ইসির খসড়া আইনে ঘুরেফিরে ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর হাতেই

প্রকাশ: ২০ জানুয়ারি ২২ । ০০:০০ | আপডেট: ২০ জানুয়ারি ২২ । ০১:৪৭ | প্রিন্ট সংস্করণ

মসিউর রহমান খান

নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনের জন্য প্রণীত আইনের খসড়ায় অনুসন্ধান বা সার্চ কমিটির কাঠামো এবং কমিশনারদের যোগ্যতা-অযোগ্যতা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। পাঁচজন কমিশনার নিয়োগে প্রতি পদের বিপরীতে সার্চ কমিটি দু'জনের নাম সুপারিশ করতে পারবে। রাষ্ট্রপতির কাছে তারা সরাসরি এই সুপারিশ পাঠাবে। সার্চ কমিটি গঠনের সর্বোচ্চ ১০ কার্যদিবসের মধ্যে সুপারিশ পাঠাতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতির নিয়োগ ছাড়া অন্য কোনো কাজে রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বাকি সব কাজ রাষ্ট্রপতির নামে পরিচালিত হলেও নির্বাহী বিভাগের প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ নিয়ে করতে হবে। তাই ঘুরেফিরে ইসি নিয়োগের সব ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর হাতেই থাকছে।

বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহ্‌দীন মালিক বলেন, নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে দেওয়া প্রস্তাবে কমিটিতে সংসদ নেতা ও বিরোধীদলীয় নেতার মনোনীত একজন করে সংসদ সদস্য এবং সংসদের তৃতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের মনোনীত একজন সংসদ সদস্য রাখার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পাওয়া খসড়া আইনে রাষ্ট্রপতির মনোনীত দু'জন বিশিষ্ট নাগরিক রাখার কথা বলা হয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে রাষ্ট্রপতিকে এ দুই সদস্য মনোনীত করতে হবে।

এর আগে ড. শামসুল হুদা কমিশনের প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, সার্চ কমিটি প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রতিটি পদের বিপরীতে তিনজনের নাম প্রস্তাব করবেন। পরে সংসদের কার্য-উপদেষ্টা কমিটি (সরকার ও বিরোধী দলের সমন্বয়ে) তা পরীক্ষা করে বিবেচনার জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠাবেন।

স্পিকারকে সভাপতি করে সংসদের কার্য-উপদেষ্টা কমিটি গঠন করা হয়ে থাকে। সংসদ নেতা, বিরোধীদলীয় নেতাসহ সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী অন্য দলগুলোর সিনিয়রদের এই কমিটির সদস্য করা হয়। বর্তমানেও কার্য-উপদেষ্টা কমিটিতে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, বিএনপি, ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদসহ প্রায় সব দলের সদস্য রয়েছেন।

এ বিষয়ে সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, মন্ত্রিসভায় পাস হওয়া খসড়া আইনে রাষ্ট্রপতির হাতে ক্ষমতা দেওয়া মানে ঘুরেফিরে প্রধানমন্ত্রীর হাতেই ক্ষমতা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। যদিও আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছিলেন, সংসদকে পাশ কাটিয়ে তিনি এত বড় আইন করতে চান না।

কিন্তু খসড়া আইনে সার্চ কমিটিতে সংসদ সদস্যদের ভূমিকার সুযোগ রাখা হয়নি।

গত সোমবার মন্ত্রিসভায় এ-সংক্রান্ত 'প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইন, ২০২২' নীতিগতভাবে চূড়ান্ত অনুমোদন পায়। সংশ্নিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং সাপেক্ষে বিলটি সংসদে পাঠানোর কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু নিয়মানুযায়ী কোনো বিলে অর্থ খরচের বিষয় থাকলে সংসদে যাওয়ার আগে রাষ্ট্রপতির সম্মতির প্রয়োজন। গতকাল বুধবার বিলটি রাষ্ট্রপতির সম্মতির জন্য বঙ্গভবনে পাঠানো হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার অথবা আগামী রোববার বিলটি সংসদের আইন শাখায় পৌঁছতে পারে।

আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি কে এম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন বর্তমান ইসির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। এর আগেই রাষ্ট্রপতিকে নতুন ইসির নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সংসদের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, খুব দ্রুত আইন পাসের অনেক নজির বর্তমান সংসদের রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সংসদীয় কমিটিতে না পাঠিয়েও বিল পাস হয়েছে। এই বিলটি দ্রুতই পাস হবে বলে তারা ধারণা করছেন। সে ক্ষেত্রে সংসদীয় কমিটিতে নাও পাঠানো হতে পারে। ফলে আইন সভার সদস্যরা এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা বা মতামত প্রদানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।

বিগত দুই সার্চ কমিটি ও ইসি গঠনের ভূতাপেক্ষ আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে খসড়ায়। বলা হয়েছে, আগের সার্চ কমিটি গঠন ও কমিশনারদের নিয়োগ বৈধ হিসেবে বিবেচিত হবে। খসড়া আইনে নির্বাচন কমিশন আইনটির প্রয়োগের জন্য একটি বিধি প্রণয়নের ক্ষমতাও সরকারের হাতে রাখার কথা বলা হয়েছে।

এর আগে ২০১২ সালের ২১ জানুয়ারি ও ২০১৭ সালের ২৫ জানুয়ারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে দুটি সার্চ কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ওই সার্চ কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে সাবেক সিইসি ড. কাজী রকিবউদ্দীন ও বর্তমান সিইসি কে এম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন দুই কমিশন গঠিত হয়। তাদের অধীনে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন নির্বাচন নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নানা ধরনের অভিযোগ ওঠে। এমনকি বর্তমান কমিশনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে তদন্তের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠনের দাবি জানায় দেশের বিশিষ্ট নাগরিক।

খসড়া আইনে বলা হয়েছে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ দিতে একটা ছয় সদস্যের অনুসন্ধান (সার্চ) কমিটি গঠন করা হবে। রাষ্ট্রপতির অনুমোদনে গঠিত অনুসন্ধান কমিটি কমিশনার পদের জন্য যোগ্য প্রার্থীদের নাম সুপারিশ করবে। রাষ্ট্রপতি উপযুক্তদের নিয়োগ দেবেন। এতে সাচিবিক সহযোগিতার দায়িত্ব পালন করবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।

খসড়ায় আরও বলা হয়েছে, প্রধান বিচারপতি মনোনীত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একজন বিচারক এই কমিটির সভাপতি হবেন এবং হাইকোর্ট বিভাগেরও একজন বিচারক থাকবেন। এ ছাড়া কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল, পিএসসির চেয়ারম্যান এবং রাষ্ট্রপতি মনোনীত দু'জন বিশিষ্ট নাগরিক সার্চ কমিটির সদস্য থাকবেন। সার্চ কমিটি নিজেরাই সভার কার্যপদ্ধতি নির্ধারণ করবেন বলেও এতে উল্লেখ করা হয়েছে। ছয় সদস্যের এই কমিটির তিনজনের উপস্থিতিতে সভার কোরাম পূর্ণ হবে। সভায় উপস্থিত সদস্যদের ভোটের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবে। ভোটাভুটির ফল সমান হলে সভাপতিত্বকারী সদস্য দ্বিতীয় বা ফল নির্ণায়ক ভোট দেওয়ার ক্ষমতা থাকবে।

অনুসন্ধান কমিটির কার্যাবলিতে বলা হয়েছে- অনুসন্ধান কমিটি স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার নীতি অনুসরণ করে দায়িত্ব পালন করবে। আইনে বর্ণিত যোগ্যতা, অযোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, সততা ও সুনাম বিবেচনা করে সিইসিসহ অন্য কমিশনারদের নিয়োগের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ করবে। রাজনৈতিক দল ও পেশাজীবী সংগঠনের কাছ থেকেও নাম আহ্বান করা যাবে।

বিদ্যমান দুদক আইনেও দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান এবং কমিশনার নিয়োগে সার্চ কমিটি গঠনের বিধান রয়েছে। দুদকের সার্চ কমিটিও সিইসি এবং ইসির প্রস্তাবিত সার্চ কমিটির মতোই। আপিল বিভাগের বিচারপতিকে সভাপতি করে হাইকোর্টের বিচারপতি, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যান এবং সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সমন্বয়ে দুদকের সার্চ কমিটি হয়। দুদকের এ সার্চ কমিটি পাঁচ সদস্যের। এ কমিটিকেও সাচিবিক সহায়তা দেয় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com