প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি

প্রকাশ: ১৯ জানুয়ারি ২২ । ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সৈয়দ মাহবুবুর রশিদ

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি ১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারি শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয়। বেগম সুফিয়া কামাল ছিলেন অনন্য প্রেরণা ও উৎসাহ প্রদানকারী। বলা বাহুল্য, প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী তথা আইনজীবী, চিকিৎসক, অধ্যাপক সাংবাদিকদের ভেতর প্রখ্যাতজনরা ছিলেন না। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বিশ্বাসী রাজনৈতিক দলের নেতারা এই প্রতিষ্ঠানে সক্রিয় ছিলেন। বেশি দেরি করতে হয়নি, মাত্র ৬৮ দিনের মাথায় গণআদালত বসিয়ে রেসকোর্স ময়দানে যুদ্ধাপরাধী ও ঘাতক দালালদের শিরোমণি গোলাম আযমের বিচার করে ফাঁসি দেওয়া হয়। লাখো জনতার সমাবেশ আয়োজনে বিশাল ভূমিকা রেখেছিলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এবং তৎকালীন বিরোধী দলের নেত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। বড় বন্ধুর ছিল নির্মূল কমিটির পথ।

শহীদ জননী ক্যান্সার নিয়ে রাস্তায় নেমেছেন। পুলিশের হাতে নিগৃহীত হয়েছেন। যিনি সন্তানকে দেশের জন্য উৎসর্গ করেছিলেন, তাকে মরতে হলো রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা মাথায় নিয়ে। তবে তিনি রেখে গেছেন আদর্শ সৈনিক। নির্মূল কমিটির নিবেদিত কর্মী। সংগ্রাম চালিয়ে গেছে নির্মূল কমিটি। শেষ পর্যন্ত যুদ্ধাপরাধী এবং মানবতাবিরোধী নেতৃস্থানীয় কর্মীদের বিচার হয়েছে এবং বিচারের রায় কার্যকর হয়েছে। বিচারকার্য এখনও চলছে। তবে বিচারের রায় কার্যকরের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী অসীম সাহসের পরিচয় দিয়েছেন। কেননা, দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে কিছু কিছু দেশে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়েছিল। যেমন পাকিস্তান, তুরস্কের আঙ্কারা পৌর করপোরেশন দু'জন যুদ্ধাপরাধী এবং মানবতাবিরোধী যথা মতিউর রহমান নিজামী এবং কামারুজ্জামানের স্মৃতি রক্ষায় দুটি সড়কের নামকরণ করা হয়েছিল। নির্মূল কমিটি এর প্রতিবাদ জানায় এবং বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে। ১৯৭১ সালে বিশ্ব প্রচণ্ড স্নায়ুযুদ্ধে বিভক্ত। বস্তুত কথিত মুক্তবিশ্বের নেতৃত্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং কমিউনিস্ট বিশ্বের নেতৃত্বে সোভিয়েত রাশিয়া। তবে মুক্ত বিশ্বগ্রুপে রাষ্ট্রের সংখ্যা অনেক ভারী।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো যেসব মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানের নির্যাতন যে অন্য একটি মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর, এটাই মেনে নিল না। শেষে যখন পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধ শুরু হলো, এর মূল কারণ যে পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশ সেটাই এরা আমলে নিলো না। '৭১-এর ৩ ডিসেম্বর পাকিস্তান যখন ভারত আক্রমণ করল এবং দেখা গেল পূর্ব প্রান্তে বাংলাদেশে পাকিস্তানের অবস্থা নাজুক, তখন যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতির জন্য নিরাপত্তা পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করল, কিন্তু সেখানে বাংলাদেশের নাম নেই। অথচ ইতোমধ্যে ভারত-বাংলাদেশ যৌথবাহিনী গঠন করেছে। ৬ ডিসেম্বর ভারত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছে। নিরাপত্তা পরিষদের ভোটাভুটিতে মার্কিন পক্ষ পেল ১১ ভোট এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন ২ ভোট। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেটো প্রয়োগ করল। তখন বিষয়টি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে নেওয়া হলো। যেমন মার্কিন পক্ষ ভোট পেল ১০৪ এবং ভারত পক্ষ ১১ ভোট। এমনকি জোটনিরপেক্ষ দেশ যুগোস্লাভিয়া, মিসর, ঘানা এবং ইন্দোনেশিয়াও ভারতের পক্ষে ভোট দেয়নি; এ দফায়ও ভারত উদ্ধার পেল সোভিয়েত ভেটোর সাহায্যে। '৭১-এর আগস্টে ইন্দিরা গান্ধী সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে মৈত্রী চুক্তি করে অসাধারণ প্রজ্ঞা এবং দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছিলেন। যদি যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব অনুযায়ী যুদ্ধবিরতি হতো, তাহলে বাংলাদেশের ভাগ্যে কী ঘটত, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

তাই এই ৫০ বছর বিজয় উৎসবে আমরা তাকে একটু বেশি করে স্মরণ করতে পারি। উল্লেখ্য, পাকিস্তানিরা বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে নেওয়ার পর বিশ্বের রাষ্ট্রপ্রধানদের ভেতর তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট পদগর্নি প্রথম চিঠি লিখেছিলেন যেন বঙ্গবন্ধুর জীবন সংশয় না হয়। আমাদের এত ত্যাগ, ৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগ, একটি জাতির অবিসংবাদিত নেতার জীবন এসব কিছুই রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কমই বিবেচিত হয়েছিল। বিভিন্ন রাষ্ট্র বিক্ষিপ্তভাবে কিছু রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবী উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বঙ্গবন্ধু মুক্ত হয়ে লন্ডনে গেলে তৎকালীন বিলাতের প্রধানমন্ত্রী ম. এডওয়ার্ড হিথ প্রটোকল ভেঙে তাকে সম্মান জানিয়েছেন, আমরা সে জন্য কৃতজ্ঞ। কিন্তু ব্রিটেন রাষ্ট্র হিসেবে না নিরাপত্তা পরিষদে, না সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের পক্ষে ভোট দিয়েছে। এককথায় বলতে হয়, ২০ শতকে এত বড় একটা গণহত্যা ঘটে গেল। এর কোনো স্বীকৃতি আমাদের কপালে জোটেনি। এমনকি বাংলাদেশ সরকারও এই দাবি ওঠায়নি। নির্মূল কমিটি ২০১৭ সালে বাংলাদেশ সরকারের কাছে বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করলে প্রবীণ রাজনীতিবিদ তোফায়েল আহমেদ সংসদে বিষয়টি উপস্থাপন করেন, ২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস হিসেবে পালনের। এখন অবশ্য বাংলাদেশ সরকার চেষ্টা করছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য।

নির্মূল কমিটির কাজকর্ম এখন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রায় ২৫০টির মতো শাখা রয়েছে দেশের অভ্যন্তরে, সদস্যসংখ্যা প্রায় তিন লাখ। দেশের বাইরে ভারত, পাকিস্তান, তুরস্কসহ ১৪টি শাখা রয়েছে। পাকিস্তানের জনগণের কাছে আমাদের আবেদন এই যে, তৎকালীন পাকিস্তানের সামরিক জান্তা গণহত্যা করেছে, যা তারা গোপন রেখেছিল। আমরা সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব চাই, আমাদের পাওনা-দেনার হিসাব চাই। তা বন্ধুত্বের পরিবেশে। এর জন্য পাকিস্তানের সরকারকে বাংলার মানুষের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।

নির্মূল কমিটির ইংরেজি নামকরণ করা হয়েছে ফোরাম ফর সেক্যুলার বাংলাদেশ। আমরা জানি, বিশ্বে যদি সেক্যুলারিজম প্রতিষ্ঠিত না হয়, তাহলে আমাদের একা সেক্যুলারিজম থাকা কঠিন। আমরা 'জাগর' নামে একটি অনলাইন মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করে চলেছি। ১৪টি ছাপা হচ্ছে। কেননা, গোটা বিশ্বেই ধর্মকে নিয়ে একদল রাজনীতিক রাজনীতি করতে চাইছে। এ সমস্যা আমাদের দেশে, প্রতিবেশীসহ অন্যান্য দেশেও রয়েছে। তাই যখনই যে দেশে এরকম লক্ষণ দেখা যায়, আমরা আমাদের পত্রিকার মাধ্যমে বা অন্য কোনো ধরনের আলোচনার মাধ্যমে দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করি। কোনো দাদাগিরির চেষ্টা করা হয় না। পরম বন্ধুত্বের পরিবেশে আলাপ-আলোচনা করে সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করা হয়।

নির্মূল কমিটির যে আদর্শ, লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য- তা নিয়ে কোনো বাণিজ্য করার চেষ্টা করা হয় না, চেষ্টা তো দূরের। এ ধরনের বিষয় মাথায়ই আনা হয় না। তাই আজ দাবি করা যায়, ১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারি যে চারা রোপণ করা হয়েছিল, তা আজ বিশাল মহিরুহের আকার ধারণ করেছে। কেবল বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের অন্যান্য দেশেও এই কমিটির শাখা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও জার্মান শাখা প্রথম বছরেই গঠিত হয়। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজ্য এবং ইউরোপের ফ্রান্স, নেদারল্যান্ড, সুইডেন, ইতালি, সুইজারল্যান্ড, ডেনমার্ক, বেলজিয়াম এবং অস্ট্রেলিয়ায় নির্মূল কমিটির শাখা গঠিত হয়। যে শাখাগুলো নিয়মিতভাবে সেসব দেশের আইনপ্রণেতা, বুদ্ধিজীবী, মানবাধিকার সংগঠন ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার এবং জঙ্গি মৌলবাদের বিরুদ্ধে বক্তব্য তুলে ধরে আন্তর্জাতিক জনমত সংগঠিত করেছে এবং করছে। সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি- সর্বক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাস্তবায়ন না ঘটানো পর্যন্ত নির্মূল কমিটির এই সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে।

সৈয়দ মাহবুবুর রশিদ : সহসভাপতি, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com