গল্প

শেষ ষাট মিনিট

প্রকাশ: ১৪ জানুয়ারি ২২ । ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মূল: সুসান গ্লাসপেল।। অনুবাদ:: কাজী আখতারউদ্দিন

'নয়-দশ-' পুরোনো দেয়ালঘড়িটা একটু থামল, যেন নাটকীয়ভাবে পরিস্থিতিকে সম্মান জানাল, তারপর বেশ ধীরে ধীরে এগিয়ে ঘড়ির কাঁটা সর্বশেষ সময় ঘোষণা করল, 'এগারো!'

চেয়ারসহ ঘুরে গভর্নর টাইমপিসটার দিকে মুখোমুখি তাকালেন। ইতোমধ্যে সেকেন্ডের কাঁটা টিকটিক করে তার সরকারি জীবনের শেষ ঘণ্টার সময় গুনতে শুরু করেছে। ঘড়ির কাঁটায় বারোটা বাজার সাথে সাথে নতুন একজন লোক রাজ্যের গভর্নর হবেন। চেয়ারে বসে তিনি মিনিটের কাঁটার টিকটিক করে এগিয়ে চলা দেখতে লাগলেন।

ছাদের কড়িবরগার ফাঁক দিয়ে বাইরের লোকজনের কথা বলার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। কারও গলার খুশির আভাস, আবার কেউ কেউ তর্ক করছে। লোকজন করিডোরে এসে ভিড় করছে, তিনি শুনতে পাচ্ছেন নতুন গভর্নরের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান দেখতে সমবেত লোকজন হলে ঢোকার জন্য অনুরোধ করছে।

এমন সময় তার সেক্রেটারি হাতে কয়েকটা চিঠি নিয়ে ঢুকল। চিঠিগুলো ডেস্কে রেখে সে জিজ্ঞেস করল-

'আপনি কি এখন মিস্টার হোয়াইটফিল্ডের সাথে দেখা করবেন? আপনার সাথে দেখা করার জন্য তিনি বাইরে অপেক্ষা করছেন।'

বৃদ্ধ গভর্নর ক্লান্ত চোখ তুলে তার দিকে তাকিয়ে বললেন-

'না, না তাকে থামাও। বল, যা যা তার বলার, সব যেন তোমাকে জানায়।'

চলে যাওয়ার জন্য সেক্রেটারি দরজার হাতলে হাত রাখতেই গভর্নর আবার ক্লান্তসুরে বললেন-

'আর শোনো চার্লি। যদি পারো সকলকে ঠেকিয়ে রাখো। এখন আমি একটু একা থাকতে চাই।'

তরুণ সেক্রেটারি ঘাড় কাত করে সায় দিয়ে দরজা খুলল। বাইরে বের হয়ে দরজাটা অর্ধেক ভেজানো অবস্থায়, সে আবার ঘুরে তাকিয়ে বলল-

'কেবল ফ্রান্সিস বাদে। তিনি এলে নিশ্চয় তার সাথে দেখা করবেন, তাই না?'

তিনি একটু ভ্রু কুঁচকালেন, তারপর অধৈর্য হয়ে একটু ছটফট করে কাঠখোট্টাভাবে বললেন-

'ওহো, হ্যাঁ।'

ফ্রান্সিস! অবশ্যই, ওরা ভাবতেই পারে না যে, ফ্রান্সিসকে তিনি তার অফিসে ঢুকতে দিতে মানা করতে পারেন। একটু নার্ভাস হয়ে গভর্নর অবিরাম ডেস্কের ওপর আঙুল ঠুকে চললেন। তারপর হঠাৎ নিচু হয়ে একটা ড্রয়ার খুললেন। সেখান থেকে কতগুলো টুকিটাকি জিনিস বের করে ছুড়ে ফেলে একটা খবরের কাগজ টেনে বের করে ভাঁজ খুলে কাগজটা ডেস্কের ওপর ছড়িয়ে রাখলেন। পত্রিকাটার ওই পৃষ্ঠার ওপর সরাসরি একটা বড় কালো লাইন চলে গেছে, 'পশ্চিমের কয়েকটি রাজ্যের আসল গভর্নর।' আর তার ঠিক নিচে, এই সিরিজের প্রথম আর্টিকেলে নামেমাত্র আর আসল গভর্নরের সবচেয়ে জাজ্বল্যমান দৃষ্টান্ত হিসেবে হার্ভি ফ্রান্সিসের একটা স্কেচ তুলে ধরা হয়েছে।

তিনি চেয়ারে বসে ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইলেন, যদিও ঠিকই জানতেন যে, এতে তার মনের অশান্তি আরও বেড়ে যাবে। এতদিন তার কাছে যা কিছু ছিল, সবকিছু আর একটু পরই শেষ হয়ে যাবে। আর শেষ মুহূর্তে এই কথাটা ভেবে, মনে কোনো প্রসন্নতা অনুভব করছেন না যে, তিনি আসলে কিছুই ছিলেন না। আর এ ব্যাপারটার সবচেয়ে তিক্ত অংশ হচ্ছে যে, এখন এই পত্রিকার পাতার দিকে তাকিয়ে তিনি দেখতে পাচ্ছেন, কথাটা কীরকম সত্য : 'হার্ভে ফ্রান্সিসই রাজ্যের প্রকৃত গভর্নর ছিলেন; জন মরিসন কেবল তার একজন মুখপাত্র এবং শোভাবর্ধক মূর্তি হিসেবে ছিলেন।'

চেয়ার থেকে উঠে হেঁটে জানালার কাছে গিয়ে গভর্নর বাইরের জানুয়ারি মাসের নিসর্গ দৃশ্যের দিকে তাকালেন। হয়তো বরফে ঢাকা পাহাড় আর সেই সাথে যে চিন্তায় তার মন ভারী হয়ে রয়েছে, সেটাই তার মনকে টেনে নিয়ে গেল অনেক বছর পেছনে শীতের এক বিকেলে। সেখানে ছোট্ট একটি লাল স্কুল দালানের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি 'রাষ্ট্রপরিচালনায় নিযুক্ত একজন ব্যক্তির গুরুদায়িত্ব' বিষয়ে বক্তৃতা দিচ্ছিলেন। বক্তৃতার শিরোনামটা মনে পড়তেই তার ঠোঁটে মৃদু হাসি খেলে গেল। কিন্তু সেই সতেরো বছরের বালকটির তখনকার মনোবলের এখন কী হয়েছে? তখন তিনি কথাগুলো মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন। ঠিকই স্মরণ করতে পারলেন, কী রকম শিহরণ নিয়ে সেদিন বিকেলে স্কুল দালানে দাঁড়িয়ে জনগণের বিশ্বাসের পবিত্র মর্যাদার বিষয়ে মন খুলে তার সমস্ত আবেগ ঢেলে দিয়েছিলেন। অথচ পরবর্তী জীবনে যখন সেই সুযোগ এলো, তখন এমন কী বাধা ছিল যে, একজন স্কুল বালকের বক্তৃতায় মনপ্রাণ ঢেলে যে কথাগুলো বলেছিলেন, সেই ব্যাপারগুলো তার পেশাগত জীবনে কাজে লাগাতে পারেননি?

কে যেন দরজায় টোকা দিচ্ছে। বেশ সহজে, আত্মবিশ্বাস নিয়ে ব্যক্তিটি দরজায় টোকা দিচ্ছিল আর সাথে সাথে গভর্নরও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে বললেন-

'আসুন।'

' একটু ধ্যান করছেন মনে হয়?'

কামরায় ঢুকে যেভাবে ফ্রান্সিস কথাটা বললেন, তাতে গভর্নরের ভ্রু কুঁচকে গেল, তবে ফ্রান্সিস তারপরও সহজভাবে বলে চললেন-

'দেখে এলাম গেটে বেশ হইচই চলছে। সবাই হলে ঢোকার জন্য টিকিট চাচ্ছে, আর সেই দারোয়ানের এমন ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি চেহারা হয়েছে, যেন সে পারলে এখুনি নদীতে ঝাঁপ দেবে। দারোয়ানরা এসব ব্যাপারকে খুব মূল্য দেয়।'

তরুণ দারোয়ানের অবস্থাটার কথা ভেবে হাসতে হাসতে তিনি একটা চুরুট ধরালেন। তারপর চেয়ারে বসে হেলান দিয়ে কামরার চারদিকে একবার তাকিয়ে বললেন-

'ভাবলাম এক মিনিটের জন্য আপনার সাথে দেখা করে যাই। কারণ জানেনই তো দুপুরের পর গভর্নরের অফিসে ঢোকার অনুমতি আর পাবো না।'

কথাটা বলে ফ্রান্সিস একটু রসিকতার সুরে হাসলেন।

তারপর ফ্রান্সিস নিজেই ধ্যানমগ্ন হয়ে গেলেন আর গভর্নর একভাবে বসে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। পত্রিকার প্রতিবেদনের একটি প্যারাগ্রাফের কথাগুলো তার মনে পড়ল : 'হার্ভে ফ্রান্সিস হচ্ছেন সবচেয়ে বিপজ্জনক ধরনের বস পলিটিশিয়ান। তিনি সেরকম অমার্জিত এবং ইতর পদ্ধতি ব্যবহার করার মতো লোক নন, যে একজন মানুষকে জিজ্ঞেস করে যে তার ভোটের মূল্য কত। অত্যন্ত শান্ত, নম্রভাবে, বিবেকবুদ্ধি নিয়ে তিনি কাজ করেন। আর খুব ভালো করেই জানেন একজন মানুষের আত্মসম্মানে ঘা না দিয়ে কীভাবে তাকে বাগে আনতে হয়।'

গভর্নরের নিজ অভিজ্ঞতা অবশ্য এই প্যারাগ্রাফের সারাংশ ঠিকই সমর্থন করে। যখন তিনি রাজ্যের গভর্নর পদে নির্বাচিত হলেন, তখন তার নির্বাচনী এলাকায় দায়িত্ব পালন করার বিষয়ে তিনি পুরোনো ধ্যানধারণা সযত্নে লালন করেছিলেন। তবে প্রথম সপ্তাহেই ফ্রান্সিস তার সেই তথাকথিত ছোট্ট একটা উপকার করার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। আর তিনিও তার নির্বাচনে ফ্রান্সিস যে সমর্থন জুগিয়েছিলেন, তার প্রতি শ্রদ্ধা দেখাবার জন্য তার অনুরোধ রাখলেন। তারপর আরও বিভিন্নভাবে তাকে সৌজন্য দেখানো হলো; তাকে একটা 'ব্যবসা বা ব্যবসায়িক লেনদেনে' ঢোকানো হলো। আর তিনি ব্যাপারটা বোঝার আগেই সবাই নিশ্চিতভাবে বুঝতে পারল যে, তিনি 'ফ্রান্সিসের লোক।'

চেয়ার থেকে উঠে ফ্রান্সিস বিড়বিড় করে বলতে লাগলেন-

'যত্তসব নির্বোধ! আনাড়ির দল!'

গভর্নর জিজ্ঞেস করলেন-

'কে লেইম্যান?'

'লেইম্যান আর তার দলবল!'

এবার গভর্নর আর কথাটা না বলে পারলেন না।

'অথচ আর এক ঘণ্টা পর এই নির্বোধ লোকটিই কিন্তু রাজ্যের গভর্নর হতে চলেছে। সেই নির্বোধ লোকটিই মনে হয় জিতেছে।'

ফ্রান্সিস অধৈর্য হয়ে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর বললেন-

'এই মুহূর্তের জন্য। তবে এটা বেশিদিন টিকবে না। যে কোনো পেশায় নির্বোধ আর আনাড়িরা হয়তো প্রথমে একবার জয়লাভ করে। তবে সেটা ওরা ধরে রাখতে পারে না। ওরা জানে না কীভাবে তা ধরে রাখতে হয়।'

তারপর বেশ উৎফুল্ল সুরে জোর দিয়ে বললেন-

'লেইম্যান এরপর আর কখনও নির্বাচনে জয়ী হয়ে ফিরে আসতে পারবে না। সত্যি বলতে কী, আমি এই কন্ট্রাক্ট ব্যবসাটার ওপর নির্ভর করেই বসে রয়েছি। তাকে দিয়েই কাজটা ভালোভাবে করার জন্য এটা আমরা এখনও ধরে রেখেছি।'

তারপর দরজার দিকে এগোতে এগোতে তিনি একটু অদ্ভুত ধরনের হাসি দিয়ে বললেন-

'তাহলে আপনার সাথে দোতলায় আবার দেখা হচ্ছে।'

গভর্নর ঘড়ির দিকে তাকালেন। দেয়ালঘড়ির কাঁটায় এখন এগারোটা বেজে পঁচিশ মিনিট। শেষ ঘণ্টাটা দ্রুত পার হয়ে যাচ্ছে। একটু পরই তাকে হাউসের এন্ট্রিরুমে পার্টিতে যোগ দিতে হবে। তবে ক্লান্তিতে সারা শরীরে অবসাদ নেমে এসেছে। চেয়ারের পিঠে হেলান দিয়ে তিনি চোখ বুজলেন।

বয়স তার সত্তর পার হয়েছে আর আজ তাকে আরও বুড়ো দেখাচ্ছে। তার চেহারা তেমন খারাপ নয়, তবে দেখতে খুব একটা শক্তিশালী বা দৃঢ় চরিত্রের মানুষ মনে হয় না। যারা গভর্নর সম্পর্কে ভালো কথা বলতে চায়, তারা তাকে একজন মিশুক, সহানুভূতিশীল অথবা দয়ালু মানুষ বলে। এমনকি তার নির্বাচনী অফিসের লোকজনও সাহস করে বলতে পারে না যে, তার মধ্যে তেমন চারিত্রিক দৃঢ়তা রয়েছে।

আর আজ তিনি সেটাই অনুভব করলেন, যা এর আগে কখনও বোঝেননি। তিনি কোনো গভীর ছাপ রেখে যাচ্ছেন না; কিছুই করেননি, কোনো কিছুর পক্ষে দাঁড়াননি। কখনও তার ব্যক্তিত্বকে স্বয়ং অনুভব করার চেষ্টা করনেনি। কেবল ডকুমেন্ট সই করেছেন; হার্ভে ফ্রান্সিস সব সময় 'বিবেচনার জন্য প্রস্তাব উপস্থাপন করেছেন' বা পরামর্শ দিয়েছেন- যার সমস্ত শর্ত ছিল লোকটির নিজের। আর সেই 'পরামর্শ' সব সময় এমন কর্মসূচির নির্দেশ দিত, যাতে সমস্ত প্রভাব কিংবা টাকা সেই চমৎকারভাবে সংগঠিত মেশিনের ওপর ঢেলে দিতে হতো আর সেই মেশিন ফ্রান্সিসই নিয়ন্ত্রণ করতেন।

নিরানন্দ এবং অস্বস্তিকর এই অতীত-পর্যালোচনা থেকে অতি কষ্টে নিজেকে সরিয়ে আনলেন। ডেস্ক থেকে দু'একটা জিনিস নিতে চাচ্ছিলেন আর এদিকে সময়ও দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। যা চেয়েছিলেন, খুঁজে পেলেন, তারপর ড্রয়ারটা যেই বন্ধ করতে যাবেন, তখন বেশ বড় একট হলুদ এনভেলপের ওপর চোখ পড়ল।

ড্রয়ারটা বন্ধ করলেন; তবে আবার খুললেন, এনভেলপটা বের করে এর ভেতরের ডকুমেন্টগুলো একে একে বের করে ডেস্কের ওপর সাজালেন।

চেয়ারে বসে এগুলোর দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগলেন যে, এতগুলো চোরা-গর্ত তার জন্য পেতে আর কোনো লোক কোনোদিন এই অফিসে ঢুকেছিল কিনা। গত একটা মাস ধরে ওরা নতুন গভর্নরের জন্য পুরোনো স্টেট-হাউস সেটিংয়ের ফাঁদ পাতার কাজে ব্যস্ত ছিল। গভর্নর যে কন্ট্রাক্টগুলো এখন তার সামনে ছড়িয়ে রেখেছেন, এগুলোর ব্যাপারে, সেই 'মেশিন' বিশেষভাবে উল্লসিত ছিলেন। 'কনভিক্ট লেবার'-কারাগার শ্রমজীবীদের প্রশ্নটি নিয়ে রাজ্যসভায় যখন জোর লড়াই চলছিল আর ঠিক তখনি সংগঠিত শ্রমজীবী শক্তি এটা বাতিল করার দাবি জানাচ্ছিল। আবার করদাতারা জোর দাবি জানাচ্ছিল যেন এটা বজায় রাখা হয়। এই পদ্ধতির অধীনে কারাগার আত্মনির্ভরশীল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। নভেম্বরে কন্ট্রাক্টটি নবায়ন করার জন্য প্রস্তাব এসেছিল। তবে হার্ভে ফ্রান্সিসের অনুরোধে বিষয়টা বারবার ঠেকিয়ে রাখা হয়েছিল। এটা এখনও উন্মুক্ত অবস্থায় রয়েছে। মাত্র এক সপ্তাহ আগে ফ্রান্সিস গভর্নরকে ব্যাপারটা এভাবে বলেছিলেন-

'কন্ট্রাক্টগুলো এখন সই করবেন না। এগুলো ধরে রাখার কিছু একটা কারণ আমরা ঠিকই দেখাতে পারব। এগুলো লেইম্যানের জন্য রাখুন। তারপর আমরা দেখব যে, এই ব্যাপারটা নিয়ে একটা আন্দোলন, উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে আর এটা নিয়ে তিনি যাই করুন না কেন, ব্যাপারটা তার জন্য খারাপ হয়ে দাঁড়াবে। যদি তিনি সই না করেন, তাহলে দেশের লোকজনের কাছে মন্দ প্রমাণিত হবেন, যারা তাকে নির্বাচিত করেছে। দেখতে পাচ্ছেন না? আপনার অধীনে যে সংশোধন-কারাগার স্বনির্ভর ছিল, তার শাসন শুরু হওয়ার পর, সেই কারাগার চালাতে ওদের এখন বেশ টাকা খরচ করতে হবে। তাকে এবার ঠিক বাগে পেয়েছি!'

ঘড়িতে বারোটা বাজতে আর বিশ মিনিট বাকি। তিনি এবার ঠিক করলেন বাইরে গিয়ে পাশের কামরায় তার কয়েকজন বন্ধুর সাথে কথা বলবেন। মুখ গোমড়া করে দোতলায় যাওয়াটা তার জন্য মোটেই ঠিক হবে না। তিনি তার সময় পার করে এসেছেন আর এখন লেইম্যানের দিন এসেছে। নতুন গভর্নর যদি আগের গভর্নরের চেয়ে ভালো কাজ করেন, তবে সেটা রাজ্যের জন্যই মঙ্গলজনক হবে। আর সেই কন্ট্রাক্টের ব্যাপারে লেইম্যানকে অবশ্যই বুঝতে হবে যে, রাজনৈতিক জলে পাড়ি দিতে গেলে অনেক ঝড়ঝঞ্ঝা মোকাবিলা করতে হয়। তবে কামরা থেকে বের হয়ে যাওয়াটা তেমন সহজ হলো না। জানালার কাছে হেঁটে গিয়ে গভর্নর আবার তুষারঢাকা পাহাড়ের দিকে তাকালেন। মন চলে গেল আবার সেই সেদিনের ঘটনার শেষে সেই ছোট্ট লাল স্কুল দালানটির দিকে, যেখান থেকে সবকিছু শুরু হয়েছিল।

স্ব্বপ্টেম্নর ঘোর ভেঙে গেল যখন দেখলেন তিনজন লোক পাহাড়ের দিকে উঠে আসছে। কথাটা ভেবে মৃদু হাসলেন, যখন ফ্রান্সিস আর তার সঙ্গীরা দেখবে যে, নতুন গভর্নর হেঁটে আসছেন। লেইম্যান অনুরোধ করেছিলেন, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের প্যারেড যেন বাতিল করা হয়- তবে সবাই ভেবেছিল যে, এ উপলক্ষে অনুষ্ঠানের মান রক্ষার জন্য অন্তত চার চাকার একটা জমকালো ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে তিনি আসবেন। আর তখন ফ্রান্সিস নিশ্চিত করবেন, বিরোধী দলের পত্রিকা যেন দেশের নির্বাচকমণ্ডলীর কাছে ব্যাপারটাকে নতুন গভর্নরের একটা আত্মম্ভরি ভাব হিসেবে তুলে ধরে।

তারপর ফ্রান্সিস আর আসন্ন অনুষ্ঠানের কথা ভুলে গিয়ে বৃদ্ধ গভর্নর জানালার সামনে দাঁড়িয়ে সেই তরুণ লোকটির দিকে তাকিয়ে রইলেন, যিনি তার জায়গায় বসার জন্য এগিয়ে আসছেন। দৃঢ় পদক্ষেপে নতুন গভর্নর হেঁটে আসছেন! পরম আত্মবিশ্বাস নিয়ে তিনি তার সামনে রাজ্যভবনের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। এখানে যে বেমানান ব্যাপারটা রয়েছে, সে কথা বিবেচনায় না নিয়ে এ রকম একজন মানুষ যে রাজ্যের শাসনভার নিতে আসছেন, এ কথা ভেবে গভর্নর সত্যিকার গর্বের শিহরণ অনুভব করলেন।

ইনি যখন ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি ছিলেন, তখন গভর্নর মরিসন বিভিন্ন বিষয়ে এই লোকটির বিরুদ্ধাচরণ করেছিলেন, তবে মনে মনে জন মরিসন সব সময় এই তরুণ তেজোদ্দীপ্ত লোকটির প্রশংসা করতেন। রাজ্যের রাজধানীর ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি হিসেবে তার অকুতোভয় এবং প্রশ্নাতীত আন্তরিকতা নিয়ে তিনি সারাদেশে একটি আলোড়ন তুলেছিলেন। গভর্নর মরিসন প্রায়ই তার অফিসে বসে পাশের শহরেই তরুণ ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যকলাপের খবর পত্রিকায় পড়তেন যে, কীভাবে তিনি একা দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়ছেন। কীভাবে উচ্চমহলে বারবার আঘাত করেছেন আবার একই সাথে তার বিরোধীদেরও হুমকির মোকাবিলা করেছেন। আর তখন থেকেই প্রায়ই তার মনে একটা শিহরণ জেগে উঠত এ কথা ভেবে যে, এ রকম একজন মানুষও আছে। তারপর রাজ্যের জনগণ যখন নিশ্চিত হলো যে, এই একজন মানুষই তাদের সঠিক সেবা দিতে পারেন, তখন ওরা সেই ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নিকে রাজ্যের চিফ এক্সিকিউটিভ পদে লড়ার জন্য অনুরোধ জানাল। এদিকে বিরোধী পক্ষের সাথে সম্পর্কযুক্ত হওয়ায় গভর্নর মরিসন আপ্রাণ চেষ্টা করলেন যাতে লেইম্যানের পরাজয় হয়। তা সত্ত্বেও তিনি কখনও সেই তরুণ প্রতিপক্ষের প্রতি যে শ্রদ্ধার অনুভূতি গোপনে মনে মনে পোষণ করতেন তা থেকে বিচ্যুত হননি। কোনো সংগঠনের সহায়তা ছাড়াই লেইম্যান একের পর এক আঘাত করে চলেছেন সেই 'মেশিনের' বিরুদ্ধে, যা এতকাল ধরে এই রাজ্যে প্রভাব বিস্তার করে রেখেছিল। পরিশেষে তিনি সেই অচিন্তনীয় বিজয় লাভ করলেন।

নতুন গভর্নর তার দৃষ্টিসীমা থেকে পার হয়ে গেলেন। আর একমুহূর্ত পর এই এক্সিকিউটিভ অফিসের নিঃসঙ্গ মানুষটির কানে তার কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। কয়েকজন বন্ধু তাকে গভর্নরের দরজার ঠিক সামনে থামিয়ে হাসতে হাসতে মন্তব্য করছিলেন-

'আশা করি পুরোনো অফিস তুমি যেমন করেছিলে, নতুন অফিসেও আমাদের জন্য তাই করবে।'

আর নতুন গভর্নরের প্রাণোচ্ছল উত্তর ছিল :

'না আমি আরও অনেক কিছু করব!'

আর এদিকে গভর্নরের অফিসে বসা লোকটি নামহীন অতৃপ্ত বাসনায় তাড়িত হয়ে মৃদু হাসলেন, তারপর একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে ডেস্কের সামনে বসলেন। ঘড়িতে এখন বারোটা বাজতে আর তেরো মিনিট বাকি; ওরা এখুনি তাকে দোতলায় যাওয়ার জন্য অনুরোধ করবে। ডেস্কের ওপর কতগুলো কাগজ পড়েছিল, তিনি সেগুলো ওয়েস্ট-পেপার বাস্কেটে ছুড়ে ফেলে বিড়বিড় করে বললেন-

'তাকে অন্তত একটা পরিস্কার ডেস্ক আমি দিতে পারি।'

চেয়ারটা একটু জোরে ঠেলা দিয়ে পেছনে সরালেন। একটি পরিস্কার ডেস্ক! হঠাৎ কথাটার গভীর অর্থ তার মনে জেগে উঠল ... আন্তরিকভাবে পরিস্কার করি না কেন? কেন তাকে একটা পরিচ্ছন্ন পরিবেশ দিই না- সত্যিকার একটা সুযোগ? কেন কন্ট্রাক্টগুলো সই করে দিচ্ছি না?

আবার ঘড়ির দিকে তাকালেন- বারোটা বাজতে আর দশ মিনিট বাকি। এখনও আরও দশ মিনিট তিনি রাজ্যের গভর্নর আছেন! দশ মিনিট সত্যিকার গভর্নরের শাসন! এটা কি তার আত্মা আর পৃথিবীর জন্য একটু সান্ত্বনা বা স্বস্তি হবে না, এতটা বছর তিনি যে দুর্বলভাবে আরেকজন মানুষের ক্রীড়নক হয়ে কাজ করেছেন, তার কি কিছুটাও নিবারণ হবে না? তিনি যে এটা করতে পারেন আর কারও যে ক্ষমতা নেই তাকে এই কাজ থেকে বিরত করতে পারে, এই চেতনাবোধটা তাকে উন্মাতাল করে তুলল। শেষ মুহূর্তে কেন এই শৃঙ্খল ভেঙে ফেলি না। সবকিছু শেষ হওয়ার আগে কেন মুক্তির আনন্দ উপভোগ করি না?

কলম হাতে নিয়ে কালির দোয়াতের দিকে হাত বাড়ালেন। কাঁপা কাঁপা হাতে উত্তেজিতভাবে তিনি কন্ট্রাক্টের কাগজটা খুললেন। কালিতে কলম চুবালেন; এমনকি কলমটা কাগজের ওপর আনলেন আর ঠিক তখুনি ক্ষণিকের উত্তেজনাটা চুপসে ভেঙে গেল। একজন ভীত সন্ত্রস্ত বুড়ো মানুষের মতো তিনি চেয়ারে হেলান দিয়ে সিটে ডুবে গেলেন।

ফিসফিস করে বললেন-

'না, না এখন না। এটা-'

মাথা নিচু করতে করতে শেষ পর্যন্ত ডেস্কে ঠেকালেন-

'অনেক দেরি হয়ে গেছে।'

তারপর আবার যখন মাথা উঠিয়ে আরও দৃঢ় হয়ে খাড়া হয়ে বসলেন, তখন তার এই সিদ্ধান্তের যুক্তি ঠিকই বুঝতে পারলেন। এই শেষ মুহূর্তে তিনি নিজের জন্য একটি ছোটখাটো মহত্ত্ব দেখাতে পারেন না। এটা এক ধরনের আত্মপ্রশ্রয় মনে হবে। ওরা বলবে এবং সম্ভবত ঠিকই বা যথার্থই বলবে যে, বিবেক তাড়িত হয়ে পূর্বে ফাঁকি দেওয়া কোনো দেনা মেটানো। ওরা বলবে ওদের সাথে যেহেতু এখন আর কাজ কারবার শেষ হয়ে গেছে, তাই তিনি ওদের বিরুদ্ধে গেছেন। না এ থেকে আর কোনো মুক্তি নেই, কেবল মৃত্যুশয্যায় শুয়ে অনুতাপ বা হাহাকার করা ছাড়া। অন্তত পূর্বাপর একই রকম হয়ে তিনি এখান থেকে বের হয়ে যেতে পারবেন। কন্ট্রাক্টের কাগজটা ভাঁজ করে আবার খামে ভরে রাখলেন। মিনিটের কাঁটায় এখন বারোটা বাজতে আর সাত মিনিট দেখাচ্ছে। কে যেন দরজায় টোকা দিচ্ছে। সেক্রেটারি মুখ বাড়িয়ে বলল-

সবাই তার জন্য দোতলায় অপেক্ষা করছেন।

তিনি উত্তর দিলেন যে, এক মিনিটের মধ্যেই তিনি সেখানে পৌঁছে যাবেন। তার কণ্ঠস্বর যে নিজের কাছেই একটু অদ্ভুত শোনাল, আশা করলেন সেক্রেটারি তা বুঝতে পারেনি।

ধীরে ধীরে দরজার দিকে হেঁটে চললেন। তাহলে এখানেই আসলে শেষ হলো; অফিস থেকে শেষবারের মতো নেমে যাওয়া! এত বছর পাবলিক সার্ভিস করার পর তিনি এক ধরনের পরাজয় আর অবমাননার অনুভূতি নিয়ে এই অফিস থেকে চলে যাচ্ছেন। গলায় কী যেন একটা শক্ত ডেলা বেঁধে রয়েছে; চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এসেছে। তারপর আবেগভরা কণ্ঠে ফিসফিস করে বললেন, যেন সান্ত্বনা পাওয়ার জন্য অন্য লোকটির দিকে ফিরেছেন-

'তবে ফ্রাঙ্ক লেইম্যান, আপনার সাথে ব্যাপারটা অন্যরকম হবে! ওরা আপনাকে ধরতে পারবে না- আপনাকে ওরা গ্রাস করতে পারবে না!'

একটা বিশাল ঢেউয়ের মতো কথাটা তাকে ওপরে উঠিয়ে নিল। এক ধরনের আবেগভরা আনন্দ যে, এখানে এমন একজন মানুষ আছে, যাকে দুর্নীতি নিজের লোক বলে দাবি করতে পারবে না। এখানে এমন একটি মানবাত্মা আছে, যা কোনো দামে বিক্রি কেনা যাবে না! তার চোখের সামনে তখন সেই ছোট্ট লাল স্কুলবিল্ডিংয়ের সামনে দাঁড়ানো সতেরো বছরের বালকের চেহারাটা ভেসে উঠল। আর এর পাশাপাশি এই অপর তরুণ লোকটির চেহারাও ভেসে উঠল, যার বিরুদ্ধে দুর্নীতির সব ক্ষমতা মিলে তাকে কাবু করতে পারেনি। একজনের কাছে এটা ছিল আবেগপ্রবণ মনের ভাববিলাসিতা, জীবনের সত্যিকার বাস্তবতা থেকে আলাদা একটি ব্যাপার। আরেকজনের কাছে এটা ছিল একটা শক্তি, যা সবকিছুর ওপর প্রভাব বিস্তার করেছে। এমন এক শক্তি, যার ওপর পরিস্থিতি এবং কোনো অভিসন্ধি টিকে থাকতে পারেনি।

তিনি বলছিলেন-

'আমি এ ব্যাপারে সবকিছু জানি। সব জানি! জানি নিচে পড়ে যাওয়া কত সহজ! এও জানি শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কত সুন্দর!' তার নিজের শূন্য, কলঙ্কিত রাজনৈতিক জীবন নিয়ে হতাশার অনুভূতি ছিল, তা প্রায় সবকিছু ডুবে গেল, যখন তিনি নিজেকে এই অন্য মানুষটির রাজনৈতিক জীবনের মধ্যে তুলে ধরলেন। যে মানুষটি আর এক ঘণ্টার মধ্যেই তার স্থান দখল করবে। কী এক গৌরবময় সুযোগ এসেছে তার জন্য, অফুরন্ত সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যাচ্ছে। আর আগামী বছরগুলোতে নিজের সেরা কাজটি করার পর তার আত্মাও কত পরিতৃপ্ত, সন্তুষ্ট হবে।

এখন এটাই সবকিছু বদলে দিল। নিজেকে যথার্থ প্রমাণ করা, তার সাথে সম্মানজনক এবং ভালো একটা কিছু তার নিজের রেকর্ডে যুক্ত করার সেই তীব্র আকাঙ্ক্ষা এখন পুরোপুরি তাকে ছেড়ে চলে গেছে। আর এই নতুন মনোভাবের সাথে এলো নতুন অন্তর্দৃষ্টি, যা ছিল একটি তাড়না, তা এখন একটা উদ্দেশ্যের ওপর কেন্দ্রীভূত হলো।

বারোটা বাজতে আর তিন মিনিট বাকি, তিনি আবার ডেস্কের কাছে ফিরে এলেন। কন্ট্রাক্ট্রের ভাঁজ খুলে একের পর এক পাতায় তার সই দিলেন। তবে অস্পষ্টভাবে সচেতন হলেন যে, তার এই প্রথম অভিপ্রায় কীভাবে ওরা ব্যাখ্যা করবে। ওরা তাকে বিশ্বাসঘাতক আর ভীরু-কাপুরুষ বলবে। তবে এতে তার কিছু আসে যায় না। তবে যে মানুষটির জন্য তিনি এটা করছেন, সে যে কখনও এটা জানবে না, সেই সত্যটা তার মনে কোনো অনুশোচনা বা আকস্মিক তীক্ষষ্ট বেদনা দিল না। সই করার পর ব্লটিং পেপার দিয়ে সাবধানে মুছে, সিল মেরে সরিয়ে রাখলেন। তার মন এখন পরিস্কার, একজন বালকের সুমিষ্ট আনন্দ তিনি অনুভব করলেন, কেননা এটা তিনি করতে পারলেন এমন একজন মানুষের জন্য, যার ওপর আস্থা রেখেছেন।

দরজা বন্ধ করে বেরিয়ে এলেন, পেছনে ব্যান্ডে উদ্বোধনী সংগীত বেজে চলেছে। তারপর সিঁড়ি বেয়ে ওপরতলার দিকে উঠে চললেন। া

***

সুসান কিটিং গ্লাসপেল [১ জুলাই ১৮৭৬-২৮ জুলাই ১৯৪৮] ছিলেন একজন আমেরিকান নাট্যকার, ঔপন্যাসিক, সাংবাদিক এবং অভিনেতা। তিনি সর্বমোট ১৫০টি ছোটগল্প, ৯টি উপন্যাসসহ ১৫টি নাটক রচনা করেছেন। তার রচিত আলিসন হাউস নাটকের জন্য তিনি ১৯৩০ সালে পুলিৎজার পুরস্কার পেয়েছেন।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com