জেব্রা ও সিংহের মৃত্যু

কর্তৃপক্ষ দায় এড়াতে পারে না

প্রকাশ: ৩১ জানুয়ারি ২২ । ০০:০০ | আপডেট: ৩১ জানুয়ারি ২২ । ০২:৫৫ | প্রিন্ট সংস্করণ

সম্পাদকীয়

গাজীপুর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কে একের পর এক জেব্রার অস্বাভাবিক মৃত্যু অনেক প্রশ্নই দাঁড় করিয়েছে। রোববার সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি মাসে ২২ দিনের ব্যবধানে ১১টি জেব্রার মৃত্যু হয়। এ পরিস্থিতির মধ্যেই ২৫ জানুয়ারি রাজধানীর মিরপুরে জাতীয় চিড়িয়াখানায় মারা যায় একটি সিংহ। শনিবার সমকালের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই সিংহের মৃত্যুর খবরটি চার দিন গোপন রেখেছিল কর্তৃপক্ষ। একই ঘটনা ঘটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কে জেব্রার মৃত্যুর ক্ষেত্রেও। প্রশ্ন হচ্ছে- এই গোপনীয়তার কারণ কী?

চিড়িয়াখানা কিংবা সাফারি পার্ক সুরক্ষিত স্থান এবং এগুলোতে যেসব পশুপাখি রয়েছে তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করাসহ যাবতীয় দেখভালের জন্য সুনির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষ রয়েছে। সাফারি পার্কের পশু চিড়িয়াখানার পশুপাখির মতো গণ্ডিবদ্ধ নয়। রোগব্যাধিতে যে কোনো প্রাণীর মৃত্যু হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু এই মৃত্যুর কারণ যদি থেকে যায় রহস্যাবৃত্ত এবং কর্তৃপক্ষ যদি তা গোপন রাখার অপচেষ্টা করে, তাহলে এ নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কে পরপর কয়েকটি জেব্রার মৃত্যুর পর বিশেষজ্ঞ বোর্ডের তড়িঘড়ি করে সংবাদ সম্মেলনে তথ্য উপস্থাপনের অভিযোগও উঠেছে। কেন কিংবা কী কারণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কে এতগুলো জেব্রার ধাপে ধাপে মৃত্যু হলো- এর কারণ তৎক্ষণাৎ উদ্ঘাটন করে যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়ার দায় কর্তৃপক্ষ এড়াতে পারে না। সাফারি পার্কে এত জেব্রার মৃত্যু একদিকে অস্বাভাবিক অন্যদিকে রহস্যজনক। এ ঘটনা তদন্তে এরই মধ্যে একটি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে। আমরা আশা করব, তারা যথাযথ কারণ উদ্ঘাটনে সক্ষম হবে। এর আগে দায়িত্বশীলরা জেব্রাগুলোর মৃত্যুর কারণ প্রাণঘাতী ব্যাকটেরিয়া ও নিজেদের মধ্যে সংঘাতের বিষয়ে সংবাদমাধ্যমে ব্যাখ্যা দেয়। প্রশ্ন হচ্ছে- যদি তা-ই হয় তাহলে ব্যাকটেরিয়ার উৎস নির্ণয়ক্রমে কেন দ্রুত তা প্রতিরোধে পদক্ষেপ নেওয়া হলো না? এর আগে জেব্রাগুলোর মধ্যে সংঘাতের কোনো ঘটনা ঘটেনি। তাই হঠাৎ কর্তৃপক্ষের সংঘাত-সংঘর্ষের ভাষ্য আরও প্রশ্নের উদ্রেক ঘটায়। বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের অভিমত- বেষ্টনীর মধ্যে থাকা জেব্রা নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষে জড়ায়, এমন নজির নেই। আমরা জানি, জেব্রা শিংহীন এক প্রজাতির পশু। তাই সংঘাত-সংঘর্ষে তারা একে অন্যকে ক্ষতবিক্ষত করার যুক্তিও ধোপে টেকে না। যদি তারা সংঘাতে জড়িয়ে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে থাকে, তাহলেও এ আঘাত এমন গুরুতর হওয়ার কথা নয়, যে কারণে মৃত্যুর ঘটনা ঘটতে পারে।

আমরা জানি, গত কয়েক বছরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কে বাঘ, জিরাফ, ক্যাঙ্গারু, জেব্রাসহ বিভিন্ন পশু ও কিছু দুর্লভ পাখির মৃত্যু হলেও অনেক ক্ষেত্রে এর সুনির্দিষ্ট কারণ কর্তৃপক্ষ নির্ণন করতে পারেনি। কোনো সংরক্ষিত স্থানে পশুপাখির মৃত্যু যদি হয় অস্বাভাবিক ও রহস্যজনক এবং এর পেছনে যদি থাকে দায়িত্বশীলদের দায়িত্বহীনতা কিংবা অবহেলা; তাহলে তা মেনে নেওয়া যায় না। সম্প্রতি এতগুলো জেব্রার মৃত্যুর বিষয়টি এসব প্রশ্নই সামনে নিয়ে এসেছে। আমরা জানি, ওই সাফারি পার্কে এরই মধ্যে পশুর সংখ্যা অনেক বাড়লেও সে তুলনায় বাড়েনি পার্কের আয়তন। এর ফলে আবাসন পরিবেশ অনেকটাই নষ্ট হয়েছে। আমরা এও জানি, সাফারি পার্ক কিংবা চিড়িয়াখানায় পশুর খাবার সরবরাহে নানারকম তুঘলকি কাণ্ড ঘটে। তাদের জন্য নির্দিষ্ট বরাদ্দের কিছু অংশ চলে যায় দায়িত্বশীল অসাধুদের উদরে। প্রশ্ন আছে খাবারের মান নিয়েও। সরবরাহকৃত খাদ্যের পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিষয়েও এর আগে প্রশ্ন উঠেছে। আমরা মনে করি, সব বিষয় খতিয়ে দেখে যথাযথ কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ফের তাগিদ দিয়েছে এতগুলো জেব্রার মৃত্যু। কারও দায়িত্বহীনতা এমন মর্মস্পর্শী ঘটনার জন্য দায়ী হলে এর প্রতিকার অবশ্যই জরুরি। পার্ক-চিড়িয়াখানায় পশুপাখির নিবিড় পর্যবেক্ষণ, স্বাস্থ্য সুরক্ষাসহ সব ব্যাপারে যথাযথ তদারকি করতেই হবে। বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কে নানা জাত ও জেব্রার সংখ্যা প্রজনন সম্ভাবনায় আরও বাড়তির দিকে ছিল। এ ক্ষেত্রে দেখা দিয়েছিল রপ্তানির সম্ভাবনাও। আমরা মনে করি, সরকারের সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয়ের এই রহস্য উন্মোচন ও প্রতিবিধান নিশ্চিত করা জরুরি।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com