স্থায়ী কমিটির জরুরি বৈঠক

নতুন জোটে নজর বিএনপির

প্রকাশ: ২৯ জানুয়ারি ২২ । ০০:০০ | আপডেট: ২৯ জানুয়ারি ২২ । ০২:৩২ | প্রিন্ট সংস্করণ

লোটন একরাম

নির্বাচন কমিশন গঠনে আইন পাসের বিষয়টি আমলে নিতে চায় না রাজপথের বিরোধী দল বিএনপি। কমিশনের বদলে দলটির লক্ষ্য এখন নির্বাচনকালীন নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকার প্রতিষ্ঠায় 'কঠোর আন্দোলন'। বর্তমান পরিস্থিতিতে এটিই প্রধান করণীয় বলে মনে করছেন নীতিনির্ধারকরা। এ জন্য নতুন বড় জোট গড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতীয় স্থায়ী কমিটি। নেতারা যেটিকে বলছেন 'বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য'। গতকাল শুক্রবার রাতে কমিটির ভার্চুয়াল বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ বিষয়ে এরই মধ্যে সমমনা বাম, ডান ও ইসলামপন্থি কয়েকটি দলের সঙ্গে বিএনপির যোগাযোগ হয়েছে। এখন দ্রুতই তাদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক শুরু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দাবি আদায়ে প্রাথমিকভাবে স্ব-স্ব দলীয় ব্যানারে যুগপৎ আন্দোলনের বিষয়ে একমত হয়েছেন নীতিনির্ধারকরা।

দলীয় সূত্র জানায়, কৌশলগত কারণে আপাতত আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না দিলেও কার্যত ২০ দলীয় জোট এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে নিষ্ফ্ক্রিয় করে দেবে বিএনপি। বৃহত্তর রাজনৈতিক জোট গঠনের পথে অন্যতম বাধা জামায়াতে ইসলামীকেও কৌশলে জোটের বাইরে রাখতে চায় তারা। এর অংশ হিসেবে এখন থেকে 'এককভাবে' সরকারবিরোধী সব কর্মসূচি পালন করবে বিএনপি।

জাতীয় সংসদে নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনে আইন পাসের দিনই বৃহস্পতিবার তাৎক্ষণিভাবে তা প্রত্যাখ্যান করে পরদিন শুক্রবার দলের সর্বোচ্চ ফোরামের বৈঠক করে এসব সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। দলটির মনে করছে, দলীয় সরকারের অধীনে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের দুটি নির্বাচনেই তা প্রমাণিত হয়েছে। তাই নির্বাচন কমিশন গঠনে রাষ্ট্রপতির আহূত সংলাপে সাড়া না দিয়ে নির্দলীয় সরকারের দাবিতে অনড় থাকে তারা।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল সমকালকে বলেন, 'অবৈধ আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে আর কোনো নির্বাচন চায় না বিএনপি। বিনা ভোটের এ সরকার অবৈধভাবে টিকে থাকার জন্য বাকশালের মতো বিতর্কিত নির্বাচন কমিশন আইন প্রণয়ন করেছে। এ আইন আমরা মানি না। নির্বাচনকালীন নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাব।'

অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করছেন বলে জানান মির্জা ফখরুল। বৃহত্তর জোট গঠন সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বৈঠকে সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে করণীয় নির্ধারণে আলোচনা হয়েছে। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করতে দেশের সব দল ও মত নির্বিশেষে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করে গণআন্দোলন সৃষ্টি করা হবে। অতীতে কোনো স্বৈরাচার টিকে থাকতে পারেনি। আওয়ামী লীগও টিকতে পারবে না। এরই মধ্যে মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। জাতিসংঘেও মানবাধিকার সংগঠনগুলো চিঠি দিয়েছে। সরকারের বিদায়ের ঘণ্টা বাজতে শুরু করেছে।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকেই ২০ দলীয় জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মধ্যে টানাপোড়েন শুরু হয়। নির্বাচন এবং আন্দোলনের কৌশল ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে পরস্পরকে দায়ী করে আসছেন জোট দুটির শীর্ষ নেতারা। এ পরিস্থিতিতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গ্রহণযোগ্য ভাবমূর্তিসম্পন্ন দলগুলো নিয়ে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে আসছেন বিএনপির শীর্ষ নেতারা। অনানুষ্ঠানিকভাবে দুই জোটের বাইরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে আসছিলেন দায়িত্বশীল নেতারা। বাম, ডান ও ইসলামপন্থি কয়েকটি দলের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনাও হয়েছে এরই মধ্যে।

নির্বাচন কমিশন গঠনে রাষ্ট্রপতির সংলাপ বিএনপির পাশাপাশি আরও ছয়টি দল বর্জন করেছে। এটিকেও এক ধরনের ঐকমত্য মনে করছেন বিএনপি নেতারা। সংলাপে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকা অন্য ছয়টি দল হচ্ছে- বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), বাংলাদেশ মুসলিম লীগ (বিএমএল) এবং জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি)। এ দলগুলোর মতে, রাষ্ট্রপতির এ সংলাপ সম্পূর্ণ অর্থহীন। এতে সরকারি দলের পছন্দের লোকদের প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও কমিশনার নিয়োগ দেওয়ার একটি লোক দেখানো সংলাপ।

বিএনপি সূত্র জানায়, গত রাতের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আলোচ্য বিষয় একটিই ছিল। ২০ দলীয় জোট ও ঐক্যফ্রন্টের বাইরে রাষ্ট্রপতির সংলাপ বর্জন করা বাম, ডান ও ইসলামী দলগুলোকে আরও কীভাবে কাছে টানা যায়- তা নিয়েই চুলচেরা বিশ্নেষণ হয়। বিশেষ করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে গ্রহণযোগ্য দল এবং রাজপথে কর্মী-সমর্থক থাকা দলগুলোর সঙ্গে শিগগির আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয়। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এতে সভাপতিত্ব করেন।

সূত্র জানায়, এর আগে স্থায়ী কমিটির চারজন নেতাকে এসব দলের সঙ্গে যোগাযোগ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। ওই নেতারা দায়িত্বপ্রাপ্ত দলগুলোর অবস্থান স্থায়ী কমিটিকে অবহিত করেছেন। বৈঠকে ওইসব নেতাকে দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে আনুষ্ঠানিক বৈঠকের দিন-তারিখ চূূড়ান্ত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য সমকালকে বলেন, জামায়াতকে জোটে না রাখার ব্যাপারে অধিকাংশ নেতাই একমত। কিন্তু জামায়াতকে বিভিন্ন কৌশলে আওয়ামী লীগ কাছে টেনে নেবে, আগেই মতো সে বিষয়টি নিয়েও তাদের ভাবতে হচ্ছে। মোট কথা, জামায়াতকে নিয়ে 'নেতিবাচক' কোনো কথা বলতে চান না তারা। এসব হিসাব-নিকাশ কষে জামায়াতকে বাইরে রেখে নতুন জোট গঠন করতে চায় বিএনপি।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান টুকু সমকালকে বলেন, নির্বাচন কমিশন গঠনে আইন প্রণয়নসহ আওয়ামী লীগ সরকার সবকিছুই একতরফা করে আসছে। তাই ইসি গঠনের আইন নয়, বিএনপি গুরুত্ব দিচ্ছে নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকার গঠনের দাবিকে। আওয়ামী লীগের অধীনে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে না। স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বৃহত্তর জোট গঠন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সমমনা সব দলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শিগগিরই শুরু হবে।

বিএনপির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার ভাষ্য, সরকারের চারদিকে এখন চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা এবং জাতিসংঘে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর চিঠিতে সরকার দিশাহীন হয়ে পড়েছে। আগামীতে সব দলের অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন না হলে বিশ্ববাসী আর গ্রহণ করবে না- তাও বুঝতে পেরেছে।

এই নেতারা আরও বলেন, সরকারের একগুঁয়েমি কি কারও চাপের মুখে, নাকি নিজ থেকে- তা বোঝার চেষ্টা করছে বিএনপি। বিএনপি কোনোভাবেই ২০২৩ সালের নির্বাচন ২০১৪ ও ২০১৮ সালের মতো করে পার হতে দেবে না। এবারের নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে দলটি।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com