বিশাল মজুত পড়ে আছে তবু টিকাদানে গতি নেই

উচ্চ সংক্রমণের এই সময়ে স্বাস্থ্য বিভাগ হাঁটছে উল্টোপথে

প্রকাশ: ১৯ জানুয়ারি ২২ । ০০:০০ | আপডেট: ১৯ জানুয়ারি ২২ । ০২:০১ | প্রিন্ট সংস্করণ

রাজবংশী রায়

ফাইল ছবি

চলতি বছরের জানুয়ারির মধ্যে দেশের ৬৩ শতাংশ মানুষকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল সরকার; কিন্তু গত শনিবার পর্যন্ত টিকার আওতায় আনা গেছে ৫১ শতাংশ মানুষকে। টিকাদানের যে গতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তাতে চলতি মাসের অবশিষ্ট সময়ে আরও ১২ শতাংশ মানুষকে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হবে না। সুতরাং টিকাদানে সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হচ্ছে না- এটি নিশ্চিত করে বলা যায়। অথচ স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে বর্তমানে প্রায় ৯ কোটি ডোজ টিকা মজুত আছে।

প্রসঙ্গত, প্রতিদিন গড়ে ছয় থেকে আট লাখ মানুষকে টিকা দেওয়া হচ্ছে। যদিও দুই দিনে ৮০ লাখ মানুষকে টিকা দেওয়ার অভিজ্ঞতাও রয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগের। অথচ উচ্চ সংক্রমণের এই সময়ে টিকাদানে গতি বাড়ানোর বদলে স্বাস্থ্য বিভাগ হাঁটছে উল্টোপথে।

এ ঘটনার সমালোচনা করে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে দ্রুততম সময়ে মানুষকে টিকার আওতায় আনা প্রয়োজন। প্রতিদিন গড়ে ৪০ লাখ মানুষ টিকার আওতায় এলে মাসে প্রায় ১০ কোটি মানুষকে টিকা দেওয়া সম্ভব। সরকারকে দ্রুততম সময়ে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।

সংশ্নিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, টিকাদান কর্মসূচি নিয়ে এক ধরনের সমন্বয়হীনতা লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ার জন্য দায়ী। টিকাদান নিয়ে প্রচার কম। এ ক্ষেত্রে বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর মধ্যে আগ্রহও কম। তাদের সচেতন করে তোলার কার্যক্রম নেওয়ার ক্ষেত্রেও ঘাটতি রয়েছে। একই সঙ্গে শহরাঞ্চলের শ্রমজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষের একটি বড় অংশও টিকা গ্রহণের বাইরে রয়েছে।

সমকালের সঙ্গে এ ধরনের অন্তত ২০ জনের কথা হয়েছে। তাদের কয়েকজন বলেছেন, টিকা ছাড়াই তারা ভালো আছেন। করোনাভাইরাসে তারা আক্রান্ত হননি। সুতরাং টিকার প্রয়োজন নেই। আবার কেউ কেউ জানিয়েছেন, জাতীয় পরিচয়পত্র ও জন্মনিবন্ধন ছাড়া নিবন্ধনের সুযোগ না থাকায় তারা টিকা নিতে পারছেন না। কেউবা নিবন্ধনকে ঝামেলার বিষয় মনে করে টিকা গ্রহণ থেকে বিরত রয়েছেন। এভাবে মোট জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ টিকার বাইরে রয়ে গেছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি জানুয়ারি মাসের প্রথম ১৫ দিনে দেশে প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ মিলে টিকা নিয়েছেন এক কোটি ৬৯ লাখ ৭৪ হাজার ৪০৫ জন।

৯ কোটি ডোজ টিকা থাকার পরও টিকাদানে এই ধীরগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের টিকাদান কর্মসূচির সমন্বয়ক ডা. শামসুল হক সমকালকে বলেন, ফেব্রুয়ারি মাসের

মধ্যে মোট জনগোষ্ঠীর ৭০ শতাংশ টিকার আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ জন্য এখনও দেড় মাসের মতো সময় রয়েছে। এ পর্যন্ত ৫১ শতাংশ মানুষকে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। ফেব্রুয়ারির মধ্যে আরও ১৯ শতাংশ জনগোষ্ঠী টিকার আওতায় চলে আসবে। সুতরাং টিকাদানে ধীরগতি বলার সুযোগ নেই।

দক্ষিণ এশিয়ায় পিছিয়ে বাংলাদেশ :দক্ষিণ এশিয়ায় টিকাদানে পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। এগিয়ে রয়েছে কেবল আফগানিস্তান ও মিয়ানমারের চেয়ে। 'আওয়ার ওয়ার্ল্ড ইন ডেটা' ওয়েবসাইটের তথ্যানুযায়ী, দুই ডোজ করে টিকা পেয়েছেন বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৩৩ দশমিক ৭৯ শতাংশ মানুষ। ভারতে এই হার ৪৬ দশমিক ৯০ শতাংশ, পাকিস্তানে ৩৪ দশমিক ৪ শতাংশ এবং নেপালে ৩৬ দশমিক ৯ শতাংশ। অন্যদিকে শ্রীলঙ্কায় ৬৪ দশমিক ৫২ শতাংশ, ভুটানে ৭২ দশমিক ৮৩ শতাংশ এবং মালদ্বীপে ৬৭ দশমিক ৭৬ শতাংশ দুই ডোজ করে টিকা পেয়েছেন। বাংলাদেশের চেয়েও পিছিয়ে থাকা মিয়ানমারে ২৮ দশমিক ৪১ শতাংশ এবং আফগানিস্তানে ৯ দশমিক ৬০ শতাংশ মানুষ দুই ডোজ করে টিকা পেয়েছেন।

দ্বিতীয় ডোজের অপেক্ষাও বেশি :এক ডোজ করে টিকা পেয়ে বাংলাদেশে দ্বিতীয় ডোজের অপেক্ষায় আছেন ১৭ দশমিক ৫০ শতাংশ মানুষ। একমাত্র ভারত ছাড়া অন্যদের তুলনায় এ ক্ষেত্রেও পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। ভারতে দ্বিতীয় ডোজের অপেক্ষায় আছে ১৮ দশমিক ২৬ শতাংশ মানুষ। এ ছাড়া পাকিস্তানে ১১ দশমিক ২ শতাংশ, নেপালে ১২ দশমিক ৯৯ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ১০ দশমিক ৭৯ শতাংশ, ভুটানে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ, মালদ্বীপে ৫ দশমিক ২৮ শতাংশ, মিয়ানমারে ৯ দশমিক ৫৭ শতাংশ এবং আফগানিস্তানে ১ দশমিক ৪৬ শতাংশ মানুষ দ্বিতীয় ডোজের অপেক্ষায় আছেন।

টিকা এসেছে ২৩ কোটির বেশি :দেশে মোট ২৯ কোটি ডোজ টিকা আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। এর মধ্যে ২৩ কোটি ডোজের বেশি চলে এসেছে। গত শনিবার পর্যন্ত টিকা বিতরণ করা হয়েছে মোট ১৪ কোটি ৩৪ লাখ ৪০ হাজার ৮৭৪ ডোজ। এখনও প্রায় ৯ কোটি ডোজ মজুত আছে।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, সরকার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছ থেকে অর্থ ভাগাভাগির মাধ্যমে সাড়ে ১০ কোটি ডোজ টিকা কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে চীন থেকে সরাসরি চুক্তির মাধ্যমে কেনার চেয়ে অর্থ ব্যয় কিছুটা কম হবে। এর মধ্যে চীনের সিনোফার্মের তিন কোটি ডোজ এবং চীনের অন্য একটি টিকা সিনোভ্যাকের সাড়ে সাত কোটি ডোজ টিকা রয়েছে। এই টিকার কিছু অংশ পাওয়া গেছে। আগামী মার্চ থেকে এপ্রিলের মধ্যে পুরো টিকা পাওয়া যাবে। এর বাইরে কোভ্যাক্সের মাধ্যমে টিকা পাওয়া গেছে। বাকি থাকা টিকাও চলতি জানুয়ারির মধ্যে সরবরাহ করার কথা রয়েছে। এভাবে ২৫ কোটি টিকা চলে আসবে। এ ছাড়া ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে কেনা টিকার বাকি দুই কোটির বেশি এবং বিভিন্ন দেশ থেকে উপহারের প্রতিশ্রুত আরও এক কোটি ডোজ টিকা পাওয়া যাবে। সব মিলিয়ে ২৯ কোটি ডোজ টিকা আসবে। এই প্রক্রিয়ায় পর্যায়ক্রমে সবাইকে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হবে বলে জানান তিনি।

গতি বাড়ানোর তাগিদ বিশেষজ্ঞদের :বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, করোনার নতুন ধরন মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় টিকাদানে গতি বাড়াতে হবে। আগে টিকা না থাকায় মানুষকে দেওয়া যায়নি। কিন্তু এখন ৯ কোটি ডোজ টিকা মজুত থাকার পরও কেন সেগুলো দ্রুত বিতরণ করা হচ্ছে না? দেশে তো দুই দিনে ৮০ লাখ মানুষকে টিকা দেওয়ার অভিজ্ঞতা আছে। তাহলে কেন তেমন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না?

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, সংক্রমণ যে হারে বাড়ছে তাতে কয়েকদিনের মধ্যে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। সুতরাং সরকারের উচিত ছিল টিকাদানে গতি বাড়ানো; কিন্তু সেটি হচ্ছে না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে বলা হচ্ছে, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে তিন কোটি ডোজ করে দেওয়া হবে। কিন্তু সেটি এক মাসে বিতরণ করলে তো কোনো সমস্যা নেই। স্বাস্থ্য বিভাগের যে সক্ষমতা রয়েছে তাতে এক মাসে ১০ কোটি মানুষকে টিকা দেওয়া যায়। সেটি কেন করা হচ্ছে না? সরকারের উচিত জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেওয়া। না হলে বিপদ বাড়বে।


© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com