পর্যটন শিল্প

পর্যটন শিল্পে বিশেষ সহায়তা যে কারণে জরুরি

প্রকাশ: ১৭ জানুয়ারি ২২ । ০০:০০ | আপডেট: ১৭ জানুয়ারি ২২ । ০৩:০৪ | প্রিন্ট সংস্করণ

মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া

দীর্ঘদিন ধরে করোনা সংক্রমণের কারণে সমগ্র বিশ্ব বড় সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশ-বিদেশে ফের করোনার সংক্রমণ বাড়ছে। করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রন ছড়িয়ে পড়ছে। দৈনিক শনাক্তের হার ১৪ শতাংশের কাছাকাছি। দেশে এখন ১৫ থেকে ২০ শতাংশ করোনা রোগীই ওমিক্রনে আক্রান্ত। এক সপ্তাহে দেশে করোনার সংক্রমণ বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। করোনাভাইরাসের প্রভাবে বিশ্বে ব্যবসা-বাণিজ্যে ব্যাপক বিরূপ প্রভাব পড়েছে। ইতোমধ্যে পর্যটন শিল্পেও এর বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।

বিশ্ব সংবাদমাধ্যম বলছে, আচমকা ফের ছড়িয়ে পড়া এই ভাইরাস ব্যবসা ও পর্যটনের জন্য বড় ধাক্কা। বাংলাদেশের পর্যটন খাতেও করোনাভাইরাসের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। পর্যটক ভাটার কারণে ইতোমধ্যে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে বাংলাদেশও। অক্টোবর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশে ঘুরতে আসেন প্রকৃতিপ্রেমীরা। কিন্তু এ বছর প্রথম থেকেই বিভিন্ন দেশের পর্যটকরা তাদের বুকিং বাতিল করছেন। দেশের পর্যটন খাতের একটি বড় অংশ চীনা নাগরিকরা। এবার তারাও আসতে পারছেন না। তা ছাড়া দেশীয় পর্যটকের সংখ্যাও করোনাভাইরাসের প্রভাবে দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে, যা পর্যটনসংশ্নিষ্ট সবাইকে ভাবিয়ে তুলছে। সন্দেহ নেই, এর নেতিবাচক কমবেশি প্রভাব পড়বে অর্থনীতিতে।

করোনা মহামারি শুরুর আগে ২০১৯ সাল ছিল পর্যটনের জন্য সবচেয়ে ভালো বছর। ২০১৯ সালে বিশ্বব্যাপী ৯ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার আয় হয়েছিল পর্যটন শিল্প থেকে। অর্থাৎ জিডিপিতে অবদান ছিল ১০ দশমিক ৪ শতাংশ। পাশাপাশি একই বছর পর্যটন শিল্পে মোট ৩৩৪ মিলিয়ন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, যা মোট কর্মসংস্থানের ১০ দশমিক ৬ শতাংশ। বিশ্বের ৫১টি দেশের প্রধান শিল্প হচ্ছে পর্যটন শিল্প এবং সব উন্নত দেশের প্রধান পাঁচটি শিল্পের মধ্যে থাকে এ শিল্প। বিগত দুই দশক ধরে পর্যটন শিল্প বিশ্বব্যাপী সব অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক উন্নয়নের মূল হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। বিগত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প এ দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা পালন করে আসছে। ২০১৯ সালে বাংলাদেশের জিডিপিতে পর্যটনের প্রত্যক্ষ অবদান ছিল ৪ দশমিক ৩ শতাংশ। তা ছাড়া মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ২ দশমিক ৯ শতাংশ তৈরি হয় এ খাতে। ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিলের মতে, ২০২০ সালে পর্যটন শিল্পে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৪ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার, যা ২০১৯ সাল থেকে প্রায় ৪৯ দশমিক ১ শতাংশ কম। এর ধাক্কা লেগেছে কর্মসংস্থানেও। ২০২০ সালে পর্যটন শিল্পে কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে মাত্র ২৭২ মিলিয়ন, যা ২০১৯ সালের চেয়ে ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ কম। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়।

২০২০ সালে করোনার প্রভাবে জিডিপিতে পর্যটনের অবদান প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। ওই বছর পর্যটনের অবদান ছিল ৪৬০০ বিলিয়ন ডলার, যা মোট জিডিপির ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। করোনার প্রভাব কর্মসংস্থানও করেছে নিম্নমুখী। ২০২০ সালে প্রায় ৬২ মিলিয়ন লোক পর্যটন খাত থেকে চাকরি হারিয়েছে। এর প্রভাব ২০২১ সাল পর্যন্ত অব্যাহত আছে। করোনার প্রকোপ মাঝেমধ্যে কমে গেলে কিছুটা সীমিত পরিসরে পর্যটন চালু থাকলেও তা আবার বন্ধ হয়ে যায়। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, হংকংয়ে জিডিপিতে পর্যটনের অবদান ৪১ শতাংশ হ্রাস পায়। সিঙ্গাপুরের পর্যটন খাতে প্রবৃদ্ধি কমে যায় প্রায় ২৫ শতাংশ। করোনাভাইরাসের প্রথম ধাক্কার প্রভাবে চীনসহ বেশ কয়েকটি দেশে পর্যটনে ধস নেমেছে, যা আগেরবারের চেয়ে আরও বেশি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে থাইল্যান্ড প্রায় ১০৯ বিলিয়ন থাই বাথ লোকসানের মুখে পড়েছে করোনাভাইরাসের কারণে। ইন্দোনেশিয়াতে করোনাভাইরাসের কারণে দেশটির চার বিলিয়ন ডলার বাণিজ্যিক ক্ষতি বা লোকসান হয়েছে। তা ছাড়া সব উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশও এর বিরূপ প্রভাব থেকে মুক্তি পায়নি। ২০২২ সালে এসেও করোনার প্রকোপে প্রায় বিপর্যস্ত হতে দেখা যাচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশকে। বর্তমানে ভারতে করোনার ভয়াবহ রূপ দেখা যাচ্ছে, যা চরম উদ্বেগের কারণ। এর ফলে পর্যটকশূন্য হয়ে পড়েছে ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ।


বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প-সংশ্নিষ্ট সব সেবা ২০২০ সালের মার্চ মাসের শেষ দিক থেকে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ ছিল। তারপর কিছুদিন সীমিত পরিসরে খুলে দেওয়া হলেও ২০২১ সালের এপ্রিল থেকে তা আবার বন্ধ করে দেওয়া হয়। তাতে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পকে পড়তে হয়েছে সীমাহীন ক্ষতির মুখে। একদিকে পর্যটন শিল্পসংশ্নিষ্টরা যেমন হারিয়েছে তাদের মুনাফা; পাশাপাশি কর্মসংস্থানহানি হয়েছে। পর্যটন শিল্পের ক্ষতিগ্রস্ত সেক্টরের মধ্যে হোটেল, মোটেল, রেস্তোরাঁ, ট্যুর অপারেটর, ট্রাভেল এজেন্সি, এয়ারলাইন্স ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাটা বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের মতে, ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত বাংলাদেশের পর্যটন খাতের সর্বক্ষেত্রে প্রায় ৯ হাজার ৭০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। হোটেল বা রিসোর্ট এবং রেস্তোরাঁয় প্রায় ২,০০০ কোটি টাকা এবং কর্মহীন প্রায় দুই লাখ ৫০ হাজার জন, ট্রাভেল এজেন্সিতে তিন হাজার কোটি টাকা এবং কর্মহীন প্রায় ১৫ হাজার জন। ট্যুর অপারেশনে চার হাজার ৫০ কোটি টাকা (ইনবাউন্ড, আউটবাউন্ড ও ডমিস্টিক) এবং কর্মহীন প্রায় ৪১ হাজার জন, পর্যটন পরিবহন ও পর্যটকবাহী জাহাজে ৫৫ কোটি টাকা এবং কর্মহীনের সংখ্যা হবে প্রায় দেড় হাজার। তবে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মতে, এই চিত্র আরও ভয়াবহ। তাদের তথ্যমতে, করোনাভাইরাস মহামারির কারণে বাংলাদেশের পর্যটন খাতে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে এবং ঝুঁকির মুখে পড়েছে প্রায় ৪০ লাখ জনবল।

বাংলাদেশে করোনার প্রকোপ কমে আসায় গত বছরের শেষদিকে দেশের বিভিন্ন স্থানে পর্যটকদের ব্যাপক সমাগম হয়। বিশেষ করে সিলেট, কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়িসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলে পর্যটকদের ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। তাতে ওইসব অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা তাদের ক্ষতির পরিমাণ কিছুটা কাটিয়ে উঠেছেন। যদিও এই সময় সঠিক স্বাস্থ্যবিধি মানার ব্যাপারে অনেকে ছিলেন উদাসীন। এর পর ২০২২ সালের শুরুতে ফের করোনার প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ায় পর্যটন খাত এখন হুমকির মুখে। তবে পর্যটনের সব স্থানে স্বাস্থ্যবিধি যাতে মানা হয়, এ ব্যাপারে কঠোর নজরদারি জরুরি। পর্যটন-সংশ্নিষ্ট সবার কাছে জীবন-জীবিকা চালিয়ে টিকে থাকা দুরূহ হয়ে পড়ছে। এ পরিস্থিতিতে পর্যটন-সংশ্নিষ্ট সব ব্যবসা টিকে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি তারা যাতে তাদের কর্মীদের বেতন-ভাতা দিতে পারে, এ জন্য প্রয়োজনীয় ব্যাংক ঋণ সহায়তা দিতে হবে। তা ছাড়া ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে করোনা মোকাবিলায় পর্যটন শিল্পের জন্য তেমন কোনো প্রণোদনা ছিল না। যদিও প্রধানমন্ত্রী এক হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন। অন্যান্য শিল্পের মতো পর্যটন খাতকেও সহায়তা প্রদান করা এখন সময়ের অন্যতম দাবি। তাছাড়া করোনা-পরবর্তী সময়ে কীভাবে এ খাতকে আরও বিকশিত করা যায়, এ জন্য প্রয়োজন দূরদর্শী কর্মপরিকল্পনা।

পর্যটন শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটি সম্ভাবনাময় অধ্যায়ের নাম। এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখা ও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া দেশের সব মানুষের দায়িত্ব। এই উন্নত প্রযুক্তির যুগে এসে করোনাভাইরাসকেও মানুষ জয় করে টিকে থাকবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ পর্যটন স্থানগুলো চালু করার জন্য নানা রকম উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, যা আমাদের ক্ষেত্রেও হতে পারে অনুকরণীয়। পাশাপাশি সচেতনতা বৃদ্ধি করতে পারলে ও প্রতিকারমূলক ব্যবস্থাগুলো যথাসম্ভব মেনে চললে করোনাভাইরাসকে আমরা জয় করতে পারব।

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া : সাবেক চেয়ারম্যান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com