কক্সবাজারের ঘোড়ার আসলেই 'ঘোড়ারোগ'

প্রকাশ: ১৫ জানুয়ারি ২২ । ০০:০০ | আপডেট: ১৫ জানুয়ারি ২২ । ০২:৩৫ | প্রিন্ট সংস্করণ

জাহিদুর রহমান, কক্সবাজার থেকে ফিরে

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে রোগাক্রান্ত একটি ঘোড়া- সমকাল

সামর্থ্যের চেয়ে বেশি কিছু চাইতে গেলে ছুড়ে দেওয়া হয় 'গরিবের ঘোড়ারোগ' উপমা। ঘোড়া তো আদতেই 'গরিব'। ঘোড়ার চাওয়ারই সামর্থ্য নেই! ফলে সত্যি সত্যিই কক্সবাজার সৈকতের ঘোড়া ভুগছে নানা রোগে। সমুদ্রতটে ঘোড়ার পিঠে চড়েন যেসব পর্যটক, তারা খোঁজ রাখেন না, যেখানে সওয়ার হয়েছেন, সেই পিঠে কত ক্ষত লুকানো। পিঠের ওপর দেওয়া রঙিন কাপড়ের আচ্ছাদনে ঢাকা পড়ে ঘোড়ার জীর্ণদেহের ছবি। হয়তো রংহীন জীবন নিয়ে ঘোড়া সব আরোহীকে বিলিয়ে দেয় আনন্দের রোশনাই!

এভাবেই তিলে তিলে বেঁচে থাকার সংগ্রামে কক্সবাজার সৈকতের ঘোড়ার দল। অনেক ঘোড়া ধকল সইতে না পেরে নীরবে আলিঙ্গন করছে মৃত্যুকোল।

কক্সবাজার শহর ঘুরে এমন অনেক হাড্ডিসার ঘোড়ার দেখা মিলেছে। জমজমাট পর্যটন নগরীর পথে পথে শরীরে ক্ষত নিয়ে ঘুরছে এই প্রাণী। ঠিকমতো দেওয়া হয় না খাবার। নেওয়া হয় না যত্ন। যেন দেখার কেউ নেই।

এ প্রসঙ্গে বেলার প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, 'কোনো প্রাণীকে প্রয়োজনীয় খাদ্য না দেওয়া এবং অসুস্থ অবস্থায় লোকালয়ে মুক্ত করে দেওয়া প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ হিসেবে গণ্য, তা দ নীয় অপরাধ। তবে এই আইনের বাস্তবায়ন দেখা যায় না।'

মজার ব্যাপার হলো, কক্সবাজারে আছে 'ঘোড়া মালিক সমিতি'। সংগঠনটির সভাপতি আহসান উদ্দিন। তিনি জানান, সমিতির আওতায় ২১ জন মালিকের ঘোড়া ছিল ৯০টির বেশি। করোনার প্রথম লকডাউনের পাঁচ মাসে (২০২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত) অভুক্ত থেকে মারা গেছে ২০টি ঘোড়া। ২০২১ সালের ১ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া দ্বিতীয় দফার লকডাউনে মারা গেছে আরও ১০টি ঘোড়া। তবে গত বছরের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত আরও পাঁচটি ঘোড়া মারা যাওয়ার তথ্য পেয়েছে ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটি (ইয়েস) নামে একটি সংগঠন। মারা যাওয়া একটি ঘোড়ারও ময়নাতদন্ত হয়নি। ফলে ঘোড়ার মৃত্যুর কারণ রয়ে গেছে অজানা।

কক্সবাজার ডলফিন মোড়। ঘড়ির কাঁটায় তখন ঠিক রাত ৯টা। পাশেই কংকালসার এক ঘোড়া দেখে স্থির হয়ে গেল চোখ। পুরো শরীরে দগদগে ক্ষত, এক চোখে ঝরছে পানি। অনেক চেষ্টায়ও সেই ঘোড়ার মালিককে খুঁজে পাওয়া যায়নি। কয়েক দিন কক্সবাজার শহর ঘুরে এরকম ১২টি অসুস্থ ও দুর্বল ঘোড়ার ওপর চোখ পড়ে। মালিক না থাকায় স্থানীয়রা এসব প্রাণীকে বলেন 'বেওয়ারিশ ঘোড়া'। খাদ্যসংকটে ঘোড়াগুলো রাস্তার পাশে ফেলা প্লাস্টিক বা পলিথিন বর্জ্য খেয়ে বাঁচার চেষ্টায় দৌড়াচ্ছে। ফলে পড়ছে দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতার জাঁতাকলে।

২০২০ সালের মার্চে লকডাউন শুরু হলে পর্যটক না থাকায় বন্ধ হয়ে যায় সৈকতে ঘোড়ার ব্যবসা। এতে ঘোড়ার খাবার জোগান দিতে খেই হারান মালিকরা। পরবর্তী সময়ে পর্যটকের ঢল নামার পর ব্যবসা চাঙ্গা হলেও রোগাক্রান্ত ঘোড়ার চিকিৎসায় উদাসীন মালিকরা।

ঘোড়া মালিক সমিতির সভাপতি আহসান উদ্দিনের দাবি, অসুস্থ ঘোড়া দিয়ে ব্যবসা করা হয় না, ছেড়ে দিই। তাদের নিয়মিত চিকিৎসা দেওয়া হয়। করোনার কারণে লকডাউনে না খেয়ে ঘোড়া মারা গেলেও পরে আর তেমন মারা যায়নি।

গত বছরের ২৮ নভেম্বর পেশাগত কাজে কক্সবাজার যান ভিজ্যুয়াল আর্টিস্ট সোমা সুরভী জান্নাত। সে সময় তিনি দেখেন পায়ে গভীর ক্ষত নিয়ে সৈকতে দাঁড়িয়ে আছে একটি ঘোড়া। ক্ষুধার্ত ও দুর্বল ঘোড়াটি হাঁটতে পারছে না। জান্নাত খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, আরোহী বহনে অক্ষম হওয়ায় ঘোড়ার মালিক দেড় বছর আগে সেটিকে রাস্তায় ছেড়ে দেন। ঘোড়াটির চিকিৎসায় জান্নাত যোগাযোগ করেন স্থানীয় প্রাণিসম্পদ অফিসে। চিকিৎসক জানান, পায়ে ইনফেকশন বেশি হওয়ায় ঘোড়াটিকে নিতে হবে ভালো ভেটেরিনারি হাসপাতালে। ঘোড়াটির চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়ার উদ্যোগ নিলে মালিক বাদ সাধেন। শেষ পর্যন্ত ১০ হাজার টাকায় জান্নাতকে ঘোড়াটি হস্তান্তর করেন মালিক। কিন্তু পরদিন সকালে মারা যায় ওই ঘোড়া। পরে সৈকতের যে স্থানটিতে ঘোড়াটিকে প্রথম দেখেছিলেন, সেখানে অবলা প্রাণীর অপব্যবহার বন্ধের দাবিতে ছবির প্রদর্শনী করেছিলেন জান্নাত।

গত বছরের ৩০ মে কক্সবাজারে ঘোড়ার মৃত্যুসহ নানা কারণ জানতে চেয়ে দুই সচিবসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের ১৩ কর্মকর্তাকে আইনি নোটিশ পাঠায় বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা), ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটি (ইয়েস) এবং পিপল ফর অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন (পাউ)। ঘোড়া, ঘোড়ার মালিক ও তত্ত্বাবধায়কদের তালিকা বানিয়ে ঘোড়াগুলোর জন্য নিরাপদ আবাস ও খাদ্য নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয় নোটিশে। নিষ্ঠুর আচরণ করা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শাস্তির দাবির পাশাপাশি ওই নোটিশে ঘোড়াগুলোর জন্য চারণভূমি সংরক্ষণের কথাও বলা হয়।

ইয়েসের প্রধান নির্বাহী ইব্রাহিম খলিল মামুন সমকালকে বলেন, নোটিশের জবাবে খাদ্য ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন। বাস্তবে ঘোড়ার দায়িত্ব নেয়নি কেউ। মালিকরা ব্যবসা করলেও ঘোড়াগুলোর দেখভাল করে না। সরকারি দপ্তরগুলোও এটি নিশ্চিত করছে না।

ঘোড়ার মৃত্যুর কারণ জানতে কক্সবাজার প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর থেকে একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছিল। তখন জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বে ছিলেন ডা. অসীম বরন সেন। তিনি বলেন, মারা যাওয়া ঘোড়াগুলো আসলে অসুস্থ ছিল বলে তদন্তে বেরিয়ে আসে। অতিরিক্ত পিঠে চড়া ও অপুষ্টির কারণে ঘোড়াগুলো অসুস্থ হয়ে পড়ে। মারা যাওয়া ঘোড়া নিয়ে কেউ হাসপাতালে আসছে না, ফলে ঘোড়ার ময়নাতদন্তও হয় না।

এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক মামুনুর রশীদ বলেন, 'লকডাউনের সময় আমরা ঘোড়ার খাবারের ব্যবস্থা করেছিলাম। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকেও খাবার দেওয়া হয়েছিল। সব সময় ঘোড়ার মালিকদের আমরা সচেতন করছি।'

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com