হিমেলের অকাল মৃত্যু এবং আমাদের করণীয়

প্রকাশ: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২২ । ১৭:১২ | আপডেট: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২২ । ১৭:১২

 প্রভাষ কুমার কর্মকার

মাহবুব হাবিব হিমেল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের অধীন গ্রাফিক ডিজাইন, কারুশিল্প ও শিল্পকলার ইতিহাস বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী গত ১ ফেব্রুয়ারি রাত ৯টায় নির্মাণাধীন ২০ তলা বিজ্ঞান ভবনের নির্মাণসামগ্রী বোঝাই ট্রাকের চাপায় নিহত হয়। হৃদয়বিদারক এ দৃশ্য আমাদের কাঁদিয়েছে, বাকরুদ্ধ করেছে। নিজের প্রিয় ক্যাম্পাস মতিহারে হিমেলের এমন অস্বাভাবিক আত্মবিসর্জন কোনোভাবেই মেনে নেওয়ার মতো না।

একজন বিধবা মায়ের একমাত্র অবলম্বন একটি টগবগে তরুণ আমাদের হিমেল চোখে-মুখে কত স্বপ্ন, না বলা চাওয়া নিয়েই যে এই মতিহারের সবুজ চত্বরে এসেছিল তা হয়তো অনুধাবন অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। তবে সে যে এক সোনালি স্বপ্ন নিয়ে এসেছিল বিশ্বমানের বিদ্যাপীঠ থেকে শিক্ষা নিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মুখ উজ্জ্বল করে কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠা লাভ করবে- পরিবার সমাজ দেশকে আলোকিত করবে তা বুঝতে আর কারোরই বাকি নেই। কিন্তু তার জীবনপ্রদীপ কেড়ে সব স্বপ্নের ইতি ঘটাল সেই নির্মাণসামগ্রী বোঝাই ঘাতক ট্রাক- শহীদ হলো মাহবুব হাবিব হিমেল। শেষ হলো গত তিন-চারটি বছরে তার সকল অর্জন-সাধনা। অসহায় মা, আত্মীয়স্বজন, সহপাঠী বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের কান্নার সাগরে ভাসিয়ে হিমেল ওপারে চলে গেল চিরদিনের মতো। তারুণ্যের ঝলকানিতে আর কখনও এই প্রতিভাবানের উপস্থিতি পাওয়া যাবে না এই উত্তরাঞ্চলের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠে। আর তাকে কর্মব্যস্ত হতে কেউ দেখবে না। বিকশিত হওয়ার আগেই এই ফুলটিকে ঝরিয়ে দিল এক ঘাতক চালকের স্টিয়ারিং। এই বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারকেও চোখের জলে বিদায় জানানো ছাড়া গত্যন্তর রইল না। প্রিয় ছাত্র হিমেল তুমি ওপারে ভালো থেকো- তোমার আত্মার চিরশান্তি কামনা করি। তোমার এ চলে যাওয়া যে কোনোক্রমেই স্বাভাবিক নয়- তাইতো তোমার সহপাঠী, পরম আত্মীয় স্বজনের সঙ্গে আমরাও এই মর্মান্তিক মৃত্যুর সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করি।

এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ছয় দশককাল অতিবাহিত হয়ে সপ্তম দশক চলমান- অনেক অতীত ঐতিহ্য, অহংকার দেশের মুক্তিসংগ্রাম থেকে অন্য যে কোনো ন্যায়সংগত আন্দোলনে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরবোজ্জ্বল অবদানে আমরা এখনও প্রীত হই, আবার অনেক আক্ষেপও আমাদের তাড়া করে ফেরে কখনও কখনও।

আজ আমাদের অবস্থান যে বিদ্যায়তনে সেখানে ছাত্র-শিক্ষক মধুর সম্পর্ক আগেও ছিল, এখনও যে নেই তা কিন্তু নয়। আমরা এখন যে কম দায়িত্বশীল তাও নয়, আবার কেউবা কখনও যে দায়িত্বহীনতার পরিচয় দেয়নি- এটিও শক্তভাবে বলা যায় না। আমার মনে হয়, কোথাও যেন একটু শূন্যস্থান থেকেই গিয়েছিল। তাইতো আজকের এই বিয়োগান্ত ঘটনার সঙ্গে খুবই সম্পৃক্ত দুটি কথা বলতে বড় ইচ্ছে করছে।

আমাদের বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক গোলাম সাব্বির সাত্তার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন খুব বেশিদিন হয়নি। তিনি দায়িত্ব নিয়ে যে দুটি বিষয়ের চটজলদি অনুকরণীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন তার দ্বিতীয়টি হিমেলের দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু সংশ্নিষ্ট। এই মর্মান্তিক ঘটনায় যেভাবে তিনি ছাত্রদের কাছে এসেছেন তাতে মনে হয় আমরা এই বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন অনেক বড় দায়িত্ববান অভিভাবক পেয়েছি। আর কেনইবা হবেন না? তাকে তো দায়িত্ববান হতেই হবে- কারণ তিনি তো ছাত্রদের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গকারী মহান শিক্ষক দেশের প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবী ড. শামসুজ্জোহার উত্তরসূরি শিক্ষক।

স্যালুট জানাই ছাত্রবান্ধব অভিভাবক, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মহোদয়কে- তিনি হিমেলের পরিবারের জন্য আর্থিক সুবন্দোবস্ত করবেন মর্মে সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছেন, হিমেলের মাকে দেখাশোনা করতে পারবে এমন কাউকে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবেন বলে জানিয়েছেন। এ হত্যা ঘটনার আইনানুগ ব্যবস্থা যাতে হয় সেই দিকটিও তিনি দেখবেন। ইতোমধ্যে ঘাতক চালক পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছে। ছাত্রদের সব দাবি উপাচার্য মেনে নিয়েছেন। নতুন প্রক্টর নিয়োগ হয়েছে। আমাদের প্রত্যাশা থাকবে নতুন প্রক্টর যেন শিক্ষার্থীবান্ধব হয়- শহীদ ড. জোহার পদাঙ্ক অনুসরণ করে শিক্ষার্থীদের ন্যায্য চাওয়া পূরণের মাধ্যমে তাদের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে পারেন। প্রকৃতপক্ষে প্রশাসনিক হারমনি যেন বজায় থাকে- যেমনভাবে নিষ্ঠাবান হয়ে উপাচার্য মহোদয় কাজ করছেন তেমনভাবে তিনিও দায়িত্বশীল থাকবেন- এ আশা আমরা করতেই পারি। এ প্রত্যাশা করি যাতে করে আর কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়কে স্পর্শ করতে না পারে। তার কাছ থেকেও সর্বোচ্চ নজরদারি এবং যথাযথ পদক্ষেপ আশা করি।

উপাচার্য মহোদয় জানিয়ে দিয়েছেন নির্মাণাধীন ভবনের নামকরণ হিমেলের নামে করবেন। যদিও কোনো কিছুরই বিনিময় একটি জীবন ফেরাতে পারে না তবুও বর্তমান উপাচার্য মহোদয় যেভাবে ছাত্রদের বিপদে এগিয়ে এসে সিদ্ধান্ত নিলেন আমি মনে করি এটি একটি অনন্য নজির। সুতরাং আমাদের সকলকেই ছাত্র-শিক্ষক সুসম্পর্ক বজায় রাখতে দায়িত্বশীল হতে হবে।

এই বিদ্যাপীঠে শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখতে, সম্প্রীতির বন্ধন অটুট রাখতে শিক্ষার্থী বন্ধুদেরও সহনশীল হতে হবে। সর্বোচ্চ পর্যায়ের অভিভাবকের এমন মনে রাখার মতো পদক্ষেপগুলো সম্মান দেখাতে হবে এবং আমাদের মনে রাখা দরকার যে, শিক্ষার উন্নয়নে ভৌত-কাঠামোগত উন্নয়নও প্রয়োজন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে প্রধানমন্ত্রীর সানুগ্রহ সহযোগিতার জন্য দেশরত্ন শেখ হাসিনার কাছে আমরা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।

তবে এসব চলমান কাজে সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় নিতে হবে। যদিও আমাদের আগেই উচিত ছিল এত বড় উন্নয়ন কাজের শুরু থেকেই সাবধানতা অবলম্ব্বন করা, প্রশাসনের প্রত্যক্ষ মেশিনারিজের সঙ্গে সঙ্গে নির্মাণকাজে প্রকৌশল দপ্তরসহ সংশ্নিষ্ট অন্য দপ্তরকে দায়িত্বশীল হওয়া, সঠিক দায়িত্ব পালন করা। তবে এটিও সত্য যে এমন বিশাল কর্মযজ্ঞের অভিজ্ঞতা এ বিশ্ববিদ্যালয়ের নেই। এমন অভিজ্ঞতা থাকলে হয়তো এ দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হতো। তবুও হিমেলের জীবনদান থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে।

এ লক্ষ্যে অন্যান্য সুরক্ষা বিষয়ের সঙ্গে সঙ্গে নিল্ফেম্নাক্ত পদক্ষেপগুলো অনুসরণ করা যেতে পারে-

১) আমাদের উচিত হবে ভারী পণ্যবাহী পরিবহন ক্যাম্পাসে প্রবেশের একটি নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করে দেওয়া (হতে পারে তা রাত ১২টা থেকে ভোর ৫টা)।

২) একটি নির্দিষ্ট রুট ব্যবহার করে পণ্য পরিবহন করতে হবে। সুরক্ষার জন্য পণ্য পরিবহন পথটি ঘেরা থাকতে হবে।

৩) এ কাজে বহুল ব্যবহূত কোনো গেট ব্যবহার করা ঠিক হবে না। প্রয়োজনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে অস্থায়ীভাবে ট্রাক প্রবেশের জন্য কোনো গেটের ব্যবস্থা করা।

৪) সতর্কতামূলক প্রচার করে শিক্ষার্থী-শিক্ষক-কর্মকর্তা ও সর্বসাধারণকে সচেতন করতে হবে।

৫) বিপজ্জনক কাজে ব্যবহূত এলাকায় পাহারার ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে কোনো পথচারী ওইসব এলাকাতে যেতে না পারে।

হিমেলের আত্মার শান্তিকল্পে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক দেয় সব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে হবে এবং সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে যাতে এমন আর কোনো স্বপ্ন যেন অঙ্কুরেই বিনাশ না হয়।

এতক্ষণে আমি উপাচার্য কর্তৃক গৃহীত দ্বিতীয় পদক্ষেপটি ও এতদসংশ্নিষ্ট দাবির কথাই বলছিলাম। এখন প্রথম নন্দিত দুঃসাহসী পদক্ষেপ খুব সংক্ষেপে তুলে ধরতে চাই। অতি সম্প্রতি বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক প্রয়াত হয়েছেন। তাকে বর্তমান উপাচার্যের একক তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের কারণেই এই গুণীজনকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার চত্বরে সমাহিত করার ব্যবস্থা হয় যা প্রথিতযশা মহান ব্যক্তির প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধারই বহিঃপ্রকাশ।

আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, যে বিশ্ববিদ্যালয়ের গর্বের আকর হিসেবে প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক ড. সৈয়দ মুহম্মদ শামসুজ্জোহা, শহীদ বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক সুখরঞ্জন সমাদ্দার, শহীদ বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক হবিবুর রহমান, শহীদ বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক মীর আব্দুল কাইয়ূম, জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, অধ্যাপক আজিজুর রহমান মল্লিক, ড. সালাহ্‌উদ্দিন আহমদ, অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, ড. মমতাজউদ্দীন আহমদ, ড. খান সরোয়ার মুরশিদ, ড. মযহারুল ইসলাম, অধ্যাপক এ বি এম হোসেন, অধ্যাপক আহমদ হোসেন, ড. কাজী আব্দুল লতিফ, ড. ফজলুল হালিম চৌধুরী, অধ্যাপক খন্দকার মনোয়ার হোসেন, সাবেক প্রধান বিচারপতি ব্যারিস্টার মুহম্মদ হাবিবুর রহমান, বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক, যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক হাইকমিশনার অধ্যাপক সাইদুর রহমান খান, অধ্যাপক আবদুল খালেক, বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন, বিশিষ্ট বিজ্ঞানী অধ্যাপক অরুণ কুমার বসাক, স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক সনৎ কুমার সাহাসহ অগণিত কীর্তিমানের দেখা মিলেছে সেই বিশ্ববিদ্যালয় তো মাথা উঁচু করে দাঁড়াবেই।

সর্বোপরি যে বিশ্ববিদ্যালয়ে জাতির পিতার চরণ স্পর্শ পড়েছে- কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার বেদির শিলান্যাসস্থলে তার উপস্থিতি আজও আমাদের মনকে আন্দোলিত করে সেই ঐতিহ্যমণ্ডিত আমাদের প্রাণের ক্যাম্পাস জ্ঞানের বাতিঘর হয়ে থাকুক, সেবা দিয়ে যাক দেশ-জাতি এবং সমাজের উন্নয়নে এবং গর্বের এই বিদ্যায়তনের প্রধান নির্বাহী উপাচার্যের আগামী দিনগুলো যশস্বী পদক্ষেপ গ্রহণের মধ্য দিয়েই কাটুক- এ প্রত্যাশা আজ প্রায় পঞ্চাশ হাজার ছাত্র-শিক্ষক-কর্মকর্তার সম্মিলিত এই স্বনামধন্য রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের।


© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com