প্রচ্ছদ

এই নিত্য, সম্ভবত নৈমিত্তিক

প্রকাশ: ১৪ জানুয়ারি ২২ । ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ইশরাত তানিয়া

সব সময় যা ব্যবহার্য, সেটি একদিন অভ্যস্ততায় পরিণত হয়। এক সময়ের অপ্রচলও তাই আগামীতে প্রচলিত ধারার অনুবর্তী। জীবনের সমুদয় অনুষঙ্গ নিয়ে এই যাপনচিত্র এঁকে ফেলা যায়। এর প্রায় সবটুকুই চেনাজানা। কাছ থেকে জীবনকে বোঝা আর সময়কে পড়া চলতে থাকে। অতিব্যবহারে আচার-অনুষঙ্গ বরং অনেকটাই চটচটে, ক্লিশে। তবু সারা বছরে শুধু শীত এলে খরখরে ঠোঁটে আমরা ভ্যাসলিন বুলিয়ে আর্দ্রতা বাড়িয়ে দিই। টানধরা চামড়া তখন সামান্য নরম। ফ্যানের রেগুলেটর বাঁ দিকে ঘুরে গিয়ে গতি হারায়। আসন্ন গ্রীষ্ফ্মে ফের ডানে। স্বস্তির আশায় গতিময় দুরন্ত। একঘেয়ে জীবনে এটুকুই অদলবদল। বাকিটা নির্দিষ্টতার ছাঁচে নির্ধারিত আদলে হয়ে ওঠে। নিয়ম করে সূর্য পূর্ব দিকে জেগে পশ্চিমে হেলে যায়। আমাদের আয়ুরেখা দৈর্ঘ্যে ছোট হয়ে আসে।

'প্রাত্যহিকতা,' তুমি বলছিলে, 'এসব আমি ঠিক বুঝি না, যেভাবে তুমি ভাবো, মননের সেই গভীরতা আর বিস্তৃতির সাথে গতানুগতিক যে কোনো কিছুই সাংঘর্ষিক।'

উত্তরে বলেছিলাম, 'রোজ রোজ যা ঘটে বা পালন করতে হয় এমন কিছু এড়িয়ে যাওয়া যায় না। এই যেমন তুমি।' একটু একটু করে যে কিনা অহরহ হয়ে গেছো। প্রাত্যহিকতায় 'কী হয় কী হয়' ভাবটা কেমন একটা হয়ে যায়। এক মুহূর্তের বিচ্যুতিও তখন কী অসহ! নকশা আঁকা চায়ের কাপ, পানির গ্লাস, ভাতের থালা, খবরের কাগজ, অ্যান্ড্রয়েড ফোন, নরম পাশ বালিশের মতো সারাটাক্ষণ আশপাশেই আছো। লেপটে আছো মায়ের বাঁ-হাতে চুড়িতে গাঁথা সেফটিপিনের মতো। আর বুঝি ছাড়ানো যায় না। জ্বরতপ্ত কপালে মা হাত রাখলেই সেই ঠান্ডা ধাতব স্পর্শ। হাত নড়লেই অনুজ্জ্বল ক্ষয়াটে চুড়ির সাথে সেফটিপিনের সাংঘর্ষিকতায় আশ্চর্য রিনরিন। নিত্যদিনের সে শব্দই দৈনন্দিনতার ডাকনাম হয়ে ওঠে।

সবই কি অভিন্নতার? ঐক্যর সাথে বৈপরীত্য নিয়ে তুমিও তো এসেছো কখনও। এই বিরুদ্ধতার মানে শুধুই মতবিরোধ নয়। শিল্পের বিপরীতে প্রতিশিল্প। সংঘর্ষেও সমৃদ্ধি, যদি দৃষ্টিভঙ্গি বদলে বদলে ভাবনার একেকটি দিগন্ত খুলে দেওয়া যায়। তোমাকে তাই, 'ধন্যবাদ', বলতেই পারি! দৃশ্যত যা দৈনন্দিন, চিন্তার অতলে সেটাও অন্যরকম করে দেখা যায়। অতি তুচ্ছ কিছুও দ্রষ্টব্য। আমিও কি কারও কাছে ক্রমশ অনায়াস হয়ে উঠিনি? নইলে কেনই বা ফোনের ওপাশে কেউ বলছে- শান্ত করো, শান্ত করো... কী যে বলি ভেবে পাই না। তবু অক্রিয় নই। শোনাও যদি ক্রিয়া হয়। দিনের পর দিন, দিনের গায়ে লেগে থাকা প্রতিটি ঘণ্টা, ঘণ্টার সব সেকেন্ডজুড়ে যা কিছু শব্দের আনাগোনা শুধু শুনে যাই। এই অসাম্যের-অস্থিরতার জীবনে, তেমন সৃজনশীল যদি হয়ে উঠতে পারতাম, কারও মনে নিরুদ্বেগ লিখে দিতাম। যেভাবে আসন্ন শীতের কথা ভেবে নীল-ধূসরের নরম একটা মাফলার বুনে ফেলা যায় কিংবা মাপ মতো ফ্লানেলের গরম কাপড় বানিয়ে নেওয়া ঠিক তেমন। কী অবলীলায় আমরা বড় হয়ে সেইসব শীতের কাপড়গুলোকে ছোটো করে দিই! সেলাই খুলে হেম মুড়ে সামান্য বড় করার চেষ্টা। এতে একটি শীত অন্তত পেরিয়ে যেতে পারে।

এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে মনে হয়- মাঝে মাঝে মনে পড়াটা ভালোই। নান্দনিক কফিশপে গাল ছুঁয়ে লাজুক, কিছুটা বা অপরাধী আদরস্পর্শটুকু। পৌষবিকেলের রোদ্দুর এসে দাঁড়িয়েছে খোলা বারান্দায়। নিজ থেকেই মাত্রা কমিয়ে সন্ধ্যার অপেক্ষায়। একের পর এক পেয়ালাভরা তোমার আমেরিকানো। আমি ক্যাপাচিনোর উষ্ণতায়। সান্নিধ্যেরও। আজ মনে হয় এতোটা নৈর্ব্যক্তিক না হলেও পারতাম। অবচেতনার গভীরে ব্যক্তি-সম্বন্ধীয় কোনো বোধ জেগে উঠলে ভালোই হতো। তোমাকে নিয়ে অনুভবটা হাত ফসকে বেরিয়ে গেলে বুঝি জীবন এমনই। নিমিত্ত থেকে আগত। বিশেষ উদ্দেশ্যে অনুষ্ঠিত। ধারাবাহিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় ক্রমশ লয়। এইসব কার্যকারিতার সবটুকু বোঝা যায় না। অবচেতনের গভীরে আমরা হয়তো পরস্পর প্রয়োজনার্থক। আমায় তাই ডাকছ- 'মনন' বলে। আর আমি নিজেকে হারাতে হারাতে, একই সময়ে খুঁজে পেতে পেতে জেনে নিই চিন্তার যৌথতা। আমাদের কোনো দেনমোহর, মন্ত্র লাগে না। ভাবনার যূথচারিতায় আমাদের রোজকার যুগলযাপন।

যা কিছু প্রতিদিনের নীরস গদ্যবৎ, নতুন করে সাজাই। গৎবাঁধা ব্যাপারগুলো তখন অপ্রত্যাশিত সংঘটনে রূপান্তরিত। তুমি নিশ্চিত বলবে পিকাসো'র কথা- ঞযব ঢ়ঁৎঢ়ড়ংব ড়ভ ধৎঃ রং ধিংযরহম :যব ফঁংঃ ড়ভ ফধরষু ষরভব ড়ভভ ড়ঁৎ ংড়ঁষং. গতানুগতিকের ধুলো জমে আত্মার ওপর। শিল্প সেই ধুলোবালি মুছে দেয়। নিত্যদিনের রাগ, দুঃখ, অভিযোগের অগ্নিবাণ উড়ে এলে ব্যথাহরা প্রলেপ হয়ে যায়। সৃষ্টিশীলতার 'ডেইলি ডোজ' চেতনাকে পরিশুদ্ধ করে। নিত্যকার নিয়মমাফিক ব্যবহারের বস্তু নতুনের নিমিত্ত হয়ে আসে। আনন্দ ভৈরবী জাগে সৃজনে। গতের মাঝে গতি আসে। আর আমি জীবন লিখি। লিখতে থাকি শিল্পের বেদনা। লিখতে লিখতে এ হলো জীবনের পুনরুদ্ধার। জীবন 'ক্যারি' করতে গিয়ে দেখে নিলাম মিসক্যারেজ। জন্মানোর আগেই যে মৃত্যু ঘটে যেতে পারে- সে কথা জেনেছি দৈনন্দিন যাপন থেকে।

চলতে চলতে জীবন চলেই যায়। সময়ের ফেরে অনভ্যাসগুলো আজ যাপিত জীবনের অংশ। নতুনের উদ্ভব হয় প্রয়োজন থেকে। সেই বিশেষ চাহিদাও এক সময় তৃপ্ত। যা কিছু একদা আধুনিক, পরে গতানুগতিক। অথচ পেছন ফিরে তাকালে মনে হয়- এতো জলদি! দেখতে দেখতে কোথায় পৌঁছে গেলাম! এই চশমা, চশমার কাচে প্রতিফলিত সৌন্দর্য, বই, বইয়ের পাতায় একেকটি অক্ষর, বারান্দায় অ্যালমান্ডা, অ্যালমান্ডার হলদেপনায় ভ্রমরের ডুবে যাওয়া কিংবা আলমারি, আলমারিতে তুলে রাখা শাড়ি, শাড়ির ভাঁজে ন্যাপথালিনের নস্টালজিয়া। সব যেন অদেখা, অজানা। এই প্রথম যেন বুকের ভেতর ন্যাপথালিনের শ্বাস টেনে নেওয়া। এই প্রথম মণিবন্ধে মিনা করা অ্যান্টিক বালা। তাঁতের শাড়ির ভাঁজ খুলে দাঁড়িয়েছি নিজস্ব আয়নায়। এই প্রথম। কিউটিকুরা পাউডারের সুবাস কী অবিকল! সেই স্যান্ডেলিনার গন্ধে ভেসে আসে টিভি স্ট্ক্রিনের বিজ্ঞাপন- স্যান্ডেলিনা সোপ, রূপচর্চায় আভিজাত্য। আমার আটপৌরে জীবনে খাঁটি চন্দন আর ময়েশ্চারাইজার সমৃদ্ধ হয়ে ঢুকে যায় ছাদ। ছাদের ওপর মেলে দেওয়া শাড়ি, তারও অনেক ওপরে ডানা মেলে উড়তে থাকা দুটো চিল। জিভে টক টক শব্দ তুলে খাওয়া কাঁচা আমের আচার। হুবহু সেই শব্দ। এর কোনো পরিবর্তন নেই। এসবের বিবর্তন হয় না। দালানের উচ্চতাটুকু শুধু বেড়ে যায়। ড্রেসিং টেবিলের ওপর রাখা ছিল লাল-নীল ফিতা। কোথায় হারিয়ে ফেলেছি কে জানে? আমি জানতাম না তখন কান্নার কথা। শুধু বুঝে নিয়েছিলাম অভিমানে গলার স্বর বুজে আসে। যত্ন করে সমস্ত কিছু তুলে রেখেছি তোমাকে দেব বলে। চিনিয়ে দেব জীবনের স্বাভাবিকতাগুলো। না চিনলেও ক্ষতি নেই। ঘটনাক্রিয়ায় স্বাভাবিকতাই অস্বাভাবিক হয়ে উঠছে। তবু স্মৃতি থেকে মুহূর্তগুলো রিক্রিয়েট করা। সেটাও হয়তো এক শৈল্পিক তাড়না।

'রিপিটেশনে,' তুমি বলেছিলে, 'ক্লান্তি আর বিরক্তি আসে। তোমার মতো অনুসন্ধিৎসু মানুষের পক্ষে দৈনন্দিনতা অভিশাপ।'

উত্তরে বলেছিলাম, 'খুঁটিনাটির এই জীবনে যতটুকু পারি আনন্দ খুঁজে নিই। ব্যষ্টিক থেকে ধীরে ধীরে সামষ্টিকের দিকে। সেও তো এক প্রকার অনুসন্ধান।' পত্রিকার শিরোনামের সাথে চা খাওয়াটা কবে থেকে অচ্ছেদ্য হয়ে গেছে জানি না। ভুলভাল ছেলেমানুষি ভালোবাসাগুলোর কথাও মনে নেই। তবু কমলাময় টক-মিষ্টির মৌসুমে খুঁজে পেয়েছি পাটালি গুড়ের উৎসব, দুধে ভেজা চন্দ্রপুলির মিষ্টতা। পাতাপোড়া ধোঁয়ার আবহে নিজের ছায়ার দিকে তাকিয়ে আজ কার মুখের ছায়া ভেসে ওঠে জানি না। কাকে খুঁজি? কে সেই অজ্ঞাত?

এমন বিকেলে সংসারের খেলনা বাটি সরিয়ে মানুষ ঠোঁট এগিয়ে দিয়েছে চায়ের কাপে। ল্যাপটপ শাটডাউন করে যে যার মতো বেরিয়েছে ক্লান্ত অফিস থেকে। পা ফেলেছে অভ্যস্ততার অ্যাভিনিউতে। দৈনন্দিন আনন্দ-বেদনা সহযোগে। জীবন অবিমিশ্র কিছু না। সেখানে অগণন যানবাহনের চাকা ঘোরে। ডাল-ভাতে ব্যয় বাড়ে। বাড়ে কভিড সংক্রমণ। বায়ুদূষণে ঢাকা আবার শীর্ষে। জীবনের এই ভোগান্তিগুলোও সয়ে যায়। তবু তুমি আরামসর্বস্বতা ছেড়ে সামষ্টিক স্বার্থে একাই নেমে যাও রাজপথে। হতে পারে সুপেয় পানির সংকট নিরসনে কিংবা মৃত দশটি মা ডলফিনের শোকে। নিজের জন্য কখনও তো কিছু চাওনি। ঠান্ডা, বিদঘুটে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে পৃথিবীর উৎকৃষ্ট শিল্পকর্মগুলো বাঁচাতে চেয়েছিলে। শুনেছি 'আন্দালুসিয় কুকুর' ছবিটি মুক্তি পাবার পর বুনুয়েলকে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছিল বিক্ষুব্ধ বুর্জোয়াদের কাছ থেকে। তোমাকে সেই বুনুয়েল মনে হয়। তোমার কাছ থেকে কিছু কি শিখেছি? আদৌ কি শিল্প কিছু শেখাতে পারে? ভাবনার উপাদান দিয়েছিলে তুমি। প্রাত্যহিকতায় একটা জোর ধাক্কা। দ্বান্দ্বিক টানাপোড়েন। শিল্প যা দিতে পারে।

আমার হাতের পাতায় মেহেদি রাঙানো নকশার প্রক্রিয়ার সাথে পণ্য ও সেবার বিনিময় ঘটে যায়। মূল্য ও মুনাফা, ভোগ ও উপযোগ ঢুকে যায় দৈনন্দিনতায়। তারপর হিসেব মিলিয়ে নিই জাতীয় উৎপাদন, মোট চাহিদা ও জোগান, সুদ ও মজুরির হার। যদিও মেলে না কিছুই। কোথায় কোথায় ডিসইকুইলিব্রিয়াম আমি বুঝে ফেলি। ভারসাম্যের ঘাটতি।

হালদা নদীতে এরপর কত কিউসেক পানি বয়ে গেছে জানো? নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও সেখানে চলে বালুবাহী বার্জ। আমাদের আটপৌরে জীবনের মতোই খননযন্ত্র নদীর বুক খুবলে তুলে নেয় বালু। সেই হা হা শূন্যতা, আমাদের মামুলী সুখ, অসুখ, অনুভব, চিন্তাশীলতা সব নিয়েই আত্মস্থ করেছি প্রাত্যহিকতা।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com