মধ্য মাঘে শীতের কামড়, উত্তরে বছরের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা

প্রকাশ: ২৮ জানুয়ারি ২২ । ১৩:৫৭ | আপডেট: ২৮ জানুয়ারি ২২ । ১৪:৩২

রংপুর অফিস, কুড়িগ্রাম ও পঞ্চগড় প্রতিনিধি, ডিমলা সংবাদদাতা

নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার চরখড়িবাড়ী গ্রামবাসী আগুন জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছেন। ছবি-সমকাল

উত্তরের জনপদে মধ্য মাঘে জেঁকে বসেছে শীত। ঘন কুয়াশা না থাকলেও হিমেল হাওয়ায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। নগরের তুলনায় তিস্তার চর এলাকায় শীতের প্রকোপ আরও বেশি। 

শীতে জবুথবু জনজীবনে আরও বেশি আতঙ্কের হয়ে দাঁড়িয়েছে ঠাণ্ডাজনিত নানা উপসর্গ। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য মতে, রংপুর জেলায় গত এক মাসে শীতজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে শিশু-বৃদ্ধসহ ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।

জরুরি প্রয়োজন ছাড়া নগরবাসীরা কেউ বাড়ির বাইরে আসছেন না। তবে বিপাকে পড়েছেন দিনমজুররা। নিতান্ত পেটের দায়ে ঘর থেকে বের হতে হচ্ছে তাদের। তীব্র শীতে কাজেরও সঙ্কট দেখা দিয়েছে। 

উত্তরের জেলাগুলোতে সরকারি, বেসরকারি ত্রাণ সহায়তা অব্যাহত থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় ‘অপ্রতুল’ বলেও দাবি করছেন কেউ কেউ। তবে প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তিরা বলেছেন, সরকারের ত্রাণ ভাণ্ডার থেকে আসা শীতবস্ত্র পর্যাপ্ত রয়েছে। ব্যক্তি উদ্যোগেও অনেকে এগিয়ে আসছেন। 

দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রাজারহাটে, ৬ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস

শুক্রবার দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে কুড়িগ্রামে। হঠাৎ করে তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় শুরু হয়েছে মাঝারি শৈত্য প্রবাহ। শুক্রবার সকাল ৯টায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৬ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করেছে রাজারহাট কৃষি ও সিনপটিক আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগার। 

এ বছর জেলার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে রংপুরে ৮ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলিসিয়াস। 

রাজারহাটের কৃষি ও সিনপটিক আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আনিসুর রহমান সমকালকে বলেন, বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। মাত্র ২৪ ঘন্টার ব্যবধানে সেই সর্বনিম্ন তাপমাত্রা প্রায় অর্ধেক কমে শুক্রবার সকাল ৯টায় ৬ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে এসেছে। 

রংপুরের একটি গ্রামে ঘন কুয়াশার মধ্যে হেঁটে যাচ্ছেন এক কৃষক। ছবি-সমকাল

তিনি আরও বলেন, উত্তর দিক থেকে ধেয়ে আসছে হিমেল হাওয়া। এই হাওয়া আসার গতিবেগ বেড়ে যাওয়ায় আকাশে এখন মেঘ নেই। ভোরের দিকে একটু হালকা কুয়াশা পড়লেও সকাল হতে না হতেই রোদের দেখা মিলেছে। তারপরও ঠান্ডা অনুভূত হচ্ছে বেশি। আগামী আরও দু-তিনদিন মাঝারি শৈত্য প্রবাহ অব্যাহত থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস রয়েছে।

রংপুর আবহাওয়া কর্মকর্তা মোস্তাফিজার রহমান সমকালকে বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যে শীত পৌষের শুরুতে অনুভূত হওয়ার কথা ছিল সেটি মাঘের মধ্যবর্তী সময়ে অনুভূত হচ্ছে। কয়েক দিন শীতের তীব্রতা থাকতে পারে।’  

এদিকে তিনদিন টানা মৃদু শৈত্যপ্রবাহের পর উত্তরের জনপদ পঞ্চগড়ে শুরু হয়েছে মাঝারি পর্যায়ের শৈত্যপ্রবাহ। 

শুক্রবার সকালে সর্বনিম্ন ৭ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করেছে তেঁতুলিয়া আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র। বৃহস্পতিবার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৯ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

তেঁতুলিয়া আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. রাসেল শাহ বলেন, ‘শুক্রবার তেঁতুলিয়ায় সর্বনিম্ন ৭ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। বৃহষ্পতিবার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৯ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তাপমাত্রা ৬ থেকে ৮ এর মধ্যেও পর্যায়কে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ বলে।’ 

‘হামরা ঠান্ডাত অনেক মুশকিলোত পড়ছি’

রংপুর নগরীর বাহার কাছনা এলাকার আবেয়া বেগম (৬২) সমকালকে বলেন, ‘হঠাৎ করি জার বাড়ি গেইল। কুয়াশা নাই, ঠাণ্ডা বাতাসোত খুব জার নাগতোছে। ঘর থেকে বাইরে হবার পাওছো না। খুলিত বান্দা গরু গুলাও জারোত ডোকরাওছে।’ 

গঙ্গাচড়া উপজেলার লহ্মীটারী ইউনিয়নের গান্নারপাড়ে তিস্তা বাঁধে আশ্রিত নদী ভাঙ্গনের শিকার মোন্নাফ মিয়া বলেন, ‘শহরোত কী ঠাণ্ডা, নদীর পাড়োত বেশি ঠাণ্ডা। শীতোত এ্যাটে না আসিয়া বুঝা যাবার ন্যায়। এ্যাটে কুয়াশাও আচে, ঠাণ্ডা বাতাসও মেলা। ঘরের ভিতরোত থাকিয়াও ছাওয়াগুলার নাক থ্যাকি পানি গরাইতোছে। অইদও আইসে আর যায়। হামরা ঠান্ডাত অনেক মুশকিলোত পড়ছি।’

তীব্র শৈত্যপ্রবাহে বিপর্যস্ত কুড়িগ্রামের জনজীবন। ছবি-সমকাল

উত্তরের জেলা নীলফামারীর ডিমলাতেও চলছে শৈত্যপ্রবাহের দাপট।

নীলফামারী জেলা পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান ফেরদৌস পারভেজ সমকালকে বলেন, গত ৩ দিন ধরে দুপুর পর্যন্ত সূরে্যর দেখা মেলেনি। বিকেলে কিছুটা রোদ দেখা গেলেও খানিকপর কুয়াশার তাও ঢেকে যাচ্ছে। 

ডিমলাতেও শীতজনিত রোগের প্রকোপে বেড়েছে। উত্তরের এই উপজেলা থেকে প্রতিদিনই ঠাণ্ডার নানা উপসর্গ নিয়ে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন রোগীরা।

গত এক মাসে ঠাণ্ডার উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন ১৫ জন

স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য মতে, রংপুর জেলায় গত এক মাসে শীতজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে শিশু-বৃদ্ধসহ ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালগুলোতেও শীতজনিত রোগ নিয়ে শিশু-বৃদ্ধসহ নানা বয়সী মানুষ চিকিৎসা নিচ্ছেন।   

শীত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শীতজনিত রোগীর সংখ্যাও বেড়েছে পাল্লা দিয়ে। উত্তরাঞ্চলের অস্বচ্ছলদের একমাত্র ভরসা এ হাসপাতালের শিশু ও মেডিসিন বিভাগে রোগীদের চিকিৎসা সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে নার্স ও চিকিৎসকদের। 

কুড়িগ্রাম সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) পুলক জানান, গতকাল বৃহস্পতিবার কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে ৫৩ রোগী ভর্তি হয়েছে। এ ছাড়া গত এক সপ্তাহে গড়ে প্রতিদিন ৫০ থেকে ৫৫ জন ভর্তি হয়েছে। রোগীদের মধ্যে অধিকাংশই শিশু। ঠাণ্ডায় রোগীর সংখ্যা বাড়ছে বলে জানান তিনি।

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের রেজিস্টার কনসালটেন্ট ডা. ফখরুল আলম সমকালকে বলেন, ‘মাঘের শীতে প্রত্যেক পরিবার সচেতন হলে তারা শীতজনিত রোগ থেকে মুক্তি পেতে পারেন। যেদিন সূর্য উঠল না সেদিন কুসুম গরম পানিতে গোসল করা, গরম পানি পান করা, যতটা সম্ভব বাহিরে কম যাওয়া ও প্রয়োজন মত গরম কাপড় পড়া। এসব সাধারণ বিষয়গুলোর দিকে লক্ষ্য রাখলে শীতজনিত রোগ এড়ানো সম্ভব।’ 

শীতবস্ত্র কর্মসূচি অব্যাহত 

শীতার্ত মানুষের জন্য সরকারি ত্রাণ সহায়তার পাশাপাশি বেসরকারি সংগঠন ও ব্যক্তি উদ্যোগেও ত্রাণ সহায়তা অব্যাহত রয়েছে উত্তরের জনপদে।

রংপুর জেলা প্রশাসক আসিব আহসান সমকালকে বলেন, ‘শীতের শুরু থেকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে শীতবস্ত্র হিসেবে কম্বল বিতরণ করা হয়েছে। নগরীর ছিন্নমূল, বেদে, আদিবাসী, নদীর চর ও বাঁধে আশ্রিত কেউ বাদ যায়নি। এছাড়া বেসরকারি উদ্যোগেও প্রচুর শীতবস্ত্র বিতরণ করা হয়েছে। আশা করছি এ শীতে কাউকে শীতবস্ত্রের অভাবে কষ্ট পেতে হবে না।’

কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রেজাউল করিম  জানান, জেলার শীতার্ত মানুষের সহায়তায় সরকারি বরাদ্দের ৩৫ হাজার ৭০০ এবং সরকারি বরাদ্দের এক কোটি ৮ লাখ টাকা দিয়ে ক্রয়কৃত ৩৫ হাজার এবং বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান থেকে পাওয়া প্রায় ৮০ হাজার শীতবস্ত্র বিতরণ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটিগুলো সক্রিয় আছে। শীতবস্ত্রের অভাবে যাতে কেউ কষ্ট না পায় সেজন্য আমরা কাজ করছি।’

ইতোমধ্যে সরকারের ত্রাণ ভাণ্ডার থেকে নীলফামারী জেলার ডিমলা উপজেলায় এখন পর্যন্ত ৭ হাজার ৭১০ টি কম্বল বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া নীলফামারী-১ (ডোমার-ডিমলা) আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা আফতাব উদ্দিন সরকারের ব্যক্তিগত পক্ষ হতে ৯০০, নীলফামারী জেলা পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান ফেরদৌস পারভেজের পক্ষ হতে ৪৫০, ডিমলা প্রেসক্লাবের পক্ষ হতে ১০০ কম্বল বিতরণ করা হয়েছে।  

ডিমলায় শীতবস্ত্র বিতরণ কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে। ছবি-সমকাল

ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বেলায়েত হোসেন বলেন, ‘সরকারি ত্রাণ ভাণ্ডার হতে উপজেলার গরীব, দুঃখী-অসহায় পরিবারের মাঝে ৭ হাজার ৭১০টি কম্বল ইতোমধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। গরীব মানুষ যাতে কষ্ট না পায় সেজন্য শীতবস্ত্র বিতরণ অব্যাহত রয়েছে।’



© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com