করোনার নয়া ঢেউ, ফায়দা লুটছে কেউ কেউ

চট্টগ্রামে আদা, মাল্টা, লেবু, মাস্ক ও ভাইরাস প্রতিরোধক কিছু ওষুধের দামে করসাজি * জড়িত থাকতে পারে পুরোনো সিন্ডিকেট, প্রশাসন এখনও নিষ্ফ্ক্রিয়

প্রকাশ: ১৯ জানুয়ারি ২২ । ০০:০০ | আপডেট: ১৯ জানুয়ারি ২২ । ০১:৫৩ | প্রিন্ট সংস্করণ

শৈবাল আচার্য্য, চট্টগ্রাম

ছোবল বসানোর পর করোনাভাইরাসকে কাবু করতে দারুণ কার্যকর আদা চা। মাল্টা কিংবা লেবুর রসেও কিছুটা বশে আসে প্রাণঘাতী এই ভাইরাস। ভিটামিন-সি সমৃদ্ধ সিভিটও ভালো টনিক। সবার জানা এই তথ্য একটু ভালোভাবেই মগজে ঢুকিয়েছে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী। বিশ্বজুড়ে করোনা সংক্রমণ এই সময়ে আবার 'পাগলা ঘোড়া'। দেশের দ্বিতীয় রাজধানী চট্টগ্রামেও এই ভাইরাস বিছিয়েছে জাল।

এই ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণকে 'পৌষ মাস' ভেবে চট্টগ্রামের কতিপয় ব্যবসায়ী কিছু পণ্যের দামে দিচ্ছে 'কৃত্রিম হাওয়া'। কয়েক দিন আগেও বন্দরনগরীতে আমদানি করা প্রতি কেজি আদার দর ছিল ১০০ থেকে ১২০ টাকা। এখন ৪০ থেকে ৬০ টাকা বেড়ে তা হয়েছে ১৪০ থেকে ১৮০ টাকা! প্রতি কেজি মাল্টা বিক্রি হয়েছিল ১২০ থেকে ১৩০ টাকায়। এখন বিকিকিনি চলছে ১৬০ থেকে ১৮০ টাকায়। একইভাবে ৩০ থেকে ৪০ টাকার প্রতি ডজন লেবু বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকা দরে। মাস্কের দামও প্রতি প্যাকেটে বেড়েছে ৫০ থেকে ১০০ টাকা।

অসাধু ব্যবসা থেকে বাদ যাচ্ছে না জীবন রক্ষাকারী ওষুধও। বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করায় ১০ ফার্মেসি ঘুরে একটিতে মিলছে নাপা, নাপা এক্সটেন্ড, প্যারাসিটামলের মতো ওষুধ। সাধারণ সিভিটও এখন দুষ্প্রাপ্য। যদিও মেলে এক পাতা ১৮ টাকার সিভিট (ভিটামিন-সি) কিনতে খরচা হচ্ছে ৩০ থেকে ৪০ টাকা।

টানা কয়েক মাস চট্টগ্রামে করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে থাকার পর গত দুই সপ্তাহে আক্রান্ত হয়েছেন রেকর্ড সংখ্যক মানুষ। এতে দিশেহারা নগরবাসী। করোনার ঊর্ধ্বমুখীকে কাজে লাগিয়ে নকল পণ্য বিক্রি করে এরই মধ্যে এক ব্যবসায়ী কোটিপতি হয়েছেন- এমন তথ্যপ্রমাণও পেয়েছে প্রশাসন। তবে অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ব্যাপারে স্থানীয় প্রশাসন এখনও নীরব।

সরেজমিন নগরের বহদ্দারহাট বাজারের সামনে এক ক্রেতাকে দেখা গেছে বিক্রেতার সঙ্গে বাগ্‌বিতণ্ডায় জড়াতে। জানতে চাইলে ক্রেতা চাকরিজীবী রুমি সমকালকে বলেন, 'কয়েক দিন ধরে আমার স্বামীর জ্বর, কাশি-শ্বাসকষ্টসহ নানা শারীরিক সমস্যা চলছে। ওষুধের পাশাপাশি মাল্টা খাওয়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসক। মাল্টা কিনতে এসে পড়েছি বিপদে! কয়েক দিন আগে যে মাল্টা প্রতি কেজি ১৩০ টাকায় কিনেছি, সেটি নাকি এখন ১৭০ টাকা। এটা কারসাজি ছাড়া আর কিছুই নয়।' মোহাম্মদপুর এলাকার বাসিন্দা রাকিব হোসেন নামের আরেক ক্রেতা বলেন, 'দাম বাড়ানোর অন্য রকম খেলায় মেতেছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। কয়েক দিনের ব্যবধানে বেশ কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বেড়েছে কয়েক গুণ। এসব দেখার যেন কেউই নেই।'

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কানু পাল বলেন, 'কয়েকটি ফার্মেসিতে ধরনা দিয়েও নাপা-প্যারাসিটামল পাচ্ছি না। বিক্রেতারা বলছেন সরবরাহ বন্ধ। এটি বাজারে সংকট তৈরি করে বাড়তি লাভ আদায় করার কৌশল। ওষুধ না পেয়ে আমার মতো দিশেহারা হচ্ছেন অনেকে।' করোনা আক্রান্ত সন্তানের বাবা মো. ইমতিয়াজ হোসেন বলেন, 'কয়েকটি ফার্মেসিতে ঘুরেও ছেলের জন্য সিভিট কিনতে পারিনি। কয়েকটি দোকানে আছে বললেও ১৮ টাকার সিভিটের দাম চাইছে ৪০ টাকা।' প্রতিপিস কেএন-৯৫ মাস্কের দাম বেড়েছে ২০ থেকে ৪০ টাকা। মানহীন মাস্কেও মজেছে অনেকে। মাত্র পাঁচ টাকায় তিনটি মাস্ক বিক্রি করতেও দেখা যায়। মানহীন মাস্ক করোনা প্রতিরোধে সহায়ক নয় বলে মত জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের। কারসাজি করে দাম বাড়ানো হচ্ছে হ্যান্ড স্যানিটাইজার, গ্লাভস ও জীবাণুনাশকের।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক খুচরা বিক্রেতা বলেন, 'পাইকারি বাজারে মাল্টা ও লেবুর দাম বেড়ে গেছে অনেক বেশি, তাই কয়েক টাকা লাভে বিক্রি করতে হচ্ছে। বড় ব্যবসায়ীরাই কৃত্রিম সংকট ও কারসাজি করে।' নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চট্টগ্রামের এক ব্যবসায়ী নেতা বলেন, 'কয়েক গুণ বাড়তি টাকা হাতিয়ে নিতে বাজারে মাল্টার সংকট তৈরি করে দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে কিছু ব্যবসায়ী। গতবারও প্রতি কেজি মাল্টা ৮০ টাকায় কিনে তা ২০০ থেকে ২৪০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করা হয়েছিল। এবারও একই কাজ চলছে।'

এ ব্যাপারে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সুমনী আক্তার সমকালকে বলেন, 'অসাধু ব্যবসায়ীরা সব সময় সুযোগসন্ধানী। এবারও এর ব্যতিক্রম নয়। করোনার সুযোগে কারসাজি ও কৃত্রিম সংকট করে ব্যবসায়ীরা দাম বাড়াচ্ছে। বাজার তদারকি করে দ্রুত এদের চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'

ক্যাবের চট্টগ্রাম মহানগরের সভাপতি জেসমিন সুলতানা পারু বলেন, 'করোনার সংক্রমণ আবারও মাথাচাড়া দেওয়ার সুযোগে দাম বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় নেমেছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। এরই মধ্যে করোনা প্রতিরোধক ওষুধসহ নানা সামগ্রীর দাম বাড়ানোর অহরহ অভিযোগ পাচ্ছি। এ জন্য প্রশাসনের নীরবতা অনেকাংশে দায়ী।'

আদার কারসাজিতে জড়িত থাকতে পারে একই সিন্ডিকেট :করোনায় আদা চায়ের উপকারিতার প্রচারণাকে কাজে লাগিয়ে কারসাজিতে জড়িয়ে পড়ে একটি সিন্ডিকেট। গত বছরের এপ্রিলে ৮০ টাকার আদা ৩৬০ টাকায় নিয়ে যায় দেশের ভোগ্যপণ্যের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জের ওই সিন্ডিকেট। জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা একাধিক অভিযান চালান সেখানে। সব তথ্য-উপাত্ত খতিয়ে দেখে আদার দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ার পেছনে ৩২ জনের সিন্ডিকেটের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পান। এই সিন্ডিকেটে জড়িতদের মধ্যে অন্যতম হলেন আজিজ, সিরাজ, কাদের ও জিয়াউর রহমান। ২০১৯ সালে পেঁয়াজের বাজার অস্থিতিশীল করার পেছনেও জিয়াউর রহমানের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পেয়েছিল প্রশাসন। খাতুনগঞ্জের হাজী সোনা মিয়া মার্কেটে তার প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তবে চিহ্নিত হওয়ার পরও এদের ব্যাপারে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়নি প্রশাসন। এবারও দাম বাড়ার পেছনে এই সিন্ডিকেট জড়িত থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন সংশ্নিষ্টরা।





© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com