সমকালীন প্রসঙ্গ

সিনহা হত্যা মামলায় 'আইনের মারপ্যাঁচ'

প্রকাশ: ০৬ ফেব্রুয়ারি ২২ । ০০:০০ | আপডেট: ০৬ ফেব্রুয়ারি ২২ । ০২:৩৫ | প্রিন্ট সংস্করণ

মো. রেজাউল করিম সিদ্দিকী

কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মোহাম্মদ ইসমাইল ৩১ জানুয়ারি ২০২২ তারিখে সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান হত্যা মামলার রায়ে ১৫ জন অভিযুক্ত আসামির মধ্যে প্রদীপ কুমার দাশ (বরখাস্তকৃত ওসি, টেকনাফ) এবং লিয়াকত আলীকে (বরখাস্তকৃত ইন্সপেক্টর, বাহারছড়া পুলিশ ফাঁড়ি) মৃত্যুদণ্ডাদেশ এবং অন্য ছয়জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেছেন। অবশিষ্ট সাতজনকে আদালত খালাস দিয়েছেন। এ রায়ে ভিকটিমের বোন ও মামলার বাদী শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস বলেছেন, তিনি ও তার পরিবার মনে করেন, রায়টি প্রত্যাশা পূরণ করেছে। কিন্তু সন্তুষ্ট তারা সেদিন হবেন, যেদিন রায়টি কার্যকর করা হবে।

রায় বাস্তবায়নের আগে পূর্ণ সন্তুষ্ট হওয়ার মতো অবস্থা আসলে নেই। সাম্প্রতিককালে বহু চাঞ্চল্যকর মামলার রায়ে অধস্তন আদালতে আসামিদের মৃত্যুদণ্ড হলেও আপিলে বেকসুর খালাস পাওয়ার নজির রয়েছে। তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ায় ত্রুটির কারণে আসামিদের বেকসুর খালাস পাওয়ায় মেজর সিনহার বোনের মতো ভুক্তভোগী অনেকের মনে খানিকটা উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও শঙ্কা তৈরি হয়েছে- শেষ পর্যন্ত নিষ্প্রভ প্রদীপরা আবার জ্বলে উঠবে না তো! এই উদ্বেগ ঘনীভূত হয়েছে মেজর সিনহা হত্যা মামলাটি সাধারণ হত্যা মামলা হিসেবে বিচার করার কারণে। মামলাটি নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩-এর আওতায় বিচার করা হলে খালাসপ্রাপ্ত সাতজনের হয়তো সাজা হতো। যারা ওই ঘটনায় বৈরী ভূমিকা পালন করেছিল, তাদের সঠিক আইনে বিচারের আওতায় আনলে দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধের পথ সুগম হতো।

উল্লেখ্য, ২০২০ সালের ৩১ জুলাই পুলিশের গুলি ও অমানবিক নির্যাতনে নিহত হন মেজর সিনহা। শামলাপুর চেকপোস্টে ব্যারিকেড দিয়ে গাড়ি থামিয়ে ভিকটিমকে ১ নম্বর আসামি লিয়াকত আলী গুলি করে রাস্তায় ফেলে দেন। ঘটনার দু'ঘণ্টা পর অকুস্থলে আসেন ২ নম্বর আসামি ওসি প্রদীপ। তিনিও নিপীড়ন চালান এবং সবশেষে ভিকটিমের গলায় পা দিয়ে পিষে পিষে মৃত্যু নিশ্চিত করেন। ওই হত্যাকাণ্ডে সহযোগিতা করে দায়িত্বরত পুলিশ ও এপিবিএনের কয়েক সদস্য। মৃতপ্রায় সিনহাকে তারা হাতকড়াও পরিয়ে দেয়! ঘটনাটি দেশজুড়ে শুধু চাঞ্চল্যই সৃষ্টি করেনি; সাবেক সেনা কর্মকর্তার ওপর পুলিশ সদস্যদের পৈশাচিক আক্রমণের ফলে আন্তঃবাহিনী টানাপোড়েন দেখা দিয়েছিল। যার ফলে তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ এবং পুলিশপ্রধান বেনজীর আহমেদ একসঙ্গে কক্সবাজার গিয়েছিলেন এবং যৌথভাবে সংবাদ সম্মেলন করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন। ঘটনার চার দিন পর ৫ আগস্ট হত্যা মামলাটি করেন মেজর সিনহার বোন। মামলা করার চার মাসের মধ্যে র‌্যাব তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয় এবং ৩১ ডিসেম্বর ২০২০ তারিখে বিজ্ঞ জেলা ও দায়রা জজ হত্যা মামলার অভিযোগপত্র গ্রহণ করেন। ২০২১ সালের মাঝামাঝি থেকে বিচার কার্যক্রম শুরু হয়।

নির্যাতন এবং অন্যান্য নিষ্ঠুর, অমানবিক, লাঞ্ছনাকর অথবা দণ্ডবিরোধী একটি আন্তর্জাতিক সনদের পক্ষরাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩ প্রণয়ন করে। মূলত এ আইনটির মাধ্যমে বিচারবহির্ভূত হত্যা কিংবা নির্যাতন বন্ধের কার্যকর উদ্যোগ নিয়েছিল রাষ্ট্র। এ আইনের ২(৭) নম্বর ধারায় বলা হয়েছে- 'হেফাজতে মৃত্যু অর্থ সরকারি কোনো কর্মকর্তার হেফাজতে কোনো ব্যক্তির মৃত্যু; ইহা ছাড়াও হেফাজতে মৃত্যু বলিতে অবৈধ আটকাদেশ, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কর্তৃক গ্রেপ্তারকালে কোনো ব্যক্তির মৃত্যুকেও নির্দেশ করিবে; কোনো মামলায় সাক্ষী হউক বা না হউক জিজ্ঞাসাবাদকালে মৃত্যুও হেফাজতে মৃত্যুর অন্তর্ভুক্ত হইবে।' আইনের ১৫(২) ধারামতে, কোনো ব্যক্তি অন্য কোনো ব্যক্তিকে যদি নির্যাতন করেন এবং উক্ত নির্যাতনের ফলে উক্ত ব্যক্তি যদি মৃত্যুবরণ করেন তাহলে নির্যাতনকারী এ আইনের ১৩(১) ধারা অনুযায়ী অপরাধ করেছেন বলে গণ্য হবেন এবং তজ্জন্য অভিযুক্ত ব্যক্তি অনূ্যন যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড অথবা নূ্যনতম এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং অর্থদণ্ডের অতিরিক্ত দুই লাখ টাকা ক্ষতিগ্রস্ত বা সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিকে প্রদান করবেন। কোনো ব্যক্তি এ অপরাধ সংঘটনে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে সহায়তা বা প্ররোচিত করলে কিংবা অপরাধ সংঘটনে ষড়যন্ত্র করলে তিনিও এ আইনের ১৫(৩) ধারা মোতাবেক অনূ্যন দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড অথবা ২০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। ২(৪) ধারামতে, পুলিশসহ দেশে আইন প্রয়োগ ও বলবৎকারী সরকারি কোনো সংস্থাকে বোঝায়।

মেজর সিনহা হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত মূল আসামি প্রদীপ এবং লিয়াকত ডিউটিরত পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন। তারা মেজর সিনহাকে সন্দেহভাজন বা অন্য যে কোনো কারণেই হোক আইনি ক্ষমতাবলে নিজ নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিলেন এবং গুলি চালিয়ে ও শারীরিক আঘাতে হত্যা করেন। ফলে স্পষ্টতই তারা নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩-এর আওতায় অপরাধ সংঘটন করেছেন। এ দু'জনকে ঘটনার আগে-পরে সহযোগিতা প্রদান করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আরও কয়েক সদস্য। মামলাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে তিনটি মিথ্যা মামলা পুলিশের পক্ষ থেকে রুজু করা হয়। সব বিষয় অবহিত থাকার পরও অভিযুক্ত পুলিশ কর্তকর্তাদের বিরুদ্ধে সংশ্নিষ্ট আইনে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় তৎকালীন পুলিশ সুপারসহ অনেকেরই নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩-এর ধারা ১৫(২)-এর অধীনে অভিযুক্ত হওয়ার কথা। যেহেতু এ আইনে বলা হয়েছে- অন্যান্য আইনে যা কিছুই থাকুক না কেন, পুলিশি হেফাজতে নির্যাতন বা মৃত্যুর ক্ষেত্রে এ আইনের বিধানাবলি প্রাধান্য পাবে; সেহেতু আইনের কোনো বিধান উপেক্ষিত হয়ে থাকলে সেই ত্রুটির পুরো সুবিধা পাবে দণ্ডিত আসামিরা।

২০০২ সালে অঞ্জলী দেবী নামে একজন ভারতীয় নাগরিক বাংলাদেশে অবৈধ অনুপ্রবেশ করে পাবনা জেলা থেকে একটি ৪ বছর বয়সী শিশুকে চুরি করে নিয়ে যাওয়ার পথে জনতার হাতে ধরা পড়ে। সে ঘটনায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৬(১) ধারায় মামলা হলে অঞ্জলীকে ২০০৫ সালের জুন মাসে পাবনার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেন। পরে মহামান্য হাইকোর্ট ডেথ রেফারেন্স ও অঞ্জলীর আপিল শুনানির পর অধস্তন আদালতের দণ্ডাদেশ বাতিল করে অঞ্জলীকে বেকসুর খালাস প্রদান করেন। উচ্চ আদালত মনে করেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের সংশ্নিষ্ট ধারাটি তখনই প্রযোজ্য হবে, যখন কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তি পুরোপুরি নিজের জিম্মায় চুরিকৃত শিশুটিকে নিতে পারবে। দণ্ডবিধির সাধারণ অপহরণ বা চুরির মামলায় বিচার করা হলে শাস্তি হয়তো কম হতো, কিন্তু অঞ্জলী বেকসুর খালাস পেতে না। আশা করি, মেজর সিনহার ক্ষেত্রে এমনটি ঘটবে না।

মো. রেজাউল করিম সিদ্দিকী: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী

advreja@gmail.com

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com