মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক

ওয়াশিং-ডাইংয়ে বিষাক্ত বুড়িগঙ্গা

প্রকাশ: ১৯ জানুয়ারি ২২ । ১৫:১১ | আপডেট: ১৯ জানুয়ারি ২২ । ১৬:০৮

জাহিদুর রহমান

কাপড় রং করতে প্রতিদিনি ২৫-৩০ হাজার লিটার পানি ব্যবহার হয়। এরপর ওই পানি বুড়িগঙ্গায় গিয়ে পড়ে। ছবি: সমকাল। ।

রাজধানীর হানিফ ফ্লাইওভার ধরে শ্যামপুরের উদ্দেশে যাত্রা। কদমতলী পার হয়ে শ্যামপুরের কাছাকাছি গেলেই নাকে আসে উৎকট গন্ধ। সামনে ধলেশ্বর গুদারা ঘাট। বুড়িগঙ্গা নদী সামান্য দূরে। নদীর কাছাকাছি যতই যাই, দুর্গন্ধও বাড়তে থাকে। ধলেশ্বর গুদারা ঘাটে গিয়ে উৎকট গন্ধে দাঁড়ানো যাচ্ছে না। মাস্ক ভেদ করে গন্ধ আসছে নাকে। নদীর পাড়ে গিয়ে দেখা গেল ভয়ঙ্কর অবস্থা। নদীর বুকে সরাসরি এসে পড়ছে শ্যামপুর শিল্পাঞ্চলের বর্জ্য মিশ্রিত রঙিন পানি। পাশেই শ্যামপুর ফায়ার স্টেশন ঘাট। শ্যামপুরে আছে ডায়িং (রং), বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্যের কারখানা।  নদীর পানির যতটুকু চোখে পড়ে, তা মিশমিশে কালো। দু’পাশে আবর্জনার স্তূপ। 

এখানে কথা হয় স্থানীয় ব্যবসায়ী আব্দুল জলিলের সঙ্গে। তিনি বলেন, এভাবে কারখানার পানি সব সময়ই পড়ে। কেউ কিছু বলে না। 

ডিঙি নৌকার মাঝি আরিফুর রহমান অতীত স্মৃতি মেলে ধরে বলেন, ‘৩০ বছর আগেও বুড়িগঙ্গার পানি ফকফকা আছিল। এখন কালা কুচকুচা। হাজারীবাগের ট্যানারি সরকার উঠায়া নিছে। ডাইং কবে উঠায়া নিব? ফাল্গুন-চইত মাস আইতে দ্যান, পানি আঠার মতো হইয়া যাইব। তখন আইসেন, খাড়াইতে পারবেন না।’

বুড়িগঙ্গার পানিতে রাসায়নিক অক্সিজেন চাহিদা বা সিওডি আদর্শমান ৪ এর চেয়ে বহুগণ বেশি। ছবি: সমকাল।

বুড়িগঙ্গার দূষণের এমন চিত্র নতুন নয়। বুড়িগঙ্গা বাঁচাতে ট্যানারি শিল্প স্থানান্তর হয়েছে বহু আগে। কিন্তু গত কয়েক বছরে সেই দূষণের মাত্রা কতটা বেড়েছে, মঙ্গলবার তা পরিমাপ ও পর্যবেক্ষণের কাজে নামে ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ। তাদের একটি বিশেষজ্ঞ দল ধলেশ্বর গুদারা ঘাটের আশপাশের কয়েক কিলোমিটার এলাকা ঘুরে দেখেন। 

তখন বেলা সাড়ে ১১টা। ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশের দলটির সঙ্গে ট্রলারে শুরু হয় যাত্রা। কয়েক জায়গায় থামে ট্রলার। কেরানীগঞ্জ-শ্যামপুর অংশের তিনটি পয়েন্টে ওয়াশিং এবং ডাইং কারখানার রঙিন বর্জ্য সরাসরি নদীতে এসে পড়ছে। 

কেরানীগঞ্জের অংশে কথা হয় ৭০ বছরের বৃদ্ধ জেলে আব্দুল হকের সঙ্গে। তিনি বলেন, ডাইং বুড়িগঙ্গা শেষ করে দিল। দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা লাল-নীল বিষাক্ত পানি পড়ছে বুড়িগঙ্গায়।

দুপুরে বুড়িগঙ্গার বুকেই ট্রলারে সংবাদ সম্মেলন করে ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ। ইউএসএআইডি, এফসিডিও এবং কাউন্টারপার্ট ইন্টারন্যাশনালের সহায়তায় দূষণবিরোধী অ্যাডভোকেসি প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভুগোল ও পরিবেশ বিভাগ এবং স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের বায়ুমন্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রকে (ক্যাপস) সঙ্গে নিয়ে কনসোর্টিয়াম গঠন হয়।

ছবিতে ঢেউ দেখে পানির রং বদলে যাওয়ার বিষয়টি বুঝা যায়। ছবি: সমকাল। 

তারা সংবাদ সম্মেলনে জানায়, গত বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বর্ষার আগে, বর্ষা ও বর্ষার পর শ্যামপুরের পানি পরীক্ষা করা হয়েছে। তিন ঋতুতে রাসায়নিক অক্সিজেন চাহিদা বা সিওডি যথাক্রমে ১৯০, ২২৭ ও ২৭৬। যা আদর্শমান ৪ এর চেয়ে বহুগণ বেশি। এ সময়ে জৈবিক অক্সিজেন চাহিদা বা বিওডি’র পরিমাণ যথাক্রমে ৮৭, ৭২ ও ১০৬। যা আদর্শমান ০.২ এর তুলনায় অনেক বেশি। পানিতে অ্যাম্যোনিয়ার পরিমাণ তিন ঋতুতে ৪.৮, ৪.২ ও ২.৮, যা আদর্শমান ০.৫ এর চেয়ে বেশি। শ্যামপুরের পানিতে উচ্চমাত্রার তেল ও গ্রিজ পাওয়া গেছে। তিন ঋতুতে তেল ও গ্রিজের পরিমাণ যথাক্রমে ২.৬, ১.৯ ও ৫.৬। পানিতে তেল ও গ্রিজের আদর্শমান ০.০১। এ ছাড়া ফেনলের উপস্থিতি পাওয়া গেছে ০.১৪, ০.৪৩৫ ও ০.২, যা আদর্শমান ০.০০২। এ ছাড়া টোটাল সাসপেন্ডেবল সলিডস (টিএসএস) পাওয়া গেছে ১০৮, ৫৭ ও ১৯৫। পানিতে টিএসএস এর আদর্শ মান ১০। টিএসএস পানিতে দ্রবীভূত হয় না এবং পানির নিচে নদীর তলদেশে পাতলা আস্তরণ সৃষ্টি করে। যা জলজ উদ্ভিদের বিকাশে বাধা দেয়।

গবেষণা দলের নেতা স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার সমকালকে বলেন, বিশ্বব্যাংক ৭২টি রাসায়নিক উপাদানকে বিষাক্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যা শুধু টেক্সটাইল ডাইং থেকে তৈরি হয়। এগুলো একবার পানিতে মিশলে নদীতে আলো প্রবেশ করতে পারে না। উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষণের ক্ষমতা হারায়। বুড়িগঙ্গার পানিতে ক্ষতিকর সবগুলো উপাদান পাওয়া গেছে। এগুলো জলজ প্রাণী ও মানবস্বাস্থ্যের জন্যও হুমকি। এই চিত্র এটাই প্রমাণ করে যে বুড়িগঙ্গার দূষণ আরও বিস্তৃত হচ্ছে।

সংবাদ সম্মেলনে ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশের সমন্বয়ক শরীফ জামিল বলেন, শ্যামপুরে বুড়িগঙ্গার পানির দূষণ পরীক্ষা করে দেখার দরকার পড়ে না। পানির দিকে তাকালেই দেখা যায় রং গোলাপী। ডায়িং শিল্প বন্ধ চাই না, চাই টেকসই উন্নয়ন। আমরা চাই নদী আবার আগের রূপে ফিরে আসুক। ডাইং কারখানার বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলা বন্ধ করতে হবে। কারখানাগুলোকে বর্জ্য শোধনাগার স্থাপন করতে হবে। 

প্রতিদিন ৩০ হাজার ঘনমিটারেরও বেশি অপরিশোধিত তরল বর্জ্য নদীতে যাচ্ছে সরাসরি। ছবি: সমকাল। 

ঢাকার কেরানীগঞ্জের শতাধিক ওয়াশিং কারখানার মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিনি ২৫-৩০ হাজার লিটার পানি ব্যবহার হয় এসব কারখানায়। কাপড় রং করার পর এসব পানি গিয়ে পড়ে বুড়িগঙ্গায়। এ হিসেবে এখানকার কারখানাগুলো থেকে প্রতিদিন অন্তত ১৮ লাখ লিটারের বেশি বিষাক্ত তরল বর্জ্য মিশছে বুড়িগঙ্গায়। শ্যামপুর শিল্প এলাকার শতাধিক প্রিন্টিং, নিট, ডায়িং কারখানা থেকে প্রতিদিন বের হয় ৩০ হাজার ঘনমিটারেরও বেশি অপরিশোধিত তরল বর্জ্য, যা নদীতে যাচ্ছে সরাসরি। 

গত বছরের জানুয়ারি মাসে কেরানীগঞ্জের ৩০টি ওয়াশিং প্ল্যান্টসহ বুড়িগঙ্গার পানি দূষণের জন্য দায়ী ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও কারখানার বিরুদ্ধে মামলা করতে পরিবেশ অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেয় হাই কোর্ট। পরিবেশ অধিদপ্তর একাধিকবার এই এলাকায় দূষণবিরোধী অভিযান চালালেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। বরং অভিযান একাধিকবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। 

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শ্যামপুর-কদমতলী শিল্প সমিতির এক নেতা জানান, ১০ বছর আগে তাদের এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ঢাকা পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশন (ওয়াসা) কর্তৃপক্ষকে কারখানার বর্জ্য শোধনে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু ওয়াসার পক্ষ থেকে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com