খাদ্য নিরাপত্তা

চালের বাজারে প্রতারণাহীন ব্যবস্থা সম্ভব

প্রকাশ: ২৮ জানুয়ারি ২২ । ০০:০০ | আপডেট: ২৮ জানুয়ারি ২২ । ১১:৪৪ | প্রিন্ট সংস্করণ

শামসুল আলম

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ কৃষিক্ষেত্রে বিশেষ করে চাল উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। চালের উৎপাদন দাঁড়িয়েছে তিন গুণেরও বেশি। বর্তমানে বাংলাদেশ চাল উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ, যা বিশ্বের মোট উৎপাদনের ৭ শতাংশ। দেশের জনগণের দৈনিক ক্যালরির ৭০ শতাংশের বেশি আসে এই চাল থেকে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার হিসাবে বাংলাদেশ মাথাপিছু বাৎসরিক চাল ভোগে এশিয়ায় দ্বিতীয়, যা প্রায় ১৮০ কেজি।



এখনও মোট চাষযোগ্য জমির ৭৭ শতাংশ ধান উৎপাদনে ব্যবহূত হয়। ধান উৎপাদন কৃষি জিডিপির ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ, মোট গ্রামীণ কর্মসংস্থানের ৫০ শতাংশ ও ১৫ শতাংশ গ্রামীণ খানা আয়ে অবদান রাখছে। সুতরাং খাদ্য নিরাপত্তার জন্য চাল বাংলাদেশের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ৬০ শতাংশ লোক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ধান উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল। সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় বাজারে চালের দাম বৃদ্ধি পেলে। ফলে চাল শুধু কৃষিপণ্য নয়; রাজনৈতিকভাবেও অতি সংবেদনশীল পণ্য।



আমাদের দেশে বাজারে চালের দাম বৃদ্ধি পেলে পত্র-পত্রিকায় বলা হয়, এটা 'মধ্যস্বত্বভোগীদের সিন্ডিকেট'। তারাই চাল মজুত করে রাখে এবং মজুত বৃদ্ধির মাধ্যমে চালের দাম বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। তখন সরকারি কর্মকর্তারা গুদামে হানা দেন। অনেক সময় দেখা যায়, বাজারে কৃষিপণ্যের দাম নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। আমাদের বোঝা উচিত, অপরিকল্পিত হস্তক্ষেপে এভাবে বাজার ব্যবস্থা চলে না। বাজার তার নিয়মে চলে। সেটি হলো, চাহিদা ও জোগানের মধ্যে সমন্বয় হয়েই দাম নির্ধারিত হয়। কাজেই এর বাইরে কাজ করতে গেলে বা বাজারকে বাধা দিতে গেলে হিতে বিপরীত হতে পারে। বাংলাদেশে হচ্ছেও তাই।



বাণিজ্যিক দিক দিয়ে বিবেচনা করলে সত্য যে, চালের বাজারদর সাধারণত মিল মালিকদের ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশে সরকারি হিসাবে (খাদ্য অধিদপ্তর) চাল মিলের সংখ্যা ১৮ হাজার ৪০৯টি (জুন ২০২১)। এর মধ্যে স্বয়ংক্রিয় চাল মিলের সংখ্যা দুই হাজার ৮৪৭টি, আধা স্বয়ংক্রিয় দুই হাজার ২৩৮টি (রাবার পলিশার ও পলিশিংযুক্ত)। সংখ্যা বিবেচনায় বাংলাদেশের চালের বাজার অনেকটা পাঠ্যপুস্তকে বর্ণিত পূর্ণ প্রতিযোগিতার কাছাকাছি। এর বড় বৈশিষ্ট্য হলো, বাজারে অসংখ্য বিক্রেতা ও ক্রেতা এবং মধ্যস্বত্বভোগী। পণ্য চলাচল ও প্রক্রিয়াজাতকরণে মধ্যস্বত্বভোগীরা বাজারে মূল্য শৃঙ্খলে বড় অবদান রাখে। তাদের মাধ্যমে চাল কৃষক থেকে ভোক্তা পর্যায়ে চলে আসে। মধ্যস্বত্বভোগীরা যদি অত্যধিক লাভ করত তাহলে বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীর সংখ্যা আরও বেড়ে যেত। অন্যান্য খাতের লোকজন এ খাতে আরও চলে আসত।


বাংলাদেশে মোটা দাগে তিন ধরনের চাল উৎপাদিত হয়- আউশ, আমন ও বোরো। আউশ রোপণ করা হয় মার্চ থেকে মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত, আর কাটা হয় জুলাই-আগস্টের দিকে। আমনের ক্ষেত্রে রোপণ শুরু হয় মে মাসের মাঝামাঝি থেকে আগস্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত। আর তা কাটা হয় নভেম্বর থেকে জানুয়ারির মাঝামাঝি। বোরো ধানের রোপণ ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত, আর ধান তোলা হয় এপ্রিল-মে মাসে। ধান উৎপাদনে কাছাকাছি তিনটি মৌসুম হওয়ায় চাল দীর্ঘকালীন মজুতের সুযোগ কম। ব্যবসায়ীরা এই দীর্ঘকালীন মজুত করে না। ধান তোলার আগে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর এবং ফেব্রুয়ারি-মার্চ বাজারে চালের সরবরাহ কম থাকে এবং এই সময়ে কিছু মূল্যবৃদ্ধি হতে পারে। পরে ধান তোলার পর বাজারে জোগান বেড়ে যাওয়ার ফলে দাম আস্তে আস্তে কমে যায়। এ ছাড়া কৃষকদের মধ্যে ৮০ শতাংশ ক্ষুদ্র চাষি (এক হেক্টরের কম জমি)। তাদের উদ্বৃত্ত থাকে খুব কম। তাদের জায়গা স্বল্পতায় ধান গুদামজাতকরণের সুযোগও খুব কম।


আমাদের দেশের দাম বৃদ্ধির ক্ষেত্রে উৎপাদকের স্বার্থকে বড় করে দেখা হয়, ভোক্তাদের কথা পরে আসে। দাম বৃদ্ধি পেলে সংখ্যায় কম উদ্বৃত্ত কৃষকের আয় বাড়ে, অন্যদিকে খাদ্যের দাম বাড়লে প্রায় ১৭ কোটি ভোক্তার মধ্যে নিম্ন আয়ের দরিদ্র মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় বেশি। খুব প্রতিযোগিতামূলক হওয়ায় এমনিতে ধান চাষ অন্যান্য কৃষিপণ্য যেমন সবজি, ফলের তুলনায় কম লাভজনক।

২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল ১৬৯ মিলিয়ন। এর জন্য নিট খাদ্যশস্য প্রয়োজন ৩১ দশমিক ৩৯ মিলিয়ন টন। আবার এ সময়ে নিট খাদ্যশস্য উৎপাদন ছিল ৩৮ মিলিয়ন টন (যার মধ্যে চাল উৎপাদন ৩৪ দশমিক ৮৮ মিলিয়ন টন)। অর্থাৎ বোঝা যাচ্ছে, আমাদের খাদ্য বিশেষ করে চাল উৎপাদনে স্বয়ম্ভরতা অর্জিত হয়েছে। এ তথ্য বলে দেয়, চালের দাম বৃদ্ধির ঘটনা হওয়া উচিত সাময়িক এবং তা অনেকাংশে বাজারে চাহিদা ও জোগানের ওপর নির্ভরশীল।

বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় কৃষিজ পণ্যের দাম বেড়ে যায়। চালের উদ্বৃত্ত হওয়া সত্ত্বেও উৎপাদন মৌসুমেই দেখা যায় মোটা চালের দাম বাজারে বৃদ্ধি পায়। যা এই ভরা আমন মৌসুমেই ৫৫-৫৬ টাকা। ব্যাপারটা খাদ্য ঘাটতিজনিত নয়। এখানেই অটো মিল মালিক ও সেমি অটো মিল মালিকদের দায়ী করা যায়। তবে সিন্ডিকেশন নয় বরং মুনাফার জন্য প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে থাকে তারা।


আমাদের দেশে 'মিনিকেট' চিকন চালের ব্যাপক প্রচলন। প্রকৃতপক্ষে উৎপাদনে এমন কোনো ধানের জাত নেই। মিলাররা মোটা চাল কেটে কৃত্রিমভাবে মসৃণ করে 'মিনিকেট' চিকন, 'নাজিরশাইল' ও 'বাংলাদেশি বাসমতি' নামে বিক্রি করে। ভোক্তাদের ঠকানো এ প্রক্রিয়ায় মোটা চাল মসৃণ চিকন চাল হয়ে যায়। প্রতি কেজি মোটা ধান ক্রয় করে তা ডায়মন্ড, হরিণ, রশিদ ইত্যাদি ব্র্যান্ডের 'মিনিকেট' ৬৫-৬৭ টাকা কেজিতে বিক্রি করে মুনাফা করে এবং এভাবে মোটা চালের সরবরাহ কমিয়ে ভরা মৌসুমেই মিলাররা দাম বাড়ার পরিস্থিতি তৈরি করে। আমাদের দেশে চালের দাম ভরা মৌসুমে বেড়ে যাওয়ার এটাই ইতিবৃত্ত। এই বাজার প্রতারণা অবশ্যই বন্ধ করতে আইনগত পদক্ষেপ নিতে হবে। আইন করতে হবে। চাল উৎপাদনের জাতভিত্তিকই বস্তাবন্দি হবে এবং জাতের নামেই বাজারে বিক্রি করতে হবে। যেমন- বিআর ২৮, বিআর ২৯, বিআর ৭৪, বঙ্গবন্ধু-১০০ ইত্যাদি।


এর পর কার্যকর ও লাভজনক কৃষির দিকে যেতে হলে আমাদের সমন্বিত কৌশল গ্রহণ করতে হবে। প্রথমত, কৃষক বা উৎপাদনকারীদের কম খরচে অধিক ফলন লাভের জন্য অধিক মনোযোগী হতে হবে। কৃষিবিজ্ঞানী ও গবেষকদের অবশ্যই জবাব খুঁজতে হবে- অত্যধিক ভর্তুকি দেওয়া সত্ত্বেও কেন বাংলাদেশে প্রতিবেশীদের থেকে চালের একরপ্রতি উৎপাদন খরচ বেশি। অধিক উৎপাদনশীল উন্নত জাত উদ্ভাবনের পাশাপাশি ভালো মানের বীজ ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ সরবরাহ করতে হবে। খরচ কমানোতে কৃষি যান্ত্রিকীকরণের বিকল্প নেই। আমাদের দেশের উপযোগী কৃষি যান্ত্রিকীকরণ উদ্ভাবন এবং তা বাণিজ্যিকীকরণে নজর দিতে হবে। এর সঙ্গে কৃষকদের আধুনিক প্রযুক্তি সুবিধা পৌঁছানোর জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র পরিসরের খামার মেশিন, মেকানিক্স সেবা এবং মেশিন মেরামতের ওপর কৃষকদের এবং যন্ত্র ব্যবসায়ীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।

দ্বিতীয়ত, যা আগেই বলেছি, আমাদের দেশের বাজার ব্যবস্থা প্রতারণাপূর্ণ। কৃষক থেকে ভোক্তা পর্যায়ে আসতে অনেক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। এই প্রক্রিয়াগুলো সহজতর এবং ঝামেলাবিহীন করতে সব পক্ষকে এগিয়ে আসতে হবে। সরকার থেকেও গভীর পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অধিকতর সচেষ্ট থাকতে হবে, যাতে পরিবহন পর্যায়ে অন্যায় চাঁদাবাজিতে চালের খুচরা পর্যায়ে দাম বেড়ে না যায়। লবণে আয়োডিন, ভোজ্যতেলে যেভাবে আইন করে ভিটামিন 'এ' সংযুক্ত করা হচ্ছে, সেভাবেই চাল-আটায় জিঙ্কসহ অন্যান্য মাইক্রো পুষ্টি উপাদান ব্রিডিংয়ের মাধ্যমে আইন করে সংযুক্ত করতে হবে। ভোক্তা পর্যায়ে মূল্য শৃঙ্খলে যাতে ব্যাঘাত না ঘটে, সে ব্যাপারে নিয়মিত তদারকি ব্যবস্থা জোরদার করা থেকে বাজার অবকাঠামো শক্তিশালীকরণসহ কৃষক পর্যায়ে মজুত সুবিধা বৃদ্ধির দিকে সরকারকে অধিকতর দৃষ্টি রাখতে হবে।


শেষে বলতে চাই, আমাদের উৎপাদনশীল আধুনিক কৃষির দিকে ধাবিত হতে হবে। মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার পথে আমাদের গতানুগতিক কৃষি থেকে বেরিয়ে এসে আরও গতিশীল কৃষির দিকে ধাবিত হতে হবে। এ জন্য চাই কার্যকর ও দক্ষ বাজার ব্যবস্থা। জিডিপির অনুপাতে কৃষির অবদান ধারাবাহিকভাবে কমে যাবে- এ কথা সত্য, তবে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য কৃষির গুরুত্ব অদূর ভবিষ্যতে হ্রাস নয় বরং বৃদ্ধি পাবে। নেদারল্যান্ডসের মতো ক্ষুদ্র উন্নত দেশ এখনও প্রতি বছর ১২০ বিলিয়ন ডলার কৃষিপণ্য রপ্তানি করে। বাংলাদেশ ও নেদারল্যান্ডস ব-দ্বীপ দেশ। এই দেশ থেকে বাংলাদেশের অনেক কিছু শেখার আছে। কৃষির জন্য তা বেশি সত্য। সে কারণে আমরা শতবর্ষব্যাপী ব-দ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০ গ্রহণ করেছি। এখন তা বাস্তবায়নের মাধ্যমে কৃষি আধুনিকীকরণের দিকে ধাবিত হয়ে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা অর্জনে এগিয়ে যেতে হবে।



ড. শামসুল আলম: প্রতিমন্ত্রী, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়; একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com