আইন-আদালত

জুডিশিয়াল সার্ভিস পরীক্ষা ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীর অধিকার

প্রকাশ: ২০ জানুয়ারি ২২ । ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মো. রেজাউল করিম সিদ্দিকী

সুদীপ দাস একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে এলএলবি (সম্মান) ও এলএলএম সম্পন্ন করে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন (বিজেএসসি) নিয়ন্ত্রিত বিচারক নিয়োগ পরীক্ষায় পরপর চারবার অংশগ্রহণের চেষ্টা করেছেন। কোনো পরীক্ষাতেই শ্রুতিলেখকের সহায়তায় পরীক্ষা দেওয়ার অনুমতি পাননি। সর্বশেষ ১৪তম বিজেএসসি পরীক্ষায় বৈষম্যমূলক পদ্ধতির বিরুদ্ধে নীরব প্রতিবাদ হিসেবে ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১ পরীক্ষার হলে প্রবেশ করেন ও সাদা খাতা জমা দিয়ে বেরিয়ে আসেন।

সংবিধানের ২৯(১) অনুচ্ছেদে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগের ক্ষেত্রে সব নাগরিকের সমান সুযোগ লাভের কথা পরিস্কারভাবে বলা হয়েছে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা কর্মে নিয়োগের ক্ষেত্রে সমান সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন- এমন কোনো কাজ করা, আইনি বিধান তৈরি করা অসাংবিধানিক ও মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকারবিষয়ক জাতিসংঘ সনদ তথা সিআরপিডির অন্যতম পক্ষরাষ্ট্র বাংলাদেশ। এই সনদে অনুস্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র হিসেবে সনদের ৪ নম্বর অনুচ্ছেদ মোতাবেক সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রতিবন্ধিতার ভিত্তিতে বৈষম্য পরিহারে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ বাংলাদেশের দায়িত্ব। সনদের ২৭ নম্বর অনুচ্ছেদ মোতাবেক কর্মে নিয়োগের শর্তাবলি থেকে প্রতিবন্ধিতার ভিত্তিতে বৈষম্য বিলোপ করাও অনুস্বাক্ষরকারী দেশের অন্যতম দায়িত্ব। ওই সনদের আলোকে সরকার প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩ প্রণয়ন করেছে। এ আইনের ১৬(১)(ঝ) ধারা মোতাবেক প্রত্যেক প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সরকারি ও বেসরকারি কর্মে নিযুক্তির অধিকার রয়েছে। আইনের ৩৫ ধারায় বলা হয়েছে, যোগ্যতা থাকা সাপেক্ষে প্রতিবন্ধিতার ধরন অনুযায়ী উপযোগী কোনো কর্মে নিযুক্ত হতে কোনো প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে বঞ্চিত বা তার প্রতি বৈষম্য বা তাকে বাধাগ্রস্ত করা যাবে না। অর্থাৎ বাংলাদেশের প্রচলিত আইন মোতাবেক যে কোনো নিয়োগ পরীক্ষা পদ্ধতি সব ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তির উপযোগী হতে হবে। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শ্রুতিলেখকের সহযোগিতায় পরীক্ষায় অংশগ্রহণের আইনগত অধিকার রয়েছে।

বিজেএসসি শ্রুতিলেখকের অনুমোদন না দেওয়ার কারণ হিসেবে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (সার্ভিস গঠন, সার্ভিস পদে নিয়োগ এবং সাময়িক বরখাস্তকরণ, বরখাস্তকরণ ও অপসারণ) বিধিমালা, ২০০৭-এর বিধি ৫-এর ৪ উপবিধি এবং বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসের প্রবেশপদে নিয়োগবিষয়ক আদেশ, ২০০৭-এর অনুচ্ছেদ ১০ এর উপ-অনুচ্ছেদ ৩-এর কথা উল্লেখ করেছে। এ দুটি আইনি বিধান হলো প্রার্থীর স্বাস্থ্যগত যোগ্যতা সংক্রান্ত। প্রিলিমিনারি, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরে তথা সব রকম মূল্যায়ন শেষে নিয়োগের জন্য বাছাইকৃত প্রার্থীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার সময় এ দুটি বিধানের প্রাসঙ্গিকতা তৈরি হয়। স্বাস্থ্য পরীক্ষার পরে প্রত্যয়ন দেওয়ার এখতিয়ারও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কর্তৃক গঠিত মেডিকেল বোর্ডের হাতে ন্যস্ত। স্বাস্থ্য পরীক্ষার আগেই কোনো প্রার্থীকে স্বাস্থ্যের কারণে অযোগ্য ঘোষণা করার এখতিয়ার বিজেএসসির নেই। বিচারকের কাজ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি করতে পারবেন কিনা, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়ার এখতিয়ার জাতীয় সমন্বয় কমিটির ওপর ন্যস্ত। বিজেএসসি বা আইন মন্ত্রণালয় এতদ্‌বিষয়ে সমন্বয় কমিটির কাছ থেকে পরামর্শ না নিয়ে নিজেরাই সিদ্ধান্ত গ্রহণের এখতিয়ার রাখে না।

প্রাগুক্ত আলোচনায় এটি প্রতীয়মান, বিজেএসসি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিচারক হওয়ার পথটি অন্যায়, অযৌক্তিক ও বেআইনিভাবে রুদ্ধ করে রেখেছে। সুদীপকে শ্রুতিলেখকের সহায়তায় নিয়োগ পরীক্ষায় বসার অনুমতি না দিয়ে বিজেএসসি একদিকে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইনের ১৬(১)(ঝ), ১৬(১)(ড), ৩৫(১) ও ৩৬(১) ধারা লঙ্ঘন করেছে; অন্যদিকে জাতীয় সমন্বয় কমিটি ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাতে ন্যস্ত ক্ষমতাও এখতিয়ারবহির্ভূতভাবে ব্যবহার করেছে।

বাংলাদেশের বিচার বিভাগ অত্যন্ত শক্তিশালী এবং ক্রমেই আধুনিক হয়ে উঠছে। উচ্চ আদালত ও অধস্তন আদালতে কর্মরত প্রায় দুই হাজার বিচারিক কর্মকর্তার নিষ্ঠা, দক্ষতা, একাগ্রতা ও নিরলস প্রচেষ্টায় বিচার বিভাগ পৃথক্‌করণের ১৪ বছরের মধ্যেই গণমানুষের ন্যায়বিচারের অভিগম্যতা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩ প্রণয়নের আট বছর পরেও বিচারক নিয়োগের দায়িত্বে থাকা সংস্থাটি প্রচলিত আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক আচরণ করায় বিচার বিভাগের গৌরব ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।

সুদীপ দাস উচ্চ আদালতে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠায় একটি রিট মামলাও (রিট পিটিশন নং ৮০৯০/২০২১) করেছিলেন, যদিও মহামান্য আদালত তার আবেদনটি খারিজ করে দিয়েছেন। প্রত্যাশা করি, তিনি আপিল বিভাগে ন্যায়বিচার পাবেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের মেধাবী ছাত্র দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি স্বপন চৌকিদারও এর আগে বিজেএসসি পরীক্ষায় শ্রুতিলেখক পাননি। এতদ্‌প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কতিপয় সংগঠন উচ্চ আদালতে একটি জনস্বার্থ মামলা (রিট পিটিশন নং ২৮৬৭/২০১০) করে। মামলার পর ১১ বছর অতিক্রান্ত হলেও সে মামলার এখনও নিষ্পত্তি হয়নি।

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা পাবলিক সার্ভিস কমিশনসহ বিভিন্ন সরকারি নিয়োগ পরীক্ষায় শ্রুতিলেখক নিয়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করছেন এবং সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে চাকরি করছেন। তাহলে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের অধীনে অনুষ্ঠিত নিয়োগ পরীক্ষায় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা শ্রুতিলেখকের সহযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ কেন পাবেন না?

কর্মসংস্থান বিষয়ে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মাঝে চরম সংকট, উদ্বেগ ও হতাশা বিরাজ করছে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা লাভের পরও তরুণ প্রতিবন্ধী ছেলেমেয়েরা চাকরি পাচ্ছে না। প্রতিবন্ধিতার সঙ্গে বেকারত্বের গ্লানি যুক্ত হয়ে তরুণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সামাজিক জীবন অমানবিক ও দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।

পাকিস্তান, কেনিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা উচ্চ আদালত ও অধস্তন আদালতে কৃতিত্বের সঙ্গে বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের বিচার বিভাগে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়োগের ক্ষেত্রে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা অপসারণ করা হবে- এটাই প্রত্যাশা।

মো. রেজাউল করিম সিদ্দিকী সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী
advreja@gmail.com

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com