অনেকখানি নিরুদ্যম, নিরুৎসাহ, বোধ করি, কিছুটা অসন্তুষ্টও। টোকা দিয়া দেখুন, তন্ত্রীতে যে সুর বাজে সে-সুর খুব মধুর নয়। প্রত্যেকের কি যেন একটা ক্ষোভ, আক্ষেপ, অসন্তোষ অভিযোগ। ... কেন এই উদ্যম-উৎসাহের অভাব? আর এটা তো শুধু প্রশাসনেই নয়, রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পে এবং গোটা পাবলিক সেক্টরেও একই অবস্থা। সেখানেও কর্মোদ্যমের অভাব, উদ্যোগ ইনিশিয়েটিভের অভাব। কলকারখানা পা খোঁড়াইয়া খোঁড়াইয়া চলিতেছে। চলিতেছে উৎপাদন হ্রাস। কোম্পানির মাল দরিয়ায় ঢালা হইতেছে। লোকসান আর ওভার-ড্রাফটের বোঝা স্টম্ফীত হইতেছে। রাষ্ট্রীয় ভর্তুকির ব্লাড-ট্রান্সফ্যুশন দিয়া চলিতেছে পাবলিক সেক্টরের এই রক্তশূন্য রোগীকে বাঁচাইয়া রাখার চেষ্টা। আর মাঝে মাঝে দেওয়া চলিতেছে, বঙ্গবন্ধুর সারপ্রাইজ ভিজিটের শক-থিরাপি। কোথায় পাটকলে ভিজা পাট, পোড়া পাট চালানো হইতেছে, কোথায় চলিয়াছে পিলফারেজ-পাচার, কোথায় 'নো-ম্যান্স-ল্যান্ডে' লাখ লাখ টাকার আমদানি করা কাপড় খোলা জায়গায় পড়িয়া পচিতেছে, তাহা ধরার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে হেলিকপ্টারে ছোটাছুটি করিতে হইতেছে। প্রশাসন কোন পর্যায়ে নামিয়া আসিলে এসব ঘটনা ঘটিতে পারে এবং এসব বিষয় লইয়া দেশের প্রধানমন্ত্রীকে ছোটাছুটি করিতে হয়, তাহা সহজেই অনুমেয়।' বাকশাল কর্মসূচি প্রবর্তনের প্রাক্কালে এই পরিস্থিতির আরও অবনমন ঘটেছিল।

দ্বিতীয়ত, বঙ্গবন্ধুর সমতামুখী সমাজের ভাবনা বাকশাল কর্মসূচিতেও বিধৃত হতে দেখি। বাকশালকে তিনি 'শোষিতের গণতন্ত্র' বলেছিলেন, যার প্রথম উচ্চারণ শুনতে পাই ১৯৭২ সালে সংবিধান গ্রহণের সময় মুজিবের ভাষণে। তিনি সেদিন যা বলেছিলেন তা 'বুর্জোয়া গণতন্ত্রের' সীমা-পরিসীমা ছাড়িয়ে যায়। বাকশাল ব্যবস্থায় বিকেন্দ্রীভবন ও এক অভিন্ন রাজনৈতিক জোটের নতুনতর সংজ্ঞার দিকে অগ্রসর হওয়ার প্রচেষ্টা ছিল। যে-অর্থে আজকের দিনেও গণচীন বা ভিয়েতনাম বুর্জোয়া-গণতন্ত্রকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে চলেছে, বঙ্গবন্ধুর বাকশাল করে সে রকম জনকল্যাণের পথে এগুতে চেয়েছিলেন। আগেই বলেছি, সেই পাশ কাটানোও ছিল সাময়িক সময়ের জন্য। ১৯৭২ সালে 'শোষিতের গণতন্ত্র' নিয়ে বঙ্গবন্ধু যা বলেছিলেন ১৯৭৫ সালে বাকশালের তাত্ত্বিক পটভূমি হিসেবে সেই কথাগুলোকে আবারও স্মরণ করতে হবে। গরিবের জন্য কল্যাণকর আর বড়লোকের জন্য কল্যাণকর গণতন্ত্র সমার্থক গণতন্ত্র নয়। তিনি বলেছিলেন :

'দ্বিতীয় কথা, আমরা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি। গণতন্ত্র সেই গণতন্ত্র, যা সাধারণ মানুষের কল্যাণ সাধন করে থাকে। মানুষের একটা ধারণা এবং আগেও আমরা দেখেছি যে, গণতন্ত্র যেসব দেশে চলেছে দেখা যায় সেসব দেশে গণতন্ত্র পুঁজিপতিদের protection দেওয়ার জন্য কাজ করে এবং সেখানে শোষকদের রক্ষা করার জন্যই গণতন্ত্র ব্যবহার করা হয়। সে গণতন্ত্রে আমরা বিশ্বাস করি না। আমরা চাই শোষিতের গণতন্ত্র এবং সেই শোষিতের গণতন্ত্রের অর্থ হলো, আমার দেশে যে গণতন্ত্রের বিধিলিপি আছে, তাতে যে সব provision করা হয়েছে, যাতে এ দেশের দুঃখী মানুষ protection পায়, তার জন্য বন্দোবস্ত আছে- ঐ শোষকরা যাতে protection পায়, তার ব্যবস্থা নাই। সেজন্য আমাদের গণতন্ত্রের সঙ্গে অন্যের পার্থক্য আছে। সেটা আইনের অনেক schedule-এ রাখা হয়েছে, অনেক বিলে রাখা হয়েছে, সে সম্বন্ধে আপনিও জানেন। অনেক আলোচনা হয়েছে যে, কারও সম্পত্তি কেউ নিতে পারবে না। সুতরাং নিশ্চয়ই আমরা কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে হাত দিচ্ছি না। কিন্তু যে চক্র দিয়ে মানুষকে শোষণ করা হয়, সেই চক্রকে আমরা জনগণের জন্য ব্যবহার করতে চাই। তার জন্য আমরা প্রথমেই ব্যাংক, ইনসিওরেন্স-কোম্পানি, কাপড়ের কল, জুট-মিল, সুগার ইন্ডাস্ট্রি সবকিছু জাতীয়করণ করে ফেলেছি তার মানে হলো, শোষক-গোষ্ঠী যাতে এই গণতন্ত্র ব্যবহার করতে না পারে। শোষিতকে রক্ষা করার জন্য এই গণতন্ত্র ব্যবহার করা হবে। সেজন্য এখানের গণতন্ত্রের, আমাদের সংজ্ঞার সঙ্গে অন্য অনেকের সংজ্ঞার পার্থক্য হতে পারে। তৃতীয়- সমাজতন্ত্র। আমরা সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করি এবং বিশ্বাস করি বলেই আমরা এগুলি জাতীয়করণ করেছি। যারা বলে থাকেন, সমাজতন্ত্র হলো না, সমাজতন্ত্র হলো না; তাদের আগে বোঝা উচিত, সমাজতন্ত্র কী। সমাজতন্ত্রের জন্মভূমি সোভিয়েত রাশিয়ায় ৫০ বছর পার হয়ে গেল অথচ এখনও তারা সমাজতন্ত্র বুঝতে পারে নাই। সমাজতন্ত্র গাছের ফল না- অমনি চেখে খাওয়া যায় না। সমাজতন্ত্র বুঝতে অনেক দিনের প্রয়োজন, অনেক পথ অতিক্রম করতে হয়। সেই পথ বন্ধুরও হয়। সেই পথ অতিক্রম করে সমাজতন্ত্রে পৌঁছানো যায়।'

আবারও দেখতে পাচ্ছি, 'শোষিতের গণতন্ত্র' সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু অর্থনৈতিক মুক্তির দিকে বিশেষভাবে নজর দিচ্ছেন। এই শোষণমুক্ত 'শোষিতের গণতন্ত্র' গড়ার সুরই বাকশালেরও প্রধান প্রেরণা। আপাতদৃষ্টিতে এর রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে 'একদলীয়' মনে হতে পারে, কিন্তু সেটা শুধু সাময়িক সময়ের জন্য। এ রকম ব্যবস্থার প্রবর্তন করে সুস্থিরতা ফিরে এলে তিনি আবার ফিরে যেতে যান বহুদলীয় বিকেন্দ্রীভূত মানবিক সমাজতন্ত্রে। লেনিনীয় নিক্তিতে বলতে হয়, বাকশাল ছিল একটি সাময়িক জরুরি অবস্থা- 'ওয়ার কমিউনিজমের' পর্ব। এই পর্ব থেকে রাশিয়াকে বেরিয়ে যেতে তিন বছর সময় লেগেছিল। বাংলাদেশেও তেমন একটা বিরতির প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। বিভিন্ন উন্নয়নকামী দেশের ক্ষেত্রেই একপর্যায়ে এ রকম 'জরুরি পর্বের' প্রয়োজন দেখা দেয়।

[ক্রমশ]

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com