গল্প

দুপায়ের দুনিয়া

প্রকাশ: ১৪ জানুয়ারি ২২ । ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

জয়দীপ দে

নভেম্বর ১৯৪৭, ঢাকা।

বিকেলবেলা হাঁটতে বের হন সিদ্দিক সাহেব। সারাজীবন চাকরিবাকরি করেছেন। পয়সা বাঁচাতে মাইলকে মাইল হেঁটেছেন। এখন ঘরে বসে থাকতে অস্বস্তি লাগে। আবার নতুন শহর, বের হতেও ভয় হয়। কলকাতায় থাকতে পত্রিকায় নিয়মিত ঢাকার দাঙ্গার খবর দেখা যেত। ঢাকার দাঙ্গার বৈশিষ্ট্য হলো এখানে কোপাকুপি নেই। দলবেঁধে কেউ আসবেও না। ঘাতক সামনে এসে চুপিসারে পকেট থেকে ছোট্ট একটা টিপ-ছুরি বের করে বসিয়ে দেবে পেটে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে ভ্যানিশ। ফলে কে দাঙ্গাবাজ আর কে ভালো, বোঝা মুশকিল। এখনও ঢাকা শহরে প্রচুর হিন্দু। আগে এরাই সংখ্যায় বেশি ছিল। ইউপি, বিহার থেকে মোহাজেররা আসার পর জনবিন্যাস পাল্টে যাচ্ছে। চারদিকে বস্তি বানিয়ে তারা আধিপত্য বিস্তার করছে। তার পরও দোকানপাট বাসাবাড়ি হিন্দুদেরই বেশি। বিশেষ করে নবাবপুরের রাস্তা ধরে সদরঘাটের দিকে যেতে থাকলে মনে হয় কলকাতায় আছি।

ব্যারাকের বিভিন্ন লোকের সঙ্গে সিদ্দিকের আলাপ হয়। তারাও তাকে হিন্দুপ্রধান এলাকা এড়িয়ে চলতে বলেছে। বিশেষ করে কিছুদিন আগে জন্মাষ্টমীর র‌্যালি করা নিয়ে দু'পক্ষ মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছিল। পরিস্থিতি সামাল দিতে ১৫ দিন সারা শহরে কারফিউ দিয়ে রাখা হয়েছিল। যাক, শান্তিমতো পূজা ও বকরি ঈদ গেছে। কোনো গণ্ডগোল হয়নি। জন্মাষ্টমীর র‌্যালি হলো না; কিন্তু ঈদের পর ঠিকই মিছিল বেরোল। সিদ্দিকের কাছে এসব হিপোক্রেসি মনে হয়।

যাই হোক। সিদ্দিক তার প্রতিবেশী থেকে হিন্দু এলাকা সম্পর্কে একটা ধারণা নিয়েছেন। ফুলবাড়িয়া রেলস্টেশন এলাকা পেরোলেই কাপ্তানবাজার, ওদিকটা পুরোপুরি হিন্দুদের এলাকা। আবার নবাবপুরের রাস্তা ধরে রায়সাহেব বাজারের পুল পর্যন্ত যেতে পারলে, ওর ওপারে আবার ঢাকার নবাবদের এলাকা। মুসলমানদের আধিপত্য। তাই আরমানিটোলা থেকে কাউকে রমনা যেতে হলে নবাবপুরের রাস্তা দিয়ে যাওয়ার উপায় নেই। যেতে হবে ইংলিশ রোড ধরে ঘুরে।

মজার ব্যাপার, সিদ্দিক নবাবপুর রাস্তা দিয়েই সরাসরি সদরঘাট যান। পথে বেশ কিছু মানুষের সঙ্গে পরিচয়ও হয়েছে। তাকে দেখলে 'সিদ্দিক ভাই' বলে হাত নাড়িয়ে সম্বোধন করে। সিদ্দিকের ভালো লাগে। এর মধ্যে ফরওয়ার্ড ব্লক করা দুই বৃদ্ধের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব হয়েছে। নবীন আর নিতুনবাবু। তাদের একটা ডিসপেনসারি আছে রথখোলা মোড়ে। পলাশী থেকে আড়াই মাইলের মতো পথ। এখন এত হাঁটা শরীরে সয় না। রিকশা বা ঘোড়ার গাড়িতে চড়ারও পয়সা নেই। তাই নিয়মিত আসা হয় না। দুপুরের খাবারের পর কে সি বিশ্বাসের ছাতিটা মাথা দিয়ে গুটি গুটি পায়ে রওনা দেন। ঝকঝকে নীল আকাশে ওড়ে বেরায় রংবেরঙের অসংখ্য ঘুড়ি। বাতাসে জল কমে এসেছে। ঠোঁটমুখ টানে। নাকে শুধু বালু বালু গন্ধ লাগে। সিদ্দিক কাঁধে ভাঁজ করে রাখা চাদরটি ঠিক করতে করতে আকাশে রঙের খেলা দেখেন। এটা ঢাকার ঐতিহ্য। পৌষসংক্রান্তিতে নাকি বড় অনুষ্ঠান হয়। সাকরাইন বলে এরা। দেখার ইচ্ছে আছে সিদ্দিকের।

নবীনবাবু পাস করা ডাক্তার। স্বদেশি আমলে প্রতিষ্ঠিত ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউটে পড়াশোনা করেছেন। এটার সরকারি অনুমোদন না থাকায় চাকরিবাকরি পাননি। লোকজন সরকারি মেডিকেল থেকে পাস করা ডাক্তারের মতো মূল্যায়ন করে না। তারপরও তার পসার একবারে কম নয়। রোগী লেগে থাকে। রোগীরা সব স্থানীয়। তার চেনাজানা। ভিজিট দিলেও কথা নেই, না দিলেও। তাদের মূল লক্ষ্য ওষুধ বিক্রি। সেটা বেশ ভালোই হয়।

নিতুনবাবু ফার্মেসি দেখেন। শখ হলো পুরোনো ধর্মগ্রন্থ পড়া আর সংগ্রহে রাখা। কিন্তু ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের প্রতি আস্থা নেই। ভদ্রলোকের এই বৈপরীত্য উপভোগ করেন সিদ্দিক। সিদ্দিক এলে দু'জনে মিলে বেরিয়ে পড়েন সদরঘাটের দিকে হাঁটার জন্য। অবশ্য সন্ধ্যার আগে আগেই ফিরে আসতে হয়। গভীর রাত পর্যন্ত ডিসপেনসারি খোলা থাকে। রথখোলা মোড়ে বড় একটা দুধমণ্ডি আছে। সেখানে দুধ দই মিষ্টি বিক্রি হয়। এরপরেই হচ্ছে কান্দুপট্টি। নগরীর বারাঙ্গনাদের আড্ডা। রাতেই এরা হাজির হয়ে বিভিন্ন জিনিসের প্রয়োজনে। হাঁটা থেকে ফিরলে মরণচাঁদের ঘন দইয়ের দুটো ভাঁড় নিয়ে আসে নিতুনবাবুর ছেলে। সিদ্দিক আর নিতুনবাবু ধীরেসুস্থে খান আর গল্প করেন।

বিকেলে হাঁটার সময় রাজ্যের গল্প হয়। শহরটা সম্পর্কে একটা ধারণা পান নিতুনবাবুর কাছ থেকে। অনেক সমৃদ্ধ একটা শহর। অনেক জ্ঞানীগুণী ব্যক্তি এখানে বড় হয়েছেন। বড়রা সব চলে যান কলকাতায়। শেষমেশ শহরটাকে কেউ আপন ভাবে না। নিতুনবাবু আফসোস করেন।

রথখোলা মোড় থেকে একটু এগুলেই মুকুল সিনেমা হল। উর্দু-হিন্দি সিনেমা চলে। লোকে গিজগিজ করে। এর পাশে ওকে রেস্টুরেন্ট। বড় বড় কাচের জানালা। তার পাশে ঢালাই লোহার নকশা করা ঝুলবারান্দা। একটা বনেদি ভাব আছে। সেখানেও মানুষের ভিড়। উল্টোদিকে কোর্ট-কাছারি। উকিল-মক্কেলরা রেস্টুরেন্টে বসে ফন্দিফিকির করে। সাক্ষী সাজায়। টাকার পুঁটলি হাতবদল হয়।

এই হট্টগোল পেরোলেই নিস্তরঙ্গ এক সাবেকি শহর। ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউটের পড়ো পড়ো ভবনের ওপর অত্যাচারী শাসকের মতো দাঁড়িয়ে আছে বট-পাকুড়ের গাছ। খসে পড়ছে পলেস্তারা। কাগজের বস্তা আর ভাঙা ফার্নিচারে বোঝাই ভবনটা। রাস্তা থেকেই কিছু আলামত পাওয়া যায়।

'শশাঙ্কবাবু হাজার টাকার সিভিল সার্জনের চাকরি ছেড়ে দিয়ে এই প্রতিষ্ঠানটি গড়েছিলেন। কেবল চাকরি মিলে না বলে কেউ আর পড়তে আসে না।'

'এখন তো আর ব্রিটিশ নাই।'

'ট্রাস্টিরা খাজা সাহেবের কাছে ধরনা দিচ্ছেন। দেখা যাক কী হয়।'

তখনই সেন্ট থমাস চার্চের বড় ঘড়িটা ঢংঢং করে চারবার বেজে ওঠে। সামনে বিশাল ফুলের বাগান নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা শ্বেতশুভ্র দালানটার কাছেই পাঁচ দিক থেকে পাঁচটি রাস্তা এসে মিশেছে। মোড় পেরুলেই ভিক্টোরিয়া পার্ক। পার্কের মন্যুমেন্ট দেখা যাচ্ছে। তার চারপাশে কোঁচানো ধুতি আর গিলে করা পাঞ্জাবি পরা বাবুরা বৈকালিক ভ্রমণে ব্যস্ত। চারদিকে স্কুল-কলেজ। পোগোজ, ইম্পেরিয়াল, কলেজিয়েট স্কুল, জগন্নাথ কলেজ। এ সময় এসবেরও ছুটি হয়। সাদা শার্ট-প্যান্ট পরা কিশোর যুবকরাও বেরিয়ে আসে। মনে হয় শুভ্র মানুষের মেলা বসেছে।

পার্কের পাশ দিয়ে একটু এগুলেই জগন্নাথ কলেজের ভিক্টোরিয়া স্থাপত্যরীতির বিশাল ভবন। বুকে চেতিয়ে মাথা টানাটান করে দাঁড়িয়ে আছে। এরপর বাংলাবাজার মোড়। ডাকঘরের বড় লাল ভবন। তার পাশে একটা ফুলবাগানে ঘেরা সুন্দর দোতলা বাড়ি। আরেকটু দূরে খ্রিষ্টানদের হোস্টেল। সবকিছু ছাপিয়ে এখানে নতুন বইয়ের গন্ধ। সঙ্গে মিষ্টি ধূপকাঠির ঘ্রাণ। ছাপাখানার আওয়াজ। ঘাটের কুলিদের হুড়োহুড়ি। পাইকারদের হাঁকডাক। এর মধ্যে নিতুনবাবু একবার অশুতোষ নইলে বৃন্দাবন লাইব্রেরির সামনে দাঁড়াবেন। প্রবাসী, ভারতবর্ষ, বসুমতি, ভারতী, মডার্ন রিভিউর সংখ্যাগুলো উলটেপালটে দেখবেন। দেশ-এর নতুন সংখ্যা এলেই লুফে নেবেন। সেখানে অজিত দত্তের 'মন পবনের নাও' নামে একটা ধারাবাহিক লেখা আসছে। সেটা তার পড়া চাই। অজিতবাবু ঢাকার ছেলে। নিতুনবাবুর বিশেষ পরিচিত। এখানেই ঢাকা ব্যাংকের চারতলা ভবন। তাতে লিফট লাগানো। পূর্ব বাংলার একমাত্র লিফট। লঞ্চে আসা গ্রামের লোকজন অবাক দৃষ্টিতে লিফটের ওঠানামা দেখে। বেশ আওয়াজ করে কলাপসিবল গেটটা খুলে। তারপর আরোহীরা ওঠে। গেট লেগে গেলে ঝমঝম আওয়াজ তুলে ধীরে ধীরে লিফটটা উঠে যায়। এরপর আর দেখা যায় না।

ওপাশে ব্রাহ্মসমাজের মন্দির। সেখানে দারুণ একটা লাইব্রেরি আছে। ধর্মীয় বইয়ের বিশাল সংগ্রহ। এরা নাকি সবধর্মের বই পড়ে। মর্মবাণী বোঝার চেষ্টা করে। এদেরই একজন গিরিশচন্দ্র সেন পবিত্র কোরআন অনুবাদ করেছেন। বাংলা কোরআন দেখার সৌভাগ্য সিদ্দিকের এখানেই প্রথম হয়েছিল। এখানে ধর্মীয় বইয়ের খোঁজে আসেন নিতুন। আবার নর্থব্রুক লাইব্রেরিতেও যান। সেটা বাকল্যান্ড বাঁধের ধারে। সেখানে মোটা মোটা সব ইংরেজি বই। চামড়ায় বাঁধানো। ইংল্যান্ড থেকে জাহাজে আনা।

ঝলমলে বাংলাবাজার পেরোলেই শান্ত স্নিগ্ধ বুড়িগঙ্গা। টলটলে জল। ওপারে ধানক্ষেত। ছোট্ট একটা গ্রামীণ বাজার। নদীর ওপর সব সময় দু-তিনটি স্টিমার থাকে। আর ডিঙি নৌকা। এরাই হাঁসের মতো সারা নদী সাঁতরে বেড়ায়। দু-তিনটি বড় পেটফোলা নৌকা সব সময় তীরে দাঁড়িয়ে থাকে। বিষয়টা রহস্যজনক মনে হওয়ায় নিতুনবাবুকে জিজ্ঞেস করছিলেন সিদ্দিক। তিনি হেসে বলেছিলেন-

'ওগুলো নড়বে কেন, ওগুলো তো পিনিশ।'

'মানে?'

'মানে ওসব আবাসিক হোটেল। ঢাকায় যাদের থাকার কোনো জায়গা নেই, ভাড়ায় থাকে।'

বাকল্যান্ড বাঁধকে ঘিরে পার্ক। করোনেশন ও লেডিস পার্ক নামের দুটো বড় পার্ক আছে। সেখানে সযত্নে ফুলের বাগান করা হয়েছে। পাকা বেঞ্চে বসে সিদ্দিক আর নিতুন গল্প করেন।

'সুরাবর্দী সাহেব নাকি আসছেন?'

'হু।'

'উনি কলকাতায় দারুণ কাজ করছেন। এখানে এসে কিছু করে গেলে উপকার হয়।'

'এখানে তো কোনো সমস্যা নেই।'

'দাদা, ভেতরে ভেতরে অনেক কিছু হয়ে যাচ্ছে, সব তো বলা যায় না। অ্যাকুইজিশন কেবল হিন্দুদের বাড়িঘর করা হচ্ছে কেন? না হয় সরকারি প্রয়োজনে। এই যে সেদিন বিহারিরা মালিটোলায় একটা বাড়ি দখল করে নিল। ভাগ্যকুলের জমিদার বাড়িও নাকি দখল হয়ে গেছে। গোপীবাগে কালীপূজা করতে দিল না। জন্মাষ্টমীর প্রসেশন হলো না।'

কিছু মানুষ এদিকে আসায় নিতুনবাবু চুপ হয়ে গেলেন। চলে যাওয়ার পর আবার শুরু করলেন-

'খাজা সাহেব কী বিহিত করলেন! দেখছি দেখবোর ওপর আছেন। কুমিল্লায় এক কিশোরীকে মণ্ডপ থেকে তুলে নিয়ে গেছে জানেন?'

'কী সাংঘাতিক! স্যারকে বলতে হবে।'

'আপনার সঙ্গে কি উনার যোগাযোগ আছে?'

সিদ্দিক সলাজ হেসে উঠলেন। তখন বুড়িগঙ্গা থেকে একটা ঠান্ডা বাতাস এসে বুলিয়ে গেল আঁচল। সিদ্দিক নদীর দিকে তাকান। অস্তাচলের রাঙা আলোয় আকাশে রঙের খেলা। ভেজা ভেজা ঠান্ডা বাতাস চাদরের শাসন মানছে না। তার পরও সুখময় লাগছে মুহূর্তটা। আচ্ছন্ন করে তোলে সিদ্দিককে। বাঁচার কী আনন্দ! কিশোরীটির জন্য তার মনটা খারাপ হয়ে উঠল। ওর জন্য আজকের সন্ধ্যাটা কেমন কে জানে!

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com