অ্যাসিডে আবার মৃত্যু

বাঁচানো গেল না সাটুরিয়ায় ঝলসে যাওয়া সাথীকে

প্রকাশ: ১০ ফেব্রুয়ারি ২২ । ২২:২৬ | আপডেট: ১০ ফেব্রুয়ারি ২২ । ২২:২৬

সমকাল প্রতিবেদক, ঢাকা ও সাটুরিয়া (মানিকগঞ্জ) প্রতিনিধি

ছবি: এসিড সারভাইভারস ফাউন্ডেশন

অ্যাসিড নিক্ষেপে আবার মৃত্যু ঘটল। মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ায় অ্যাসিডে ঝলসে যাওয়া পোশাককর্মী সাথী আক্তারের ওপর সাবেক স্বামীর অ্যাসিড নিক্ষেপের দুই সপ্তাহ পর বুধবার রাতে তিনি মারা গেছেন। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে বর্বরোচিত এ সহিংসতা কমে এলেও তা যে বন্ধ হয়নি- সে কথাই মনে করিয়ে দিল এ ঘটনা।

সাবেক স্বামী নাঈমের ছোড়া অ্যাসিডে সারা শরীর ঝলসে গিয়েছিল সাথীর। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বুধবার রাতে মারা যান তিনি।

সাথীর বাবা আব্দুল সাত্তার বাকপ্রতিবন্ধী। তিনি মেয়ের লাশ বুকে জড়িয়ে হাউমাউ করে কাঁদছিলেন। প্রতিবেশীরা তাকে শান্ত করার চেষ্টা করছিলেন। সাথীর মা জুলেখা বেগম বলেন, 'আমার মেয়েকে হত্যা করা হয়েছে। আমি ঘাতকের ফাঁসি চাই।' ইতোমধ্যে নাঈমের ফাঁসির দাবিতে এলাকাবাসী মানববন্ধন করেছেন।

গত ২৯ জানুয়ারি সাথীকে তার বাবার বাড়িতে অ্যাসিড ছুড়ে মারে নাঈম। এতে তার মুখমণ্ডলসহ শরীর ঝলসে যায়। আহত হন সাথীর মা জুলেখা ও বোন ইতি আক্তার। পরে নাঈম ঘরে পেট্র্রোল ঢেলে আগুন লাগিয়ে তাদের হত্যা করতে চেয়েছিল বলে গ্রেপ্তারের পর পুলিশের কাছে স্বীকারোক্তি দিয়েছে।

এলাকাবাসী জানান, দুই বছর আগে সাথীর বিয়ে হয়েছিল মানিকগঞ্জের বেতুলিয়া গ্রামের নাঈমের সঙ্গে। বিয়ের পর থেকে যৌতুকের জন্য শারীরিক নির্যাতন করত নাঈম। সে নেশাখোর হওয়ায় ছয় মাস আগে তাদের বিয়ে বিচ্ছেদ হয়। সাথী ধামরাইয়ের একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। কারখানায় আসা-যাওয়ার পথে সাথীকে উত্ত্যক্ত করত নাঈম। সাথীকে পুনরায় বিয়ের প্রস্তাব দেয় সে। এ প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় নাঈম এ ঘটনা ঘটায়।

গত ১ ফেব্রুয়ারি র্যাাব নাঈমকে গ্রেপ্তার করে সাটুরিয়া থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে। এ সময় নাঈম র্যাবব ও পুলিশের কাছে অ্যাসিড ও পুড়িয়ে হত্যা করার পরিকল্পনার কথা স্বীকার করে। সাটুরিয়া থানার ওসি আশরাফুল আলম বলেন, অ্যাসিড মামলার পাশাপাশি এখন হত্যার মামলায়ও আসামি করা হবে নাঈমকে।

স্থানীয় ধানকোড়া ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুর রউফ জানান, সাথীর পরিবার অত্যন্ত নিরীহ। তার বাবা বাকপ্রতিবন্ধী ও তার ছোট ভাই শারীরিক প্রতিবন্ধী। সাথীর বাবা এক দিন কাজ না করলে তাদের অনাহারে থাকতে হয়। তিনি নাঈমের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন। সাটুরিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মজিদ বলেন, যেভাবে সাথীকে অ্যাসিড মেরে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে, সেভাবেই ওই নরপশুর বিচার হওয়া উচিত। এ জন্য সব ধরনের সহযোগিতা সাথীর পরিবারকে দেওয়া হবে।

বন্ধ হয়নি অ্যাসিড সন্ত্রাস:

সামাজিক আন্দোলন, ধারাবাহিক সচেতনমূলক কার্যক্রম ও কঠোর আইনের কারণে গত কয়েক বছরে অ্যাসিড সন্ত্রাস কমে এলেও তা বন্ধ হয়নি। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত জানুয়ারিতে দেশে অ্যাসিডদগ্ধের শিকার হয়েছেন ২ জন। ২০২১ সালে এর শিকার হয়েছেন ২২ জন। এদের মধ্যে অ্যাসিডদগ্ধের কারণে ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া ২০১২ থেকে '১৮ সাল পর্যন্ত অর্থাৎ সাত বছরে অ্যাসিডদগ্ধের শিকার হয়েছেন ২৯২ জন। এর মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ১৬ জনের।

অ্যাসিড সারভাইভারস ফাউন্ডেশনের সাবেক উপদেষ্টা ও মানসিক স্বাস্থ্য অধিকারকর্মী মনিরা রহমান বলেন, দীর্ঘদিন অ্যাসিড অপরাধ নিয়ে ন্যাশনাল অ্যাসিড কন্ট্রোল কাউন্সিল ও ডিস্ট্রিক্ট অ্যাসিড কন্ট্রোল কমিটিগুলোর কোনো সভা অনুষ্ঠিত না হওয়া, অ্যাসিড সংক্রান্ত মামলার বিচার না হওয়া; সর্বোপরি জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার কারণে অ্যাসিড সন্ত্রাসের ভয়াবহতা ফিরে আসতে পারে। শুরুতেই দ্রুততার সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে পরিস্থিতি সামলানো মুশকিল হবে।

অ্যাসিড অপরাধ দমন আইন-২০০২ এ উল্লেখ আছে, ট্রাইব্যুনাল বিচারের জন্য মামলার নথি প্রাপ্তির তারিখ থেকে ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে বিচারকার্য সমাপ্ত করবেন। অ্যাসিড সন্ত্রাসের শিকার ভিকটিমকে নিয়ে কাজ করা অধিকারকর্মীরা বলছেন, অ্যাসিড মামলায় বিচারের সংখ্যা খুবই কম। ১৯৯৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত এক হাজার ৯৩৪ জন নারী অ্যাসিড সন্ত্রাসের শিকার হলেও অপরাধীদের মধ্যে সাজা পেয়েছে মাত্র ৩৩৪ জন। তাদের মধ্যে ১৪ আসামির মৃত্যুদণ্ড হলেও কারও সাজা কার্যকর হয়নি। এ সময় খালাস পেয়েছে ১৯০৮ জন আসামি।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com