কখনও আয়েশা বা সামিরা, কখনও শ্রেয়া কিংবা মারিয়া

প্রকাশ: ২০ জানুয়ারি ২২ । ১৩:৪২ | আপডেট: ২০ জানুয়ারি ২২ । ১৩:৫০

রাসেল আজাদ বিদ্যুৎ

নুসরাত ফারিয়া ছবি: বিশ্বরঙ

কথার জাদুতে মুগ্ধ করে রাখতে দারুণ পারদর্শী নুসরাত ফারিয়া। তাই তো উপস্থাপনায় আসার পর দর্শক মনোযোগ কাড়তে সময় লাগেনি। এরপর অভিনেত্রী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে না করতে দর্শক আলোচনায় উঠে আসে তার নাম। মডেল হিসেবেও জায়গা করে নিয়েছেন তারকার প্রথম সারিতে। কণ্ঠশিল্পী হিসেবেও তাকে নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা কম হয়নি। এত কিছুর পর এবার নুসরাত ফারিয়া আইন বিষয়ে পড়াশোনার পাট চুকিয়ে আরেকটি নতুন পরিচয়ে উপস্থিত হয়েছেন। এখন দেখার অপেক্ষা, আইনি লড়াইয়ে কবে মাঠে নামেন জনপ্রিয় এই তরকা। সেটা জানতে চাইলেই ফারিয়া হেসে বলেন, 'এখনই এসব নিয়ে ভাবছি না। সবেমাত্র ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন থেকে ব্যাচেলর অব ল পাস করলাম। সেই সুবাদে শিক্ষাজীবন থেকে কিছুটা চাপমুক্ত হয়েছি। এটাই ভালো লাগা। এরপর কী করব, না করব- সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার যথেষ্ট সময় হাতে আছে। আপাতত অভিনয় নিয়ে ভাবতে চাই।'

 অভিনয় নিয়েই যখন ফারিয়ার সব ভাবনা, তখন একটু নজর দেওয়া প্রয়োজন এই সময়ে তার ব্যস্ততা কী নিয়ে। অবশ্য অনেকের জানা হয়ে গেছে, এরই মধ্যে ফারিয়া পরিচালক দীপংকর দীপনের 'অপারেশন সুন্দরবন' ছবির কাজ শেষ করে ফেলেছেন। শ্যাম বেনেগালের 'বঙ্গবন্ধু' ছবির কাজও অনেকটাই শেষ। যেখানে ফারিয়াকে দেখা যাবে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার তরুণ বয়সের চরিত্রে। অন্যদিকে অভিনেতা ইয়াশ রোহানের সঙ্গে জুটি বেঁধে অভিনয় করতে যাচ্ছেন 'পর্দার আড়ালে' নামে ওয়েব ছবিতে। ছবিটি নির্মাণ করছেন পারভেজ আমিন। নতুন প্রতিটি ছবিতেই ভিন্ন রূপে দেখা মিলবে এই অভিনেত্রীর। ফারিয়া নিজেও তা স্বীকার করেছেন।

তার কথায়, 'পর্দায় নিজেকে নতুনরূপে তুলে ধারার জন্য যে ধরনের চরিত্র খুঁজছিলাম, তা পেয়েছি 'অপারেশন সুন্দরবন' ও 'পর্দার আড়ালে' ছবিতে। এর মধ্যে আরও কিছু ছবির বিষয়ে কথা হয়েছে। তবে যে কাজই হাতে নিই না কেন, তার গল্প, চরিত্র যাচাই-বাছাই করেই নির্বাচন করতে চাই।' তার এই কথায় স্পষ্ট, প্রস্তাব পেলেই যে কোনো কাজ করার পক্ষে তিনি নন। ফারিয়া এও স্বীকার করছেন, 'বঙ্গবন্ধু' ছবিতে কাজ করার পর অভিনয়ের বিষয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গি অনেক বদলে গেছে। তার কথায়, "কমবেশি সব শিল্পীর প্রথম চাওয়া থাকে তার অভিনীত চরিত্র যেন দর্শকের মনে ছাপ ফেলে এবং তা অনেক দিন বেঁচে থাকে তাদের হৃদয়ে। 'বঙ্গবন্ধু' তেমনই একটি ছবি, যার মধ্য দিয়ে আমি এবং আরও যারা কাজ করেছেন, সবাই ইতিহাসের একটি অংশ হয়ে থেকে যাবেন। এই ছবিতে শেখ হাসিনার তরুণ বয়সের চরিত্রে অভিনয় করতে পেরে নিজেকে ভাগ্যবান বলে মনে হয়েছে। ভালো লাগার আরেকটি বিষয় হলো, এই ছবির সূত্র ধরে গুণী নির্মাতা শ্যাম বেনেগালের কাছে অনেক কিছু শেখার সুযোগ হয়েছে। এখন তাই প্রতীক্ষার প্রহর গুনে যাচ্ছি, কবে আসবে সেই কাঙ্ক্ষিত ক্ষণ, যেদিন সবার সঙ্গে 'বঙ্গবন্ধু' ছবিটি দেখার সুযোগ হবে।"

একটু পেছন ফিরে তাকালে আমরা দেখি, রোমান্টিক নায়িকার ইমেজ থেকে বেরিয়ে আসতে ফারিয়া খুব একটা সময় নেননি। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ প্রযোজনার ছবি 'আশিকী' দিয়ে বড় পর্দায় অভিষেক হয়েছিল ফারিয়ার। তার আগে থেকেই নানা ধরনের টিভি অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করে দর্শকের মনোযোগ কেড়েছিলেন তিনি। যে জন্য প্রথম ছবি থেকেই দর্শকের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল ফারিয়াকে নিয়ে। সেই প্রত্যাশা পূরণের জন্য এরপর ধারাবাহিকভাবে অভিনয় করেছেন 'হিরো ৪২০', 'বাদশা- দ্য ডন', 'ধ্যাততেরিকি', 'প্রেমী ও প্রেমী', 'বস-২', 'ইন্সপেক্টর নটি কে', 'শাহেনশাহ' ছবিগুলোয়। যেখানে প্রতিনিয়ত নিজেকে ভেঙে নতুনভাবে পর্দায় তুলে ধরার চেষ্টা ছিল তার। তাই ফারিয়ার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, যখন কোনো চরিত্রে অভিনয় করেন, তখন বিষয়গুলো কীভাবে প্রাধান্য দেন। এর জবাবে ফারিয়া বলেন, "যে কোনো কাজের প্রথম শর্ত থাকে গল্প ভিন্ন ধরনের কিংবা সময়োপযোগী হতে হবে। ইতিহাসনির্ভর কাজ করতেও আপত্তি নেই। তবে তার আগে নির্মাণ পরিকল্পনা ও চরিত্র সম্পর্কে ভালোভাবে জেনে নিতে চাই। গল্পে চরিত্র কতটা গুরুত্ব পেয়েছে, সেটাও দেখার চেষ্টা করি। চরিত্রের ব্যাপ্তি কম হতে পারে, কিন্তু তা যদি গুরুত্বপূর্ণ হয়, তাহলে দ্বিতীয়বার তা নিয়ে ভাবি না। 'বস-২' ছবিতে অভিনয়ের সময় চরিত্রের ব্যাপ্তি নিয়ে ভাবিনি। বরং গল্পে এই চরিত্র কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে, সেটাই যাচাই করেছি।"

যাদের কাছে থেকে দেখার সুযোগ হয়নি, তেমন কোনো চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পেলে কী করবেন- এ প্রশ্নে ফারিয়া বলেন, 'অভিনীত সব চরিত্রই চোখে দেখা বা তাদের জীবনযাপন সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকবে- এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। আমরা সমাজের নানা স্তরে নানাভাবে বেড়ে উঠি। পেশা, চিন্তা-চেতনা, ধ্যান-ধারণায় একেকজন একেক রকম। তাই অভিনয়ের আগে যতটা সম্ভব চরিত্রের সঙ্গে মিশে যাওয়ার চেষ্টা করি। তার বেড়ে ওঠা, চিন্তাধারা, স্বভাব- এই বিষয়গুলো নিয়ে নির্মাতার সঙ্গে আলোচনা করি। যে শ্রেণির জীবনধারা পর্দায় তুলে ধরা হচ্ছে, তাদের সম্পর্কে আমার বা অন্য যে কোনো শিল্পীর স্পষ্ট ধারণা না-ই থাকতে পারে। সেটা জেনে চরিত্র কীভাবে আত্মস্থ করতে হবে, তা করে দেখানোই শিল্পীর কাজ।'

ফারিয়ার মুখে এ কথা শুনে বুঝতে অসুবিধা হলো না, অভিনয়কে তিনি কতটা সিরিয়াসভাবে নিয়েছেন। এখন কথা হলো, অভিনয়ের সঙ্গে জনপ্রিয়তা, তারকা খ্যাতি, শীর্ষস্থানে যাওয়ার প্রতিযোগিতা ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে। এই বিষয়টি নিয়ে কখনও ভাবেন কিনা- জানতে চাইলে ফারিয়া বলেন, 'শিল্পীর এক জীবনের সঞ্চয় হলো দর্শকের ভালোবাসা। তা কতটুকু পেলাম, সেটাই বড় বিষয়। অস্বীকার করব না, অভিনয়ের মধ্য দিয়ে দর্শকের ভালোবাসা কুড়ানোর একটা বাসনা সব সময় ছিল। কারণ, তাদের জন্যই তো আমরা নিরলস কাজ করে যাচ্ছি। ক্যামেরার সামনে নিজেকে ভুলে অন্য এক আমিতে রূপান্তরিত হচ্ছি। দিনের পর দিন ভুলে থাকছি, এই আমি কে। কখনও আয়েশা, কখনও সামিরা, নয়তো শ্রেয়া, শ্রুতি কিংবা মারিয়া, তানিয়ার মতো কোনো নারী বা তরুণীর অবয়বে তাদের জীবনের গল্প তুলে ধরছি। এসব কিছুর জন্যই নিজেকে আলাদাভাবে তৈরি করে নিতে হচ্ছে। তাই যতটা না তারকা খ্যাতি, তার চেয়ে বেশি চাওয়া ছিল দর্শকের কাছে চরিত্র বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা। অভিনয় দিয়ে তাদের মনে দাগ কেটে যাওয়া। যাতে করে দর্শক-মনে দীর্ঘদিন পরও সেই চরিত্রের ছায়া থেকে যায়। আর শীর্ষস্থানের প্রতিযোগিতা নিয়ে যেটা জানতে চাইলেন তার উত্তরে বলব, অবস্থান সবারই যার যার নিজস্ব। কে শীর্ষে, কে কতটা জনপ্রিয় তার সঠিক কোনো মাপকাঠি আদৌ আছে কিনা, আমার তা জানা নেই। শুধু এটা জানি, দর্শক কোনো অভিনেতা-অভিনেত্রীকে তখনই মনে রাখে, যখন সে তার কাজের মধ্য দিয়ে মনে দাগ কেটে যায়। তাই অভিনয়ের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আমার একটাই চাওয়া, ভালো কিছু কাজের মধ্যে দিয়ে দর্শকের মনে জায়গা করে নেওয়া। এর বেশি প্রত্যাশা কখনোই ছিল না।' ফারিয়ার এ কথা স্পষ্ট, খ্যাতির কাজই তার কাছে প্রধান। শুধু অভিনয় নয়, মডেলিং বা উপস্থাপনাও তার কাছে সমান গুরুত্ব পায়। আর গানের বিষয়টি তার শখ ও ভালো লাগার। ফারিয়া বলেন, 'যখন যে কাজই করি না কেন, তার মাধ্যমে মানুষের কাছাকাছি যেতে চাই। তাই চেষ্টা করি প্রতিনিয়ত নিজেকে নতুন আর ভিন্ন রূপে তুলে ধরতে, যা দর্শককে কাঁদাবে-হাসাবে-ভাবাবে।'

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com