সমকালীন প্রসঙ্গ

শাবিপ্রবি উপাচার্যের পদত্যাগই সমাধান

প্রকাশ: ২৫ জানুয়ারি ২২ । ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সাইফুর রহমান তপন

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন পয়েন্ট অব নো রিটার্নে চলে গেছে- এ কথা এখন জোর গলায় বলা যায়। শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি ২১ জানুয়ারি আন্দোলনকারীদের ঢাকায় এসে তার সঙ্গে আলোচনায় বসার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সে আমন্ত্রণ শিক্ষার্থীরা কার্যত প্রত্যাখ্যান করেন। তারা স্পষ্ট করে বলেন, আমরণ অনশনকারী বন্ধুদের সিলেটে রেখে তারা ঢাকায় গিয়ে মন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনায় বসতে রাজি নন। আলোচনা চাইলে মন্ত্রী বরং তাদের কাছে আসুন। আর মন্ত্রী চাইলে উভয় পক্ষের মধ্যে ভার্চুয়াল আলোচনাও হতে পারে।

শিক্ষার্থীদের এ প্রস্তাবে প্রথমদিকে নিরুৎসাহ দেখালেও ২২ জানুয়ারি গভীর রাতে শিক্ষামন্ত্রী তাদের সঙ্গে ভার্চুয়াল আলোচনায় বসেন। কোনো সমাধানে পৌঁছাতে না পারায় মন্ত্রী আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ২৩ জানুয়ারি দুপুরে আবারও ভার্চুয়াল আলোচনায় বসার কথা বলেছিলেন। কিন্তু মন্ত্রী অজানা এক কারণে সে আলোচনায় বসেননি।

২৩ জন শিক্ষার্থী অনশন করছেন গত ১৯ জানুয়ারি থেকে। তাদের মধ্যে ১৭ জনকে ইতোমধ্যে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে। বাকি ছয়জন আছেন অনশনস্থলে। গত রোববার তাদের সঙ্গে আরও কয়েকজন যুক্ত হয়েছেন বলে জানা গেছে। শিক্ষার্থীদের শঙ্কা, যে কোনো সময় খারাপ কিছু ঘটে যেতে পারে। সরকার আলোচনার নামে কালক্ষেপণ করছে। তাই তারা মনে করেন, অনশনকারীদের কিছু হলে তার দায় সরকারকে নিতে হবে।

আমরাও মনে করি, আন্দোলনকারীদের দাবি খুব স্পষ্ট- শাবিপ্রবি উপাচার্য প্রফেসর ফরিদ উদ্দিনকে পদত্যাগ করতে হবে। দেশের অন্যতম সেরা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রায় সবাই তাদের দাবির সঙ্গে একাত্ম। আন্দোলন বন্ধের কোনো কৌশলের কথা না ভেবে সরকারের উচিত প্রথমে তাদের মূল দাবিটি মেনে নেওয়া, এর পর শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের অন্য দাবিগুলো বাস্তবায়নের ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণ করা। আন্দোলনকারীদের মধ্যে বিভেদ তৈরি করে কিংবা দমন-পীড়ন চালিয়ে আন্দোলনকে হয়তো স্তিমিত করে দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু এতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সুসম্পর্ক নিশ্চিত করে ক্যাম্পাসে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা যাবে না। শিক্ষার্থীরা যাকে মন থেকে আর শিক্ষক বলে মানছেন না, তাকে তাদের ওপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার কোনো মানে নেই।

শাবিপ্রবি উপাচার্য বলেছেন, তিনি সরকারের সিদ্ধান্ত মেনে নেবেন; অর্থাৎ নিজে থেকে তিনি ক্যাম্পাস ছাড়বেন না; সরকার বললেই তিনি তা করবেন। আর সরকারও উপাচার্যকে পদত্যাগ করতে বলবে বলে আপাতত মনে হচ্ছে না।

উল্লেখ্য, প্রফেসর ফরিদ উদ্দিনকে ২০১৭ সালে অবসরপূর্ব ছুটি ভোগকালে এক নির্বাহী আদেশবলে শাবিপ্রবির উপাচার্য পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। তখনই কথা উঠেছিল, বিএনপি-জামায়াতপন্থি সাদা গ্রুপ থেকে আওয়ামী লীগপন্থি নীল গ্রুপে যোগ দেওয়ার কারণেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের এ অধ্যাপককে এ পুরস্কার দেওয়া হলো।

এটা তো সত্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের সিরাজুন্নেসা ছাত্রী হলের মেয়েরা গত ১৩ জানুয়ারি যেসব দাবি নিয়ে আন্দোলন শুরু করেছিলেন, সেগুলোর কোনোটাই বড় কোনো দাবি ছিল না। হলের কিছু অব্যবস্থাপনা ও অনিয়ম নিয়ে তারা তৎকালীন প্রাধ্যক্ষের সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু প্রাধ্যক্ষ ধৈর্য ধরে কথা না শুনে তাদের সঙ্গে 'অশালীন' আচরণ করেন। এর প্রতিবাদেই ছাত্রীরা রাস্তায় নামেন। বলা হচ্ছে, উপাচার্য ছাত্রী হলের শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে ওই অভিযুক্ত প্রাধ্যক্ষকে সরিয়ে নতুন একজন প্রাধ্যক্ষ নিয়োগ দিয়েছেন। কিন্তু এটা করা হয়েছে সরকারি ছাত্র সংগঠনের মাধ্যমে ওই ছাত্রীদের বিক্ষোভ দমাতে ব্যর্থ হওয়ার পর। অর্থাৎ ওই ছাত্রীদের দাবি মানার বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার আগে উপাচার্য এক দফা আগুনে ঘি ঢেলেছেন!

আবার ছাত্রীরা তাদের ওপর হামলার বিচার দাবিতে উপাচার্যকে যখন ঘেরাও করলেন তখনও তিনি ক্ষমতার দম্ভ দেখিয়ে তাদের দমাতে চেয়েছেন। তিনি পুলিশ লেলিয়ে দিয়ে ছাত্রীদের রক্তাক্ত করেছেন। ছাত্রী হলের একটা 'নিরীহ' বিক্ষোভকে শাবিপ্রবি উপাচার্যই আজকের পর্যায়ে নিয়ে এসেছেন। তাই ক্যাম্পাস শান্ত করার সব দায় তাকেই নিতে হবে।

২০১৯ সালের যে ভিডিওটি ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে, যেখানে তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের সম্পর্কে খুবই আপত্তিকর কিছু মন্তব্য করেছেন- এর জন্যও তো ফরিদ উদ্দিন আহমেদের কড়া শাস্তি পাওয়া উচিত। নারীর ক্ষমতায়নে আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর ঐকান্তিক ইচ্ছা ও চেষ্টা কে না স্বীকার করে! আর তারই হাত দিয়ে নিয়োগপ্রাপ্ত একজন বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন করার জন্য আরেকটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের অশালীন ভাষায় আক্রমণ করেছেন, তাও এই একবিংশ শতাব্দীতে বসে!

জনপ্রিয় লেখক প্রফেসর জাফর ইকবাল শাবিপ্রবিতে শিক্ষক হিসেবে প্রায় সিকি শতাব্দী কাটিয়েছেন। শুধু শাবিপ্রবি নয়, গোটা দেশের শিক্ষার্থীদের কাছে তিনি অত্যন্ত শিক্ষার্থীবান্ধব বলে পরিচিত। গত শুক্রবার শাবিপ্রবির পরিস্থিতি নিয়ে তার লেখা একটা কলাম বিভিন্ন গণমাধ্যমে ছাপা হয়েছে। সেখানে তিনি সম্প্রতি তার শাবিপ্রবি ক্যাম্পাস ঘুরে আসার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে লিখেছেন, 'আমি বেশ দুঃখের সঙ্গে আবিস্কার করেছি, আমার পরিচিত শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের চরিত্র পাল্টে যাচ্ছে।' তার কাছে সেখানকার শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, ক্যাম্পাসে এখন আলপনা আঁকার মতো সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডও বন্ধ।

এমনও অভিযোগ উঠেছে, ফরিদ উদ্দিন সাহেব 'ভাগ করো শাসন করো' নীতির ভিত্তিতে ক্যাম্পাস চালাচ্ছেন। একজনের বিরুদ্ধে আরেকজনকে লেলিয়ে দিয়ে ক্যাম্পাসে কবরের শান্তি তৈরি করেছেন। এসব জেনেই জাফর ইকবাল চলমান আন্দোলন সম্পর্কে বলেছেন, 'আমি শুধু তাদের (শিক্ষার্থী) ভেতরকার চাপা ক্ষোভটি অনুভব করেছি। সেই ক্ষোভটি এখন বিস্ম্ফোরণে রূপ নিয়েছে।' তার এ ধারণা কতটা সত্য তা বোঝা যায় রোববার বিকেলের ঘটনাটি খেয়াল করলে, যেখানে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের বাসভবনের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছেন।

শিক্ষার্থীদের এ ক্ষোভের আঁচ শাবিপ্রবি শিক্ষক সমিতির নেতাদের গায়েও লেগেছে বলে মনে হয়। তারা এতদিন উপাচার্যের পক্ষাবলম্বন করে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন বলে জানা যায়। কিন্তু উপাচার্যের বাসভবনের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পর তারা বিবৃতি দিয়ে 'উপাচার্যের পদত্যাগ'-এর ব্যাপারে 'দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য' সরকারের প্রতি 'অনুরোধ' জানিয়েছেন। বিষয়টি সরকারও দ্রুত উপলব্ধি করবে বলে আমাদের ধারণা।

সাইফুর রহমান তপন: সাবেক ছাত্রনেতা

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com