কূটনীতি

'নিউ গ্রেট গেম' এবং বাংলাদেশ

প্রকাশ: ১৫ জানুয়ারি ২২ । ০০:০০ | আপডেট: ১৫ জানুয়ারি ২২ । ০১:১৪ | প্রিন্ট সংস্করণ

দেলোয়ার হোসেন

গত এক দশকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে যেমন ব্যাপক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি সাধিত হয়েছে, তেমনি ভূরাজনৈতিক প্রভাবও বৃদ্ধি পেয়েছে। শান্তিকামী ও সহিষুষ্ণ জাতি হিসেবে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশ তার নিজস্ব প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হয়েছে। দ্বিপক্ষীয় অংশীদারিত্ব ও বহুপক্ষীয় কূটনীতির মাধ্যমে বাংলাদেশ এখন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর। ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা বৃদ্ধির সঙ্গে সাম্প্রতিক বছরে ভূরাজনৈতিক ও কৌশলগত দিক থেকে অবস্থানের সুবিধা কাজে লাগানোর অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ।

বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর মধ্যে যে প্রতিযোগিতা স্পষ্ট, তাকে বিশেষজ্ঞরা 'নিউ গ্রেট গেম' কিংবা 'নিউ কোল্ড ওয়ার' নামে আখ্যায়িত করেছেন। বিশেষ করে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এ খেলা নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশকে কিছু ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে হতে পারে। তবে ২০২২ সালে দেশের পররাষ্ট্রনীতির কথা চিন্তা করলে বৈশ্বিক শক্তি বিবেচনায় বাংলাদেশ তার চলমান প্রভাব বজায় রাখবে বলে আমি মনে করি।

থিঙ্ক ট্যাঙ্ক লোয়ি ইনস্টিটিউটের মতে, ২০২১ সালের এশিয়া ক্ষমতা সূচকে এশিয়ায় যে চারটি দেশের অবস্থান সুসংহত, সেখানে বাংলাদেশ অন্যতম। ২০২১ সালের বৈশ্বিক সামরিক শক্তির জরিপে বাংলাদেশ ৪৫তম অবস্থানে রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ জিডিপির অংশ হিসেবে তার সামরিক ব্যয় তাৎপর্যপূর্ণভাবে ্বৃদ্ধি করেছে। বাংলাদেশের প্রভাব দেখার ক্ষেত্রে অর্থনীতি এবং রাজনৈতিক কৌশল- এ দুটি বিষয়ে আলোচনা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সফলতাই এর গুরুত্ব বৃদ্ধির ইঙ্গিতবহ। শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি বাংলাদেশকে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমীহ করার মতো জায়গায় নিয়ে গেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের পর বাংলাদেশের অর্থনীতি সবচেয়ে বড়। ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের বিশ্বের ২৮তম বড় অর্থনীতির দেশ হওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে। ১৬ কোটির অধিক জনসংখ্যার দেশ হিসেবে বাংলাদেশ অনেক বড় বাজার। শুধু তাই নয়, আঞ্চলিক সংযোগ কিংবা সাপ্লাই চেইনের সুবিধার সঙ্গে ভৌগোলিক অবস্থান ও ডেমোগ্রাফিক ক্যারেক্টার জনসংখ্যাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য বিবেচনায়ও বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান প্রভাব স্পষ্ট। অধিকন্তু বৈদেশিক বিনিয়োগের মাধ্যমে বাজার সম্প্রসারণ এবং অন্যদের ঋণদানও বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে প্রভাব বৃদ্ধির পরিচায়ক। আমরা দেখছি, ঢাকা মালদ্বীপকে ২০০ মিলিয়ন ডলার ঋণ দেওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশের সে ভূমিকাও সামনে এসেছে।

বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক শ্রীলঙ্কাকে ২০০ মিলিয়ন ডলারের মুদ্রা বিনিময় বা কারেন্সি সোয়াপ ঋণ দেওয়ার অনুমোদন দিয়েছে। যার অন্তত তিনটি উদ্দেশ্য রয়েছে। এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির শক্ত ভিত্তির প্রমাণ। একই সঙ্গে এ প্রক্রিয়া ইঙ্গিত দিচ্ছে, বাংলাদেশ আঞ্চলিক রাজনীতিতে প্রভাবকের ভূমিকা পালন করছে। পাশাপাশি ঢাকার অভিপ্রায় অনুসারে শ্রীলঙ্কার উদাহরণ থেকে এ মাপের অন্য দেশগুলোও বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করতে চাইবে।



বলাবাহুল্য, শক্তিশালী অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ যে আত্মবিশ্বাস অর্জন করেছে, সেখান থেকেই ভূরাজনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া সহজ হচ্ছে। ৫০ বছরে আমরা যে অর্থনৈতিক মাইলফলক অর্জন করেছি, তাকে ভিত্তি করে আগামী ৫০ বছরের প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধি নির্ধারণ করছে সরকার। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণও বাংলাদেশের প্রভাবের অন্যতম পরিমাপক। আঞ্চলিক ও অন্যান্য পরিসরে বাংলাদেশের নেতৃস্থানীয় ভূমিকা এবং অর্থনৈতিক সংহতির মধ্যেই ঢাকার আঞ্চলিক অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশের অভিপ্রায় রয়েছে। আঞ্চলিক অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব কর্মসূচিতে বাংলাদেশের যোগদানও সেটি প্রমাণ করছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, অর্থনেতিক কর্মকাণ্ডই মূলত পরবর্তী রাজনীতি ও ভূরাজনৈতিক বিষয়াদির চালিকাশক্তি।

আমরা যদি রাজনৈতিক ও কৌশলগত বিষয়ে যাই তাহলে দেখব, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন শাসনে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থায়িত্ব অর্জিত হয়েছে। এটিই আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতিতে ভূমিকা রাখতে বাংলাদেশকে শক্ত ভিত দিয়েছে। তা ছাড়া ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ যেমন তার মানবতাবাদী অবস্থান স্পষ্ট করেছে, তেমনি জলবায়ু ফোরামে বাংলাদেশের শক্তিশালী কণ্ঠও বিশ্বের কাছে আমাদের বিশেষ পরিচিতি দিয়েছে। বাংলাদেশ এখন ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরামের চেয়ারম্যান। এ সংস্থাটি তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর জলবায়ু ন্যায্যতা নিশ্চিতে কাজ করছে। একই সঙ্গে এটাও উল্লেখ করা যেতে পারে, জাতিসংঘের বিশ্বশান্তি কর্মসূচিতে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি সংখ্যক সৈন্য পাঠিয়ে দেশের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল করেছে। কৌশলগত বিষয়ে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সফলতা আমরা দেখেছি। এর মাধ্যমেই বাংলাদেশ দীর্ঘদিন অমীমাংসিত থাকা সমুদ্র সীমানা সমস্যার সমাধান করে প্রতিবেশী ভারত ও মিয়ানমার উভয় দেশের সঙ্গেই আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে সীমানা নির্ধারণ করেছে। আমরা জানি, বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতি যেটি বঙ্গবন্ধুই নির্ধারণ করে গেছেন- সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়; এ নীতিও বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে এবং বিশ্বে প্রভাব বাড়াতে ভূমিকা পালন করছে।

৫০ বছরে এসে বাংলাদেশের কৌশলগত সফল ভূমিকা কূটনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক দিক থেকে বিরল দৃষ্টান্ত। ভৌগোলিক দিক থেকে এটা অস্বীকারের উপায় নেই, ভারত প্রায় বাংলাদেশকে ঘিরে রেখেছে। বলাবাহুল্য, বাংলাদেশও ভূরাজনৈতিক দিক থেকে ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির উত্তর-পূর্ব সীমান্তে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ যে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করছে, তার ওপর ভারতের আস্থা রয়েছে। অন্যদিকে, ভারতকে টেক্কা দিতে ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগরে চীনের যে ভূরাজনৈতিক আগ্রহ রয়েছে, সেদিকে বাংলাদেশের কৌশলী ভূমিকা প্রয়োজন। তা ছাড়া রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের এ অঞ্চলে উপস্থিতির বিষয়েও বাংলাদেশের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

তুরস্ক, ফ্রান্স ও ইতালির সঙ্গে যেভাবে চুক্তি হয়েছে, এর মাধ্যমে বাংলাদেশ শুধু সামরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রই প্রসারিত করেনি; একই সঙ্গে এটি ঢাকার ক্রমবর্ধমান প্রভাবেরও পরিচায়ক। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সফলতাও আমাদের সামরিক বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ে দৃষ্টি দেওয়ার অবকাশ দিচ্ছে। ফোর্সেস গোল-২০৩০ এর অংশ হিসেবে আমাদের সামরিক সরঞ্জামের নিয়মিত সরবরাহকারী চীন ও রাশিয়ার বাইরে গিয়েও বাংলাদেশ অন্যদের সঙ্গে কাজ করছে। আমরা দেখেছি, তুরস্ক বাংলাদেশের কাছে এক বিলিয়ন ডলারের সামরিক যান ও রকেট লাঞ্চার বিক্রির চুক্তি করেছে। বাংলাদেশ বিমানবাহিনী ইউএস এফ-১৬এস বা ইউরোফাইটার টাইফুনস ক্রয়ের পরিকল্পনা করছে, যেটি প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বাংলাদেশকে বিশেষ সুবিধা দেবে।

যদিও বাংলাদেশ প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর মধ্যে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে, তারপরও কিছু চ্যালেঞ্জ নতুন বছরে মোকাবিলা করতে হবে। এগুলো অবশ্য নতুন নয়; গত এক দশকে বাংলাদেশ এমন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে আসছে। প্রথমত, বঙ্গোপসাগরের ব্যাপারে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং ভারতের সঙ্গে কৌশলী ভূমিকা পালন করতে হবে। এমনটি ক্ষমতার রাজনীতিতে বিশ্বে বিরল নয়। দ্বিতীয়ত, নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তাদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অপ্রয়োজনীয় নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশকে আলোচনা করতে হবে। তৃতীয়ত, রোহিঙ্গা বিষয়ে মিয়ানমারের অসহযোগিতা বজায় থাকতে পারে বিশেষ করে যতদিন সে দেশে জান্তা সরকার রয়েছে। তা ছাড়া চীন, রাশিয়া, ভারত, আসিয়ান ও পশ্চিমা বিশ্বও রোহিঙ্গা প্রত্যবাসন বিষয়ে তাদের নীরবতা বজায় রাখতে পারে। চতুর্থত, বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক বিষয়ের উল্লেখযোগ্য অংশজুড়ে থাকবে কভিড-১৯। সর্বশেষ তবে একমাত্র বিষয় নয়, বাংলাদেশ সফলভাবে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণে অর্থনৈতিক এবং জলবায়ু কূটনীতিতে তার সাফল্য অব্যাহত রাখবে।

৫০ বছরের 'এশিয়ান টাইগার' বাংলাদেশ আঞ্চলিক ও বিশ্বরাজনীতিতে একটি শক্ত অবস্থান গড়তে উদগ্রীব। সে লক্ষ্যে বাংলাদেশ ভূরাজনৈতিক ও কৌশলগত সম্পদ কাজে লাগাচ্ছে। নতুন বছরেও বাংলাদেশের সে প্রচেষ্টা আরও জোরালো হবে নিশ্চয়।

ড. দেলোয়ার হোসেন: অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com