বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ সেবা

ব্যাংকিং সমস্যার দ্রুত প্রতিকার

প্রকাশ: ২৯ জানুয়ারি ২২ । ০০:০০ | আপডেট: ২৯ জানুয়ারি ২২ । ১৩:৪৩ | প্রিন্ট সংস্করণ

ওবায়দুল্লাহ রনি

দেশের ৬১টি ব্যাংকের ১১ হাজার শাখার মাধ্যমে সেবা বিস্তৃত। উপশাখা, এজেন্ট আউটলেট ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমেও দেওয়া হচ্ছে সেবা। আবার অ্যাপ, ইন্টারনেট ব্যাংকিং, এটিএম বুথ, পস মেশিনের মাধ্যমে সেবা দিচ্ছে ব্যাংকগুলো। এর বাইরে ৩৪টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শাখা রয়েছে আড়াইশর মতো। গ্রাহক আকর্ষণে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সতর্কতার পরও নানা সমস্যা ও হয়রানিতে পড়ছেন অনেকে। গ্রাহকের সঙ্গে প্রতারণার ঘটনাও ঘটছে। এসব হয়রানি বা প্রতারণার সহজ সমাধানে কাজ করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্ট্রিগ্রিটি অ্যান্ড কাস্টমার সার্ভিস বিভাগে ব্যাংকিং সংক্রান্ত যে কোনো অভিযোগ করে আপনি প্রতিকার পেতে পারেন। বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রতি কর্মদিবসে গড়ে ৫৫টি অভিযোগ আসছে এ কেন্দ্রে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই বিশেষ সেবার মাধ্যমে প্রতিকার পেয়েছেন সোলায়মান হোসেন (ছদ্মনাম) ও তার কয়েকজন সহকর্মী। জানা গেছে, কয়েকজন কর্মকর্তার নামে ভুয়া ঋণ নিয়েছে মাল্টিপ্ল্যান ডেভেলপমেন্ট নামের একটি আবাসন কোম্পানি। মাল্টিপ্ল্যানের কাছে থাকা কর্মীদের এনআইডি, বেতনের ব্যাংক স্টেটমেন্ট, টিআইএন নাম্বারসহ যাবতীয় তথ্য দিয়ে ন্যাশনাল হাউজিং ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট থেকে নেওয়া হয় পাঁচ কোটি টাকা। প্রয়োজনীয় সব ডকুমেন্ট দিলেও যাদের নামে ঋণ নেওয়া হয়েছে তাদের কেউ জানেনই না। এদের মধ্যে কোনো একজন ব্যক্তিগত ঋণের জন্য আবেদন করে সিআইবি থেকে জানতে পারেন তার নামে ৫০ লাখ টাকার একটি ফ্ল্যাট কেনার ঋণ রয়েছে। নিজেদের মধ্যে আলোচনার ভিত্তিতে অন্যরাও জানতে পারেন এ তথ্য। এদের মধ্যে কেউ একজন অভিযোগ করেন বাংলাদেশ ব্যাংকে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্ট্রিগ্রিটি অ্যান্ড কাস্টমার সার্ভিস বিভাগ তদন্ত করে বেনামে ঋণ নেওয়ার সত্য উদ্ঘাটন করেছে। ভুয়া ঋণ থেকে মাল্টিপ্ল্যান ডেভেলপমেন্টের কর্মকর্তাদের দায়মুক্তি দিতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া ভুয়া ঋণ আদায় এবং ঋণ অনুমোদনে জড়িত ন্যাশনাল হাউজিংয়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সমাধান পেয়ে যেন হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছেন আবাসন কোম্পানিটির কর্মকর্তারা।

প্রতিনিয়ত এমন নানা অভিযোগ করছেন প্রতারিত বা হয়রানির স্বীকার গ্রাহক। অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন সেবা সম্পর্কিত তথ্যের জন্যও টেলিফোন করছেন। দেশের সীমানা পেরিয়ে প্রবাসী বাংলাদেশি বা বিদেশিরাও অভিযোগ করে সমাধান পাচ্ছেন। বিদেশিদের অভিযোগের বেশিরভাগই এলসির বিপরীতে পণ্য দিয়েও টাকা না পাওয়া কিংবা বাংলাদেশ থেকে পণ্য কিনে বুঝে না পাওয়া সংক্রান্ত। বেশিরভাগ অভিযোগ নিষ্পত্তিতে কাজ করছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা। সরাসরি ১৬২৩৬ এই নাম্বারে টেলিফোন করে অভিযোগ করা যায়। এ ছাড়া মোবাইল অ্যাপ, ই-মেইল, বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটের নির্ধারিত ফরম, ডাকযোগে এবং সশরীরে অভিযোগ করার সুযোগ রয়েছে।

অভিযোগ ও নিষ্পত্তির পরিসংখ্যান : বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে টেলিফোন ও লিখিতভাবে মোট ১৩ হাজার ৫০৪টি অভিযোগ এসেছে। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ১১ হাজার ৫০টি। প্রায় ৮২ শতাংশ অভিযোগ এরই মধ্যে নিষ্পত্তি হয়ে গেছে। বাকি ২ হাজার ৪৫৪টি অভিযোগ রয়েছে নিষ্পত্তির অপেক্ষায়। গত বছর সাপ্তাহিক ও অন্যান্য ছুটি বাদে ২৪৫ কর্মদিবস ছিল। এর মানে প্রতিদিন গড়ে ৫৫টির বেশি অভিযোগ এসেছে। আর নিষ্পত্তি হয়েছে ৪৫টির বেশি। আগের বছর ২০২০ সালে ১০ হাজার ২৬৯টি অভিযোগের মধ্যে



৮ হাজার ৮৭৩টি নিষ্পত্তি হয়। নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে এক হাজার ৩৯৬টি। অনিষ্পন্ন এসব অভিযোগে কোনো প্রতিকার মিলবে না, তেমন নয়। অনেক ক্ষেত্রে গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে পরিদর্শন ও চিঠি চালাচালি শেষে প্রতিকারে সময় লেগে যায়। কখনও কখনও আদালতে মামলা বা অন্য কারণে নিষ্পত্তিতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। তবে প্রতিকার না পাওয়া পর্যন্ত নিষ্পত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। বাংলাদেশ ব্যাংকে অভিযোগ কেন্দ্রের যাত্রা শুরু হয় ২০১১ সালের মার্চে। সেই থেকে ২০১২ সালের জুন পর্যন্ত ২ হাজার ৫২৬টি অভিযোগ আসে। যার সবই নিষ্পত্তি হয়েছে। এভাবে ২০১৫ সাল পর্যন্ত কোনো অভিযোগ আর অনিষ্পন্ন নেই। ২০১৬ সালে ৮ হাজার ৯১৯টি অভিযোগের মধ্যে অনিষ্পন্ন রয়েছে মাত্র ৯টি। পর্যায়ক্রমে ২০১৭ সালে ৯ হাজার ৪টি অভিযোগের মধ্যে ১৩টি রয়েছে অনিষ্পন্ন। ২০১৮ সালে ১১ হাজার ৯৪০টি অভিযোগের মধ্যে ১১ হাজার ৭৬৬টি অভিযোগ নিষ্পত্তি হয়েছে। নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে ১৭৪টি। ২০১৯ সালের ১১ হাজার ১৬৪টি অভিযোগের মধ্যে ১৪৬টি ছাড়া বাকি সব নিষ্পত্তি হয়েছে।

গ্রাহক হয়রানি বন্ধে ২০১১ সালের ২৭ মার্চ প্রথমে 'হেল্প ডেস্ক' নামে সেবা কেন্দ্র চালু করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পরে ২০১২ সালের জুলাইতে 'ফাইন্যান্সিয়াল ইন্ট্রিগ্রিটি অ্যান্ড কাস্টমার সার্ভিস (এফআইসিএসডি)' নামে আলাদা বিভাগ গঠন করা হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে এ রকম অভিযোগ কেন্দ্র খোলা নিয়ে শুরুতে নানা সমালোচনা ছিল। তবে তৎকালীন গভর্নর ড. আতিউর রহমানের আন্তরিক চেষ্টায় আনুষ্ঠানিক রূপ পায়। দিনে দিনে যত মানুষ জানতে পারছে অভিযোগ তত বাড়ছে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অভিযোগ গ্রহণের শুরুতে শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে। তবে ২০১১ সালের শেষ দিকে অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তির জন্য প্রতিটি ব্যাংকেও অভিযোগ সেল খোলার নির্দেশ দেওয়া হয়। কেউ সেবা নিতে গিয়ে হয়রানিতে পড়লে কিংবা কোনো ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হলে প্রথমে ওই শাখায় প্রতিকার চাইতে হবে। শাখায় প্রতিকার না পেলে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় বা আঞ্চলিক কার্যালয়ের অভিযোগ কেন্দ্রে জানাতে হবে। অবশ্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকেই আসেন অভিযোগকারী।

কিছু জটিলতা 

বাংলাদেশ ব্যাংকে এসেও অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ আমলে না নেওয়ারও ঘটনা শোনা যায়। বিশেষ করে টেলিফোনের মাধ্যমে জানানো অভিযোগ নিষ্পত্তি না হওয়ার ঘটনা শোনা যায়। আবার অনেক সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৬২৩৬ এই টেলিফোন নাম্বারে ঢুকতে না পারা, বারবার রিং হলেও অফিস সময়েও কেউ ফোন না ধরা কিংবা অকেজো পাওয়া যায়। ছোট অভিযোগও লিখিতভাবে জানাতে বলা হয়। এ নিয়ে অনেকের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। মূলত সার্বক্ষণিক ফোন ধরা অনেক সময় বিরক্তিকর হয়ে ওঠে। ফলে টেলিফোন ধরার কাজটি পেশাদার তৃতীয় পক্ষকে দিয়ে করানো বা এ জন্য আলাদা কর্মী নিয়োগ দেওয়ার দাবি রয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে।

যশোরের আহাদুল ইসলাম নামের এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বেসরকারি একটি ব্যাংকে ঋণের টাকা পরিশোধ করেও দলিল ফেরত পাচ্ছিলেন না। প্রথমে ওই ব্যাংকের অভিযোগ কেন্দ্রে যোগাযোগ করেও প্রতিকার পাননি। পরে গত ১৪ ডিসেম্বর ডাকযোগে বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্রাহক স্বার্থ সংরক্ষণ কেন্দ্রে অভিযোগ করেন। এর কয়েক দিন পর তাকে ডেকে এনে দলিল ফেরত দিয়েছে ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তাৎক্ষণিক এই সেবায় তিনি খুশি। তবে এভাবে যে অভিযোগ করা যায় তা তিনি জানতেন না। তার এক ব্যাংকার বন্ধুর সহায়তায় বিষয়টি জেনে অনেক উপকার পেয়েছেন।

অভিযোগের যত ধরন 

ভুয়া ঋণ সৃষ্টি বা ঋণ ফেরত দিয়েও দলিল ফেরত না পাওয়া কিংবা আমানতের টাকা ঠিক মতো বুঝে পেতে অভিযোগ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে হাজির হন গ্রাহক। আবার ঋণ নিতে গিয়ে নানা হয়রানির অভিযোগ তো আছেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের এফআইসিএসডিতে আসা অভিযোগ ১৩ ভাগে ভাগ করে প্রতিকার দেওয়া হয়। অভিযোগের ধরনের মধ্যে রয়েছে- ব্যাংকিং সেবা পেতে হয়রানি, চেক জালিয়াতি, কার্ড সংক্রান্ত, রেমিট্যান্স, মোবাইল ব্যাংকিং, ব্যাংক গ্যারান্টির টাকা যথাসময়ে না পাওয়া, ব্যাংক নোট ও মুদ্রণ, আইনি নোটিশ, ঋণ ও অগ্রিম, ফি ও চার্জ, এলসি সংক্রান্ত তথা স্থানীয় ও বৈদেশিক বিল, সাধারণ ব্যাংকিং এবং বিবিধ। সাধারণ ব্যাংকিংয়ের মধ্যে আমানতে চুক্তির চেয়ে কম সুদ, মেয়াদপূর্তির পরও ঠিকমতো টাকা না দেওয়া, ঋণের কিস্তি পরিশোধের পরও টাকা দাবি- এ রকম নানা অভিযোগ নিয়ে আসেন গ্রাহকরা। সাধারণভাবে ছেঁড়াফাটা নোট বদল, সঞ্চয়পত্র কেনা বা ভাঙাতে হয়রানি বা সাধারণ ব্যাংকিং সেবা সংক্রান্ত তথ্য দিতে অসহযোগিতার অভিযোগ টেলিফোনেই নিষ্পত্তি করা হয়। অন্য অভিযোগ লিখিতভাবে জানানোর পরামর্শ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।

অভিযোগকারী নিজের সমস্যা নিয়েই শুধু অভিযোগ করেন তেমন নয়। বরং অনেক সময় অন্যের জালিয়াতি বা প্রভাবশালী গ্রাহকের অনৈতিক চাপ নিয়ে ব্যাংকার নিজেও বেনামে অভিযোগ করেন। বেসরকারি খাতের ন্যাশনাল ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে সিকদার পরিবারের ১১৭ কোটি টাকা পাচারের বিষয়টি কেন্দ্রীয় ব্যাংক উদ্ঘাটন করেছে এক অভিযোগের ভিত্তিতে। ব্যাংক খাতের আলোচিত হলমার্ক জালিয়াতি ধরা পড়েছিল প্রতিষ্ঠানটিতে সরবরাহকারী বিভিন্ন ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান যথাসময়ে বিল না পাওয়ার বিভিন্ন অভিযোগকে কেন্দ্র করে। আবার বিসমিল্লাহ গ্রুপ যে ঋণের নামে হাজার কোটি টাকার বেশি পাচার এবং ভুয়া বিলের বিপরীতে কোটি কোটি টাকা নগদ সহায়তা নেওয়ার তথ্য বের করার তথ্য সূত্র ছিল অভিযোগ। জাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ওয়েস্টার্ন মেরিনের নামে সেলিম চৌধুরী নামের এক ব্যক্তি একটি ভুয়া অ্যাকাউন্ট খোলা হয়। বিষয়টি নিয়ে ওয়েস্টার্ন মেরিনের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়। এর ভিত্তিতে অগ্রণী ব্যাংক থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে বের করে নেওয়া ২০ কোটি টাকা উদ্ধার হয়। এ ছাড়া আরও ৩০১ কোটি টাকা বের করে নেওয়া ঠেকিয়ে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এভাবে বিভিন্ন অভিযোগকে কেন্দ্র করে শত শত কোটি টাকা জালিয়াতি থেকে রক্ষার অনেক ঘটনা রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, কোনো না কোনো পর্যায় থেকে না জানলে জালিয়াতি ধরার উপায় থাকে না। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকের এই অভিযোগ কেন্দ্র ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম ধরার ক্ষেত্রে প্রাথমিক তথ্য সূত্র হিসেবে ব্যাপক কাজে দিচ্ছে।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com